প্রেম বলতে আমরা সাধারণত মানুষে-মানুষে ভালোবাসার কথাই ভাবি। কিন্তু কেউ যদি ৪০ বছর বয়সে এসে হঠাৎ আস্ত একটা বিষয়ের প্রেমে পড়ে যায়, তাহলে কেমন হবে?
ব্যাপারটা কিন্তু কাল্পনিক রূপকথা নয়, বাস্তবেই এমন ঘটনা ঘটেছে বহুবার। যেমন সপ্তদশ শতকের বিখ্যাত ইংরেজ দার্শনিক থমাস হবসের কথাই ধরা যাক। তাঁর জীবনে ঠিক এই অদ্ভুত আর মজার কাণ্ডটাই ঘটেছিল—আর তিনি প্রেমে পড়েছিলেন জ্যামিতির! অথচ অনেকের কাছেই এই বিষয়টা নিরস বা কাটখোট্টা বলে পরিচিত। ইউক্লিডের জ্যামিতি নিয়ে এরকমই দুটি অবিশ্বাস্য আর রোমাঞ্চকর ঘটনা দিয়ে শুরু করা যাক।
জন অব্রির লেখা বিখ্যাত জীবনীগ্রন্থ ব্রিফ লাইভস-এ থমাস হবসের এই জ্যামিতির প্রেমে পড়ার ঘটনাটি চমৎকারভাবে তুলে ধরা হয়েছে।
হবসের বয়স তখন ৪০ বছর। এর আগে সারা জীবনে তিনি কখনো জ্যামিতি ছুঁয়েও দেখেননি। দর্শনের নানা জটিল তত্ত্ব নিয়েই তাঁর দিন কাটত। একদিন এক পরিচিত ভদ্রলোকের বিশাল লাইব্রেরিতে গিয়ে বসে আছেন তিনি। হঠাৎ তাঁর চোখ গেল টেবিলের ওপর পড়ে থাকা একটা খোলা বইয়ের ওপর। বইটা বেশ পুরোনো। আর সেটা ছিল জ্যামিতির জনক ইউক্লিডের লেখা সর্বকালের সেরা গণিতের বই এলিমেন্টস। ওই বইয়ের প্রথম খণ্ড খোলা ছিল।
একটু কৌতূহলী হলো হবসের। তিনি খোলা পাতাটির দিকে তাকালেন। খোলা পাতাটি ছিল ইউক্লিডের এলিমেন্টস-এ প্রথম খণ্ডের ৪৭ নম্বর প্রস্তাবনা। আসলে ওই পাতাতে লেখা ছিল আমাদের সেই পরিচিত পিথাগোরাসের উপপাদ্যের প্রমাণ!
হঠাৎ হবসের চোখ গেল টেবিলের ওপর পড়ে থাকা একটা খোলা বইয়ের ওপর। বইটা বেশ পুরোনো। আর সেটা ছিল জ্যামিতির জনক ইউক্লিডের লেখা সর্বকালের সেরা গণিতের বই এলিমেন্টস।
মনে আছে, আগের পর্বে আমরা ইউক্লিডের প্রমাণটির কথা বলেছিলাম। অনেকের কাছেই সেটা নাকি দেখতে একটা বায়ুকল বা ময়ূরপুচ্ছের মতো বিদঘুটে আর ভীতিজনক। হবসও সেদিন ঠিক সেই ছবিটাই দেখেছিলেন!
বইয়ের পাতায় ওই জটিল আর হিজিবিজি জ্যামিতিক চিত্র দেখে রীতিমতো আঁতকে উঠলেন হবস (সেটা দেখে সাধারণ মানুষ কেন, বড় বড় পণ্ডিতরাও ভড়কে যেতেন!)। অবাক হয়ে তিনি জোর গলায় শপথ করে বলে উঠলেন, ‘আরে ভাই! এ তো অসম্ভব! এটা কখনোই সত্যি হতে পারে না!’
সাধারণ মানুষ হলে হয়তো ‘ধুর! এসব আমার মাথার ওপর দিয়ে যাচ্ছে’ বলে বইটা বন্ধ করে রেখে দিত। কিন্তু থমাস হবস মোটেও দমে যাওয়ার পাত্র ছিলেন না। তাঁর মাথায় কেন যেন জেদ চেপে গেল। মনে মনে ভাবলেন, ওই বইয়ের লেখক কীভাবে এই অসম্ভব কথাকে সত্যি বলে দাবি করছেন, তা তিনি দেখেই ছাড়বেন!
ওই ৪৭ নম্বর উপপাদ্যের প্রমাণটা পড়ার চেষ্টা করলেন হবস। দেখলেন, সে জন্য আগের একটি উপপাদ্যের সাহায্য নিতে হচ্ছে। তিনি পাতা উল্টে আগের উপপাদ্যে গেলেন। দেখলেন, সেটি বোঝার জন্য আরও পেছনের আরেকটি উপপাদ্য বুঝতে হবে। এভাবে পেছাতে পেছাতে তিনি চলে গেলেন একদম বইয়ের শুরুতে। আর সেখানে লেখা ছিল জ্যামিতির সাধারণ কিছু স্বীকার্য বা স্বতঃসিদ্ধ নিয়ম।
হবসের মাথায় কেন যেন জেদ চেপে গেল। মনে মনে ভাবলেন, ওই বইয়ের লেখক কীভাবে এই অসম্ভব কথাকে সত্যি বলে দাবি করছেন, তা তিনি দেখেই ছাড়বেন!
কাজেই এবার হবস একদম প্রথম ধাপ থেকে শুরু করলেন। একটা একটা করে বিন্দু, রেখা আর ত্রিভুজের যুক্তি ধরে সামনের দিকে এগোতে লাগলেন। কিছুক্ষণ পরেই তিনি অবাক হয়ে দেখলেন, প্রতিটি যুক্তি আগের যুক্তির ওপর একদম নিরেট ইটের গাঁথুনির মতো শক্তভাবে দাঁড়িয়ে আছে। এখানে অনুমানের কোনো জায়গা নেই, পুরোটাই নিখাদ যুক্তি!
প্রতিটি ধাপ গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করতে করতে শেষ ধাপে (সেই ৪৭ নম্বর উপপাদ্যে) এসে তিনি একেবারে স্তব্ধ হয়ে গেলেন। দেখলেন—প্রমাণটা একদম নিখুঁত! কোনো ফাঁকি নেই।
লেখক জন অব্রির ভাষায়, ঠিক সেই মুহূর্তেই এক জাদুকরি ঘটনা ঘটল—থমাস হবস জ্যামিতির প্রেমে পড়ে গেলেন! জ্যামিতির এই ধাপে ধাপে যুক্তি দিয়ে সত্য প্রমাণের পদ্ধতি তাঁকে এতই মুগ্ধ করেছিল যে, পরবর্তীতে নিজের লেখা দর্শনের বইগুলোতেও জ্যামিতির এই যৌক্তিক কাঠামো ব্যবহার করা শুরু করেছিলেন তিনি।
কিছুক্ষণ পরেই হবস অবাক হয়ে দেখলেন, প্রতিটি যুক্তি আগের যুক্তির ওপর একদম নিরেট ইটের গাঁথুনির মতো শক্তভাবে দাঁড়িয়ে আছে। এখানে অনুমানের কোনো জায়গা নেই, পুরোটাই নিখাদ যুক্তি!
ত্রিভুজের ক্ষেত্রফল
ইউক্লিড কীভাবে পিথাগোরাসের উপপাদ্য প্রমাণ করেছিলেন, তা বুঝতে হলে, আমাদের প্রথমে ত্রিভুজের ক্ষেত্রফল নিয়ে একটি অসাধারণ নিয়ম জানতে হবে। আমরা সবাই জানি:
ত্রিভুজের ক্ষেত্রফল = 1/2 (ভূমি × উচ্চতা)
শুনতে খুব সাধারণ মনে হলেও, এই সূত্রটার ভেতরেই লুকিয়ে আছে দারুণ এক জ্যামিতিক ম্যাজিক। চলো, দুটো আলাদা রকমের ত্রিভুজ দিয়ে ম্যাজিকটা একটু পরখ করে দেখি!
প্রথমে এমন একটা ত্রিভুজের কথা ভাবো, যার সবগুলো কোণই ৯০ ডিগ্রির চেয়ে ছোট (অর্থাৎ সূক্ষ্মকোণী)। এটা একদম সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। এর একদম ওপরের মাথা (শীর্ষবিন্দু) থেকে যদি তুমি নিচের ভূমির ওপর সোজা একটা খাড়া রেখা (উচ্চতা) টেনে দাও, তাহলে কী হবে?
মজার ব্যাপার হলো, ওই দাগটা ত্রিভুজটিকে একদম নিখুঁত দুটি ছোট সমকোণী ত্রিভুজে ভাগ করে ফেলবে! আগের একটি পর্বে আমরা জেনেছিলাম, সমকোণী ত্রিভুজ হলো একটা আয়তক্ষেত্রের ঠিক অর্ধেক। কাজেই, এই দুটো সমকোণী ত্রিভুজের ক্ষেত্রফল আলাদা আলাদাভাবে বের করে যোগ করে দিলেই, জাদুর মতো আমাদের ওই চেনা সূত্রটি—1/2 (ভূমি × উচ্চতা)—বেরিয়ে আসে!
যোগের বদলে বিয়োগ করার চালাকিটা করার সাথে সাথেই ম্যাজিকটা ঘটে! হিসাব শেষে দেখা যায়, হেলানো বা স্থূলকোণী ত্রিভুজের ক্ষেত্রফলের সূত্রটাও একদম হুবহু একই রয়ে গেছে!
এবার একটা বাঁকানো বা স্থূলকোণী ত্রিভুজের কথা চিন্তা করো। এটা দেখতে অনেকটা পিসার হেলানো মিনারের মতো, একদিকে হেলে আছে! সমস্যা হলো, এই ত্রিভুজের ওপরের মাথা থেকে সোজা খাড়া দাগ টানলে তা আর ত্রিভুজের ভূমির ওপর পড়ে না, বরং ভূমির বাইরে গিয়ে শূন্যে ঝুলে থাকে! তাহলে এর ক্ষেত্রফল কীভাবে বের করব?
ভয় নেই, জ্যামিতিতে কোনো ‘কিন্তু’ নেই! এক্ষেত্রে আমরা যা করি: হেলানো ত্রিভুজটার ভূমিকে কাল্পনিকভাবে একটু সামনের দিকে বাড়িয়ে দিই, যাতে ওপর থেকে ফেলা লম্বটা বা উচ্চতাটা ওই বর্ধিত ভূমির ওপর গিয়ে পড়ে। এর ফলে সেখানে মস্ত বড় একটা নতুন সমকোণী ত্রিভুজ তৈরি হয়! এবার এই বিশাল সমকোণী ত্রিভুজের ক্ষেত্রফল থেকে, ওই যে বাইরে যেটুকু কাল্পনিক সমকোণী ত্রিভুজ ধরে নিয়েছিলাম, তার ক্ষেত্রফলটা স্রেফ বিয়োগ করে দিই।
যোগের বদলে বিয়োগ করার এই চালাকিটা করার সাথে সাথেই ম্যাজিকটা ঘটে! হিসাব শেষে দেখা যায়, হেলানো বা স্থূলকোণী ত্রিভুজের ক্ষেত্রফলের সূত্রটাও একদম হুবহু একই রয়ে গেছে!
তার মানে কী দাঁড়াল? তুমি একটা ত্রিভুজকে যতই টানো, বাঁকাও বা একদিকে হেলিয়ে দাও না কেন—যতক্ষণ পর্যন্ত তার ভূমি আর একদম খাড়া উচ্চতা সমান থাকছে, তার পেটের ভেতরের জায়গাটুকু বা ক্ষেত্রফল এক চুলও বদলাবে না!
জ্যামিতির এই চমৎকার ও শক্তিশালী নিয়মটিকে হাতিয়ার করেই ইউক্লিড সেই বিখ্যাত প্রমাণটি করেছিলেন। এখন আমরা ত্রিভুজের এই গোপন রহস্যটি জেনে গেছি। তাই ইউক্লিডের সেই ভীতিজনক প্রমাণটি বুঝতে আমাদের আর একটুও কষ্ট হবে না!
আমরা যা করি: হেলানো ত্রিভুজটার ভূমিকে কাল্পনিকভাবে একটু সামনের দিকে বাড়িয়ে দিই, যাতে ওপর থেকে ফেলা লম্বটা বা উচ্চতাটা ওই বর্ধিত ভূমির ওপর গিয়ে পড়ে।
নিউটন এবং চলমান ত্রিভুজ!
১৬৬১ সালের কথা। ইংল্যান্ডের বিখ্যাত কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রিনিটি কলেজে সদ্য ভর্তি হয়েছেন তরুণ আইজ্যাক নিউটন। গণিত শেখার জন্য তিনি হাতে নিলেন জ্যামিতির বিখ্যাত বই—ইউক্লিডের এলিমেন্টস।
প্রথম প্রথম বইয়ের পাতা উল্টাতে উল্টাতে নিউটনের বেশ বিরক্তিই লাগছিল। বিন্দু, রেখা, সমকোণের সহজ সহজ কথাগুলো দেখে তিনি ভেবেছিলেন, ‘এসব পানির মতো সহজ জিনিসে সময় নষ্ট করে মানুষ এত মোটা বই লেখে কীভাবে!’ তিনি তো ভেবেই বসেছিলেন যে জ্যামিতি জিনিসটা বোধহয় ভীষণ সহজ আর স্রেফ সাধারণ জ্ঞানের খেলা।
কিন্তু বইয়ের পাতা একটু এগোতেই নিউটন এমন এক জ্যামিতিক ম্যাজিক দেখতে পেলেন যে তাঁর চোখ ছানাবড়া হয়ে গেল!
ধরে নাও, একটি ত্রিভুজের ভূমি AB নির্দিষ্ট। এখন এর শীর্ষবিন্দু C-কে যদি তুমি ভূমির সমান্তরাল একটি রেখা ধরে ডানদিকে যত খুশি ঠেলে নিয়ে যাও। দেখা যাবে, শীর্ষবিন্দুকে দূরে ঠেলে নেওয়ার সাথে সাথে ত্রিভুজটি চ্যাপ্টা হতে হতে এক অদ্ভুত, ত্যাড়া আর বিষম আকৃতি ধারণ করছে! কিন্তু ত্রিভুজটির আকৃতি যতই অদ্ভুত আর চ্যাপ্টা হয়ে যাক না কেন, তার ক্ষেত্রফল কিন্তু একবিন্দুও বদলাবে না! কারণ তার ভূমি (AB) আর উচ্চতা (h) দুটিই তো একই থাকছে।
বিন্দু, রেখা, সমকোণের সহজ সহজ কথাগুলো দেখে নিউটন ভেবেছিলেন, ‘এসব পানির মতো সহজ জিনিসে সময় নষ্ট করে মানুষ এত মোটা বই লেখে কীভাবে!’
কিন্তু চোখ কপালে ওঠার মতো জ্যামিতিক সত্যটি হলো—ত্রিভুজটি দেখতে যতই বদলে যাক না কেন, তার ভেতরের জায়গা বা ক্ষেত্রফল কিন্তু একবিন্দুও বদলাবে না!
তরুণ নিউটন প্রথমে নিজের চোখকেই যেন বিশ্বাসই করতে পারেননি! ‘ত্রিভুজের আকৃতি বদলে যাচ্ছে, অথচ কী আশ্চর্য তার ক্ষেত্রফল সমান থাকছে?!’—এই ধাক্কাটা তাঁর চিন্তার জগতকে পুরোপুরি বদলে দিল। তিনি বুঝতে পারলেন, ইউক্লিডের জ্যামিতিকে তিনি যতটা সহজ ভেবেছিলেন, তার গভীরে লুকিয়ে আছে প্রকৃতিকে ব্যাখ্যা করার মতো এক অবিশ্বাস্য ক্ষমতা।
মজার ব্যাপার হলো, ইউক্লিডের এই সাধারণ চলমান ত্রিভুজের আইডিয়াটি সারাজীবন মনে রেখেছিলেন নিউটন। পরবর্তী জীবনে যখন তিনি মহাকাশে গ্রহদের গতিপথ নিয়ে গবেষণা শুরু করেন এবং সর্বকালের সেরা বিজ্ঞানগ্রন্থ প্রিন্সিপিয়া ম্যাথমেটিকা লেখেন, তখন সূর্যকে কেন্দ্র করে গ্রহগুলো কীভাবে ঘোরে (কেপলারের দ্বিতীয় সূত্র)—তা প্রমাণ করতে গিয়ে নিউটন এই ত্রিভুজের ক্ষেত্রফল অপরিবর্তিত থাকার জ্যামিতিক নিয়মটিই ব্যবহার করেছিলেন!
ইউক্লিডের জ্যামিতির একটি অতি সাধারণ সত্যানুসন্ধান কীভাবে পরবর্তীতে নিউটনের মহাকর্ষ সূত্র আবিষ্কারের পথ খুলে দিয়েছিল—তা সত্যি বিজ্ঞান জগতের অন্যতম এক রোমাঞ্চকর ইতিহাস!
নিউটন বুঝতে পারলেন, ইউক্লিডের জ্যামিতিকে তিনি যতটা সহজ ভেবেছিলেন, তার গভীরে লুকিয়ে আছে প্রকৃতিকে ব্যাখ্যা করার মতো এক অবিশ্বাস্য ক্ষমতা।
পিথাগোরাসের উপপাদ্য প্রমাণে ইউক্লিডের কৌশল
এবার আসা যাক সেই বহুল আলোচিত, বিদঘুটে দেখতে অথচ অসম্ভব বুদ্ধিদীপ্ত ইউক্লিডীয় প্রমাণের ভেতরে। সেটা দেখে ৪০ বছর বয়সে থমাস হবস প্রথম দর্শনে ‘অসম্ভব!’ বলে চিৎকার করে উঠেছিলেন!
ইউক্লিডের প্রমাণের কৌশলটি একটু জটিল মনে হলেও, এর পেছনের আসল ভাবনাটি কিন্তু অত্যন্ত চমৎকার এবং বুদ্ধিমত্তায় ভরপুর। কোনো বীজগণিত বা সংখ্যার যোগ-বিয়োগ ব্যবহার না করে স্রেফ ত্রিভুজগুলোকে ঘুরিয়ে আর টেনে পিথাগোরাসের সূত্রটি প্রমাণ করেছিলেন ইউক্লিড!
তাঁর আইডিয়াটা ছিল এরকম:
প্রথমে একটি সমকোণী ত্রিভুজের তিন বাহুর ওপর তিনটি বর্গক্ষেত্র আঁকা হলো। (দুটি ছোট বর্গ a2 ও b2, আর অতিভুজের ওপর একটি বড় বর্গ c2)। এবার সমকোণ থেকে অতিভুজের ওপর একটি লম্ব রেখা টানা হলো, যা অতিভুজের ওপর আঁকা বড় বর্গক্ষেত্রটিকে দুটি আয়তক্ষেত্রে ভাগ করে। ইউক্লিড প্রমাণের লক্ষ্য স্থির করলেন: ছোট দুটি বর্গের একটির ক্ষেত্রফল হবে নিচে তৈরি হওয়া একটি আয়তক্ষেত্রের সমান, আর দ্বিতীয় বর্গটির ক্ষেত্রফল হবে ওপরের আয়তক্ষেত্রটির সমান! দুটি ছোট বর্গের ক্ষেত্রফল যোগ করলে তা বড় বর্গটির মোট ক্ষেত্রফলের সমান হয়ে যাবে—আর অমনি প্রমাণিত হয়ে যাবে: a2 + b2 = c2!
ইউক্লিড প্রমাণের লক্ষ্য স্থির করলেন: ছোট দুটি বর্গের একটির ক্ষেত্রফল হবে নিচে তৈরি হওয়া একটি আয়তক্ষেত্রের সমান, আর দ্বিতীয় বর্গটির ক্ষেত্রফল হবে ওপরের আয়তক্ষেত্রটির সমান!
ইউক্লিডের তিন ধাপের ম্যাজিক (৩টি ধাপে ক্ষেত্রফল একই রাখা):
ইউক্লিড খেলাটা শুরু করলেন ছোট বর্গটির ঠিক অর্ধেক (একটি ত্রিভুজ) ধরে। তিনি দেখালেন, কীভাবে এই ছোট ত্রিভুজটিকে বদলে নিচে অতিভুজের ভেতরের আয়তক্ষেত্রটির অর্ধেকে রূপান্তর করা যায়:
প্রথম ধাপ (টেনে লম্বা করা): ভূমির সমান্তরাল রেখার নিয়ম ব্যবহার করে প্রথম ত্রিভুজটিকে চ্যাপ্টা করে এমনভাবে টানা হলো যেন তার ক্ষেত্রফল অপরিবর্তিত থাকে।
দ্বিতীয় ধাপ (90 ডিগ্রি ঘোরানো): এবার ওই নতুন ত্রিভুজটিকে কেন্দ্রে রেখে ঠিক 90 ঘোরানো হলো। জ্যামিতির SAS (Side-Angle-Side) বা বাহু-কোণ-বাহু সর্বসমতার নিয়মে প্রমাণ করা যায় যে, ঘোরানোর পর তৈরি হওয়া ত্রিভুজটির আকার ও ক্ষেত্রফল আগের ত্রিভুজটির অবিকল সমান!
তৃতীয় ধাপ (আয়তক্ষেত্রে রূপান্তর): এবার সেই ঘূর্ণায়মান ত্রিভুজটিকে আবার সমান্তরাল রেখা ধরে টেনে নিচে অতিভুজের ভেতরের আয়তক্ষেত্রটির ওপর বসানো হলো। এতেও ক্ষেত্রফল বিন্দুমাত্র পরিবর্তন হলো না!
এখন শুরুর ত্রিভুজটির ক্ষেত্রফল যদি শেষ ত্রিভুজটির সমান হয়, তবে তাদের দ্বিগুণ ক্ষেত্রফলও সমান হবে! অর্থাৎ, ছোট বর্গের ক্ষেত্রফল = অতিভুজের ওপর তৈরি আয়তক্ষেত্রের ক্ষেত্রফল!
একইভাবে অন্য পাশের বর্গটির ক্ষেত্রেও একই জিনিস প্রমাণ করা যায়। এভাবেই কোনো জটিল বীজগণিত ছাড়াই, স্রেফ ত্রিভুজগুলোকে ঘুরিয়ে আর টেনে পিথাগোরাসের বিখ্যাত উপপাদ্যটি চিরকালের জন্য প্রমাণ করেছিলেন গ্রিক পণ্ডিত ইউক্লিড!
