১৭৯৭ সালের কথা। ফরাসি সেনাপতি নেপোলিয়ন বোনাপার্ট১ তখন যুদ্ধে যুদ্ধে পুরো ইউরোপ দাপিয়ে বেড়াচ্ছেন। তরবারি ও কামানের গোলার পাশাপাশি এই সেনাপতির আরেকটা অদ্ভুত নেশা ছিল—গণিত! একদিন এক ইতালীয় ভদ্রলোক নেপোলিয়নের হাতে একটি বই তুলে দিলেন। বইটির নাম জিওমেট্রিয়া ডেল কম্পাসো বা কম্পাসের জ্যামিতি। সেই বইয়ের পাতায় পাতায় লুকিয়ে ছিল এমন এক গাণিতিক জাদু, যা দেখে স্বয়ং নেপোলিয়নও বিস্ময়ে হতবাক হয়ে গিয়েছিলেন!
কী ছিল সেই বইয়ে? সাধারণ জ্যামিতি বাক্সে দুটি প্রধান যন্ত্র থাকে—একটি রুলার এবং একটি কম্পাস। হাজার হাজার বছর ধরে গণিতবিদদের বদ্ধমূল ধারণা ছিল, জ্যামিতির যেকোনো নিখুঁত চিত্র আঁকতে গেলে এই দুটি জিনিস একসঙ্গেই লাগবে। কিন্তু ওই ইতালীয় ভদ্রলোক দাবি করলেন, রুলারের কোনো দরকারই নেই! রুলার ও কম্পাস দিয়ে যত ধরনের জ্যামিতিক চিত্র আঁকা সম্ভব, তার সবকিছুই শুধু একটি কম্পাস দিয়ে আঁকা যায়!
স্কেল ছাড়া সরলরেখার অস্তিত্ব প্রমাণ করা? এ যেন রংতুলি ছাড়াই ক্যানভাসে ছবি ফুটিয়ে তোলার মতো অসম্ভব এক ব্যাপার। কিন্তু সেই অসম্ভবকেই গাণিতিক যুক্তিতে সম্ভব করে দেখিয়েছিলেন যে মানুষটি, তাঁর নাম লরেঞ্জো মাসকেরোনি।
১৭৭৮ সালে লরেঞ্জো মাসকেরোনি বেরগামোর সেমিনারিতে পদার্থবিজ্ঞান ও গণিত পড়ানো শুরু করেন। তাঁর মেধা এতই প্রখর ছিল যে, দ্রুতই তাঁর ডাক পড়ে ইতালির বিখ্যাত পাভিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে।
দুই
লরেঞ্জো মাসকেরোনির জন্ম ১৭৫০ সালে, ইতালির লম্বার্ডি প্রদেশের বেরগামো শহরে। তাঁর পরিবার ছিল বেশ অবস্থাসম্পন্ন। পরিবারের প্রবল ইচ্ছা ছিল ছেলে বড় হয়ে পাদ্রি হবে। পরিবারের কথা মেনে ১৭৬৭ সালে তিনি সত্যিই একজন পাদ্রি হিসেবে অভিষিক্ত হলেন। শুরুতে তিনি সেমিনারিতে অলংকারশাস্ত্র পড়াতেন। কিন্তু যাঁর মগজজুড়ে প্রতিনিয়ত ঘুরপাক খাচ্ছে সংখ্যা ও জ্যামিতির নানা জটিল সমীকরণ, তাঁকে কি আর শুধু চার্চের নিয়মে আটকে রাখা যায়?
১৭৭৮ সালে তিনি বেরগামোর সেমিনারিতে পদার্থবিজ্ঞান ও গণিত পড়ানো শুরু করেন। তাঁর মেধা এতই প্রখর ছিল যে, দ্রুতই তাঁর ডাক পড়ে ইতালির বিখ্যাত পাভিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে। সেখানে তিনি গণিতের অধ্যাপক হিসেবে যোগ দেন এবং ১৭৮৯ সালে সেই বিশ্ববিদ্যালয়ের রেক্টর নির্বাচিত হন। টানা চার বছর তিনি অভাবনীয় সাফল্যের সঙ্গে এই দায়িত্ব পালন করেছিলেন।
মাসকেরোনি শুধু নিরস অঙ্কের মানুষ ছিলেন না। তিনি ছিলেন একাধারে অসাধারণ এক কবি। ইতালির বিখ্যাত সাহিত্যিকদের সংগঠন আর্কেডিয়ান একাডেমির সদস্য ছিলেন তিনি। ‘ইনভিটো ডি দাফনি আ লেসবিয়া সিডোনিয়া’ নামে তাঁর লেখা একটি কবিতা সে যুগে ইতালির সাহিত্যিক মহলে রীতিমতো ঝড় তুলেছিল। গণিতের নিরেট সমীকরণ ও কবিতার সূক্ষ্ম ছন্দ; এই দুয়ের এমন অপূর্ব মিলন ইতিহাসে খুব কমই দেখা যায়।
তাঁর সবচেয়ে বিখ্যাত কাজ জিওমেট্রিয়া ডেল কম্পাসো বইটি প্রকাশের পর তিনি সেটি উৎসর্গ করেছিলেন তাঁর স্বপ্নের নায়ক নেপোলিয়ন বোনাপার্টকে। নেপোলিয়ন নিজেই একজন তুখোড় শৌখিন গণিতবিদ ছিলেন। মাসকেরোনির সঙ্গে পরিচয়ের পর তিনি এতই মুগ্ধ হন যে, তাঁদের মধ্যে রীতিমতো গাণিতিক আড্ডা বসত।
ইতিহাসবিদদের মতে, নেপোলিয়ন একবার একটি জটিল জ্যামিতিক সমস্যার সমাধান করতে দিয়েছিলেন, যা নেপোলিয়নের সমস্যা নামে পরিচিত। মাসকেরোনি শুধু কম্পাস ব্যবহার করে সেই সমস্যার এমন চমৎকার সমাধান বের করেছিলেন যে, নেপোলিয়ন আনন্দে আত্মহারা হয়ে গিয়েছিলেন। এই কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ মাসকেরোনি পাডুয়া একাডেমি, ইতালীয় বিজ্ঞান সোসাইটি এবং মান্টুয়া একাডেমির মতো সম্মানজনক প্রতিষ্ঠানগুলোতে সদস্যপদ লাভ করেন।
মাসকেরোনি শুধু নিরস অঙ্কের মানুষ ছিলেন না। তিনি ছিলেন একাধারে অসাধারণ এক কবি। ইতালির বিখ্যাত সাহিত্যিকদের সংগঠন আর্কেডিয়ান একাডেমির সদস্য ছিলেন তিনি।
তিন
বিজ্ঞানের ইতিহাসে অনেক সময়ই এমন অদ্ভুত ঘটনা ঘটে, যেখানে একজন বিজ্ঞানীর করা আবিষ্কার অন্য কারও নামে পরিচিতি পেয়ে যায়! মাসকেরোনির ক্ষেত্রেও ঠিক এমনটাই ঘটেছিল। তিনি যখন প্রমাণ করলেন, স্কেল ছাড়া শুধু কম্পাস দিয়েই যেকোনো জ্যামিতিক চিত্র আঁকা সম্ভব, তখন পুরো ইউরোপ তাঁকে প্রশংসায় ভাসিয়ে দিল। জ্যামিতির এই বিশেষ পদ্ধতিটির নামই হয়ে গেল হলো মাসকেরোনি কনস্ট্রাকশন বা মাসকেরোনির অঙ্কন।
কিন্তু ইতিহাসের আড়ালে লুকিয়ে ছিল এক করুণ সত্য। মাসকেরোনি ঘুণাক্ষরেও জানতেন না, তাঁর এই যুগান্তকারী আবিষ্কারের ঠিক ১২৫ বছর আগে অন্য একজন মানুষ হুবহু একই জিনিস প্রমাণ করে গেছেন! তিনি ড্যানিশ গণিতবিদ জর্জ মোর২। ১৬৭২ সালে ইউক্লিডেস ড্যানিকাস নামে একটি বইয়ে তিনি এই প্রমাণটি দেখিয়েছিলেন।
জর্জ মোর ১৬৪০ সালে কোপেনহেগেনে জন্মেছিলেন এবং নেদারল্যান্ডসে গিয়ে বিখ্যাত বিজ্ঞানী ক্রিশ্চিয়ান হাইগেন্সের৩ কাছে গণিত শিখেছিলেন। কিন্তু তাঁর সেই মহামূল্যবান বইটি কালের গহ্বরে হারিয়ে যায়। ১৯২৮ সালে যখন ডেনমার্কের এক বুকশপে মোরের বইটি হঠাৎ আবিষ্কৃত হলো, তখন সবাই বুঝতে পারল আসল ঘটনা।
ততদিনে জ্যামিতির পাতায় ‘মাসকেরোনি অঙ্কন’ নামটি স্থায়ী হয়ে গেছে। মাসকেরোনি নিজে যেহেতু মোরের কাজের কথা জানতেন না এবং তাঁর প্রমাণের কৌশলটিও ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন, তাই গণিতবিদেরা তাঁকেও এই কৃতিত্ব থেকে বঞ্চিত করেননি।
প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক, স্কেল ছাড়া কীভাবে সরলরেখা আঁকা সম্ভব? রুলার দিয়ে তো আমরা সোজা দাগ টানি। কম্পাস দিয়ে তো কেবল বৃত্ত বা বক্ররেখা আঁকা যায়!
মাসকেরোনি ঘুণাক্ষরেও জানতেন না, তাঁর যুগান্তকারী আবিষ্কারের ঠিক ১২৫ বছর আগে অন্য একজন মানুষ হুবহু একই জিনিস প্রমাণ করে গেছেন! তিনি ড্যানিশ গণিতবিদ জর্জ মোর।
মাসকেরোনির যুক্তি ছিল একেবারে ভিন্ন ধাঁচের। তিনি বললেন, একটি সরলরেখা আসলে কী? অসংখ্য বিন্দুর সমষ্টি। আমরা যদি শুধু কম্পাস ব্যবহার করে এমন কিছু নির্দিষ্ট বিন্দু খুঁজে বের করতে পারি, যেগুলো ঠিক একই সরলরেখায় অবস্থান করে, তবে সেই বিন্দুগুলোই একটি সরলরেখার প্রতিনিধিত্ব করবে। কাগজে পেনসিল দিয়ে দাগ টানার কোনো প্রয়োজনই নেই!
যেকোনো জ্যামিতিক চিত্র আঁকার জন্য আমাদের মূলত পাঁচটি মূল কাজ করতে হয়। ১. দুটি বিন্দুর মধ্য দিয়ে রেখা টানা। ২. নির্দিষ্ট কেন্দ্র ও ব্যাসার্ধ নিয়ে বৃত্ত আঁকা। ৩. দুটি বৃত্তের ছেদবিন্দু বের করা। ৪. একটি বৃত্ত ও একটি সরলরেখার ছেদবিন্দু বের করা। ৫. দুটি সরলরেখার ছেদবিন্দু বের করা।
দ্বিতীয় ও তৃতীয় কাজটি এমনিতেই কম্পাস দিয়ে করা যায়। মাসকেরোনি তাঁর বইয়ে একের পর এক জ্যামিতিক প্রমাণের সাহায্যে দেখিয়ে দিলেন, বাকি তিনটি কাজও স্কেলের সাহায্য ছাড়াই নিখুঁতভাবে শুধু কম্পাসের কাঁটা ঘুরিয়ে করা সম্ভব! তিনি বৃত্তের পর বৃত্ত এঁকে, সমদ্বিবাহু ও সমবাহু ত্রিভুজের জ্যামিতিক বৈশিষ্ট্য ব্যবহার করে এবং পিথাগোরাসের উপপাদ্যকে কাজে লাগিয়ে এমন সব বিন্দু খুঁজে বের করলেন, যেগুলো দিয়ে স্কেলের সাহায্য ছাড়াই সরল রেখা আঁকা সম্ভব। এটি ছিল মানুষের সাধারণ চিন্তার বাইরে এক সত্যিকারের গাণিতিক বিপ্লব।
কীভাবে শুধু কম্পাসের সাহায্যে সরলরেখা আঁকা যায়, তা তিনি বিষদভাবে ব্যাখ্যা করেছে। স্কুল পড়ুয়া শিক্ষার্থীরা হয়তো সহজেই নিচের ছবি দেখে তা বুঝতে পারবে। এখানে এসব ছবির কার্যপ্রণালী ব্যাখ্যা করে লেখাটি আর বড় করলাম না। নিচের ছবিগুলো দেখুন, তবেই বিষয়টা বুঝতে পারবেন।
আমরা যদি শুধু কম্পাস ব্যবহার করে এমন কিছু নির্দিষ্ট বিন্দু খুঁজে বের করতে পারি, যেগুলো ঠিক একই সরলরেখায় অবস্থান করে, তবে সেই বিন্দুগুলোই একটি সরলরেখার প্রতিনিধিত্ব করবে।
চার
১৭৯৫ সালে ইউরোপে একটি যুগান্তকারী পরিবর্তন আসে। ফরাসি বিপ্লবের হাত ধরে চালু হয় মেট্রিক পদ্ধতি৪। মানে পরিমাপের দশমিক একক মিটার, কিলোগ্রাম ইত্যাদি চালু হয়। ইতালির মিলান সরকার মাসকেরোনিকে এই নতুন পদ্ধতি সম্পর্কে পড়াশোনা ও গবেষণা করার জন্য প্যারিসে পাঠায়। উদ্দেশ্য ছিল, তিনি ফিরে এসে ইতালিতেও এই বৈজ্ঞানিক পরিমাপ পদ্ধতি চালুর ব্যাপারে প্রতিবেদন দেবেন।
১৭৯৮ সালে তিনি তাঁর দুর্দান্ত একটি রিপোর্ট প্রকাশ করেন। কিন্তু তাঁর আর ইতালিতে ফেরা হলো না। সে সময় নেপোলিয়নের যুদ্ধবিগ্রহের কারণে পুরো ইউরোপের রাজনৈতিক পরিস্থিতি ছিল চরম উত্তপ্ত। এই অস্থিরতার কারণে মাসকেরোনিকে প্যারিসেই আটকা পড়তে হয়।
প্যারিসের বৈরী আবহাওয়ার সঙ্গে তাঁর শরীর মানিয়ে নিতে পারেনি। প্রথমে সাধারণ ঠান্ডা, তারপর ঠান্ডা থেকে মারাত্মক ভাইরাল ইনফেকশনে।
১৮০০ সালের ১৪ জুলাই। সেদিন প্যারিসের রাজপথে উন্মত্ত জনতা ফরাসি বিপ্লবের স্মৃতিতে বাস্তিল দিবস উদ্যাপন করছিল। সেদিনই প্যারিসের এক নিঃসঙ্গ কুঠুরিতে চিরতরে চোখ বুজলেন এই প্রতিভাবান মানুষটি।
১৭৯৮ সালে মাসকেরোনি তাঁর দুর্দান্ত একটি রিপোর্ট প্রকাশ করেন। কিন্তু তাঁর আর ইতালিতে ফেরা হলো না। সে সময় নেপোলিয়নের যুদ্ধবিগ্রহের কারণে পুরো ইউরোপের রাজনৈতিক পরিস্থিতি ছিল উত্তপ্ত।
জর্জ মোর হয়তো তাঁর আগেই তত্ত্বটি আবিষ্কার করেছিলেন, কিন্তু লরেঞ্জো মাসকেরোনি তাঁর নিজস্ব মেধা, কাব্যিক মন এবং গাণিতিক সৌন্দর্য দিয়ে যে জ্যামিতির জগৎ রচনা করেছিলেন, তা আজীবন গণিতের ইতিহাসে এক উজ্জ্বল অধ্যায় হয়ে থাকবে। রুলার ছাড়া জ্যামিতি আঁকার এই যে অদ্ভুত কৌশল, তা যুগে যুগে তরুণ বিজ্ঞানীদের শিখিয়ে যাবে, সীমিত উপকরণ দিয়েও মানুষের অসীম কল্পনাশক্তি যেকোনো অসাধ্য সাধন করতে পারে।
