ল্যাপলাসের দৈত্য: বিজ্ঞান ও দর্শনের সবচেয়ে রহস্যময় ভূত

ফরাসি গণিতবিদ ও জ্যোতির্বিজ্ঞানী পিয়েরে সাইমন ল্যাপলাসছবি: উইকিকোট

এমন এক সত্তার কথা ভাবুন, যার কাছে মহাবিশ্বের অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যতের কোনো কিছুই লুকানো নেই! আপনি কাল সকালে কী খাবেন, ১০ বছর পর কোথায় থাকবেন, কিংবা আজ থেকে কোটি বছর পর মহাবিশ্বের কোন গ্যালাক্সি কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে, সবকিছুই সে নিখুঁত গাণিতিক হিসাব কষে বলে দিতে পারে।

বিজ্ঞানের জগতে এই সর্বজান্তা ও কল্পিত সত্তাকেই বলা হয় ল্যাপলাসের দৈত্য। এটি কোনো সত্যিকারের দৈত্য বা ভূত নয়, বরং এটি পদার্থবিজ্ঞানের ইতিহাসের অন্যতম বিখ্যাত একটি থট এক্সপেরিমেন্ট।

কবে এবং কীভাবে এর জন্ম হলো

১৮১৪ সালে বিখ্যাত ফরাসি গণিতবিদ ও জ্যোতির্বিজ্ঞানী পিয়েরে সাইমন ল্যাপলাস তাঁর ‘আ ফিলোসফিক্যাল এসে অন প্রবাবিলিটিস’ নামে একটি বই প্রকাশ করেন। এই বইয়ের একটি অংশে তিনি এই অদ্ভুত চিন্তার বীজ বপন করেছিলেন।

ল্যাপলাসের লেখা আ ফিলোসফিক্যাল এসে অন প্রবাবিলিটিস বইয়ের প্রথম পৃষ্ঠা
ছবি: উইকিসোর্স

মজার ব্যাপার হলো, ল্যাপলাস কিন্তু তাঁর লেখায় কোথাও দৈত্য বা ডেমন শব্দটি ব্যবহার করেননি! তিনি একে বলেছিলেন অতিমানবীয় বুদ্ধিমত্তা বা ইন্টেলেকচুয়াল সত্তা। পরে তাঁর জীবনীকার এবং অন্য দার্শনিকেরা এই সত্তাটিকে বোঝাতে গিয়ে ল্যাপলাসের দৈত্য নামটা জনপ্রিয় করে তোলেন।

ল্যাপলাস তাঁর বইয়ে লিখেছিলেন, ‘আমরা মহাবিশ্বের বর্তমান অবস্থাকে এর অতীতের ফলাফল এবং ভবিষ্যতের কারণ হিসেবে ধরতে পারি। যদি এমন কোনো অতিমানবীয় বুদ্ধিমত্তা থাকে, যে এই মহাবিশ্বের প্রতিটি কণার বর্তমান অবস্থান এবং তাদের ওপর কাজ করা সব বল বা ফোর্সের খবর জানে এবং সেই বিশাল ডেটা বিশ্লেষণ করার মতো ক্ষমতা তার থাকে...তবে তার কাছে কোনো কিছুই অনিশ্চিত থাকবে না। তার চোখের সামনে অতীত ও ভবিষ্যৎ একেবারে বর্তমানের মতো পরিষ্কার হয়ে ধরা দেবে।’

আরও পড়ুন
ল্যাপলাস কিন্তু তাঁর লেখায় কোথাও দৈত্য বা ডেমন শব্দটি ব্যবহার করেননি! তিনি একে বলেছিলেন অতিমানবীয় বুদ্ধিমত্তা বা ইন্টেলেকচুয়াল সত্তা।

ল্যাপলাসের দৈত্য আসলে কী বোঝায়

সহজ কথায়, এটি হলো ডিটারমিনিজম বা বৈজ্ঞানিক নিয়তিবাদের চরম রূপ। ল্যাপলাসের সময়টা ছিল নিউটনীয় পদার্থবিজ্ঞানের স্বর্ণযুগ। তখন মনে করা হতো, এই মহাবিশ্ব একটা বিশাল ঘড়ির মতো। একবার দম দিয়ে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে, আর এখন তা নির্দিষ্ট গাণিতিক নিয়মে কাঁটায় কাঁটায় চলছে।

ল্যাপলাসের সময় মনে করা হতো, এই মহাবিশ্ব একটা বিশাল ঘড়ির মতো
ছবি: ক্যানোপি

ক্যারাম বোর্ডের একটা গুটিকে স্ট্রাইকার দিয়ে আঘাত করলে সেটা ঠিক কোন পকেটে গিয়ে পড়বে, তা যেমন পদার্থবিজ্ঞানের সূত্র দিয়ে মাপা সম্ভব; তেমনি মহাবিশ্বের প্রতিটি কণার গতিবিধি যদি আমরা জানতে পারি, তবে ভবিষ্যতের সব ঘটনা আগে থেকেই বলে দেওয়া সম্ভব!

আধুনিক বিজ্ঞানে এর গুরুত্ব কতটা

ল্যাপলাসের এই দৈত্য প্রায় এক শ বছর ধরে বিজ্ঞানীদের মাথায় চেপে বসেছিল। কিন্তু বিংশ শতাব্দীতে এসে আধুনিক বিজ্ঞানের দুটি বিশাল আবিষ্কার এই দৈত্যকে রীতিমতো গলা ধাক্কা দিয়ে বের করে দিয়েছে! তবুও বর্তমান যুগে এর গুরুত্ব অপরিসীম। কেন? চলুন দেখি:

১. কোয়ান্টাম মেকানিকসের ধাক্কা: ১৯২০-এর দশকে কোয়ান্টাম মেকানিকসের জন্ম হলে বিজ্ঞানী ওয়ার্নার হাইজেনবার্গ দিলেন তাঁর বিখ্যাত অনিশ্চয়তা নীতি। এই নীতি প্রমাণ করল, ল্যাপলাসের দৈত্যের মূল শর্তটাই আসলে ভুল! হাইজেনবার্গ দেখালেন, মহাবিশ্বের কোনো কণার অবস্থান এবং ভরবেগ আমরা কখনোই একই সঙ্গে শতভাগ নিখুঁতভাবে মাপতে পারব না। অবস্থান নিখুঁতভাবে মাপতে গেলে গতি এলোমেলো হয়ে যাবে, আর গতি মাপতে গেলে অবস্থান হারিয়ে যাবে। যেহেতু আমরা বর্তমান অবস্থারই ১০০ ভাগ নিখুঁত ডেটা সংগ্রহ করতে পারব না, তাই ভবিষ্যৎ হিসাব করার তো কোনো প্রশ্নই ওঠে না!

আরও পড়ুন
১৯২০-এর দশকে কোয়ান্টাম মেকানিকসের জন্ম হলে বিজ্ঞানী ওয়ার্নার হাইজেনবার্গ দিলেন তাঁর বিখ্যাত অনিশ্চয়তা নীতি। এই নীতি প্রমাণ করল, ল্যাপলাসের দৈত্যের মূল শর্তটাই আসলে ভুল!

২. ক্যাওস থিওরি বা বাটারফ্লাই ইফেক্ট: কোয়ান্টাম মেকানিকসকে বাদ দিয়ে আমরা যদি শুধু সাধারণ মেকানিকসের কথাও ধরি, তাহলেও ক্যাওস থিওরি ল্যাপলাসের দৈত্যকে অকেজো করে দেয়। ক্যাওস থিওরি বলছে, শুরুর অবস্থার খুব সামান্য, এমনকি দশমিকের পর হাজার ঘরের কোনো ভুলের কারণেও ভবিষ্যতের ফলাফলে আকাশ-পাতাল তফাত হয়ে যেতে পারে! একেই বলে বাটারফ্লাই ইফেক্ট। ল্যাপলাসের দৈত্যের কম্পিউটারে যদি একচুলও ভুল ডেটা ঢোকে, তবে তার ভবিষ্যতের হিসাব পুরোপুরি ভুল হতে বাধ্য।

৩. মুক্ত ইচ্ছার দর্শন: বিজ্ঞানের পাশাপাশি দর্শনের জগতেও ল্যাপলাসের দৈত্য খুব গুরুত্বপূর্ণ। যদি ল্যাপলাসের দৈত্য সত্যি হতো, তবে তার মানে দাঁড়াত এরকম: আমাদের জীবনের কোনো কিছুর ওপরই আমাদের নিজেদের কোনো হাত নেই! আমি এখন এই লেখাটা পড়ছি, কারণ বিগ ব্যাংয়ের পর থেকেই অণু-পরমাণুর সংঘর্ষ এমনভাবে নির্ধারিত হয়ে আছে যে আমার এই লেখাটাই পড়ার কথা। অর্থাৎ, মানুষের মুক্ত ইচ্ছা বলতে কিছু নেই। আধুনিক স্নায়ুবিজ্ঞান ও দর্শন আজও এই ডিটারমিনিজম এবং মুক্ত ইচ্ছার মধ্যকার দ্বন্দ্ব নিয়ে আলোচনা করার সময় ল্যাপলাসের দৈত্যকে রেফারেন্স হিসেবে টানে।

বিজ্ঞানের পাশাপাশি দর্শনের জগতেও ল্যাপলাসের ভূুমিকা খুবই গুরুত্বপূর্ণ
ছবি: ব্রিটানিকা

শেষ কথা

ল্যাপলাসের দৈত্য আজ আর আধুনিক পদার্থবিজ্ঞানে টিকে নেই। কোয়ান্টাম মেকানিকস ও ক্যাওস থিওরি তাকে অনেক আগেই হারিয়ে দিয়েছে। কিন্তু বিজ্ঞান যে সব সময় নিখুঁতভাবে ভবিষ্যদ্বাণী করতে পারে না, এই বিষয়টা মানুষকে বোঝানোর জন্য ল্যাপলাসের দৈত্য আজও এক অসাধারণ টুল। এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয়, মহাবিশ্ব কোনো একঘেয়ে যান্ত্রিক ঘড়ি নয়, বরং এটি অনিশ্চয়তা ও বিস্ময়ে ভরা!

সূত্র: নিউ সায়েন্টিস্ট ও কোয়ান্টা ম্যাগাজিন

আরও পড়ুন