জ্যামিতি বললেই হয়তো তোমার চোখের সামনে ভেসে ওঠে খাতা-কলম, স্কেল-কম্পাস আর খটমটে সব উপপাদ্যের ভিড়। মনে হয়, ধুর! এসব বোরিং জিনিস দিয়ে বাস্তবে কী হয়? কিন্তু সত্যি বলতে কী, জ্যামিতি হলো বাস্তব জগতের এক গোপন‘সুপারপাওয়ার!
জ্যামিতির এমনই দুই সুপারপাওয়ার হলো সর্বসমতা (Congruence) এবং সদৃশতা (Similarity)। সর্বসমতা হলো একদম জমজ বা ফটোকপি। দুটি চিত্রের আকার এবং আকৃতি যদি একদম ১:১ হুবহু মিলে যায়, তাহলে তারা সর্বসম। আর সদৃশতা হলো জুম-ইন বা জুম-আউট গেম। দেখতে বা আকৃতিতে এক, কিন্তু সাইজে ছোট-বড়।
যুদ্ধক্ষেত্র থেকে শুরু করে আলোর প্রতিফলনের শর্টকাট—অনেক জায়গাতেই রাজত্ব করছে এই জ্যামিতি! এই সহজ নিয়মটি ব্যবহার করে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে এক অসম্ভব সামরিক মিশন সফল করা হয়েছিল! চলো, সেই শ্বাসরুদ্ধকর কাহিনিটাও জানা যাক।
সর্বসমতা হলো একদম জমজ বা ফটোকপি। দুটি চিত্রের আকার এবং আকৃতি যদি একদম ১:১ হুবহু মিলে যায়, তাহলে তারা সর্বসম। আর সদৃশতা হলো জুম-ইন বা জুম-আউট গেম।
ড্যাম বাস্টার অভিযান এবং ত্রিভুজ গঠন!
১৯৪৩ সাল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ তখন তুঙ্গে। একপক্ষে ব্রিটেন, ফ্রান্স, যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া (তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়ন) ও চীন এবং অন্যপক্ষে জার্মানি, ইতালি ও জাপান। ব্রিটিশ বিমানবাহিনী এক অসম্ভব পরিকল্পনার ছক কষল—জার্মানির সুবিশাল পানির বাঁধগুলো উড়িয়ে দিতে হবে, যাতে বাঁধগুলো তাদের অস্ত্র কারখানাগুলো পানিতে তলিয়ে যায়! কিন্তু সমস্যা হলো, বাঁধগুলোতে সাধারণ বোমা ফেললে পানির তোড়ে তা লক্ষ্যভ্রষ্ট হবে। গোটা অভিযানটাই ভেস্তে যাবে।
তখন বিজ্ঞানীরা বানালেন এক বিশেষ বাউন্সিং বোমা। পানিতে চ্যাপ্টা পাথর ছুঁড়লে যেমন লাফিয়ে চলে, তেমনই পানির ওপর লাফিয়ে চলে এই বাউন্সিং বোমা। এই বোমাও তেমনি পানির ওপর দিয়ে লাফিয়ে গিয়ে বাঁধের গায়ে ফাটবে। কিন্তু এই বোমার সফলতার জন্য একটা কঠিন শর্ত ছিল। সেটা হলো, বোমাটাকে ঠিকঠাক কাজ করতে হলে, রাতের ঘুটঘুটে অন্ধকারে বিমানটিকে পানির ঠিক ৬০ ফুট ওপর দিয়ে উড়তে হবে। একটু উঁচুতে বা নিচুতে গেলেই পুরো মিশন ব্যর্থ!
সে কালের যুদ্ধবিমানের অ্যালটিমিটার (উচ্চতা মাপার যন্ত্র) রাতে এত নিখুঁতভাবে ৬০ ফুট মাপতে পারত না। তখন প্রকৌশলীরা কাজে লাগালেন খাঁটি জ্যামিতির ট্রিক!
ব্রিটিশ বিমানবাহিনী এক অসম্ভব পরিকল্পনার ছক কষল—জার্মানির সুবিশাল পানির বাঁধগুলো উড়িয়ে দিতে হবে, যাতে বাঁধগুলো তাদের অস্ত্র কারখানাগুলো পানিতে তলিয়ে যায়!
জ্যামিতিক ট্রিকটা কী ছিল? বিমানের নাকের কাছে একটা আর লেজের দিকে আরেকটা—মোট দুটো স্পটলাইট বসানো হলো। আলো দুটোকে নিচের দিকে এমন একটি নির্দিষ্ট কোণে বাঁকিয়ে দেওয়া হলো, যেন বিমানটি ঠিক ৬০ ফুট উঁচুতে থাকলেই আলো দুটো পানির ওপর একে অপরকে ছুঁয়ে একটা সিঙ্গেল ডট বা বিন্দু তৈরি করে!
এর ফলাফল হলো দারুণ। রাতের আঁধারে বিমানে বসে পাইলট যখনই দেখলেন পানির ওপর আলো দুটি আলাদা না থেকে একদম একবিন্দুতে মিলে গেছে—তিনি বুঝে গেলেন বিমানটি ঠিক ৬০ ফুট উঁচুতে আছে! আর অমনি—বুম! বোমা ড্রপ! জ্যামিতির এক চালে গুঁড়িয়ে গেল জার্মান বাহিনির বাঁধ!
এই বোমারু বিমানের আলো কীভাবে ওই নির্দিষ্ট উচ্চতা তৈরি করেছিল?
এই যে আলো দিয়ে উচ্চতা মাপা হলো, এটা আসলে ত্রিভুজের ASA (Angle-Side-Angle বা কোণ-বাহু-কোণ) নিয়মের খেলা! বিমানের নির্দিষ্ট দৈর্ঘ্যটা ছিল ত্রিভুজের নির্দিষ্ট বাহু, আর দুই দিকের স্পটলাইটের আলো ছিল দুটো নির্দিষ্ট কোণ। এই তিনটা জিনিস মিলে শূন্যে একটা অদৃশ্য ত্রিভুজ তৈরি করেছিল। কারণ একটা নির্দিষ্ট সর্বসম ত্রিভুজ বানাতে সব তথ্য লাগে না, মাত্র ৩টি শর্ত জানলেই একটি নিখুঁত ত্রিভুজ লক হয়ে যায়। সর্বসমতার এই ৩টি নিয়মকে বলা হয়:
১. SAS (Side-Angle-Side / বাহু-কোণ-বাহু): দুটি বাহুর দৈর্ঘ্য এবং তাদের ভেতরের কোণ নির্দিষ্ট থাকলে কেবল একটিই ত্রিভুজ তৈরি সম্ভব।
২. ASA (Angle-Side-Angle / কোণ-বাহু-কোণ): দুটি কোণ এবং তাদের মাঝের বাহু নির্দিষ্ট থাকা। (ড্যাম বাস্টারদের বিমানে এই নিয়মটিই ব্যবহার করা হয়েছিল! বিমানের দৈর্ঘ্য ছিল নির্দিষ্ট বাহু, আর দুটি আলোর কোণ ছিল নির্দিষ্ট।)
৩. SSS (Side-Side-Side / বাহু-বাহু-বাহু): তিনটি বাহুর দৈর্ঘ্য নির্দিষ্ট করে দিলে ত্রিভুজের আকৃতি আর কোনোভাবেই বদলানো সম্ভব নয়। (এটি সবচেয়ে অদ্ভুত! মনে করো, নির্দিষ্ট দৈর্ঘ্যের একটি দাগের দুই প্রান্ত থেকে দুটি ব্যাসার্ধ নিয়ে বৃত্ত আঁকলে, তারা ওপরে কেবল একটি নির্দিষ্ট বিন্দতেই ছেদ করতে পারে!)
তিনটির মধ্যে SSS (বাহু-বাহু-বাহু) হয়তো সবচেয়ে কম সুস্পষ্ট। তবে একটু কল্পনা করো তো—একটি নির্দিষ্ট দৈর্ঘ্যের রেখা নিলেন এবং এর দুই প্রান্তে নির্দিষ্ট ব্যাসার্ধের দুটি বৃত্ত আঁকলে (চিত্র ৪৪)।
রাতের আঁধারে বিমানে বসে পাইলট যখনই দেখলেন পানির ওপর আলো দুটি আলাদা না থেকে একদম একবিন্দুতে মিলে গেছে—তিনি বুঝে গেলেন বিমানটি ঠিক ৬০ ফুট উঁচুতে আছে! আর অমনি—বুম!
এখানে দেখা যাচ্ছে, বৃত্ত দুটি যদি আদৌ পরস্পরকে ছেদ করে, তাহলে তারা মূল রেখার যেকোনো একপাশে একটি নির্দিষ্ট বিন্দু P-তে মিলিত হবে। তাহলে একটি ত্রিভুজের নিখুঁত আকার ও আকৃতি নির্ধারণের জন্য এখন আমাদের কাছে তিনটি উপায় রয়েছে। আর এগুলো সরাসরি ত্রিভুজের সর্বসমতা চিহ্নিত করার ও তা কাজে লাগানোর তিনটি পথের দিকে আমাদের নিয়ে যায়।
দেখতেই পাচ্ছো, জ্যামিতি শুধু বইয়ের পাতার কাটখোট্টা উপপাদ্য নয়, আমাদের চারপাশের জগতেও এর চমৎকার সব ব্যবহার ছড়িয়ে আছে। আগের পর্বে আমরা দেখেছি, প্রাচীন গ্রিক গণিতবিদ থেলিস পিরামিডে না চড়েই নিচ থেকে এর বিশাল উচ্চতা মেপে ফেলেছিলেন! কীভাবে? তিনি শুধু মাটিতে পোঁতা নিজের হাতের লাঠির ছায়া আর পিরামিডের ছায়ার অনুপাত হিসেব করেছিলেন। সদৃশ ত্রিভুজের এই সহজ সূত্র ব্যবহার করেই বেরিয়ে এসেছিল পিরামিডের নিখুঁত উচ্চতা।
কখনো খেয়াল করেছ কি, নদীর ওপর বড় বড় ব্রিজের ফ্রেমগুলো বা টাওয়ারের গঠন সবসময় ত্রিভুজাকৃতির কেন হয়? এর পেছনে রয়েছে জ্যামিতির SSS নিয়ম। একটি চতুর্ভুজের ওপর চাপ দিলে তা সহজেই বেঁকে যেতে পারে। কিন্তু ত্রিভুজ প্রচণ্ড শক্ত ও অনমনীয় হয়। ত্রিভুজের তিনটি বাহুর দৈর্ঘ্য ঠিক থাকলে তাকে ধাক্কা দিয়ে বা চাপ প্রয়োগ করে বাঁকানো একপ্রকার অসম্ভব! আর এই শক্তির কারণেই বড় বড় স্থাপনায় ত্রিভুজের এত কদর।
গুগল ম্যাপে তুমি এই মুহূর্তে ঠিক কোথায় আছো, তা জ্যামিতির হিসাব ছাড়া বের করা অসম্ভব! মহাকাশে থাকা অন্তত ৩টি জিপিএস স্যাটেলাইট একসঙ্গে কাজ করে তোমার অবস্থান নির্ণয় করে। ত্রিভুজের সর্বসমতা, দূরত্ব এবং ট্রায়াংগুলেশন পদ্ধতি ব্যবহার করে এই স্যাটেলাইটগুলো জ্যামিতিক হিসেবের মাধ্যমে পৃথিবীর বুকে তোমার নিখুঁত লোকেশন পিনপয়েন্ট করে ফেলে।
ত্রিভুজ প্রচণ্ড শক্ত ও অনমনীয় হয়। এর তিনটি বাহুর দৈর্ঘ্য ঠিক থাকলে তাকে ধাক্কা দিয়ে বা চাপ প্রয়োগ করে বাঁকানো একপ্রকার অসম্ভব! আর এই শক্তির কারণেই বড় বড় স্থাপনায় ত্রিভুজের এত কদর।
সর্বসমতা
সর্বসম ত্রিভুজের তিনটি প্রধান পরীক্ষা চিত্র ৪৫-এ দেখানো হয়েছে।
এখানে হয়তো জোর দিয়ে বলা দরকার যে, SAS-এর ক্ষেত্রে কোণটিকে অবশ্যই দুটি বাহুর মাঝখানে থাকতে হবে, ঠিক যেমন ASA-এর ক্ষেত্রে বাহুটিকে অবশ্যই দুটি কোণের মাঝখানে থাকতে হবে। তবে এই বিষয়টি পরিষ্কার করার পর, আমি দ্রুত সর্বসমতা পরীক্ষার দুটি বাস্তব উদাহরণের দিকে এগিয়ে যেতে চাই।
আলো কেন সমকোণে প্রতিফলিত হয়?
আয়নায় আলো পড়লে সে যে কোণে এসে পড়ে (প্রতিফলন কোণ), ঠিক সেই কোণেই প্রতিফলিত হয়ে বেরিয়ে যায়—এ তো আমরা সবাই জানি। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে চুল আঁচড়ানোর সময় কখনো কি ভেবেছ তা কেন হয়?
পানির ওপর বল মারলে যেমন ধাক্কা খেয়ে নির্দিষ্ট কোণে ফেরত আসে, আলোর ক্ষেত্রেও তা-ই। পদার্থবিজ্ঞানের ভাষায় এটাকে বলে প্রতিফলনের সূত্র (আপতন কোণ = প্রতিফলন কোণ)। কিন্তু প্রশ্ন হলো, আলো কেন এই নির্দিষ্ট নিয়মই মেনে চলে? সে কি অন্য কোনো কোণে বেঁকে যেতে পারত না? আজ থেকে প্রায় দুই হাজার বছর আগে (খ্রিষ্টাব্দ ১০০ অব্দে) মিসরের আলেকজান্দ্রিয়ার এক অসাধারণ গণিতবিদ ও উদ্ভাবক হ্যারন জ্যামিতির সাহায্যে এর এক অদ্ভুত ও চমৎকার ব্যাখ্যা দিয়েছিলেন!
এখানে হয়তো জোর দিয়ে বলা দরকার যে, SAS-এর ক্ষেত্রে কোণটিকে অবশ্যই দুটি বাহুর মাঝখানে থাকতে হবে, ঠিক যেমন ASA-এর ক্ষেত্রে বাহুটিকে অবশ্যই দুটি কোণের মাঝখানে থাকতে হবে।
হ্যারন বললেন, আলো আসলে ভীষণ কুঁড়ে বা অলস! সে সবসময় এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় যাওয়ার জন্য সবচেয়ে কম দূরত্ব বা শর্টকাট পথ বেছে নেয়। আর এই সবচেয়ে কম দূরত্ব পাড়ি দিতে গিয়েই আসার কোণ আর যাওয়ার কোণ একদম সমান হয়ে যায়! ধরো, আলো A বিন্দু থেকে বের হয়ে আয়নার P বিন্দুতে ধাক্কা খেয়ে B বিন্দুতে যাবে (চিত্র ৪৬ক)। আমাদের বের করতে হবে—আয়নার ঠিক কোন বিন্দুতে (P) ধাক্কা খেলে আলোর মোট পথ (AP + PB) সবচেয়ে কম বা শর্টকাট হবে?
হ্যারন জ্যামিতির একটি দারুণ ট্রিক খাটালেন। তিনি আয়নার উল্টো পাশে (কাল্পনিক ভেতরের দিকে) B বিন্দুর একটি হুবহু প্রতিবিম্ব B' চিন্তা করলেন (যেখানে আয়না থেকে B আর B'-এর দূরত্ব একদম সমান)। অর্থাৎ OB = OB'। তখন POB এবং POB′ত্রিভুজ দুটি SAS (বাহু-কোণ-বাহু) অনুসারে সর্বসম হবে (যেহেতু এখানকার কোণটি ৯০ ডিগ্রি)।
সর্বসমতার SAS নিয়ম দিয়ে খুব সহজেই প্রমাণ করা যায় যে, আয়নার ওপর P বিন্দু যেখানেই থাক না কেন, PB আর PB'-এর দৈর্ঘ্য সবসময় একদম সমান হবে! তার মানে, AP + PB-কে সবচেয়ে ছোট করতে হলে আসলে AP + PB'-কে সবচেয়ে ছোট করতে হবে।
এবার চিন্তা করো—দুটি বিন্দুর (A এবং B') মধ্যে সবচেয়ে ছোট বা শর্টকাট পথ কী হতে পারে? একটি সোজা সরলরেখা (A-P-B') (চিত্র ৪৬খ)! আলো যখন এই সোজা সরলরেখার পথে চলে, তখন জ্যামিতির বিপ্রতীপ কোণের নিয়মে আলোর আপতন কোণ (আসার কোণ) এবং প্রতিফলন কোণ (বের হওয়ার কোণ) হুবহু সমান হতে বাধ্য!
সর্বসমতার SAS নিয়ম দিয়ে খুব সহজেই প্রমাণ করা যায় যে, আয়নার ওপর P বিন্দু যেখানেই থাক না কেন, PB আর PB'-এর দৈর্ঘ্য সবসময় একদম সমান হবে!
জ্যামিতি দিয়ে ফিজিক্সের এত বড় একটা সত্য প্রমাণের কী চমৎকার উপায়, তাই না?
তুমি কি কখনো বিলিয়ার্ডস বা ক্যারেম খেলেছ? বোর্ডের দেওয়ালে স্ট্রাইকার দিয়ে ধাক্কা মেরে যখন কোনায় লাল গুটি পাঠাতে চাও, তোমার মগজ কিন্তু অজান্তেই এই হ্যারনের জ্যামিতি হিসেব করে! বোর্ডের দেওয়ালে বল বা গুটি ধাক্কা খেয়ে যে কোণে বের হয়, তা ঠিক আলোর প্রতিফলনের এই শর্টকাট জ্যামিতির নিয়মেই কাজ করে।
হ্যারনের এই ধারণাটি পরবর্তীতে বিজ্ঞানের এক মহা-আবিষ্কারের ভিত্তি তৈরি করেছিল। সপ্তদশ শতকে ফরাসি গণিতবিদ পিয়েরে দ্য ফার্মা বললেন: আলো শুধু শর্টকাট দূরত্ব নয়, সে আসলে সবচেয়ে কম সময়ে পৌঁছানোর পথ খোঁজে!
মনে করো সৈকতে দাঁড়িয়ে থাকা এক লাইফগার্ড সাগরে ডুবতে থাকা একজনকে বাঁচাতে দৌড়ে যাবে। বালুর ওপর দিয়ে দৌড়ানো সহজ ও দ্রুত, কিন্তু পানিতে সাঁতার কাটা কঠিন ও ধীরগতির। লাইফগার্ড কি একদম সোজা লাইনে গিয়ে পানিতে নামবে? না! সে বালুর ওপর দিয়ে কিছুটা বেশি পথ দৌড়ে এমন একটি কোণে পানিতে নামবে, যাতে তার মোট সময় সবচেয়ে কম লাগে।
আলো যখন বাতাস থেকে কাচে বা পানিতে ঢোকে (প্রতিসরণ), তখন সে-ও ঠিক এই চালাক লাইফগার্ডের মতোই সামান্য বেঁকে গিয়ে নিজের সময় বাঁচায়!
সপ্তদশ শতকে ফরাসি গণিতবিদ পিয়েরে দ্য ফার্মা বললেন: আলো শুধু শর্টকাট দূরত্ব নয়, সে আসলে সবচেয়ে কম সময়ে পৌঁছানোর পথ খোঁজে!
সামান্তরিকের রহস্য
চিন্তা করে দেখেছ, সামান্তরিক বা প্যারালেলোগ্রাম (Parallelogram) নামটার ভেতরেই এর আসল পরিচয় লুকিয়ে আছে? যার বিপরীত বাহুগুলো পরস্পরের সমান্তরাল, সেটাই সামান্তরিক। কিন্তু মজার ব্যাপার হলো, এর বিপরীত বাহুগুলোর দৈর্ঘ্যও কিন্তু সবসময় হুবহু সমান হয়!
কিন্তু প্রশ্ন হলো—কে তৈরি করল এই চমৎকার নিয়ম? জ্যামিতি কীভাবে নিশ্চিত করে যে বিপরীত বাহু দুটো সমান হতে বাধ্য?
এটি প্রমাণের জন্য সামান্তরিকের মাঝখান দিয়ে একটি কর্ণ (AC) এঁকে নিলেই কেল্লা ফতে! খানে কালো ডট (•) কোণগুলো সমান (একান্তর কোণ), এবং ঠিক একই কারণে সাদা ডট কোণগুলোও সমান। একান্তর কোণের নিয়মে কোণগুলো সমান হয় এবং মাঝের কর্ণটি দুটি ত্রিভুজেই সাধারণ বাহু।
ফলে ASA নিয়মে ABC এবং CDA ত্রিভুজ দুটি সর্বসম হয়। আর অমনি বোঝা যায়—বিপরীত বাহুগুলো হুবহু সমান! সুতরাং নির্দিষ্টভাবে বলা যায়, AB = CD এবং BC = DA। আমরা মূলত এটিই প্রমাণ করতে চেয়েছিলাম।
যার বিপরীত বাহুগুলো পরস্পরের সমান্তরাল, সেটাই সামান্তরিক। কিন্তু মজার ব্যাপার হলো, এর বিপরীত বাহুগুলোর দৈর্ঘ্যও কিন্তু সবসময় হুবহু সমান হয়!
সদৃশতা
দুটি ত্রিভুজের তিনটি কোণই যদি সমান হয়, তবে তাদের দেখতে একই রকম লাগবে, কিন্তু সাইজ ছোট-বড় হতে পারে। একেই বলে সদৃশতা। সদৃশ ত্রিভুজগুলোর আকৃতি হুবহু একই রকম হয়, আর তাই এদের তিনটি কোণও সমান হয়। এর ফলে এদের সবকটি বাহু একটি নির্দিষ্ট অনুপাতে থাকে, যাকে k বা স্কেল ফ্যাক্টর বলা হয়।
ফোনে গুগল ম্যাপ ব্যবহার করার সময় যখন জুম-ইন বা জুম-আউট করো, তখন এই স্কেল ফ্যাক্টর (k) কাজ করে! বাস্তব পৃথিবীর সুবিশাল রাস্তাগুলোকে এই জ্যামিতিক অনুপাত ঠিক রেখে তোমার ছোট্ট স্ক্রিনে একদম সঠিকভাবে সদৃশ করে দেখানো হয়। আবার কোনো স্থপতি বা আর্কিটেক্ট যখন বিশাল এক প্রাসাদের নকশা কাগজে আঁকেন, তখন তিনি জ্যামিতিক সদৃশতার নিয়মই মানেন। কাগজের ১ সেন্টিমিটার বাস্তবে হয়তো ১০ ফুট নির্দেশ করে!
দুটি ত্রিভুজের একটি যদি অন্যটির চেয়ে ২ গুণ বা ৩ গুণ বড় হয়, তবে স্কেল ফ্যাক্টর k = 2 বা k = 3। আর যদি k = 1 হয়ে যায়? অর্থাৎ বাহুগুলোর অনুপাত ১:১? অমনি সদৃশ চিত্রটি রূপ নেয় সর্বসমতায়! অর্থাৎ, সর্বসমতা আসলে সদৃশতারই এক বিশেষ রূপ, যেখানে স্কেল ফ্যাক্টর ঠিক ১।
তাই এতে অবাক হওয়ার কিছু নেই যে, সদৃশতা প্রমাণের তিনটি প্রধান পরীক্ষা (চিত্র ৪৮) সর্বসমতার পরীক্ষাগুলোর সাথেই দারুণভাবে মিলে যায়। সেগুলো হলো AAA, SAS (অনুপাতে), এবং SSS (অনুপাতে)। AAA (Angle-Angle-Angle): তিনটি কোণ সমান হওয়া। SAS (Side-Angle-Side): দুটি বাহু একই অনুপাতে থাকা এবং তাদের মাঝের কোণ সমান হওয়া। SSS (Side-Side-Side): তিনটি বাহুই একই অনুপাতে থাকা।
কোনো স্থপতি বা আর্কিটেক্ট যখন বিশাল এক প্রাসাদের নকশা কাগজে আঁকেন, তখন তিনি জ্যামিতিক সদৃশতার নিয়মই মানেন। কাগজের ১ সেন্টিমিটার বাস্তবে হয়তো ১০ ফুট নির্দেশ করে!
মিড-পয়েন্ট থিওরেম
জ্যামিতি নিয়ে যাদের ধারণা—এটা কেবল কঠিন সব উপপাদ্য আর মুখস্থ প্রমাণের চ্যাপ্টার, তাদের জন্য এখানে একটা চমক আছে। কারণ গণিতের পাতায় এমন কিছু নিয়ম লুকিয়ে আছে, যা জানা থাকলে যেকোনো এলোমেলো আকৃতিকেও চোখের নিমেষে এক নিখুঁত সৌন্দর্যে বদলে দেওয়া যায়।
জ্যামিতির অত্যন্ত শক্তিশালী একটি হাতিয়ার মিড-পয়েন্ট থিওরেম। সোজা বাংলায় একে বলা যায় মধ্যবিন্দু উপপাদ্য। নিয়মটা কিন্তু খুব সোজা।
তুমি যেকোনো সাইজের বা যেকোনো আকৃতির একটি ত্রিভুজ নাও। এবার তার যেকোনো দুটি বাহুর একদম মাঝের বিন্দু দুটোকে (মধ্যবিন্দু) একটি সোজা দাগ দিয়ে জুড়ে দাও। ফলাফল? এই নতুন দাগটি ত্রিভুজের তিন নম্বর বাহুটির সাথে সবসময় সমান্তরাল হবে এবং দৈর্ঘ্যে তার ঠিক অর্ধেক (1/2) হবে (চিত্র ৪৯)।
এটি বোঝার জন্য আমরা PCQ এবং ACB ত্রিভুজ দুটির তুলনা করতে পারি। এদের উভয়েরই সাধারণ কোণ হলো C, এবং এদের সংলগ্ন বাহুগুলোও সমানুপাতিক। এখানে PC = ½ AC এবং QC = ½ BC।
তাই তারা SAS অনুসারে সদৃশ, যার স্কেল ফ্যাক্টর বা অনুপাত K = ১/২।
সুতরাং এদের প্রতিটি কোণ অবশ্যই অনুরূপ হবে এবং বিশেষ করে, CPQ = CAB সমান হবে।
তাই বলা যায় PQ এবং AB সমান্তরাল।
গণিতের পাতায় এমন কিছু নিয়ম লুকিয়ে আছে, যা জানা থাকলে যেকোনো এলোমেলো আকৃতিকেও চোখের নিমেষে এক নিখুঁত সৌন্দর্যে বদলে দেওয়া যায়।
ভারিগননের উপপাদ্য: জ্যামিতির ম্যাজিক!
এখন এমন একটি উপপাদ্যের কথা বলব যা দেখলে মনে হবে জ্যামিতিক জাদু!
যেকোনো অদ্ভুত, বাঁকাচ্যাটা, চার বাহুর আকৃতি (চতুর্ভুজ) নাও। এবার তার চার বাহুর মধ্যবিন্দুগুলো ফিতা দিয়ে মেপে চিহ্নিত করো। মধ্যবিন্দুগুলোকে পর পর চার কোণায় দাগ টেনে যোগ করে দাও।
ফলাফল কি হবে জানো? ভেতরে যে নতুন ৪ বাহুর আকৃতি তৈরি হবে, তা সবসময়, ১০০% একটি নিখুঁত সামান্তরিক হবে! আকৃতিটা বাইরে থেকে দেখতে যতই বিচ্ছিরি বা বাঁকাচ্যাটা হোক না কেন—ভেতরের আকৃতিটি সামান্তরিক হতে বাধ্য!
প্রথম দেখায় এটাকে কোনো ভৌতিক ঘটনা মনে হলেও, মিড-পয়েন্ট থিওরেম দিয়ে এক সেকেন্ডেই এর রহস্য ফাঁস করা যায়!
মূল আঁকাবাঁকা চতুর্ভুজের এক কোণা থেকে অন্য কোণায় একটি কাল্পনিক দাগ বা কর্ণ টেনে নাও। এতে করে মূল চতুর্ভুজটি দুটি ত্রিভুজে ভাগ হয়ে গেল (একটি ওপরে, একটি নিচে)। এবার ওপরের ত্রিভুজটিতে মিড-পয়েন্ট থিওরেম খাটাও—ভেতরের ওপরের বাহুটি হবে মাঝের কর্ণের সমান্তরাল ও অর্ধেক।
যে চতুর্ভুজের বিপরীত বাহুগুলো পরস্পর সমান্তরাল ও সমান—তা-ই তো সামান্তরিক! ১৭৩১ সালে ফরাসি গণিতবিদ পিয়েরে ভারিগনন এটি আবিষ্কার করেন।
একইভাবে নিচের ত্রিভুজটিতেও মিড-পয়েন্ট থিওরেম খাটাও—ভেতরের নিচের বাহুটিও হবে সেই একই কর্ণের সমান্তরাল ও অর্ধেক! তার মানে, ভেতরের বিপরীত বাহু দুটি একই কর্ণের সমান্তরাল হওয়ায় তারা নিজেদের মধ্যেও পরস্পর সমান্তরাল ও সমান! অন্য দুটি কোণার ক্ষেত্রে দ্বিতীয় কর্ণটি একে একই নিয়মে প্রমাণ করা যায় (চিত্র ৫১)।
যে চতুর্ভুজের বিপরীত বাহুগুলো পরস্পর সমান্তরাল ও সমান—তা-ই তো সামান্তরিক!
১৭৩১ সালে ফরাসি গণিতবিদ পিয়েরে ভারিগনন এটি আবিষ্কার করেন। তাঁর নামানুসারেই এই উপপাদ্যের নামকরণ করা হয়েছে। যেকোনো চতুর্ভুজের মধ্যবিন্দু যোগ করে তৈরি হওয়া সামান্তরিকটির ক্ষেত্রফল সবসময় মূল চতুর্ভুজের ঠিক অর্ধেক (1/2) হয়! জমি মাপার সময় বা জটিল কোনো প্লটের ক্ষেত্রফল সহজে বের করতে সারভেয়াররা এই ট্রিক ব্যবহার করেন। বাঁকাচ্যাটা গঠনকে মজবুত করা। বড় বড় স্থাপনা বা ব্রিজের ট্রাস ডিজাইনে মধ্যবিন্দু ও সামান্তরিকের এই ভারসাম্য ব্যবহার করা হয় যেন চাপ সমানভাবে ছড়ায়। আবার কোনো ছবিকে হুবহু বড় বা ছোট করে আঁকার যন্ত্র প্যান্টোগ্রাফ-এ এই জ্যামিতিক সামান্তরিকের ফ্রেমই ব্যবহার করা হয়!
