গণিত ও জ্যোতির্বিজ্ঞানের অবিসংবাদিত প্রতিভা ল্যাপলাস

ফরাসি গণিতবিদ ও জ্যোতির্বিজ্ঞানী পিয়েরে সাইমন ল্যাপলাসছবি: ব্রিটানিকা

আপনি এমন একজন মানুষের সামনে দাঁড়িয়ে আছেন, যিনি আপনার মনের প্রতিটি ইচ্ছা, প্রতিটি সিদ্ধান্ত আগে থেকেই জানেন! আপনি কখন ডান হাত তুলবেন, কখন এক গ্লাস পানি খাবেন; সবকিছুই তিনি আগে থেকে হিসাব করে বলে দিতে পারেন। কারণ তাঁর মতে, এই মহাবিশ্বের প্রতিটি কণা, প্রতিটি ঘটনা একটা নির্দিষ্ট নিয়মে বাঁধা। কেউ যদি এই মহাবিশ্বের বর্তমান অবস্থার সব তথ্য জানে, তবে সে ভবিষ্যৎটাও একটা গাণিতিক সূত্রের মতো বলে দিতে পারবে।

এই যে সবজান্তা এক সত্তার কথা বললাম, দর্শনের জগতে একে বলা হয় ল্যাপলাসের দৈত্য। আর এই অদ্ভুত ধারণার জন্ম দিয়েছিলেন যিনি, তিনি হলেন ফরাসি গণিতবিদ ও জ্যোতির্বিজ্ঞানী পিয়েরে সাইমন ল্যাপলাস। আজ তাঁর মৃত্যুদিবস। এই দিনে জানুন গণিত ও জ্যোতির্বিজ্ঞানের তাঁর অবদানের কথা।

ল্যাপলাসের দৈত্যের গল্পটা কিন্তু আজও বিজ্ঞানীদের ভাবায়। ১৯৮০-এর দশকে মার্কিন স্নায়ুবিজ্ঞানী বেঞ্জামিন লিবেট একটা দারুণ পরীক্ষা করেছিলেন। তিনি দেখতে চেয়েছিলেন, আমাদের কি আসলেই মুক্ত ইচ্ছা বলে কিছু আছে?

আরও পড়ুন
পিয়েরে সাইমন ল্যাপলাসের মতে, কেউ যদি এই মহাবিশ্বের বর্তমান অবস্থার সব তথ্য জানে, তবে সে ভবিষ্যৎটাও একটা গাণিতিক সূত্রের মতো বলে দিতে পারবে।

তিনি কিছু মানুষকে একটা দ্রুতগামী ঘড়ির সামনে বসালেন। তাদের বলা হলো, যখন ইচ্ছা তখন হাতের আঙুল নাড়াতে বা মুঠি পাকাতে। শর্ত হলো, ঠিক যে মুহূর্তে তাদের আঙুল নাড়ানোর ইচ্ছা হবে, সেই মুহূর্তের ঘড়ির কাঁটার অবস্থানটা মনে রাখতে হবে।

পরীক্ষার ফলাফল ছিল চমকে দেওয়ার মতো! দেখা গেল, মানুষ যখন সিদ্ধান্ত নিচ্ছে, তার ঠিক ২০০ মিলিসেকেন্ড পর সে কাজটা করছে। কিন্তু আরও অবাক করা ব্যাপার হলো, ইইজি মেশিনে দেখা গেল, মানুষের ওই ইচ্ছা জাগার অন্তত ৩০০ মিলিসেকেন্ড আগেই তার মস্তিষ্ক সেই কাজের সংকেত তৈরি করে ফেলেছে!

তার মানে কী দাঁড়াল? আমরা কি আসলেই নিজেদের ইচ্ছামতো কিছু করি, নাকি আমাদের মস্তিষ্ক আগে থেকেই সব ঠিক করে রাখে, আমরা শুধু তা পালন করি? এই প্রশ্নের উত্তর আজও বিজ্ঞানীরা খুঁজছেন। কিন্তু এই যে সবকিছু আগে থেকেই নির্ধারিত থাকার ধারণা, অর্থাৎ ডিটারমিনিজমের বৈজ্ঞানিক ভিত্তিটা কিন্তু তৈরি করে দিয়েছিলেন ল্যাপলাস।

আরও পড়ুন
অবাক করা ব্যাপার হলো, ইইজি মেশিনে দেখা গেল, মানুষের ওই ইচ্ছা জাগার অন্তত ৩০০ মিলিসেকেন্ড আগেই তার মস্তিষ্ক সেই কাজের সংকেত তৈরি করে ফেলেছে!

দুই

১৭৪৯ সালের ২৩ মার্চ। ফ্রান্সের নরম্যান্ডি অঞ্চলের বিউমন্ট-এন-অজ নামে এক ছোট্ট গ্রামে জন্ম নিলেন ল্যাপলাস। বাবা পিয়েরে ল্যাপলাস আপেলের রস বিক্রেতা। মা মারি-অ্যান সোচন এক সচ্ছল কৃষক পরিবারে বড় হয়েছেন। পিয়েরে ল্যাপলাসের সঙ্গে বিয়ে হওয়ার পর এসে পড়লেন টানাটানির সংসারে। ল্যাপলাসের পরিবারে আগে কেউ উচ্চশিক্ষার মুখ দেখেনি।

বাবা চেয়েছিলেন ছেলে বড় হয়ে যাজক হবে। তাই ১৬ বছর বয়স পর্যন্ত গ্রামের স্কুলে পড়ার পর ল্যাপলাসকে পাঠানো হলো কেয়েন বিশ্ববিদ্যালয়ে, ধর্মতত্ত্ব পড়ার জন্য। কিন্তু কে জানত, এই ছেলেই একদিন ঈশ্বরের অস্তিত্ব নিয়েই প্রশ্ন তুলবে!

বিখ্যাত গণিতবিদ জোসেফ-লুই ল্যাগ্রেঞ্জ
ছবি: উইকিপিডিয়া

কেয়েন বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়ে ল্যাপলাস বুঝতে পারলেন, ধর্মের চেয়ে গণিতের প্রতিই তাঁর টান বেশি। ক্রিস্টোফ গ্যাডব্লেড এবং পিয়েরে লে কানু নামে দুজন গণিত শিক্ষক তাঁর এই প্রতিভা ধরতে পারলেন। তাঁদের উৎসাহে ল্যাপলাস ছাত্রাবস্থাতেই তাঁর প্রথম গবেষণাপত্র লিখে ফেললেন। সেটা পাঠিয়ে দিলেন বিখ্যাত গণিতবিদ জোসেফ-লুই ল্যাগ্রেঞ্জের কাছে। ল্যাগ্রেঞ্জ সেটা তাঁর জার্নালে ছাপালেনও। ব্যাস, ল্যাপলাস সিদ্ধান্ত নিলেন তিনি গণিতবিদই হবেন!

শিক্ষক লে কানুর কাছ থেকে একটা সুপারিশপত্র নিয়ে ল্যাপলাস সোজা চলে গেলেন প্যারিসে। উদ্দেশ্য, তখনকার অন্যতম সেরা গণিতবিদ জ্যঁ-ব্যাপটিস্ট লে রন্ড ডি’আলেম্বার্টের সঙ্গে দেখা করা। ডি’আলেম্বার্ট প্রথমে এই ছোকরাকে খুব একটা পাত্তা দিলেন না। তাকে তাড়ানোর জন্য তিনি গণিতের খুব কঠিন ও মোটা একটা বই ধরিয়ে দিয়ে বললেন, ‘আগে এটা পড়ে আসো!’

আরও পড়ুন
বাবা চেয়েছিলেন ছেলে বড় হয়ে যাজক হবে। তাই ১৬ বছর বয়স পর্যন্ত গ্রামের স্কুলে পড়ার পর ল্যাপলাসকে পাঠানো হলো কেয়েন বিশ্ববিদ্যালয়ে, ধর্মতত্ত্ব পড়ার জন্য।

তিনি ভেবেছিলেন ল্যাপলাস আর ফিরবে না। কিন্তু কয়েক দিন পরই ল্যাপলাস আবার হাজির! বিরক্ত হয়ে ডি’আলেম্বার্ট তাকে ওই বই থেকে কঠিন সব প্রশ্ন করতে শুরু করলেন। কিন্তু ল্যাপলাস তো সব প্রশ্নের উত্তর গড়গড় করে দিয়ে দিল!

ডি’আলেম্বার্ট বুঝলেন, এই ছেলে সাধারণ কেউ নয়। তিনি ল্যাপলাসকে নিজের ছাত্র হিসেবে গ্রহণ করলেন। প্যারিসের এক সামরিক একাডেমিতে গণিতের অধ্যাপক হিসেবে তাঁর চাকরিরও ব্যবস্থা করে দিলেন।

ল্যাপলাস কখনোই নিজের মেধা নিয়ে বিনয়ী ছিলেন না
ছবি: উইকিপিডিয়া

আর্থিক চিন্তা দূর হওয়ার পর ল্যাপলাস পুরোদমে গবেষণায় মন দেন। একের পর এক দারুণ সব গবেষণাপত্র প্রকাশ করেন। কিন্তু ফ্রেঞ্চ একাডেমি অব সায়েন্সেসে সদস্য পদের জন্য আবেদন করে দুবার তিনি প্রত্যাখ্যাত হন। তাঁর চেয়ে বয়সে বড়, কিন্তু কম মেধাবীদের সুযোগ দেওয়া হলো; অথচ তাঁকে দেওয়া হলো না! ল্যাপলাস ভীষণ রেগে গেলেন। তিনি কখনোই নিজের মেধা নিয়ে বিনয়ী ছিলেন না। তবে তাঁর এই রাগ বেশি দিন টিকল না। ১৭৭৩ সালে, মাত্র ২৪ বছর বয়সে তিনি একাডেমির সদস্য পদ পেয়ে গেলেন।

আরও পড়ুন
ডি’আলেম্বার্ট বুঝলেন, এই ছেলে সাধারণ কেউ নয়। তিনি ল্যাপলাসকে নিজের ছাত্র হিসেবে গ্রহণ করলেন। প্যারিসের এক সামরিক একাডেমিতে গণিতের অধ্যাপক হিসেবে তাঁর চাকরির ব্যবস্থা করেন।

তিন

ল্যাপলাসের সবচেয়ে বড় অবদান জ্যোতির্বিজ্ঞানে। ১৬৮৭ সালে আইজ্যাক নিউটন তাঁর মহাকর্ষ সূত্রে দেখিয়েছিলেন, গ্রহগুলো কীভাবে সূর্যের চারদিকে ঘোরে। কিন্তু সমস্যা হলো, নিউটন শুধু সূর্য ও একটা গ্রহের হিসাব মেলাতে পেরেছিলেন। মানে টু বডি প্রবলেমের সমাধান করেছিলেন তিনি।

কিন্তু সৌরজগতে তো অনেক গ্রহ! প্রতিটি গ্রহই একে অপরকে আকর্ষণ করছে। এই টানাটানির কারণে গ্রহগুলো তাদের নির্দিষ্ট পথ থেকে একটু একটু সরে যায়। নিউটন ভেবেছিলেন, এই ছোট ছোট পরিবর্তনগুলো জমতে জমতে একদিন হয়তো পুরো সৌরজগৎটাই ধ্বংস হয়ে যাবে! তাই তিনি বিশ্বাস করতেন, ঈশ্বর মাঝে মাঝে এসে এই গ্রহগুলোকে তাদের ঠিক পথে বসিয়ে দিয়ে যান।

ল্যাপলাসের লেখা সেলেস্টিয়াল মেকানিকস বইয়ের প্রথম পৃষ্ঠা
ছবি: দ্য ডেভন অ্যান্ড এক্সিটার ইনস্টিটিউশন

ল্যাপলাস এই ঈশ্বর তত্ত্ব মানতে রাজি ছিলেন না। তিনি ক্যালকুলাস ব্যবহার করে সৌরজগতের এক নিখুঁত গাণিতিক মডেল দাঁড় করালেন। তিনি প্রমাণ করে দিলেন, বৃহস্পতি ও শনি গ্রহের কক্ষপথের মধ্যে যে ছোটখাটো পরিবর্তন দেখা যায়, তা আসলে একটা নির্দিষ্ট নিয়মে ঘটে এবং একটা সময় পর তা আবার ঠিক হয়ে যায়। অর্থাৎ, সৌরজগৎ এমনিতেই খুব স্থিতিশীল, একে ঠিক রাখার জন্য বাইরে থেকে কারও হস্তক্ষেপের দরকার নেই!

১৭৯৯ থেকে ১৮২৫ সালের মধ্যে ল্যাপলাস তাঁর এই যুগান্তকারী কাজগুলোকে পাঁচ খণ্ডের এক বিশাল বই আকারে প্রকাশ করলেন। বইয়ের নাম দিলেন সেলেস্টিয়াল মেকানিকস

আরও পড়ুন
ল্যাপলাস প্রমাণ করে দিলেন, বৃহস্পতি ও শনি গ্রহের কক্ষপথের মধ্যে যে ছোটখাটো পরিবর্তন দেখা যায়, তা আসলে একটা নির্দিষ্ট নিয়মে ঘটে এবং একটা সময় পর তা আবার ঠিক হয়ে যায়।

ল্যাপলাসের এই বই পড়ার পর ফরাসি সম্রাট নেপোলিয়ন বোনাপার্ট তাঁকে ডেকে পাঠালেন। নেপোলিয়ন জিজ্ঞেস করলেন, ‘আপনি সৌরজগতের এত বড় একটা বই লিখলেন, কিন্তু বইয়ের কোথাও ঈশ্বরের কথা উল্লেখ করলেন না কেন?’

ল্যাপলাস সোজাসাপটা উত্তর দিলেন, ‘মহামান্য সম্রাট, আমার বইয়ে ওই হাইপোথিসিসের কোনো দরকার পড়েনি!’

শুধু জ্যোতির্বিজ্ঞান নয়, সম্ভাবনা তত্ত্বেও ল্যাপলাসের অবদান বিশাল। ১৮১২ সালে তিনি প্রকাশ করেন অ্যানালিটিক থিওরি অব প্রোবাবিলিটি। এই বইয়ে তিনি সম্ভাবনা তত্ত্বের মূল ভিত্তি দাঁড় করান। তিনি একটা দারুণ নিয়ম দিয়েছিলেন। সেই নিয়মই ল্যাপলাসের রুল অব সাকসেশন নামে পরিচিত।

ল্যাপলাসের সম্ভাবনা তত্ত্ব নিয়ে লেখা বই অ্যানালিটিক থিওরি অব প্রোবাবিলিটি
ছবি: এমএএ ডট অর্গ

ধরুন, আপনি তিনবার কয়েন টস করলেন এবং তিনবারই হেড পড়ল। সাধারণ হিসেবে মনে হতে পারে, পরের বারও হেড পড়ার সম্ভাবনা ১০০ ভাগ! কিন্তু ল্যাপলাস দেখালেন, এটা ভুল। তাঁর সূত্র অনুযায়ী, পরের বার ভিন্ন কিছু ঘটার সম্ভাবনাও সব সময় একই থাকে।

ল্যাপলাস রাজনীতিতেও বেশ ধূর্ত ছিলেন। ফরাসি বিপ্লবের সেই ভয়াল সময়ে তিনি খুব চালাকির সঙ্গে নিজেকে বাঁচিয়ে রেখেছিলেন। এমনকি নেপোলিয়ন তাঁকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীও বানিয়েছিলেন! যদিও সেই চাকরি টিকেছিল মাত্র ছয় সপ্তাহ। নেপোলিয়ন পরে ল্যাপলাস সম্পর্কে লিখেছিলেন, ‘ল্যাপলাস সবকিছুর ভেতরেই শুধু সূক্ষ্ম সমস্যা খুঁজত!’

আরও পড়ুন
১৮১২ সালে পিয়েরে সাইমন ল্যাপলাস প্রকাশ করেন অ্যানালিটিক থিওরি অব প্রোবাবিলিটি। এই বইয়ে তিনি সম্ভাবনা তত্ত্বের মূল ভিত্তি দাঁড় করান।

চার

জীবনের শেষ দিকে ল্যাপলাস আলো ও তাপ নিয়েও গবেষণা করেন। যদিও সেগুলো পরে ভুল প্রমাণিত হয়। তবে ৭০ বছর বয়স পার হওয়ার পরও তিনি গবেষণা থামাননি।

১৮২৭ সালের ৫ মার্চ প্যারিসে এই মহান বিজ্ঞানীর মৃত্যু হয়। কিন্তু গণিত ও পদার্থবিজ্ঞানের পরতে পরতে আজও ল্যাপলাসের নাম জড়িয়ে আছে। ল্যাপলাস ইকুয়েশনের মতো গাণিতিক সূত্রগুলো ছাড়া আধুনিক বিজ্ঞান চিন্তাই করা যায় না।

গণিত ও পদার্থবিজ্ঞানের পরতে পরতে আজও ল্যাপলাসের নাম জড়িয়ে আছে
ছবি: আল্যামি

আর ওই যে শুরুতে বলেছিলাম ল্যাপলাসের দৈত্য, তা আজও আমাদের আধুনিক স্নায়ুবিজ্ঞান ও দর্শনের আলোচনায় বারবার ফিরে আসে। আমাদের মনে করিয়ে দেয়, এই মহাবিশ্বের বিশালতা ও নিয়মের অনেক কিছুই হয়তো আমরা এখনো জানি না!

সূত্র: ম্যাথ মেকারস: দ্য লাইভস অ্যান্ড ওয়ার্কস অব ফিফটি ফেমাস ম্যাথেমেটিশিয়ান ও ম্যাথ হিস্ট্রি ডটকম

টীকা

১. ল্যাপলাসের দৈত্য একটি কল্পিত সত্তা। উনিশ শতকে ফরাসি গণিতবিদ ও জ্যোতির্বিজ্ঞানী পিয়েরে সাইমন ল্যাপলাস এই ধারণাটি প্রস্তাব করেছিলেন। সহজ ভাষায়, মহাবিশ্ব যদি পুরোপুরি নির্দিষ্ট নিয়মে চলে, তাহলে সবকিছুই আগে থেকে নির্ধারিত এবং তা হিসাব করে বলে দেওয়াও সম্ভব। আপনি যে এখন এই লেখাটি পড়ছেন, তাও আগে থেকেই নির্ধারিত।

তবে আধুনিক পদার্থবিজ্ঞান এই ধারণায় বড় ধাক্কা দিয়েছে। বিশেষ করে কোয়ান্টাম মেকানিকস দেখিয়েছে, খুব ছোট জগতের কণাগুলোর অবস্থান ও গতি একসঙ্গে নির্ভুলভাবে জানা সম্ভব নয়। একে বলা হয় হাইজেনবার্গের অনিশ্চয়তা নীতি। ফলে ল্যাপলাসের সেই দৈত্য বাস্তবে থাকা কঠিন বলেই মনে করেন বিজ্ঞানীরা। এটা আসলে এক ধরনের থট এক্সপেরিমেন্ট বা মানস পরীক্ষা। এই পরীক্ষার মাধ্যমে বিজ্ঞানীরা বোঝার চেষ্টা করেছিলেন, মহাবিশ্ব কতটা অনিশ্চিত।

 

২. বেঞ্জামিন লিবেট ছিলেন মার্কিন স্নায়ুবিজ্ঞানী। মানুষ নিজের ইচ্ছায় সিদ্ধান্ত নেয় কি না; এই প্রশ্ন নিয়ে গবেষণার জন্যই তিনি সবচেয়ে বেশি পরিচিত। ১৯৮০–এর দশকে তিনি একটি বিখ্যাত পরীক্ষা করেছিলেন। সে পরীক্ষার কথা ওপরে বলেছি। লিবেট মূলত পরীক্ষাগারভিত্তিক গবেষণার জন্য বিখ্যাত ছিলেন। তিনি খুব বেশি জনপ্রিয় বিজ্ঞান বই লেখেননি, তবে একটি গুরুত্বপূর্ণ বই আছে, মাইন্ড টাইম। বইটি প্রকাশিত হয় ২০০৪ সালে। এখানে তিনি মানুষের সচেতনতা, মস্তিষ্কের সংকেত এবং সিদ্ধান্ত নেওয়ার সম্পর্ক নিয়ে আলোচনা করেছেন।

 

৩. ইতালীয় গণিতবিদ ও পদার্থবিজ্ঞানী জোসেফ-লুই ল্যাগ্রেঞ্জ ফ্রান্সে কাজ করে খ্যাতি অর্জন করেন। অষ্টাদশ শতকের সবচেয়ে প্রভাবশালী গণিতবিদদের একজন হিসেবে তাঁকে ধরা হয়। গণিতের নানা শাখায় তাঁর অবদান থাকলেও তাঁর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ যান্ত্রিকতাকে নতুনভাবে সাজানো। আজ তা ল্যাগ্রেঞ্জ মেশিনস নামে পরিচিত। এই পদ্ধতিতে জটিল গতির সমস্যাও তুলনামূলক সহজ সমীকরণে প্রকাশ করা যায়।

১৭৮৮ সালে তাঁর প্রকাশিত অ্যানালিটিক্যাল মেকানিকস বইয়ে তিনি পুরো যান্ত্রিকতাকে বিশুদ্ধ গণিতের ভাষায় সাজিয়ে দেন। সেখানে চিত্রের বদলে সমীকরণ ব্যবহার করে গতির নিয়ম ব্যাখ্যা করা হয়। জ্যোতির্বিদ্যাতেও তাঁর গুরুত্বপূর্ণ অবদান আছে। তিনটি মহাজাগতিক বস্তুর পারস্পরিক মাধ্যাকর্ষণের সমস্যায় তিনি যে বিশেষ ভারসাম্যের বিন্দুগুলোর কথা বলেছিলেন, সেগুলো আজ ল্যাগ্রেঞ্জ পয়েন্ট নামে পরিচিত।

 

৪. জ্যঁ-ব্যাপটিস্ট লে রন্ড ডি’আলেম্বার্ট ফরাসি গণিতবিদ, পদার্থবিজ্ঞানী ও দার্শনিক। জন্মের সময় তাঁকে প্যারিসের সাঁ-জ্যঁ-লে-রঁ গির্জার সিঁড়িতে পরিত্যক্ত অবস্থায় পাওয়া যায়। সেখান থেকেই তাঁর নামের অংশ ‘লে রন্ড’ এসেছে। পরে পালক পরিবারে বড় হয়ে তিনি ইউরোপের অন্যতম খ্যাতিমান চিন্তাবিদ হয়ে ওঠেন।

গণিত ও পদার্থবিজ্ঞানে তাঁর সবচেয়ে পরিচিত অবদান ডি’আলেম্বার্ট প্রিন্সিপ্যাল। এই নীতির মাধ্যমে তিনি দেখান, কোনো চলমান বস্তুর সমস্যাকে এমনভাবে রূপান্তর করা যায় যেন তা স্থির ভারসাম্যের সমস্যা। তিনি আংশিক ডিফারেনশিয়াল সমীকরণ নিয়েও গুরুত্বপূর্ণ কাজ করেন। বিশেষ করে কম্পনশীল তারের গতি ব্যাখ্যা করার জন্য যে সমীকরণটি ব্যবহার করা হয়, তা আজ ওয়েভ ইকুয়েশন নামে পরিচিত। শব্দ, আলো ও তরঙ্গের নানা ঘটনা বোঝার ক্ষেত্রে এই সমীকরণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

 

৫. সেলেস্টিয়াল মেকানিকস বইয়ের কাজ শুরু হয় আঠারো শতকের শেষ দিকে। এরপর ধীরে ধীরে পাঁচ খণ্ডের এই বিশাল বইয়ের কাজ শেষ করেন ল্যাপলাস। এই নামের অর্থ মহাজাগতিক যান্ত্রিকতা। মহাকাশের বস্তুগুলোর গতি কীভাবে কাজ করে, তার গাণিতিক ব্যাখ্যা রয়েছে এই বইয়ে। এর মূল ধারণা এসেছে আইজ্যাক নিউটনের মহাকর্ষ তত্ত্ব থেকে। নিউটন দেখিয়েছিলেন, মহাকর্ষই গ্রহগুলোকে কক্ষপথে ধরে রাখে। ল্যাপলাস সেই ধারণাকে আরও গভীর ও নিখুঁত গণিতের মাধ্যমে বিশ্লেষণ করেন।

এই বইয়ে তিনি দেখান, সূর্যকে কেন্দ্র করে গ্রহগুলোর কক্ষপথ কেন স্থিতিশীল থাকে, এক গ্রহের মহাকর্ষ বল কীভাবে অন্য গ্রহের গতিতে সূক্ষ্ম প্রভাব ফেলে, জোয়ার-ভাটা কীভাবে তৈরি হয়, এমনকি শনির বলয়ের গঠনও তিনি বিশ্লেষণ করেন। পুরো বইটিই ক্যালকুলাস ও গাণিতিক বিশ্লেষণে ভরা। তাই সাধারণ পাঠকের কাছে এই বই দুর্ভেদ্য দুর্গ হলেও বিজ্ঞানীদের কাছে মহাজাগতিক গতিবিদ্যার ভিত্তি।

 

৬. ফরাসি সম্রাট নেপোলিয়ন বোনাপার্ট ১৭৯৯ সালে ল্যাপলাসের খ্যাতিতে মুগ্ধ হয়ে অল্প সময়ের জন্য তাঁকে ফ্রান্সের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বানিয়েছিলেন। কিন্তু ল্যাপলাস গণিতবিদ হিসেবে যতটা দক্ষ ছিলেন, প্রশাসক হিসেবে ততটা নন। তাই ৬ সপ্তাহের মধ্যেই তাঁকে সেই পদ থেকে সরিয়ে দেন। পরে অবশ্য সম্মান দেখিয়ে তাঁকে সেনেটের সদস্য ও কাউন্ট উপাধি দেন।

 

৭. ল্যাপলাস সমীকরণ গণিতে খুব গুরুত্বপূর্ণ। এই সমীকরণ বলে, কোনো জায়গায় উৎস বা ক্ষয় না থাকলে সেখানে কোনো ভৌত রাশির মান আশপাশের মানের সঙ্গে কীভাবে ভারসাম্যে থাকবে। গণিতে সমীকরণটি লেখা হয় এভাবে: ∇²φ = 0। এখানে ফাইয়ের (φ) সাহায্যে তাপমাত্রা, বৈদ্যুতিক বিভব, কিংবা মহাকর্ষীয় বিভবের মতো রাশি বোঝায়। আর নাবলা স্কোয়ার (∇²) হচ্ছে একটি গাণিতিক প্রতীক, একে ল্যাপলাসিয়ান বলে। এটি মূলত বিন্দুর মান চারপাশের তুলনায় কতটা বাঁকছে বা পরিবর্তিত হচ্ছে তা বোঝায়।

একটি সহজ উদাহরণ দিয়ে বিষয়টা বোঝা যায়। ধরুণ, একটি ধাতব পাত গরম করা হয়েছে। একবার পাতটি গরম হওয়ার পর আপনি আর নতুন করে পাতে তাপ দিচ্ছেন না। তবে তাপ যাতে বেরিয়ে যেতে না পারে, সে ব্যবস্থাও করলেন। এমন অবস্থায় শুরুতে পাতের একেক জায়গায় তাপমাত্রা একেকরকম থাকলেও কিছু সময় পরে সব জায়গায়  সমান হয়ে যাবে। এই স্থির অবস্থার তাপবণ্টনই ল্যাপলাস সমীকরণ দিয়ে বর্ণনা করা যায়। মজার বিষয় হলো, মহাবিশ্বের অনেক জটিল সমস্যার পেছনে এমন সরল সমীকরণ লুকিয়ে আছে।

আরও পড়ুন