ট্রাম্প প্রশাসনের নীতি অভিবাসীদের নোবেল পুরস্কারকে হুমকির মুখে ফেলছে
জর্ডানের এক শরণার্থী পরিবারে জন্ম নিয়েছেন ওমর ইয়াঘি। তাঁর শৈশব কেটেছে চরম দারিদ্র্যে, এক কক্ষের ছোট্ট ঘরে আট ভাইবোন, মা-বাবা আর গবাদি পশুর সঙ্গে। ঘরে ছিল না বিদ্যুৎ, ছিল না পানির সংযোগ। স্কুলের বইয়ে পরমাণুর ছবি দেখেই বিজ্ঞানের প্রতি তাঁর প্রথম ভালোবাসা জন্মায়। বাবার সামান্য আয়ের ওপর ভরসা করে মাত্র ১৫ বছর বয়সে তিনি পাড়ি জমান যুক্তরাষ্ট্রে। সেই ওমর ইয়াঘি ৬০ বছর বয়সে ২০২৫ সালে রসায়নে নোবেল পেলেন। ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়ায় অধ্যাপনা করছেন। রসায়নে বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ বিজ্ঞানীদের একজন তিনি।
ড. ইয়াঘির এই গল্প যুক্তরাষ্ট্রে নতুন কিছু নয়। পরিসংখ্যান বলছে, একবিংশ শতাব্দীতে পদার্থ, রসায়ন এবং চিকিৎসাবিজ্ঞানে যুক্তরাষ্ট্র যতগুলো নোবেল জিতেছে, তার ৪০ শতাংশই এসেছে অভিবাসীদের হাত ধরে। অর্থনীতিবিদেরা মনে করেন, সিলিকন ভ্যালির ট্রিলিয়ন ডলারের কোম্পানি বা যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমানের এই শক্তিশালী অর্থনীতির পেছনে অভিবাসী বিজ্ঞানীদের অবদান অপরিসীম। তবে ট্রাম্প প্রশাসনের আমেরিকা ফার্স্ট নীতির কারণে এই সাফল্যের ধারা ব্যাহত হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা। তাঁদের মতে, বৈধ অভিবাসী, বিদেশি ছাত্র এবং গবেষকদের আসার পথ সংকুচিত হলে যুক্তরাষ্ট্রের সমৃদ্ধির দিন হয়তো ফুরিয়ে আসবে।
ড. ইয়াঘি নিজেও এই শঙ্কার কথা জানিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘মানব সভ্যতার ইতিহাস বলে, জ্ঞানার্জনের জন্য পণ্ডিতরা যুগে যুগে সীমানা পেরিয়েছেন। এভাবেই জ্ঞান ছড়িয়েছে, বিশ্ব দারিদ্র্যমুক্ত হয়েছে। ভিন্ন ভিন্ন ব্যাকগ্রাউন্ডের মানুষ এক হলে সবার উন্নতি হয়। বিশ্বের মহান চিন্তাবিদরা শুধু আমেরিকার নয়, পুরো বিশ্বের সম্পদ।’
পরিসংখ্যান বলছে, একবিংশ শতাব্দীতে পদার্থ, রসায়ন এবং চিকিৎসাবিজ্ঞানে যুক্তরাষ্ট্র যতগুলো নোবেল জিতেছে, তার ৪০ শতাংশই এসেছে অভিবাসীদের হাত ধরে।
অন্যদিকে হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র অ্যাবিগেল জ্যাকসন স্পষ্ট জানিয়েছেন, প্রশাসন বিদেশি কর্মীদের চেয়ে মার্কিন কর্মীদেরই অগ্রাধিকার দেবে। তিনি বলেন, ‘মার্কিন মেধাই এই দেশকে আজকের সুপারপাওয়ার বানিয়েছে।’ কিন্তু জর্জ মেসন ইউনিভার্সিটির ইনস্টিটিউট ফর ইমিগ্রেশন রিসার্চের পরিচালক লিসা গিলম্যান এর সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করেন। তিনি বলেন, ‘এই নীতিগুলো প্রতিভাদের আসার পথ বন্ধ করে দিচ্ছে। এভাবে চলতে থাকলে বিজ্ঞান ও উদ্ভাবনে বিশ্বনেতা হিসেবে আমাদের অবস্থান হারাব।’
সফলতার খতিয়ান হিসেবে হাঙ্গেরির কাতালিন কারিকো এবং ড্রু ওয়াইসম্যানের কথাই ধরা যাক। একসময় তাঁদের কাজ খুব একটা গুরুত্ব দেওয়া হতো না। কিন্তু তাঁদের গবেষণাই পরবর্তীতে কোভিড-১৯-এর জীবনরক্ষাকারী ভ্যাকসিনের পথ দেখিয়েছে এবং ২০২৩ সালে তাঁরা চিকিৎসায় নোবেল পান। সেমিকন্ডাক্টর বা চিপ প্রযুক্তির বিকাশেও অভিবাসীদের অবদান অনস্বীকার্য।
জাপানের লিও এসাকি, নরওয়ের ইভার গিয়াভার, জার্মানির হার্বার্ট ক্রোয়েমার এবং কানাডার উইলার্ড এস. বয়েলের মতো বিজ্ঞানীরা যুক্তরাষ্ট্রে কাজ করার সময়ই নোবেল পেয়েছেন। তাঁদের আবিষ্কারের ফলেই আজ আমাদের হাতে স্মার্টফোন, ডিজিটাল ক্যামেরা এবং মহাকাশ গবেষণার উন্নত যন্ত্রপাতি এসেছে।
ড. ইয়াঘির আবিষ্কৃত মেটাল-অর্গানিক ফ্রেমওয়ার্কস বাতাস থেকে পানি শুষে নিতে পারে। জর্ডানে পানি সংগ্রহের কষ্টই তাঁকে এই আবিষ্কারে উদ্বুদ্ধ করেছিল। তিনি বলেন, ‘আমার সেই অতীত না থাকলে এই আবিষ্কার হয়তো সম্ভব হতো না।’
লিসা গিলম্যান বলেন, ‘এই নীতিগুলো প্রতিভাদের আসার পথ বন্ধ করে দিচ্ছে। এভাবে চলতে থাকলে বিজ্ঞান ও উদ্ভাবনে বিশ্বনেতা হিসেবে আমাদের অবস্থান হারাব।’
একইভাবে পদার্থবিজ্ঞানের জগতকে বদলে দিয়েছেন ফ্রান্সের মিশেল এইচ. দ্যোভেরে এবং ইংল্যান্ডের জন ক্লার্ক। তাঁরাও চলতি বছর ওম্র ইয়াঘির সঙ্গে রসায়নে নোবেল পেয়েছেন।
ট্রাম্প প্রশাসনের স্টিফেন মিলার দাবি করেছেন, বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে যখন অভিবাসন কম ছিল, তখনো যুক্তরাষ্ট্রে বিজ্ঞানে দাপট দেখিয়েছে। একে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের নিজস্ব জিনিয়াস বলে অভিহিত করেন। তবে ইতিহাসবিদরা মনে করিয়ে দিচ্ছেন, সেই সময়েও নিউক্লিয়ার যুগে যুক্তরাষ্ট্রের অগ্রগতির পেছনে ছিল ফেলিক্স ব্লচ, এমিলিও সেগ্রে, মারিয়া গোয়েপার্ট মায়ার, ইউজিন উইগনার এবং হ্যান্স বেথের মতো নোবেলজয়ী অভিবাসীদের অবদান।
ড. ইয়াঘি সতর্ক করে বলেন, ‘বিজ্ঞানীরা দেশের ভবিষ্যতের জন্য বিনিয়োগ। আমরা যদি পিছিয়ে পড়ি, চীন বা অন্য কেউ আমাদের জায়গা দখল করে নেবে।’
বিজ্ঞান কোনো সীমানা মানে না, আর যুক্তরাষ্ট্রে এতদিন সেই অবারিত মেধার সুফলই ভোগ করে এসেছে। এখন দেখার বিষয়, দরজা বন্ধ করে দিয়ে সেই অগ্রযাত্রা ধরে রাখা সম্ভব হয় কি না।