শিশুদের মনে বিজ্ঞানের বিস্ময় সৃষ্টি করুন
প্রত্যেক মানুষেরই তিনটি চোখ থাকে। দুটি চোখ দিয়ে আমরা দেখি, তিন নম্বর চোখ দিয়ে সেই দেখাকে গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করি, ছবিগুলোকে উপলব্ধি করার চেষ্টা করি এবং সবকিছু অনুভব করি। যাঁদের এই তৃতীয় নয়ন যত বেশি শক্তিশালী, তাঁরা সবকিছু তত বেশি নিখুঁতভাবে দেখতে পান। মার্কিন পরিবেশবিদ ও বিজ্ঞান লেখিকা রেচেল কারসন এই তৃতীয় চোখটি খোলা রাখার কথা বলেছেন এবং কীভাবে তা খুলতে হবে সেই পরামর্শও দিয়েছেন।
তিনি বলেছেন, ‘One way to open your eyes is to ask yourself, what if I had never seen this before? What if I knew I would never see it again?’—অর্থাৎ ‘চোখ খোলার একটি অন্যতম উপায় হলো নিজেকে জিজ্ঞেস করা, যদি আমি এটি আগে কখনো না দেখতাম, তাহলে কেমন হতো? আমি যদি জানতাম যে এটি আর কখনো দেখতে পাব না, তবে কেমন হতো?’
আমরা আমাদের চারপাশে যা কিছু দেখি, সেদিকে শুধু তাকালেই হবে না; তাকিয়ে দেখার পর সেখান থেকে মনে প্রশ্নের পর প্রশ্ন জাগাতে হবে—কী ওটা? কেন ওটা এমন হলো? কী করে ওটা তৈরি হলো ইত্যাদি ইত্যাদি। ভাবতে হবে সেসব প্রশ্নের উত্তর পাওয়ার জন্যও। প্রশ্নগুলো হবে নিজের কাছেই নিজের। আর এই অভ্যাস গড়ে তুলতে সাহায্য করতে হবে আমাদের সন্তানদের, যেন তারা ছোটবেলা থেকেই এমন একটি বিজ্ঞানমনস্ক অনুসন্ধানী মন নিয়ে বড় হয় এবং সবকিছু দেখেই বিস্ময় ও কৌতূহল বোধ করে।
রেচেল কারসন একাধারে প্রকৃতিবিদ, জীববিজ্ঞানী ও লেখিকা। যুক্তরাষ্ট্রে তাঁকে পরিবেশ আন্দোলনের জননী হিসেবে অভিহিত করা হয়।
একটি বাবুই পাখির বাসা দেখেও যেন সন্তানেরা বিস্মিত হয়ে প্রশ্ন করতে শেখে, ‘ওই ছোট্ট পাখিটা, যার কোনো হাত নেই, সে কী করে এমন সুন্দর একটা বাসা বানাল? কে তাকে শিখিয়েছে? কোনো স্কুলে তো সে কখনো পড়েনি!’ অথচ আমরা মানুষেরা স্কুল-বিশ্ববিদ্যালয়ে এত বছর পড়েও ওই ছোট্ট পাখিটার মতো এমন নিখুঁত বাসা বানাতে পারব না। এখানেই লুকিয়ে রয়েছে দেখা ও ভাবনার বিস্ময়, প্রকৃতির অপার রহস্য। শুধু গভীরভাবে চোখ দিয়ে তা দেখতে হবে, মন দিয়ে অনুভব করতে হবে এবং জীবনের প্রতিটি দেখারই রহস্য উন্মোচন করতে হবে।
রেচেল কারসন একাধারে প্রকৃতিবিদ, জীববিজ্ঞানী ও লেখিকা। যুক্তরাষ্ট্রে তাঁকে পরিবেশ আন্দোলনের জননী হিসেবে অভিহিত করা হয়। কেননা তিনি পরিবেশবিনাশী কীটনাশক ডিডিটির বিরুদ্ধে ব্যাপক জনমত গড়ে তুলেছিলেন ১৯৬২ সালে প্রকাশিত তাঁর সাড়া জাগানো বই দ্য সাইলেন্ট স্প্রিং-এর মাধ্যমে। তিনি ১৯০৭ সালের ২৭ মে যুক্তরাষ্ট্রের পেনসিলভানিয়া অঙ্গরাজ্যের এক পাহাড়ি ছোট্ট শহর স্প্রিংডেলে জন্মগ্রহণ করেন। জায়গাটি ছিল অপূর্ব প্রকৃতিময়। একদিকে অ্যালেঘেনি নদীর স্রোতধারা ও নদীর পাড় ঘেঁষে সুউচ্চ পর্বত, অন্যদিকে পাহাড়ি ঢালে বনের মধ্যে তাঁদের ঘরবাড়ি, খামার ও গাছগাছালির মনোরম শোভা।
শিশুকাল থেকেই তিনি মায়ের কাছ থেকে প্রকৃতির সব গল্প শুনতেন। মা তাঁকে যুক্তরাষ্ট্রের বিখ্যাত সব নারী লেখকদের বই পড়তে দিতেন। এসব বই তাঁকে লেখিকা হওয়ার স্বপ্ন দেখিয়েছিল। মাত্র দশ বছর বয়সেই তিনি গল্প লিখেছিলেন। সেটা সে সময় পত্রিকাতেও প্রকাশিত হয়েছিল।
রেচেল কারসন পরিবেশবিনাশী কীটনাশক ডিডিটির বিরুদ্ধে ব্যাপক জনমত গড়ে তুলেছিলেন ১৯৬২ সালে প্রকাশিত তাঁর সাড়া জাগানো বই দ্য সাইলেন্ট স্প্রিং-এর মাধ্যমে।
১৯১২ সালের কথা। কারসনের বয়স তখন মাত্র পাঁচ বছর। একদিন কারসন তাঁদের বাড়ির পাশ দিয়ে হাঁটছিলেন। তাঁদের বাড়িটি ছিল সাগর থেকে অনেক দূরে। বাড়ির কাছ দিয়ে বয়ে চলা অ্যালেঘেনি নদী ছাড়া আর কোনো জলাশয় সেখানে ছিল না। তাই সেখানে কোনো গাংচিল, হাঙর বা তিমির দেখাও মিলত না। কিন্তু হাঁটতে হাঁটতে তিনি একটি ফসিল দেখতে পান। বাড়িতে এনে তা মাকে দেখান। মা বলেন, ‘ওটা হয়তো সামুদ্রিক কোনো প্রাণীর জীবাশ্ম হবে।’
কারসন বিস্মিত হন। বাড়ির কাছে যখন কোনো সাগরই নেই, তাহলে সামুদ্রিক প্রাণীর জীবাশ্ম এখানে এল কী করে? তখন মা তাঁকে বলেন, লাখ লাখ বছর আগে এ জায়গাগুলোতে সমুদ্র ছিল। মা আরও বলেন, ‘এই যে যেখানে তুমি তোমার প্রিয় কুকুরকে নিয়ে খেলা করো, দৌড়াও, বাগান করো, বনের ভেতর বড় বড় গাছপালা দেখো, স্প্রিংডেল ও অ্যালেঘেনি নদী পেরিয়ে পিটসবার্গ শহর দেখো—এর সবই তখন ছিল সমুদ্রের নিচে।’
এ কথা শুনে বিস্ময়ে অভিভূত হয়ে গেলেন তিনি। সে রাতে বিছানায় শুয়ে কারসন এসব নিয়ে ভাবতে শুরু করলেন। তাঁর মনে শুরু হলো বিস্ময়ের ঢেউ। এসব বিষয় তাঁর মনে এমনভাবে স্থায়ী রেখাপাত করেছিল যে তিনি পরে সামুদ্রিক জীবদের নিয়ে গবেষণা করার জন্য সামুদ্রিক জীববিজ্ঞানী হয়ে যান। এ বিষয়ে পড়াশোনাও করেন তিনি।
কারসন বিস্মিত হন। বাড়ির কাছে যখন কোনো সাগরই নেই, তাহলে সামুদ্রিক প্রাণীর জীবাশ্ম এখানে এল কী করে? তখন মা তাঁকে বলেন, লাখ লাখ বছর আগে এ জায়গাগুলোতে সমুদ্র ছিল।
১৯২৯ সালে তিনি পেনসিলভানিয়ার কলেজ ফর উইমেন (বর্তমানে চ্যাথাম বিশ্ববিদ্যালয়) থেকে সামুদ্রিক জীববিজ্ঞানে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। ১৯৩২ সালে জনস হপকিনস বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রাণিবিদ্যায় স্নাতকোত্তর ডিগ্রি সম্পন্ন করেন এবং গবেষণার কাজ করেন উডস হোল মেরিন বায়োলজিক্যাল ল্যাবরেটরিতে।
এরপর তিনি লিখে ফেলেন তাঁর প্রথম বই আন্ডার দ্য সি-উইন্ড (১৯৪১)। এরপর ১৯৫১ সালে প্রকাশিত হয় তাঁর আরেকটি বই দ্য সি অ্যারাউন্ড আস। এ বইটি সে সময় তুমুল জনপ্রিয়তা পায়, বেস্টসেলারের তালিকায় স্থান করে নেয় এবং যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল বুক অ্যাওয়ার্ড অর্জন করে। এরপর ১৯৫৫ সালে প্রকাশিত হয় দ্য এজ অব দ্য সি। এই বইয়ে তিনি মেইন থেকে ফ্লোরিডা পর্যন্ত পূর্ব উপকূলের বাস্তুতন্ত্র নিয়ে আলোচনা করেন।
এই তিনটি বই-ই ছিল জীবনের ভৌত ব্যাখ্যা এবং সমুদ্রের ভেতরে ও তার কাছাকাছি জীবদের নিয়ে ঘটা অলৌকিক সব বিস্ময়ে ভরপুর। এসব বই রাতারাতি খ্যাতিমান করে তোলে তাঁকে। তিনি স্বীকৃতি পান সে দেশের জনপ্রিয় পরিবেশবিদ ও বিজ্ঞান লেখক হিসেবে।
রেচেল কারসন তাঁর প্রথম জীবনে একটি পত্রিকায় একটি প্রবন্ধ লেখেন, যার শিরোনাম ছিল ‘হেল্প ইওর চাইল্ড টু ওয়ান্ডার’। এর অর্থ দাঁড়ায়, ‘আপনার সন্তানকে বিস্মিত হতে সাহায্য করুন’। সেই প্রবন্ধটি ১৯৫৬ সালের জুলাই মাসে উইমেনস হোম কম্প্যানিয়ন পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। পরে সেই পত্রিকার মূল প্রবন্ধটিই দ্য সেন্স অব ওয়ান্ডার নামে বই হিসেবে প্রকাশিত হয়। এর অসাধারণ বিষয়বস্তু খুব দ্রুতই বইটিকে জনপ্রিয় করে তোলে।
১৯৫১ সালে প্রকাশিত হয় কারসনের বই দ্য সি অ্যারাউন্ড আস। এ বইটি সে সময় তুমুল জনপ্রিয়তা পায়, বেস্টসেলারের তালিকায় স্থান করে নেয় এবং যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল বুক অ্যাওয়ার্ড অর্জন করে।
কারসন ছিলেন জন্মগত প্রকৃতিবিদ। তাঁর ছোটবেলার এসব স্মৃতিকে মনে রেখেই তিনি তাঁর দ্য সেন্স অব ওয়ান্ডার বইয়ে লিখেছেন, ‘কোনো শিশু যদি তার সহজাত বিস্ময়বোধকে বাঁচিয়ে রাখতে চায়... তবে তার এমন অন্তত একজন প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তির সঙ্গ দরকার, যিনি তার সঙ্গে তাঁর অভিজ্ঞতাকে ভাগ করে নিতে পারেন এবং তাঁর সঙ্গে মিলে আমরা যে পৃথিবীতে বাস করি, তার আনন্দ, উত্তেজনা ও রহস্যকে নতুন করে আবিষ্কার করতে পারেন।’
কারসন বিশ্বাস করতেন, জানার চেয়ে অনুভব করাটা অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। তাই তিনি অভিভাবকদের প্রতি এই বইয়ে আহ্বান জানিয়েছেন যেন শিশুদের নাম ও তথ্য দিয়ে ভারাক্রান্ত করার আগে তাদের ইন্দ্রিয়ের মাধ্যমে প্রকৃতিকে অনুভব করতে শেখানো হয়। কাঠ পোড়ালে সেই ধোঁয়ার গন্ধ কেমন, সাগরের জল কতটা লোনা, শ্যাওলার পুরু চাদরে পা রাখলে কেমন লাগে, গোলাপফুলের সৌরভ কেমন, বসন্তের বনে শুকনো পাতা বা শরতে শিশিরভেজা সবুজ দূর্বাঘাসের ওপর হাঁটতে কেমন লাগে; সেসব অনুভব করাতে হবে।
শিশুদের দেখাতে হবে নদীতে জোয়ারের জলের ওপর পূর্ণিমার আলো কীভাবে রেশমি বুননে খেলা করে, অমাবস্যার রাতে জোনাকি পোকার মিটিমিটি আলো দেখতে কেমন লাগে অথবা নির্জন বনের মধ্যে নানা রকম পাখি ও ঝিঁঝি পোকার ডাক শোনা। এই সবই শিশুদের বুঝতে ও অনুভব করতে দিতে হবে।
প্রতিটি শিশুর মধ্যে তার সহজাত বিস্ময়বোধকে বাঁচিয়ে রাখতে হবে। প্রতিটি জিজ্ঞাসার উত্তর খোঁজার নামই বিজ্ঞান। অতি সাধারণ জিনিসের মধ্য থেকেই জাদুকরি বিষয় খুঁজে বের করতে হবে। শিশুরা যেন তা পারে, তাদের সেই বিস্ময়বোধকে জাগাতে সাহায্য করতে হবে অভিভাবকদেরই।