পিথাগোরাসের উপপাদ্য

সমকোণী ত্রিভুজ বলতে বোঝায় যার একটি কোণ কাঁটায় কাঁটায় ৯০ ডিগ্রিছবি: সংগৃহীত

যদি প্রশ্ন করা হয়, সবচেয়ে বিখ্যাত উপপাদ্য কোনটি? তাহলে এক কথায় উত্তর হবে পিথাগোরাসের উপপাদ্য। আসলে গণিতের বিশাল জগতে সবচেয়ে বিখ্যাত, সবচেয়ে কাজের আর সবচেয়ে সুপরিচিত একটা নিয়মের নাম যদি বলতে হয়, তাহলে সেটা নিঃসন্দেহে পিথাগোরাসের উপপাদ্য। সমকোণী ত্রিভুজের বাহুগুলোর মধ্যে এমন যে একটা চমৎকার, সহজ আর নিখুঁত সম্পর্ক থাকতে পারে—তা সত্যিই অবাক করার মতো!

এই উপপাদ্যের মূল কথাটাও একদম সহজ। আর এর প্রমাণগুলো বেশ মজার। এই পর্বে আমরা সেরকম কয়েকটি প্রমাণ দেখাবো। তার আগে এই বহুল আলোচিত উপপাদ্যটির সঙ্গে পরিচিত হওয়া যাক।

যেকোনো সমকোণী ত্রিভুজ—মানে যার একটি কোণ কাঁটায় কাঁটায় ৯০ ডিগ্রি—তার তিনটি বাহু থাকে। বাহুগুলোর নির্দিষ্ট নামও আছে। যেমন অতিভুজ, লম্ব এবং ভূমি। সমকোণের ঠিক বিপরীতে থাকা সবচেয়ে লম্বা বাহুকেই বলে অতিভুজ (c)। আর অন্য বাহু দুটিকে (a এবং b) বলা হয় লম্ব (b) এবং ভূমি (a)। ২৪ নং ছবিটা দেখো।

ছবি ২৪: পিথাগোরাসের উপপাদ্য

গ্রিক পণ্ডিত পিথাগোরাস বললেন: কোনো সমকোণী ত্রিভুজের অতিভুজের ওপর আঁকা বর্গক্ষেত্রের ক্ষেত্রফল, অপর দুই বাহুর ওপর আঁকা বর্গক্ষেত্রদ্বয়ের ক্ষেত্রফলের যোগফলের সমান। সহজ বীজগণিতের ভাষায় যা দাঁড়ায়: a2 + b2 = c2। অর্থাৎ, অতিভুজের দৈর্ঘ্যের বর্গ (c2) হবে বাকি দুই বাহুর দৈর্ঘ্যের বর্গের— ভূমির বর্গ (a2) এবং লম্বের বর্গ (b2)—যোগফলের সমান!

আরও পড়ুন
গ্রিক পণ্ডিত পিথাগোরাস বললেন: কোনো সমকোণী ত্রিভুজের অতিভুজের ওপর আঁকা বর্গক্ষেত্রের ক্ষেত্রফল, অপর দুই বাহুর ওপর আঁকা বর্গক্ষেত্রদ্বয়ের ক্ষেত্রফলের যোগফলের সমান।

অনেকেই মনে করেন এই উপপাদ্যটি হয়তো পিথাগোরাস হুট করে একদিন একা একাই আবিষ্কার করে ফেলেছিলেন। কিন্তু আসল ইতিহাস আরও রোমাঞ্চকর! পিথাগোরাসের জন্মেরও প্রায় এক হাজার বছর আগে প্রাচীন ব্যাবিলন (বর্তমান ইরাক) এবং প্রাচীন ভারতের স্থপতিরা ৩, ৪ ও ৫ একক দৈর্ঘ্যের বাহুওয়ালা ত্রিভুজ দিয়ে সমকোণ তৈরি করতে পারতেন।

যেমন প্রাচীন ব্যাবিলনের একটি বিখ্যাত পোড়ামাটির ফলকের নাম প্লিম্পটন ৩২২। এতে কিউনিফর্ম হরফে বেশ কিছু সংখ্যা লেখা আছে, যা আসলে পিথাগোরিয়ান ট্রিপ্লেট বা ত্রয়ীর তালিকা! পিথাগোরাসের জন্মের কয়েকশো বছর আগে ভারতীয় গণিতবিদ বৌধায়ন তাঁর শুল্বসূত্রে ঠিক একই ধারণার কথা লিপিবদ্ধ করেছিলেন। এছাড়া প্রাচীন ভারতে যজ্ঞের বেদি বা আলতার নিখুঁত সমকোণ তৈরির জন্য গ্রন্থি দেওয়া দড়ি ব্যবহার করা হতো। আর সেজন্য ব্যবহার করা হতো পিথাগোরাসের নামে পরিচিত সেই ত্রয়ী সংখ্যা।

এদিকে মিশরের পিরামিড এবং নীল নদের অববাহিকায় জমি পরিমাপের জন্য মিশরীয়রা ১২টি সমান ভাগে ভাগ করা বা গিঁট দেওয়া দড়ি ব্যবহার করত। বাহুগুলোর অনুপাত ৩:৪:৫ বানিয়ে তারা সমকোণী ত্রিভুজ গঠন করত। গ্রিক ইতিহাসবিদদের মতে, থেলিস এবং পিথাগোরাস মিশর ভ্রমণ করেই জ্যামিতির এই প্রাথমিক জ্ঞান অর্জন করেছিলেন। আবার চীনে এই উপপাদ্যটি গোউগু নীতি নামে পরিচিত (এ বিষয়ে আরও আলোচনা করবো একটু পরে)।

আরও পড়ুন
প্রাচীন ব্যাবিলনের একটি বিখ্যাত পোড়ামাটির ফলকের নাম প্লিম্পটন ৩২২। এতে কিউনিফর্ম হরফে বেশ কিছু সংখ্যা লেখা আছে, যা আসলে পিথাগোরিয়ান ট্রিপ্লেট বা ত্রয়ীর তালিকা!

ব্যাবিলনীয়, মিশরীয় বা ভারতীয়রা এই নীতিটি ব্যবহারিক কাজে (স্থাপত্য, জমি মাপা, যজ্ঞবেদি তৈরি) প্রয়োগ করত। কিন্তু পিথাগোরাস (বা তাঁর শিষ্যরা) প্রথম একে শুধু বাস্তব প্রয়োগে সীমাবদ্ধ না রেখে গাণিতিক যুক্তির মাধ্যমে সার্বজনীনভাবে প্রমাণ করেছিলেন যে, এটি যেকোনো সমকোণী ত্রিভুজের জন্যই সত্য।

যাই হোক, এই ত্রয়ী সংখ্যাটা কেমন? একটু হিসাব করে দেখা যাক:

যেমন: a = 3 এবং b = 4 হলে, 32 + 42 = 9 + 16 = 25। আর 25 হলো 52—মানে অতিভুজ c হবে 5!

এই ৩, ৪, ৫ সংখ্যা তিনটি হলো পিথাগোরীয় ট্রিপলেট বা পিথাগোরাসের ত্রয়ী সংখ্যার সবচেয়ে প্রথম ও জনপ্রিয় উদাহরণ।

ব্যাবিলনের এক প্রাচীন কাদামাটির ফলকে এই ৩-৪-৫ ত্রিভুজ দিয়ে এক দারুণ ধাঁধা লেখা ছিল: ৫ একক লম্বা একটি মই দেয়ালের সাথে একদম খাড়াভাবে লাগানো আছে। মইটির ওপরের অংশটি যদি ১ একক নিচে পিছলে নেমে যায়, তাহলে নিচের অংশটি দেয়াল থেকে কতটা দূরে সরে যাবে?

ছবি ২৫: জন ব্যাবিংটনের ট্রিটিজ অব জিওমেট্রি (১৬৩৫) থেকে নেওয়া পিথাগোরাসের উপপাদ্যের বিশেষ ৩-৪-৫ ক্ষেত্র

সহজ সমাধান: শুরুর অবস্থা: মইটির দৈর্ঘ্য ছিল c = 5 একক। যখন তা দেয়ালের সাথে একদম খাড়াভাবে ছিল, তখন দেয়ালের উচ্চতাও ছিল 5 একক। পিছলে নামার পর: ওপরের অংশ 1 একক নিচে নেমে গেল। ফলে দেয়ালের নতুন উচ্চতা দাঁড়াল: 5 - 1 = 4 একক।

আরও পড়ুন
তবে মনে রেখো, ৩-৪-৫ হলো এই উপপাদ্যের খুব বিশেষ একটি পূর্ণসংখ্যার বিশেষ ক্ষেত্র মাত্র। এটাই কিন্তু সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র নয়!

এবার জ্যামিতির হিসাব: মইটির দৈর্ঘ্য কিন্তু পাল্টায়নি, তা আগের মতোই 5 এককই আছে (যা এখানে অতিভুজ c)! আর দেয়ালের উচ্চতা এখন b = 4 একক। পিথাগোরাসের নিয়ম বসালে:

a2 + 42 = 52

a2 + 16 = 25

a2 = 25 - 16 = 9

a = √9 = 3

অর্থাৎ, মইটির নিচের অংশটি দেয়াল থেকে ঠিক ৩ একক দূরে সরে যাবে! দেখলে তো, কীভাবে ৩-৪-৫ ত্রিভুজটা চোখের সামনে ফুটে উঠল?

তবে মনে রেখো, ৩-৪-৫ হলো এই উপপাদ্যের খুব বিশেষ একটি পূর্ণসংখ্যার বিশেষ ক্ষেত্র মাত্র। এটাই কিন্তু সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র নয়! পিথাগোরাসের এই সূত্রের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো—বাহুর দৈর্ঘ্য ৩, ৪, ৫ হোক কিংবা ১.৫, ২, ২.৫ কিংবা ভগ্নাংশ, এমনকি কোনো অমূলদ সংখ্যাও হোক না কেন—ত্রিভুজটি সমকোণী হলেই a2 + b2 = c2 সূত্রটি ঠিকমতো কাজ করবে! কিন্তু প্রশ্ন হলো—পিথাগোরাস কীভাবে নিশ্চিত হলেন যে এটি পৃথিবীর যেকোনো সমকোণী ত্রিভুজের জন্যই সত্যি? তিনি কীভাবে সেটা প্রমাণ করেছিলেন? সেই প্রমাণের গল্পটাই কিন্তু আসল চমক!

আরও পড়ুন
সাড়ে তিন হাজার বছর আগে প্রাচীন ব্যাবিলনীয়রা এমন এক নিখুঁত মান বের করে বসেছিল, যা আসল মানের সাথে ১০ লাখ ভাগের ১ ভাগের মতো সামান্য তফাত দেখায়!

অপ্রত্যাশিত অমূলদ সংখ্যা

পিথাগোরাসের সূত্র শিখেই আমরা ভাবি—গণিত বোধহয় খুব সুন্দর, নিয়মমাফিক আর গোছানো। কিন্তু এই সূত্রের ভেতরেই লুকিয়ে ছিল এমন এক রহস্য, যা প্রাচীন গণিতবিদদের রাতের ঘুম হারাম করে দিয়েছিল! সামান্য ১ সেমি আর ১ সেমির দুটি বাহু এক মস্ত ঝাঁকুনি দিয়েছিল পুরো গণিত জগতকে।

চিন্তা করো তো, এমন একটা বর্গক্ষেত্র আঁকা হলো, যার প্রতিটি বাহুর দৈর্ঘ্য ১ একক। এবার তার মাঝখান দিয়ে আড়াআড়ি একটা কর্ণ টেনে দাও। এভাবে যে সমকোণী ত্রিভুজটা তৈরি হলো, তার: ভূমি (a) = 1 এবং লম্ব (b) = 1।

তাহলে এবার পিথাগোরাসের সূত্র অনুযায়ী: c2 = 12 + 12 = 2,

অর্থাৎ অতিভুজ হবে c = √2 (উচ্চারণ রুট ২)!

ছবি ২৬: পিথাগোরাসের উপপাদ্যের আরেকটি বিশেষ ক্ষেত্র

খ্রিষ্টপূর্ব ১৭০০ অব্দের (আজ থেকে প্রায় ৩,৭০০ বছর আগের) একটি ব্যাবিলনীয় কাদার ফলক পাওয়া গেছে। সেটা ইতিহাসে YBC 7289 নামে পরিচিত (২৬ নং ছবির ডান পাশে দেখো)। এই ছোট কাদার টুকরোটিতে কিউনিফর্ম অক্ষরে একটি বর্গের বাহু আর কর্ণের অনুপাত নিখুঁতভাবে লেখা ছিল। ব্যাবিলনীয়দের সেই হিসাবকে আজকের দশমিকে রূপান্তর করলে দাঁড়ায়: 1.41421296...

আজকের আধুনিক কম্পিউটারে √2-এর মান হলো 1.41421356...। ভেবে দেখো, সাড়ে তিন হাজার বছর আগে প্রাচীন ব্যাবিলনীয়রা এমন এক নিখুঁত মান বের করে বসেছিল, যা আসল মানের সাথে ১০ লাখ ভাগের ১ ভাগের মতো সামান্য তফাত দেখায়!

আরও পড়ুন
খ্রিষ্টপূর্ব ১৭০০ অব্দের একটি ব্যাবিলনীয় কাদার ফলক পাওয়া গেছে। এই ছোট কাদার টুকরোটিতে কিউনিফর্ম অক্ষরে একটি বর্গের বাহু আর কর্ণের অনুপাত নিখুঁতভাবে লেখা ছিল।

কিন্তু আসল কাণ্ডটা ঘটেছিল এর ঠিক পরেই। পিথাগোরাস এবং তাঁর অনুসারীরা (যাদের পিথাগোরীয় দল বলা হতো) বিশ্বাস করতেন—বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের সব কিছু নিখুঁত পূর্ণসংখ্যা এবং তাদের অনুপাত (ভগ্নাংশ) দিয়ে তৈরি। যেমন: ১/২, ৩/৪, ৫/৮ ইত্যাদি। তাঁদের কাছে এটি ছিল প্রায় এক ধর্মের মতো বিশ্বাস!

কিন্তু যখন তারা গাণিতিকভাবে প্রমাণ করে ফেললেন যে √2 কোনো সাধারণ ভগ্নাংশ হতে পারে না! অর্থাৎ এমন দুটি পূর্ণসংখ্যা p এবং q পাওয়া কোনোদিনই সম্ভব নয়, যাদের ভাগফল p/q আকারে লিখলে মান ঠিক √2 হবে! দশমিকের পর এর অঙ্কগুলো (1.41421356...) অনন্তকাল ধরে চলতে থাকবে, কিন্তু কখনোই কোনো নির্দিষ্ট ধারায় বা প্যাটার্নে পুনরাবৃত্তি হবে না। এই ধরনের সংখ্যাগুলোকে বলা হয় অমূলদ সংখ্যা বা ইর‍্যাশনাল নাম্বার।

এখানে মূলদ ও অমূলদ নিয়ে ছোট্ট দুটি কথা বলে রাখা ভালো। মনে করো, তোমার কাছে কয়েকটি পিজ্জা আছে এবং তা কয়েকজন বন্ধুর মধ্যে সমান ভাগে ভাগ করে দিতে হবে। যদি তুমি পিজ্জাগুলোকে একদম নিখুঁতভাবে টুকরো করে বা ভগ্নাংশ আকারে প্রকাশ করতে পারো, তাহলে সেটাই মূলদ সংখ্যা। সহজ কথায়, যেকোনো সংখ্যাকে যদি দুটি পূর্ণসংখ্যার অনুপাত বা ভগ্নাংশ আকারে লেখা যায়, তাহলে সেটিই মূলদ সংখ্যা র‍্যাশনাল নাম্বার। এই র‍্যাশনাল শব্দটি এসেছে ইংরেজি র‍্যাশিও থেকে, যার অর্থ অনুপাত বা ভগ্নাংশ। অর্থাৎ যা অনুপাত বা ভগ্নাংশ তৈরি করতে পারে।

আরও পড়ুন
গাণিতিকভাবে, যে গাণিতিক রাশি থেকে সুনির্দিষ্ট ও স্পষ্টভাবে এর মূল বা মান বের করা সম্ভব, তাকে বলা হলো মূলদ। যা ভগ্নাংশ বা নির্দিষ্ট পরিমাপে প্রকাশযোগ্য, তা-ই মূলদ।

অন্যদিকে মূলদ সংখ্যা ঠিক উল্টো হলো অমূলদ সংখ্যা। অর্থাৎ যেসব সংখ্যাকে ভগ্নাংশ আকারে লেখা যায় না এবং যার দশমিক মান কখনো শেষ হয় না কিংবা রিপিট (পৌনঃপুনিক) হয় না, সেগুলোই অমূলদ সংখ্যা। ইর‍্যাশনাল শব্দটি এসেছে ‘Not Ratio’ থেকে। অর্থাৎ যা অনুপাত বা ভগ্নাংশ মানতে অস্বীকার করে!

বাংলায় মূলদ ও অমূলদ শব্দ দুটি ব্যবহারেরও সুনির্দিষ্ট কিছু কারণ আছে। সংস্কৃত পরিভাষায় ‘মূল’ শব্দের অন্যতম অর্থ ছিল পরিমাপযোগ্য মান। গণিতে এই শব্দটি বর্গমূল (square root), ঘনমূল (cube root) ইত্যাদিতেও ব্যবহার করা হয়। ‘দ’— একটি সংস্কৃত প্রত্যয় যার অর্থ প্রদানকারী বা উৎপন্নকারী (যেমন জলদ = জল প্রদানকারী, সুখদ = সুখ প্রদানকারী)। তাই গাণিতিকভাবে, যে গাণিতিক রাশি থেকে সুনির্দিষ্ট ও স্পষ্টভাবে এর ‘মূল’ বা মান বের করা সম্ভব, তাকে বলা হলো মূলদ। যা ভগ্নাংশ বা নির্দিষ্ট পরিমাপে প্রকাশযোগ্য, তা-ই মূলদ। যেমন: গণিতে x2 = 4 হলে, এর মূল (root) পাওয়া যায় 2 (যা একটি নির্দিষ্ট পূর্ণসংখ্যা)।  

অন্যদিকে মূলদ শব্দের আগে ‘অ’ নঞর্থক বা না বোধক উপসর্গ যোগ করে অমূলদ শব্দটি তৈরি করা হয়েছে। অমূলদ হলো মূলদের ঠিক বিপরীত। যা মূলদ নয়, অর্থাৎ যেসব সংখ্যা বা রাশির কোনো নিখুঁত মূল বা ভগ্নাংশীয় মান বের করা যায় না, তা অমূলদ (যা মূল বা রুটের মান দেয় না)। যেমন √2-এর মতো রাশি।

ছবি ২৭: পিথাগোরাস সম্পর্কে নিশ্চিতভাবে জানা খুব অল্প কিছু তথ্যের একটি হলো—তিনি গণিত এবং সংগীতের মধ্যকার সম্পর্ক নিয়ে গবেষণা করেছিলেন। এই কাঠখোদাইচিত্রটি ফ্রাঙ্কিনো গাফুরিওর ‘থিওরিকা মিউজিকা’ (১৪৯২) থেকে নেওয়া হয়েছে

এর মানে দাঁড়াল—একটি বর্গক্ষেত্রের বাহু এবং তার কর্ণকে মাপার মতো কোনো সাধারণ ছোট স্কেল এই পৃথিবীতে নেই, যা দিয়ে মেপে তুমি দুটোকেই পূর্ণসংখ্যায় প্রকাশ করতে পারবে! তুমি যদি বাহুটি মেপে ১ মিটার বলো, কর্ণটি আর কোনো পূর্ণসংখ্যার ভগ্নাংশ থাকবে না।

আরও পড়ুন
অমূলদ হলো মূলদের ঠিক বিপরীত। যা মূলদ নয়, অর্থাৎ যেসব সংখ্যা বা রাশির কোনো নিখুঁত মূল বা ভগ্নাংশীয় মান বের করা যায় না, তা অমূলদ। যেমন √2-এর মতো রাশি।

এই সত্যটি পিথাগোরাসের নিখুঁত সুন্দর গাণিতিক বিশ্বভাবনাকে এক বড় ধাক্কা দিয়েছিল। পিথাগোরাস এবং তাঁর অনুসারীদের (যাঁদের পিথাগোরিয়ান বলা হতো) দর্শন ছিল—সবকিছুই সংখ্যা। তাঁদের ধারণা অনুযায়ী, বিশ্বজগতের সবকিছুই দুটি পূর্ণসংখ্যার অনুপাত বা ভগ্নাংশ (মূলদ সংখ্যা) দিয়ে প্রকাশ করা সম্ভব। কিন্তু এই সুন্দর ধারণাকে চুরমার করে দিয়েছিল তাঁদেরই এক আবিষ্কার, যা ইতিহাসে অমূলদ সংখ্যার ট্র্যাজেডি নামে পরিচিত!

এখানে সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডিটা হলো, হিপাসাস নামে পিথাগোরিয়ানদের এক সদস্যই একদিন আবিষ্কার করে বসলেন গণিতের প্রথম অমূলদ সংখ্যা। তাঁর পদ্ধতিটি কিছুক্ষণ আগেই আমরা আলোচনা করেছি। ওই যে বর্গক্ষেত্রের প্রতিটি বাহুর দৈর্ঘ্য এক একক নিলে সমকোণী ত্রিভুজের অতিভূজের মান পাওয়া যায় √2, যা একটি অমূলদ সংখ্যা।

যাই হোক, এই আবিষ্কারে পিথাগোরিয়ানরা প্রচণ্ড আতঙ্কিত হয়ে পড়েন। তাঁরা এই আবিষ্কার সাধারণ মানুষের কাছে গোপন রাখার জন্য কঠোর প্রতিজ্ঞা নেন। হিপাসাসকে নির্দেশ দেওয়া হয় যাতে তিনি এই নিয়ে কারও সাথে মুখ না খোলেন।

কিন্তু হিপাসাস ছিলেন খাঁটি সত্যসন্ধানী। তিনি এই গোপন তথ্য পিথাগোরিয়ান সম্প্রদায়ের বাইরে প্রকাশ করে দেন। কথিত আছে, একদিন হিপাসাস অন্য পিথাগোরিয়ানদের সাথে একটি নৌকায় করে সমুদ্রে যাচ্ছিলেন। তখন এই তথ্য ফাঁস করে দেওয়ার অপরাধে তাঁকে জাহাজ থেকে সমুদ্রে ফেলে দিয়ে ডুবিয়ে হত্যা করা হয়।

কিন্তু হিপাসাসকে হয়তো সমুদ্রে ডুবিয়ে দেওয়া হয়েছিল, কিন্তু সত্যকে তো আর ডুবিয়ে রাখা যায় না! এই অমূলদ সংখ্যার আবিষ্কার গণিতে গভীর প্রভাব ফেলেছিল। তাই পরবর্তীতে গ্রিক গণিতবিদ ইউক্লিড তাঁর বিখ্যাত এলিমেন্টস বইটি লেখার সময় সংখ্যাকে শুধু সংখ্যা হিসেবে না রেখে জ্যামিতিক রেখাংশের দৈর্ঘ্য দিয়ে প্রকাশ করার রীতি চালু করেন। আবার আজকের আধুনিক গণিত, জ্যামিতি এবং ক্যালকুলাসের ভিত্তি এই অমূলদ সংখ্যা।

আরও পড়ুন
কথিত আছে, একদিন হিপাসাস অন্য পিথাগোরিয়ানদের সাথে একটি নৌকায় করে সমুদ্রে যাচ্ছিলেন। তখন তথ্য ফাঁস করে দেওয়ার অপরাধে তাঁকে জাহাজ থেকে সমুদ্রে ফেলে দিয়ে ডুবিয়ে হত্যা করা হয়।

পিথাগোরাসের ৪টি মজার প্রমাণ!

a2 + b2 = c2—কথাটি আসলে কেবল সংখ্যার হিসাব নয়, কিন্তু এটি আসলে জ্যামিতিক সত্য! এটি দিয়ে বোঝা যায় ত্রিভুজের তিন বাহুর ওপর অঙ্কিত তিনটি বর্গক্ষেত্রের ক্ষেত্রফলের সম্পর্ক!

সহজ ভাষায় বললে: একটি সমকোণী ত্রিভুজের লম্ব ও ভূমির ওপর দুটি বর্গক্ষেত্র আঁকলে, তাদের মোট ক্ষেত্রফল হবে অতিভুজের ওপর আঁকা বর্গক্ষেত্রের ক্ষেত্রফলের একদম সমান!

ইতিহাসে এই উপপাদ্যের শত শত প্রমাণ রয়েছে। পিথাগোরাসের উপপাদ্যটি গণিত শাস্ত্রের সবচেয়ে বেশি উপায়ে প্রমাণিত হওয়া উপপাদ্যগুলোর একটি। এখন পর্যন্ত এর ৩৭০টিরও বেশি স্বতন্ত্র ও নিবন্ধিত প্রমাণ সংগৃহীত হয়েছে।

ছবি ২৮: পিথাগোরাসের উপপাদ্যের বিকল্প ব্যাখ্যা

১৯২৭ সালে প্রকাশিত তাঁর বিখ্যাত বই দ্য পিথাগোরিয়ান প্রোপোজিশন-এ ৩৭০টিরও বেশি ভিন্ন ভিন্ন প্রমাণ একত্র করে প্রকাশ করেন। গাণিতিক দৃষ্টিকোণ থেকে এই উপপাদ্যের সম্ভাবনাময় প্রমাণের সংখ্যা অসীম।

চলো, সবচেয়ে সুন্দর, সহজ আর বুদ্ধিদীপ্ত চারটি প্রমাণ দেখে নেওয়া যাক।

আরও পড়ুন
সহজ ভাষায় বললে: একটি সমকোণী ত্রিভুজের লম্ব ও ভূমির ওপর দুটি বর্গক্ষেত্র আঁকলে, তাদের মোট ক্ষেত্রফল হবে অতিভুজের ওপর আঁকা বর্গক্ষেত্রের ক্ষেত্রফলের একদম সমান!

ছবি দিয়ে প্রমাণ

ধরা যাক, তোমার কাছে একটা বড় বর্গাকার ফ্রেম আছে। আর আছে হুবহু একই মাপের ৪টি সমকোণী ত্রিভুজ (যাদের বাহু তিনটি হলো a, b, এবং অতিভুজ c)।

ত্রিভুজ ৪টিকে বড় ফ্রেমটির চার কোণায় এমনভাবে সাজাও যেন তাদের অতিভুজগুলো (c) ভেতরের দিকে থাকে। খেয়াল করে দেখো, চার কোণায় ৪টি ত্রিভুজ বসানোর পর মাঝখানে যে ফাঁকা জায়গাটা রয়ে গেল, সেটিও একটি নিখুঁত বর্গক্ষেত্র! যেহেতু এর প্রতিটি বাহুর দৈর্ঘ্য c, তাই এই খালি অংশের ক্ষেত্রফল হলো c2

এবার ত্রিভুজগুলোকে ফ্রেম থেকে বের না করে, স্রেফ ঘষে ঘষে (টাইলসের মতো সরিয়ে) জোড়ায় জোড়ায় একপাশে আনি। দুটি ত্রিভুজ মিলে একটা আয়তক্ষেত্র (a × b) বানিয়ে ফ্রেমে বসাই।

ছবি ২৯: পিথাগোরাসের উপপাদ্যের সরল প্রমাণ

যেহেতু আমরা বাইরের মূল ফ্রেম বা ৪টি ত্রিভুজের ক্ষেত্রফল একটুও কমাইনি বা বাড়াইনি, তাই ভেতরের বাকি থাকা খালি জায়গার মোট পরিমাণ আগের মতোই সমান থাকবে!

কিন্তু এবার সেই খালি জায়গাটা দুটো নতুন বর্গে ভাগ হয়ে গেছে: একটি ছোট বর্গ, যার বাহু a (ক্ষেত্রফল = a2) এবং একটি বড় বর্গ, যার বাহু b (ক্ষেত্রফল = b2)

কাজেই, আগের খালি জায়গা (c2) আর বর্তমানের খালি জায়গা (a2 + b2) একদম সমান!

অর্থাৎ, সোজা কথায়: c2 = a2 + b2!

আরও পড়ুন
চার কোণায় ৪টি ত্রিভুজ বসানোর পর মাঝখানে যে ফাঁকা জায়গাটা রয়ে গেল, সেটিও একটি নিখুঁত বর্গক্ষেত্র! যেহেতু এর প্রতিটি বাহুর দৈর্ঘ্য c, তাই এই খালি অংশের ক্ষেত্রফল হলো c2

 সহজ ও সরল বীজগণিতিক প্রমাণ

১৭০৭ সালে জন ওয়ার্ডের লেখা ইয়াং ম্যাথমেথিশিয়ানস গাইড বইয়ে খুব সুন্দর একটা প্রমাণ দেওয়া হয়েছিল:

ধরা যাক, চারটি ত্রিভুজকে বাইরে রেখে একটি বড় বর্গ আঁকা হলো। এদের প্রতিটি বাহুর দৈর্ঘ্য (a + b)।

ছবি ৩০: পিথাগোরাসের উপপাদ্যের বীজাগাণিতিক প্রমাণ

তাহলে বীজগণিতের সাধারণ সূত্র অনুসারে, (a + b) বাহুওলা বর্গের মোট ক্ষেত্রফল হবে = (a + b)2 = a2 + 2ab + b2

কিন্তু খেয়াল করে দেখো, এই বড় বর্গটা আসলে মাঝখানের ১টি ছোট বর্গ (c2) আর ৪টি সমকোণী ত্রিভুজ। সূত্র অনুসারে তাদের ক্ষেত্রফল হবে: ½ ab

কাজেই চারটি সমকোণী ত্রিভুজের মোট ক্ষেত্রফল = 4 × (½ ab) = 2ab

অতএব, ভেতরের সব টুকরো যোগ করলে মোট ক্ষেত্রফল দাঁড়ায় = c2 + 2ab

এবার এই দুটো মানকে মুখোমুখি বসাই!

ছবি ৩১: ইয়াং ম্যাথমেথিটিশিয়ানস গাইড বইয়ের পাতা থেকে

যেহেতু দুটিই একই বড় বর্গের ক্ষেত্রফল প্রকাশ করছে, তাই সমীকরণ দাঁড়ায়: a2 + 2ab + b2 = c2 + 2ab

দুই পাশ থেকে 2ab কেটে দিলেই বাকি থাকে: a2 + b2 = c2

কী দারুণ, তাই না?

আরও পড়ুন
কোষ্ঠী বিচার করে ভাস্করাচার্য জেনেছিলেন তাঁর কন্যার বিয়ের শুভলগ্নে এক চরম গ্রহদোষ আছে। বিয়ের শুভক্ষণ নিখুঁতভাবে মাপার জন্য তিনি একটি বিশেষ জলঘড়ি তৈরি করেন।

ভারতের গণিতবিদ ভাস্করাচার্যের প্রমাণ

দ্বাদশ শতাব্দীর (১১৪১-১১৮৫ খ্রিষ্টাব্দ) ভারতের অন্যতম শ্রেষ্ঠ জ্যোতির্বিজ্ঞানী ও গণিতবিদ দ্বিতীয় ভাস্কর (যাঁকে আমরা ভাস্করাচার্য নামে চিনি) গণিত শাস্ত্রে এক অমর নাম।

তিনি মাত্র ৩৬ বছর বয়সে (১১৪৫ খ্রিষ্টাব্দে) তাঁর সর্বশ্রেষ্ঠ কাব্যিক গাণিতিক গ্রন্থ সিদ্ধান্তশিরোমণি রচনা করেন। এই বইটি চার ভাগে বিভক্ত ছিল: লীলাবতী, বীজগণিত, গ্রহগণিত এবং গোল অধ্যায়। এর মধ্যে ‘লীলাবতী’ এবং ‘বীজগণিত’ অংশ দুটি গণিত ইতিহাসে জনপ্রিয় ও বিখ্যাত।

জনশ্রুতি আছে, ‘লীলাবতী’ ছিল ভাস্করাচার্যের কন্যার নাম। কোষ্ঠী বিচার করে ভাস্করাচার্য জেনেছিলেন তাঁর কন্যার বিয়ের শুভলগ্নে এক চরম গ্রহদোষ আছে। বিয়ের শুভক্ষণ নিখুঁতভাবে মাপার জন্য তিনি একটি বিশেষ জলঘড়ি তৈরি করেন।

কিন্তু বিয়ের ঠিক আগে কৌতূহলী লীলাবতী পাত্রের পানির দিকে ঝুঁকে তাকালে তাঁর অলংকার থেকে একটি মুক্তো খসে ঘড়ির ছিদ্র বন্ধ করে দেয়। ফলে শুভলগ্ন পার হয়ে যায় এবং লীলাবতীর আর বিয়ে হয়নি। কন্যার মন ভালো করতে এবং তাঁকে অমর করে রাখতে ভাস্করাচার্য তাঁর এই গাণিতিক গ্রন্থের নাম রাখেন ‘লীলাবতী’। পুরো বইটি সংস্কৃত শ্লোকে বা কবিতার আকারে লেখা। এতে কঠিন গাণিতিক সমস্যাগুলোকে এক একটি কবিতার মাধ্যমে ধাঁধা হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে।

আরও পড়ুন
ভাস্করাচার্য মাত্র ৩৬ বছর বয়সে তাঁর সর্বশ্রেষ্ঠ কাব্যিক গাণিতিক গ্রন্থ সিদ্ধান্তশিরোমণি রচনা করেন। এই বইটি চার ভাগে বিভক্ত ছিল: লীলাবতী, বীজগণিত, গ্রহগণিত এবং গোল অধ্যায়।

‘লীলাবতী’ যদি হয় পাটিগণিতের কাব্য, তবে ‘বীজগণিত’ অংশটি হলো উচ্চতর অংকের এক মাস্টারপিস। ভাস্করাচার্যের এই অংশে এমন কিছু ধারণা ছিল যা তৎকালীন ইউরোপীয় গণিতবিদদের কল্পনারও বাইরে ছিল। যাই হোক, লীলাবতীবীজগণিত-এ পিথাগোরাসের উপপাদ্যের এক আশ্চর্য প্রমাণ দিয়েছেন ভাস্করাচার্য। তিনি একটি বর্গের ভেতরে ৪টি সমকোণী ত্রিভুজ সাজিয়ে একটি ছবি এঁকেছিলেন। আর তার নিচে প্রমাণের ব্যাখ্যা হিসেবে লম্বা কোনো সমীকরণ না লিখে শুধু একটিমাত্র শব্দ লিখেছিলেন: ‘পশ্য’! এটি সংস্কৃত শব্দ, যার বাংলা অর্থ—দেখো।

তাঁর কথা ছিল—ছবিটার দিকে শুধু মন দিয়ে তাকালেই প্রমাণটা চোখের সামনে ভেসে ওঠে! মাঝখানের ছোট বর্গের বাহু হয় (b - a)। ফলে মোট ক্ষেত্রফল দাঁড়ায়:

c2 = 4 (½ ab) + (b - a)2

c2 = 2ab + (b2 - 2ab + a2)

c2 = a2 + b2

কাগজ-কলমের জটিল হিসাব ছাড়াই ছবি আর জ্যামিতির নিখুঁত সমন্বয়ে গণিতের কত বড় সত্যকে প্রমাণ করা যায়, পিথাগোরাসের এই প্রমাণগুলো তার সবচেয়ে দারুণ উদাহরণ!

আরও পড়ুন
ভাস্করাচার্য একটি বর্গের ভেতরে ৪টি সমকোণী ত্রিভুজ সাজিয়ে একটি ছবি এঁকেছিলেন। আর তার নিচে প্রমাণের ব্যাখ্যা হিসেবে লম্বা কোনো সমীকরণ না লিখে শুধু একটিমাত্র শব্দ লিখেছিলেন: পশ্য!

প্রাচীন চীনে পিথাগোরাস?

পিথাগোরাসের বিখ্যাত উপপাদ্যটি কি কেবল গ্রিস বা ব্যাবিলনেই নয়, সীমাবদ্ধ ছিল? একদমই না! পৃথিবীর অন্য প্রান্তে, প্রাচীন চীনেও গণিতবিদরা স্বাধীনভাবে এই একই জ্যামিতিক সত্য আবিষ্কার করেছিলেন।

চৈনিক গণিতশাস্ত্রে পিথাগোরাসের উপপাদ্যকে বলা হতো গৌ-গু উপপাদ্য। গৌ (Gou) মানে সমকোণী ত্রিভুজের ছোট বাহু (ভূমি), আর গু (Gu) মানে বড় বাহু (লম্ব)। আর অতিভুজকে বলা হতো ঝিয়ান (Xian)।

চীনের ইতিহাসের অন্যতম প্রাচীন গণিতগ্রন্থ ঝৌ বি সুয়ান জিং (Zhou Bi Suan Jing)-এ এই প্রমাণের একটি বিখ্যাত চিত্র পাওয়া যায়, যাকে বলা হয় ঝাও ফ্রন্টপ্রিন্ট বা সুয়ান-ঝু তু। চীনের ইতিহাসের অন্যতম প্রাচীন গণিতের বই ঝৌ বি সুয়ান জিং-এ পিথাগোরাসের মতো একটি ছবি দেখতে পাওয়া যায়।

ছবি ৩২: আরেকটি বীজগাণিতিক প্রমাণ

ঝৌ বি সুয়ান জিং বইটিতে ৪টি সমকোণী ত্রিভুজকে একটি বর্গের ভেতরে দারুণভাবে সাজানো হয়েছিল। জ্যামিতিক হিসাবটা এরকম: ধরা যাক, সমকোণী ত্রিভুজগুলোর বাহু দুটি a এবং b (যেখানে b > a), আর অতিভুজ c। বাইরের বড় বর্গের ক্ষেত্রফল: c2। সেখানে ৪টি ত্রিভুজকে বর্গের ভেতরে এমনভাবে রাখা হয়, যেন মাঝখানে ছোট একটি খালি বর্গ থাকে, যার ক্ষেত্রফল (a - b)2

আরও পড়ুন
চৈনিক গণিতশাস্ত্রে পিথাগোরাসের উপপাদ্যকে বলা হতো গৌ-গু উপপাদ্য। গৌ মানে সমকোণী ত্রিভুজের ছোট বাহু বা ভূমি, আর গু মানে বড় বাহু বা লম্ব। আর অতিভুজকে বলা হতো ঝিয়ান।

৪টি ত্রিভুজের ক্ষেত্রফল এবং মাঝের বর্গের ক্ষেত্রফলের যোগফল: 4 (1/2ab) + (a - b)2

মাঝখানের ছোট খালি বর্গের বাহু: (b - a)

সুতরাং, ছোট বর্গের ক্ষেত্রফল = (b - a)2 = b2 - 2ab + a2

এবার ভেতরের সবকটি টুকরো যোগ করলেই বাইরের বড় বর্গের ক্ষেত্রফল পাওয়া যাবে: c2 = 4 (1/2ab) + (a - b)2

হিসাব করলে দাঁড়ায়: c2 = 2ab + a2 - 2ab + b2

সহজ বীজগণিতে +2ab আর -2ab কাটাকাটি চলে গিয়ে বাকি থাকে: c2 = a2 + b2

ছবি ৩৩: মিং রাজবংশের আমলের ঝৌ বি-এর একটি অনুলিপি থেকে নেওয়া, যা ১৬০৩ সালে মুদ্রিত হয়েছিল

চৈনিক ঐতিহ্যে এটাকে পিথাগোরাসের প্রাচীন প্রমাণ হিসেবে দাবি করা হয়। কিন্তু ইতিহাসবিদ ও ভাষাবিদদের মধ্যে এটি নিয়ে এখনো বেশ তর্ক-বিতর্ক রয়েছে। এর মূল কারণ হলো—প্রাচীন চীনা ভাষার সংকেত ও গাণিতিক টার্মগুলোর সঠিক অনুবাদ করা অত্যন্ত কঠিন! প্রাচীন সেই লেখাগুলোতে ঠিক কতটা জ্যামিতিক প্রমাণের উদ্দেশ্য ছিল, আর কতটা জ্যোতির্বিদ্যা বা বর্ষপঞ্জি তৈরির হিসাব ছিল—তা নিয়ে পণ্ডিতদের মতামত ভিন্ন। অবশ্য একটা ব্যাপারে সবাই একমত যে, গ্রিকদের অনেক আগেই চৈনিকরা ৩-৪-৫ ত্রিভুজের ধর্ম ব্যবহার করে জমি মাপা এবং আকাশের তারা পর্যবেক্ষণের কাজ চমৎকারভাবে সম্পন্ন করতেন।

আরও পড়ুন
পিথাগোরাসের যে প্রমাণটি দিয়েছিলেন, তা দেখতে এতই জটিল এবং তার ভেতরে এতগুলো রেখা ও ত্রিভুজ আঁকা ছিল যে—পরবর্তী যুগের শিক্ষার্থীরা তাকে রসিকতা করে বলত উইন্ডমিল বা ময়ুরের লেজ।

চৈনিক ঐতিহ্যে এটাকে পিথাগোরাসের প্রাচীন প্রমাণ হিসেবে দাবি করা হয়। কিন্তু ইতিহাসবিদ ও ভাষাবিদদের মধ্যে এটি নিয়ে এখনো বেশ তর্ক-বিতর্ক রয়েছে। এর মূল কারণ হলো—প্রাচীন চীনা ভাষার সংকেত ও গাণিতিক টার্মগুলোর সঠিক অনুবাদ করা অত্যন্ত কঠিন! প্রাচীন সেই লেখাগুলোতে ঠিক কতটা জ্যামিতিক প্রমাণের উদ্দেশ্য ছিল, আর কতটা জ্যোতির্বিদ্যা বা বর্ষপঞ্জি তৈরির হিসাব ছিল—তা নিয়ে পণ্ডিতদের মতামত ভিন্ন। অবশ্য একটা ব্যাপারে সবাই একমত যে, গ্রিকদের অনেক আগেই চৈনিকরা ৩-৪-৫ ত্রিভুজের ধর্ম ব্যবহার করে জমি মাপা এবং আকাশের তারা পর্যবেক্ষণের কাজ চমৎকারভাবে সম্পন্ন করতেন।

তবে গ্রিক গণিতবিদ ইউক্লিড তাঁর এলিমেন্টস বইয়ে পিথাগোরাসের এই উপপাদ্যের যে প্রমাণটি দিয়েছিলেন, তার সঙ্গে এই প্রমাণের কোনো মিলই নেই।

ইউক্লিড তাঁর কালজয়ী বই এলিমেন্টস-এর প্রথম খণ্ডের ৪৭ নম্বর উপপাদ্যে (পিথাগোরাসের যে প্রমাণটি দিয়েছিলেন, তা দেখতে এতই জটিল এবং তার ভেতরে এতগুলো রেখা ও ত্রিভুজ আঁকা ছিল যে—পরবর্তী যুগের শিক্ষার্থীরা তাকে রসিকতা করে বলত উইন্ডমিল বা ময়ুরের লেজ। ইউক্লিড কোনো বীজগণিত বা ছবি কাটাকাটি ব্যবহার না করে, কেবল বিশুদ্ধ জ্যামিতিক যুক্তির ধাপে ধাপে (ত্রিভুজের সর্বসমতা ও ক্ষেত্রফলের নিয়ম দিয়ে) সেটি প্রমাণ করেছিলেন।

শিক্ষার্থীদের কাছে সেই প্রমাণটি আসলেই একটু ভীতিজনক ছিল, কিন্তু গণিতের ইতিহাসে যুক্তি ও কঠোরতার দিক থেকে ইউক্লিডের সেই প্রমাণকেই সবচেয়ে নিখুঁত মানা হয়!

সূত্র: ডেভিড অ্যাচিসনের দ্য ওয়ান্ডার বুক অব জিওমেন্ট্রি: আ ম্যাথমেটিক্যাল স্টোরি অবলম্বনে

আরও পড়ুন