মৌলিক সংখ্যা কি মহাকালের সুর, নাকি সময়ের ধাঁধা
অসীম মৌলিক সংখ্যার অদ্ভুত কাণ্ডকারখানা - ৩
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ফরাসি সুরকার অলিভিয়ে মেসিয়েনকে আটক করা হয়। তিনি ‘স্টালাগ ৮-এ’ শিবিরে যুদ্ধবন্দী ছিলেন। সেখানে ছিলেন আরও তিনজন শিল্পী। একজন ক্ল্যারিনেট বাজাতেন, একজন সেলো এবং একজন বাজাতেন ভায়োলিন।
জেলে বসেই পিয়ানো বাজানোর সিদ্ধান্ত নিলেন মেসিয়েন। চারজনের জন্য একটা সুর বাঁধলেন। এভাবেই তৈরি হলো বিংশ শতাব্দীর অন্যতম সেরা মিউজিক ‘কোয়ার্টেট ফর দ্য এন্ড অব টাইম’। কোয়ার্টেট মানে চার। তাঁরা চারজন ছিলেন বলেই এমন নাম। ক্যাম্পের ভেতর একটা নড়বড়ে পিয়ানো বাজিয়ে বন্দী ও অফিসারদের সামনেই প্রথম পরিবেশন করা হলো এই মিইজিক।
এর প্রথম পর্বের নাম ‘লিটার্জি ডি ক্রিস্টাল’। মেসিয়েন চেয়েছিলেন এমন একটা আবহ তৈরি করতে, যেন মনে হয় সময় ফুরোচ্ছে না, অনন্তকাল ধরে চলছে। আর এই সময়হীন অনুভূতির চাবিকাঠি ছিল দুটি বিশেষ সংখ্যা—১৭ ও ২৯। ভায়োলিন ও ক্ল্যারিনেট যখন পাখির গানের সুর তুলছিল, তখন সেলো ও পিয়ানো দিচ্ছিল তাল। পিয়ানোর অংশে ছিল ১৭টি নোটের রিদম, যা বারবার বাজছিল। এই তালের ওপর যে কর্ডগুলো বাজছিল, সেগুলোর সিকোয়েন্স ছিল ২৯টি। সোজা কথায়, যখন ১৭ নোটের তালের চক্করটা দ্বিতীয়বার শুরু হচ্ছে, তখন ২৯ নোটের কর্ডের সিকোয়েন্সটা মাত্র তিন ভাগের দুই ভাগ শেষ হয়েছে।
জেলে বসেই পিয়ানো বাজানোর সিদ্ধান্ত নিলেন মেসিয়েন। চারজনের জন্য একটা সুর বাঁধলেন। এভাবেই তৈরি হলো বিংশ শতাব্দীর অন্যতম সেরা মিউজিক ‘কোয়ার্টেট ফর দ্য এন্ড অব টাইম’।
মিউজিকে ১৭ ও ২৯ মৌলিক সংখ্যা দুটি বেছে নেওয়ায় এক জাদুকরী ব্যাপার ঘটল। পুরো পিসটিতে ১৭ × ২৯ নোট না বাজানো পর্যন্ত তাল ও সুরের এই কম্বিনেশন রিপিট হবে না। মানে আগের জায়গায় ফিরে আসবে না। এই যে মিউজিকটা ক্রমাগত সরে যাচ্ছে, এটাই সেই সময়হীন অনুভূতি তৈরি করে। এটাই চেয়েছিলেন মেসিয়েন।
তিনি সিকাডা পোকা ও শিকারি প্রাণীদের সেই একই কৌশল ব্যবহার করেছিলেন। মনে করুন, সিকাডারা হলো রিদম, আর শিকারিরা হলো কর্ড। ১৭ ও ২৯ সংখ্যা দুটি রিদম ও কর্ড মিলতে দেয় না। ফলে শ্রোতারা মিউজিকের কোনো পুনরাবৃত্তি শোনার আগেই গান শেষ হয়ে যায়।
শুধু মেসিয়েন নন, আলব্যান বার্গ নামে আরেক সুরকারও গানে মৌলিক সংখ্যা ব্যবহার করতেন সিগনেচার হিসেবে। ডেভিড বেকহ্যামের মতোই বার্গ ২৩ নম্বর সংখ্যা ব্যবহার করতেন। আলব্যান রীতিমতো সংখ্যাটি নিয়ে আচ্ছন্ন ছিলেন। যেমন, তাঁর লিরিক স্যুট-এ ২৩ বারের সিকোয়েন্স দিয়ে গানের কাঠামো সাজানো হয়েছিল। কিন্তু এর ভেতরে লুকিয়ে ছিল এক গোপন প্রেমকাহিনি। এক ধনী বিবাহিত নারীর সঙ্গে বার্গের প্রেম ছিল। সেই প্রেমিকাকে তিনি সুরের ভেতর চিহ্নিত করেছেন ১০ বারের একটি সিকোয়েন্স দিয়ে। আর নিজের পরিচয় হিসেবে ব্যবহার করেছেন ২৩ সংখ্যাটি। গণিত ও সুরের মিশ্রণে তিনি তাঁর প্রেমকে অমর করে রেখেছেন।
সিকাডারা হলো রিদম, আর শিকারিরা হলো কর্ড। ১৭ ও ২৯ সংখ্যা দুটি রিদম ও কর্ড মিলতে দেয় না। ফলে শ্রোতারা মিউজিকের কোনো পুনরাবৃত্তি শোনার আগেই গান শেষ হয়ে যায়।
মেসিয়েনের মতো গণিত ব্যবহার করে আরও একটি মিউজিক তৈরি করা হয়েছে। এটি হয়তো সময়হীন নয়, তবে হাজার বছরের আগে রিপিট হবে না। নতুন মিলিয়েনিয়ামকে বরণ করতে দ্য পোগস ব্যান্ডের সদস্য জেম ফাইনার লন্ডনের ইস্ট এন্ডে একটি মিউজিক ইন্সটলেশন বসান। এটি ৩০০০ সালের আগে রিপিট হবে না। নামটাও দারুণ, লংপ্লেয়ার। তিব্বতি সিংগিং বোল ও গং দিয়ে তৈরি মূল সুরটি মাত্র ২০ মিনিট ২০ সেকেন্ডের।
কিন্তু মেসিয়েনের মতো গণিতের কৌশল খাটিয়ে তিনি এটাকে ১০০০ বছর লম্বা করেছেন। মূল সুরের ছয়টি কপি একসঙ্গে ভিন্ন ভিন্ন গতিতে বাজানো হয়। প্রতি ২০ সেকেন্ড পর পর প্রতিটি ট্র্যাক আবার শুরু হয়, কিন্তু একটু করে পিছিয়ে বা এগিয়ে দেওয়া হয়। গাণিতিক হিসাব করেই ঠিক করা হয়েছে কে কতটা সরবে। এ কারণেই ১০০০ বছরের আগে ট্র্যাকগুলো আর কখনো একসঙ্গে মিলবে না।
নতুন মিলিয়েনিয়ামকে বরণ করতে দ্য পোগস ব্যান্ডের সদস্য জেম ফাইনার লন্ডনের ইস্ট এন্ডে একটি মিউজিক ইন্সটলেশন বসান। এটি ৩০০০ সালের আগে রিপিট হবে না। নামটাও দারুণ, লংপ্লেয়ার।
শুধু সুরকাররাই নন, সাহিত্যিকরাও মৌলিক সংখ্যা নিয়ে মেতে আছেন। মার্ক হ্যাডন তাঁর বেস্টসেলিং বই দ্য কিউরিয়াস ইনসিডেন্ট অব দ্য ডগ ইন দ্য নাইট-টাইম-এ অধ্যায়গুলোর নাম দিয়েছেন শুধু মৌলিক সংখ্যা দিয়ে। গল্পের কথক ক্রিস্টোফার নামে এক কিশোর। তার অ্যাসপারগার সিনড্রোম আছে।
ক্রিস্টোফার গণিতের জগত খুব পছন্দ করে, কারণ সে বুঝতে পারে গণিতে কোনো সারপ্রাইজ নেই। কিন্তু মানুষের সম্পর্কগুলো বড্ড জটিল, অনিশ্চিত ও অযৌক্তিক। ক্রিস্টোফার এগুলো মেনে নিতে পারে না।
ক্রিস্টোফারের ভাষায়, ‘আমি মৌলিক সংখ্যা পছন্দ করি...আমার মনে হয় মৌলিক সংখ্যাগুলো জীবনের মতো। এগুলো খুবই যৌক্তিক, কিন্তু কখনোই এর আসল নিয়মটা বের করা যায় না, এমনকি সারা জীবন ভাবলেও না।’
সিকাডারাও বুঝেছিল, এই দুনিয়ায় টিকে থাকতে হলে অঙ্ক জানাটা খুব জরুরি। মৌলিক সংখ্যা ব্যবহার করে ওরা এখনো পৃথিবীতে টিকে আছে।
