সাগরের পাশে কীভাবে মরুভূমি সৃষ্টি হয়

দক্ষিণ আফ্রিকার নামিব মরুভূমি আটলান্টিক মহাসাগরের পাশে অবস্থিতছবি: মার্কো বোটিগেলি / গেটি ইমেজ

মরুভূমি মানেই চারদিকে ধু ধু বালি। কোথাও একফোঁটা জল নেই। জলের উৎস থেকে শত শত মাইল দূরে এক রুক্ষ প্রান্তর। এমনটাই তো ভাবছেন? কিন্তু মজার ব্যাপার হলো, পৃথিবীর সবচেয়ে শুষ্ক কিছু মরুভূমি কিন্তু সাগরের একদম গা ঘেঁষেই অবস্থিত!

চিলির আতাকামা কিংবা দক্ষিণ আফ্রিকার নামিব মরুভূমির কথা ধরা যাক। এগুলো সবই সমুদ্রের তীর ধরে গড়ে উঠেছে। কিন্তু সাগরের এত জল থাকতেও এই জায়গাগুলো এমন খাঁখাঁ মরুভূমি হলো কীভাবে?

যুক্তরাষ্ট্রের লাস ভেগাসের নেভাডা ইউনিভার্সিটির জলবিজ্ঞানী ডেভিড ক্রেমার এর কারণ বলেছেন। সাগরের পাশে মরুভূমি তৈরির পেছনে মূলত তিনটি কারণ কাজ করে। প্রথমত, বাতাসের ওপর-নিচ চলাচল। দ্বিতীয়ত, বাতাসের আড়াআড়ি চলাচল। তৃতীয়ত, পাহাড়-পর্বতের বাধা। চলুন, একে একে কারণগুলো একটু বোঝা যাক।

বাতাসের ওপর-নিচের খেলা

পৃথিবীর ম্যাপের দিকে তাকালে একটা জিনিস খেয়াল করবেন। বেশির ভাগ মরুভূমিই বিষুবরেখার একটু ওপরে বা নিচে অবস্থিত। কিন্তু কেন? বিষুবরেখা অঞ্চলে সূর্যের আলো একদম খাড়াভাবে পড়ে। এতে সেখানকার বাতাস গরম হয়ে হালকা হয়ে যায়। গরম বাতাস সব সময় ওপরের দিকে ওঠে। বাতাস ওপরে উঠলে সেখানে একটা নিম্নচাপ তৈরি হয়। তখন বাতাসের জলীয় বাষ্প ঠান্ডা হয়ে মেঘ ও বৃষ্টিতে পরিণত হয়। এ কারণেই বিষুবরেখা অঞ্চলে আমাজনের মতো ঘন ও চিরসবুজ বন দেখা যায়।

বেশির ভাগ মরুভূমিই বিষুবরেখার একটু ওপরে বা নিচে অবস্থিত
ছবি: রেডিট

কিন্তু ওই যে বাতাসটা ওপরে উঠল, তার কী হবে? সেই বাতাস বিষুবরেখা থেকে উত্তর ও দক্ষিণে ছড়িয়ে পড়ে। এরপর তা আবার নিচে নামতে শুরু করে। এই নিচের দিকে নামা বাতাস মেঘ তৈরি হতে বাধা দেয়। আর মেঘ না থাকলে তো বৃষ্টিও হয় না! ঠিক এ কারণেই সাহারা বা কালাহারির মতো বড় বড় মরুভূমিগুলো তৈরি হয়েছে।

আরও পড়ুন
বিষুবরেখা অঞ্চলে সূর্যের আলো একদম খাড়াভাবে পড়ে। এতে সেখানকার বাতাস গরম হয়ে হালকা হয়ে যায়। গরম বাতাস সব সময় ওপরের দিকে ওঠে। বাতাস ওপরে উঠলে সেখানে নিম্নচাপ তৈরি হয়।

আড়াআড়ি বাতাস ও শীতল স্রোত

এবার আসি দ্বিতীয় কারণে। পৃথিবীর বিষুবরেখার কাছাকাছি অঞ্চলে বায়ু পূর্ব থেকে পশ্চিম দিকে বয়। এই বাতাস মহাদেশগুলোর পূর্ব দিকে প্রচুর বৃষ্টি ঝরায়। কিন্তু পশ্চিম দিকে পৌঁছাতে পৌঁছাতে বাতাসের সব জল ফুরিয়ে যায়। ফলে পশ্চিম দিকটা শুকনোর খটখটে থেকে যায়! ইংল্যান্ডের ম্যানচেস্টার ইউনিভার্সিটির ভূগোলবিদ অ্যাবি স্টোনের মতে, নামিব মরুভূমির ক্ষেত্রে ঠিক এমনটাই ঘটে। সেখানে যা বৃষ্টি হওয়ার, তা মরুভূমির পূর্ব দিকের পাহাড়েই হয়ে যায়।

সাগরের শীতল স্রোতের ওপর দিয়ে যখন বাতাস বয়ে যায়, তখন বাতাসটাও ঠান্ডা হয়
ছবি: মিডজার্নির সাহায্যে তৈরি

এর সঙ্গে আরেকটা জিনিস যুক্ত হয়। তা হলো সাগরের শীতল স্রোত। এই শীতল স্রোতের ওপর দিয়ে যখন বাতাস বয়ে যায়, তখন বাতাসটাও ঠান্ডা হয়। ঠান্ডা বাতাস খুব একটা ওপরে উঠতে পারে না। সে এক জায়গায় স্থির হয়ে থাকে। ওপরে উঠতে না পারায় মেঘ বা বৃষ্টিও তৈরি হয় না। কিন্তু এই ঠান্ডা বাতাস বেশ কিছু জলীয় বাষ্প ধরে রাখতে পারে। ফলে বৃষ্টি না হলেও মরুভূমির এই উপকূলীয় অঞ্চলগুলোতে প্রচুর কুয়াশা তৈরি হয়।

আরও পড়ুন
সাগরের শীতল স্রোতের ওপর দিয়ে যখন বাতাস বয়ে যায়, তখন বাতাসটাও ঠান্ডা হয়। ঠান্ডা বাতাস খুব একটা ওপরে উঠতে পারে না। সে এক জায়গায় স্থির হয়ে থাকে।

পাহাড়ের বাধা

তৃতীয় কারণটি হলো পাহাড় বা পর্বতের বাধা। একে বিজ্ঞানের ভাষায় রেইন শ্যাডো বলে। জলীয় বাষ্পে ভরা বাতাস যখন কোনো উঁচু পাহাড়ে ধাক্কা খায়, তখন সে বাধ্য হয়ে ওপরে ওঠে। ওপরে উঠলেই বাতাস ঠান্ডা হয়ে পাহাড়ের ওই পাশেই প্রচুর বৃষ্টি ঝরায়। কিন্তু পাহাড় টপকে বাতাস যখন অন্য পাশে যায়, তখন তার ভেতরে আর কোনো জল থাকে না!

আতাকামা মরুভূমি প্রশান্ত মহাসাগরের পাশে অবস্থিত
ছবি: ভিডব্লিউ পিকস / গেটি ইমেজ

আতাকামা মরুভূমির ক্ষেত্রে ঠিক এটাই ঘটেছে। ডেভিড ক্রেমারের মতে, দক্ষিণ আমেরিকার বাতাস প্রথমে আমাজন বনে প্রচুর বৃষ্টি ঝরায়। এরপর সেই বাতাস গিয়ে ধাক্কা খায় বিশাল আন্দিজ পর্বতমালার গায়ে। আন্দিজ পর্বত বাতাসের বাকি জলটুকুও শুষে নেয়। ফলে পাহাড় পেরিয়ে চিলির দিকে বা আতাকামা মরুভূমিতে যখন বাতাস পৌঁছায়, তখন তা একদম শুকনো!

মরুভূমির অদ্ভুত প্রাণিকুল

এই সাগরের ধারের মরুভূমিগুলোর কিছু অদ্ভুত বৈশিষ্ট্য আছে। ভেতরের দিকের মরুভূমির তুলনায় এগুলো বেশ ঠান্ডা হয়। এখানকার আবহাওয়াও অনেক শান্ত থাকে। সবচেয়ে মজার ব্যাপার হলো, এখানকার প্রাণীগুলো বৃষ্টি না থাকলেও বেঁচে থাকার দারুণ সব কৌশল বের করে নিয়েছে।

যেমন, নামিব মরুভূমিতে একধরনের পোকা বা বিটল আছে। তারা কুয়াশা থেকে জল খাওয়ার জন্য তাদের পেছনের অংশ উঁচিয়ে ধরে! বিজ্ঞানীরা এই পোকাদের দেখেই বাতাস থেকে জল আটকানোর বিশেষ জাল তৈরির ধারণা পেয়েছেন।

আরও পড়ুন
জলীয় বাষ্পে ভরা বাতাস যখন কোনো উঁচু পাহাড়ে ধাক্কা খায়, তখন সে বাধ্য হয়ে ওপরে ওঠে। ওপরে উঠলেই বাতাস ঠান্ডা হয়ে পাহাড়ের ওই পাশেই প্রচুর বৃষ্টি ঝরায়।

বরফের মরুভূমি!

আচ্ছা, শুধু কি গরম জায়গাতেই মরুভূমি থাকে? একদমই না! পৃথিবীর দুই মেরুতে থাকা অ্যান্টার্কটিকা বা আর্কটিক অঞ্চলও কিন্তু একেকটা বিশাল মরুভূমি। এগুলোকে বলা হয় মেরু মরুভূমি।

অ্যান্টার্কটিকা অঞ্চলে অবস্থিত মেরু মরুভূমি
ছবি: সিক্রেট অ্যাটলাস

সাগরের ধারের মরুভূমিগুলোর মতো এখানেও একই নিয়ম কাজ করে। তবে এখানে তাপমাত্রারও একটা বড় ভূমিকা আছে। বাতাস এতই ঠান্ডা থাকে যে, সে কোনো জলীয় বাষ্প ধরে রাখতেই পারে না। অ্যান্টার্কটিকার চারপাশের তীব্র বাতাস ও সাগরের স্রোত বাইরের কোনো আবহাওয়াকে ভেতরে ঢুকতেই দেয় না। ফলে চারদিকে বরফে ঢাকা থাকলেও সেখানে এক ফোঁটাও বৃষ্টি বা তুষারপাত হয় না!

লেখক: প্রাক্তন শিক্ষার্থী, গণিত বিভাগ, সরকারি তিতুমীর কলেজ, ঢাকা

সূত্র: লাইভ সায়েন্স

আরও পড়ুন