আপনি এমন একজন মানুষের সামনে দাঁড়িয়ে আছেন, যিনি আপনার মনের প্রতিটি ইচ্ছা, প্রতিটি সিদ্ধান্ত আগে থেকেই জানেন! আপনি কখন ডান হাত তুলবেন, কখন এক গ্লাস পানি খাবেন; সবকিছুই তিনি আগে থেকে হিসাব করে বলে দিতে পারেন। কারণ তাঁর মতে, এই মহাবিশ্বের প্রতিটি কণা, প্রতিটি ঘটনা একটা নির্দিষ্ট নিয়মে বাঁধা। কেউ যদি এই মহাবিশ্বের বর্তমান অবস্থার সব তথ্য জানে, তবে সে ভবিষ্যৎটাও একটা গাণিতিক সূত্রের মতো বলে দিতে পারবে।
এই যে সবজান্তা এক সত্তার কথা বললাম, দর্শনের জগতে একে বলা হয় ল্যাপলাসের দৈত্য১। আর এই অদ্ভুত ধারণার জন্ম দিয়েছিলেন যিনি, তিনি হলেন ফরাসি গণিতবিদ ও জ্যোতির্বিজ্ঞানী পিয়েরে সাইমন ল্যাপলাস। আজ তাঁর মৃত্যুদিবস। এই দিনে জানুন গণিত ও জ্যোতির্বিজ্ঞানের তাঁর অবদানের কথা।
ল্যাপলাসের দৈত্যের গল্পটা কিন্তু আজও বিজ্ঞানীদের ভাবায়। ১৯৮০-এর দশকে মার্কিন স্নায়ুবিজ্ঞানী বেঞ্জামিন লিবেট২ একটা দারুণ পরীক্ষা করেছিলেন। তিনি দেখতে চেয়েছিলেন, আমাদের কি আসলেই মুক্ত ইচ্ছা বলে কিছু আছে?
পিয়েরে সাইমন ল্যাপলাসের মতে, কেউ যদি এই মহাবিশ্বের বর্তমান অবস্থার সব তথ্য জানে, তবে সে ভবিষ্যৎটাও একটা গাণিতিক সূত্রের মতো বলে দিতে পারবে।
তিনি কিছু মানুষকে একটা দ্রুতগামী ঘড়ির সামনে বসালেন। তাদের বলা হলো, যখন ইচ্ছা তখন হাতের আঙুল নাড়াতে বা মুঠি পাকাতে। শর্ত হলো, ঠিক যে মুহূর্তে তাদের আঙুল নাড়ানোর ইচ্ছা হবে, সেই মুহূর্তের ঘড়ির কাঁটার অবস্থানটা মনে রাখতে হবে।
পরীক্ষার ফলাফল ছিল চমকে দেওয়ার মতো! দেখা গেল, মানুষ যখন সিদ্ধান্ত নিচ্ছে, তার ঠিক ২০০ মিলিসেকেন্ড পর সে কাজটা করছে। কিন্তু আরও অবাক করা ব্যাপার হলো, ইইজি মেশিনে দেখা গেল, মানুষের ওই ইচ্ছা জাগার অন্তত ৩০০ মিলিসেকেন্ড আগেই তার মস্তিষ্ক সেই কাজের সংকেত তৈরি করে ফেলেছে!
তার মানে কী দাঁড়াল? আমরা কি আসলেই নিজেদের ইচ্ছামতো কিছু করি, নাকি আমাদের মস্তিষ্ক আগে থেকেই সব ঠিক করে রাখে, আমরা শুধু তা পালন করি? এই প্রশ্নের উত্তর আজও বিজ্ঞানীরা খুঁজছেন। কিন্তু এই যে সবকিছু আগে থেকেই নির্ধারিত থাকার ধারণা, অর্থাৎ ডিটারমিনিজমের বৈজ্ঞানিক ভিত্তিটা কিন্তু তৈরি করে দিয়েছিলেন ল্যাপলাস।
অবাক করা ব্যাপার হলো, ইইজি মেশিনে দেখা গেল, মানুষের ওই ইচ্ছা জাগার অন্তত ৩০০ মিলিসেকেন্ড আগেই তার মস্তিষ্ক সেই কাজের সংকেত তৈরি করে ফেলেছে!
দুই
১৭৪৯ সালের ২৩ মার্চ। ফ্রান্সের নরম্যান্ডি অঞ্চলের বিউমন্ট-এন-অজ নামে এক ছোট্ট গ্রামে জন্ম নিলেন ল্যাপলাস। বাবা পিয়েরে ল্যাপলাস আপেলের রস বিক্রেতা। মা মারি-অ্যান সোচন এক সচ্ছল কৃষক পরিবারে বড় হয়েছেন। পিয়েরে ল্যাপলাসের সঙ্গে বিয়ে হওয়ার পর এসে পড়লেন টানাটানির সংসারে। ল্যাপলাসের পরিবারে আগে কেউ উচ্চশিক্ষার মুখ দেখেনি।
বাবা চেয়েছিলেন ছেলে বড় হয়ে যাজক হবে। তাই ১৬ বছর বয়স পর্যন্ত গ্রামের স্কুলে পড়ার পর ল্যাপলাসকে পাঠানো হলো কেয়েন বিশ্ববিদ্যালয়ে, ধর্মতত্ত্ব পড়ার জন্য। কিন্তু কে জানত, এই ছেলেই একদিন ঈশ্বরের অস্তিত্ব নিয়েই প্রশ্ন তুলবে!
কেয়েন বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়ে ল্যাপলাস বুঝতে পারলেন, ধর্মের চেয়ে গণিতের প্রতিই তাঁর টান বেশি। ক্রিস্টোফ গ্যাডব্লেড এবং পিয়েরে লে কানু নামে দুজন গণিত শিক্ষক তাঁর এই প্রতিভা ধরতে পারলেন। তাঁদের উৎসাহে ল্যাপলাস ছাত্রাবস্থাতেই তাঁর প্রথম গবেষণাপত্র লিখে ফেললেন। সেটা পাঠিয়ে দিলেন বিখ্যাত গণিতবিদ জোসেফ-লুই ল্যাগ্রেঞ্জের৩ কাছে। ল্যাগ্রেঞ্জ সেটা তাঁর জার্নালে ছাপালেনও। ব্যাস, ল্যাপলাস সিদ্ধান্ত নিলেন তিনি গণিতবিদই হবেন!
শিক্ষক লে কানুর কাছ থেকে একটা সুপারিশপত্র নিয়ে ল্যাপলাস সোজা চলে গেলেন প্যারিসে। উদ্দেশ্য, তখনকার অন্যতম সেরা গণিতবিদ জ্যঁ-ব্যাপটিস্ট লে রন্ড ডি’আলেম্বার্টের৪ সঙ্গে দেখা করা। ডি’আলেম্বার্ট প্রথমে এই ছোকরাকে খুব একটা পাত্তা দিলেন না। তাকে তাড়ানোর জন্য তিনি গণিতের খুব কঠিন ও মোটা একটা বই ধরিয়ে দিয়ে বললেন, ‘আগে এটা পড়ে আসো!’
বাবা চেয়েছিলেন ছেলে বড় হয়ে যাজক হবে। তাই ১৬ বছর বয়স পর্যন্ত গ্রামের স্কুলে পড়ার পর ল্যাপলাসকে পাঠানো হলো কেয়েন বিশ্ববিদ্যালয়ে, ধর্মতত্ত্ব পড়ার জন্য।
তিনি ভেবেছিলেন ল্যাপলাস আর ফিরবে না। কিন্তু কয়েক দিন পরই ল্যাপলাস আবার হাজির! বিরক্ত হয়ে ডি’আলেম্বার্ট তাকে ওই বই থেকে কঠিন সব প্রশ্ন করতে শুরু করলেন। কিন্তু ল্যাপলাস তো সব প্রশ্নের উত্তর গড়গড় করে দিয়ে দিল!
ডি’আলেম্বার্ট বুঝলেন, এই ছেলে সাধারণ কেউ নয়। তিনি ল্যাপলাসকে নিজের ছাত্র হিসেবে গ্রহণ করলেন। প্যারিসের এক সামরিক একাডেমিতে গণিতের অধ্যাপক হিসেবে তাঁর চাকরিরও ব্যবস্থা করে দিলেন।
আর্থিক চিন্তা দূর হওয়ার পর ল্যাপলাস পুরোদমে গবেষণায় মন দেন। একের পর এক দারুণ সব গবেষণাপত্র প্রকাশ করেন। কিন্তু ফ্রেঞ্চ একাডেমি অব সায়েন্সেসে সদস্য পদের জন্য আবেদন করে দুবার তিনি প্রত্যাখ্যাত হন। তাঁর চেয়ে বয়সে বড়, কিন্তু কম মেধাবীদের সুযোগ দেওয়া হলো; অথচ তাঁকে দেওয়া হলো না! ল্যাপলাস ভীষণ রেগে গেলেন। তিনি কখনোই নিজের মেধা নিয়ে বিনয়ী ছিলেন না। তবে তাঁর এই রাগ বেশি দিন টিকল না। ১৭৭৩ সালে, মাত্র ২৪ বছর বয়সে তিনি একাডেমির সদস্য পদ পেয়ে গেলেন।
ডি’আলেম্বার্ট বুঝলেন, এই ছেলে সাধারণ কেউ নয়। তিনি ল্যাপলাসকে নিজের ছাত্র হিসেবে গ্রহণ করলেন। প্যারিসের এক সামরিক একাডেমিতে গণিতের অধ্যাপক হিসেবে তাঁর চাকরির ব্যবস্থা করেন।
তিন
ল্যাপলাসের সবচেয়ে বড় অবদান জ্যোতির্বিজ্ঞানে। ১৬৮৭ সালে আইজ্যাক নিউটন তাঁর মহাকর্ষ সূত্রে দেখিয়েছিলেন, গ্রহগুলো কীভাবে সূর্যের চারদিকে ঘোরে। কিন্তু সমস্যা হলো, নিউটন শুধু সূর্য ও একটা গ্রহের হিসাব মেলাতে পেরেছিলেন। মানে টু বডি প্রবলেমের সমাধান করেছিলেন তিনি।
কিন্তু সৌরজগতে তো অনেক গ্রহ! প্রতিটি গ্রহই একে অপরকে আকর্ষণ করছে। এই টানাটানির কারণে গ্রহগুলো তাদের নির্দিষ্ট পথ থেকে একটু একটু সরে যায়। নিউটন ভেবেছিলেন, এই ছোট ছোট পরিবর্তনগুলো জমতে জমতে একদিন হয়তো পুরো সৌরজগৎটাই ধ্বংস হয়ে যাবে! তাই তিনি বিশ্বাস করতেন, ঈশ্বর মাঝে মাঝে এসে এই গ্রহগুলোকে তাদের ঠিক পথে বসিয়ে দিয়ে যান।
ল্যাপলাস এই ঈশ্বর তত্ত্ব মানতে রাজি ছিলেন না। তিনি ক্যালকুলাস ব্যবহার করে সৌরজগতের এক নিখুঁত গাণিতিক মডেল দাঁড় করালেন। তিনি প্রমাণ করে দিলেন, বৃহস্পতি ও শনি গ্রহের কক্ষপথের মধ্যে যে ছোটখাটো পরিবর্তন দেখা যায়, তা আসলে একটা নির্দিষ্ট নিয়মে ঘটে এবং একটা সময় পর তা আবার ঠিক হয়ে যায়। অর্থাৎ, সৌরজগৎ এমনিতেই খুব স্থিতিশীল, একে ঠিক রাখার জন্য বাইরে থেকে কারও হস্তক্ষেপের দরকার নেই!
১৭৯৯ থেকে ১৮২৫ সালের মধ্যে ল্যাপলাস তাঁর এই যুগান্তকারী কাজগুলোকে পাঁচ খণ্ডের এক বিশাল বই আকারে প্রকাশ করলেন। বইয়ের নাম দিলেন সেলেস্টিয়াল মেকানিকস৫।
ল্যাপলাস প্রমাণ করে দিলেন, বৃহস্পতি ও শনি গ্রহের কক্ষপথের মধ্যে যে ছোটখাটো পরিবর্তন দেখা যায়, তা আসলে একটা নির্দিষ্ট নিয়মে ঘটে এবং একটা সময় পর তা আবার ঠিক হয়ে যায়।
ল্যাপলাসের এই বই পড়ার পর ফরাসি সম্রাট নেপোলিয়ন বোনাপার্ট তাঁকে ডেকে পাঠালেন। নেপোলিয়ন জিজ্ঞেস করলেন, ‘আপনি সৌরজগতের এত বড় একটা বই লিখলেন, কিন্তু বইয়ের কোথাও ঈশ্বরের কথা উল্লেখ করলেন না কেন?’
ল্যাপলাস সোজাসাপটা উত্তর দিলেন, ‘মহামান্য সম্রাট, আমার বইয়ে ওই হাইপোথিসিসের কোনো দরকার পড়েনি!’
শুধু জ্যোতির্বিজ্ঞান নয়, সম্ভাবনা তত্ত্বেও ল্যাপলাসের অবদান বিশাল। ১৮১২ সালে তিনি প্রকাশ করেন অ্যানালিটিক থিওরি অব প্রোবাবিলিটি। এই বইয়ে তিনি সম্ভাবনা তত্ত্বের মূল ভিত্তি দাঁড় করান। তিনি একটা দারুণ নিয়ম দিয়েছিলেন। সেই নিয়মই ল্যাপলাসের রুল অব সাকসেশন নামে পরিচিত।
ধরুন, আপনি তিনবার কয়েন টস করলেন এবং তিনবারই হেড পড়ল। সাধারণ হিসেবে মনে হতে পারে, পরের বারও হেড পড়ার সম্ভাবনা ১০০ ভাগ! কিন্তু ল্যাপলাস দেখালেন, এটা ভুল। তাঁর সূত্র অনুযায়ী, পরের বার ভিন্ন কিছু ঘটার সম্ভাবনাও সব সময় একই থাকে।
ল্যাপলাস রাজনীতিতেও বেশ ধূর্ত ছিলেন। ফরাসি বিপ্লবের সেই ভয়াল সময়ে তিনি খুব চালাকির সঙ্গে নিজেকে বাঁচিয়ে রেখেছিলেন। এমনকি নেপোলিয়ন তাঁকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীও৬ বানিয়েছিলেন! যদিও সেই চাকরি টিকেছিল মাত্র ছয় সপ্তাহ। নেপোলিয়ন পরে ল্যাপলাস সম্পর্কে লিখেছিলেন, ‘ল্যাপলাস সবকিছুর ভেতরেই শুধু সূক্ষ্ম সমস্যা খুঁজত!’
১৮১২ সালে পিয়েরে সাইমন ল্যাপলাস প্রকাশ করেন অ্যানালিটিক থিওরি অব প্রোবাবিলিটি। এই বইয়ে তিনি সম্ভাবনা তত্ত্বের মূল ভিত্তি দাঁড় করান।
চার
জীবনের শেষ দিকে ল্যাপলাস আলো ও তাপ নিয়েও গবেষণা করেন। যদিও সেগুলো পরে ভুল প্রমাণিত হয়। তবে ৭০ বছর বয়স পার হওয়ার পরও তিনি গবেষণা থামাননি।
১৮২৭ সালের ৫ মার্চ প্যারিসে এই মহান বিজ্ঞানীর মৃত্যু হয়। কিন্তু গণিত ও পদার্থবিজ্ঞানের পরতে পরতে আজও ল্যাপলাসের নাম জড়িয়ে আছে। ল্যাপলাস ইকুয়েশনের মতো গাণিতিক সূত্রগুলো ছাড়া আধুনিক বিজ্ঞান চিন্তাই করা যায় না।
আর ওই যে শুরুতে বলেছিলাম ল্যাপলাসের দৈত্য, তা আজও আমাদের আধুনিক স্নায়ুবিজ্ঞান ও দর্শনের আলোচনায় বারবার ফিরে আসে। আমাদের মনে করিয়ে দেয়, এই মহাবিশ্বের বিশালতা ও নিয়মের অনেক কিছুই হয়তো আমরা এখনো জানি না!
