গণিত শিখলে কেন অন্য বিষয়েও ভালো করা যায়
তোমাদের অনেকেরই হয়তো ধারণা, গণিত মানেই একগাদা খটমট সংখ্যা এবং মাথা খারাপ করা সব সমীকরণ। ক্লাসে বসে হয়তো প্রায়ই ভাবো, ‘ধুর! এসব বীজগণিত ও জ্যামিতি জীবনে কী কাজে লাগবে?’
কিন্তু আসল ব্যাপারটা জানলে তুমি চমকে যাবে। গণিত মোটেও শুধু হিসাব-নিকাশের বিষয় নয়, এটি তোমার মস্তিষ্কের সুপারপাওয়ার জাগিয়ে তোলার এক গোপন মন্ত্র। হয়তো কথাটা বিশ্বাস করছ না, অতিরঞ্জিত মনে হচ্ছে! কিন্তু বিজ্ঞানের একাধিক গবেষণায় দেখা গেছে, যারা গণিতে ভালো, তারা শুধু অঙ্কই ভালো পারে না বরং সাহিত্য, ইতিহাস, বিজ্ঞান কিংবা দৈনন্দিন জীবনের জটিল সমস্যা সমাধানেও অন্যদের চেয়ে এগিয়ে থাকে। গণিত মস্তিষ্কের এমন কিছু পেশি তৈরি সাহায্যে করে, যার সুফল অন্যান্য বিষয়েও পাওয়া যায়।
চলো জেনে নিই, গণিত চর্চা কীভাবে তোমার মস্তিষ্কের ক্ষমতা বাড়িয়ে দেয়। এর ৫টি বৈজ্ঞানিক কারণ জেনে নিই।
১. গণিত ভালো পাঠক বানায়
শুনতে আজব লাগলেও অঙ্কের সঙ্গে সাহিত্যের সম্পর্ক আছে। গবেষণা বলছে, সম্পর্কটা বেশ গভীর। প্রায় ৩ লাখ ৫৫ হাজার শিক্ষার্থীর ওপর চালানো এক গবেষণায় দেখা গেছে, যাদের গণিতের দক্ষতা ভালো, তাদের পড়ার দক্ষতাও অন্যদের চেয়ে বেশি।
এর কারণ কী? গণিত তোমাকে শেখায়, কীভাবে জটিল তথ্য ভেঙে সহজ করতে হয়। কীভাবে ভাষার প্যাটার্ন বা গঠন বুঝতে হয় এবং কীভাবে যুক্তির ক্রম সাজাতে হয়। লার্নিং ডিজঅ্যাবিলিটিস রিসার্চ অ্যান্ড প্র্যাকটিস প্রবন্ধে প্রকাশিত মাইকেল ওরোস্কোর এক গবেষণায় দেখা গেছে, গণিতের সমস্যা সমাধান করার অভ্যাস মানুষকে কঠিন কঠিন উপন্যাসের সারমর্ম বুঝতে সাহায্য করে। গণিত মস্তিষ্ককে শেখায়, কীভাবে একটা বড় প্যারাগ্রাফ থেকে প্রয়োজনীয় তথ্য ছেঁকে বের করতে হয়।
বিজ্ঞানের একাধিক গবেষণায় দেখা গেছে, যারা গণিতে ভালো, তারা শুধু অঙ্কই ভালো পারে না বরং সাহিত্য, বিজ্ঞান কিংবা দৈনন্দিন জীবনের জটিল সমস্যা সমাধানেও অন্যদের চেয়ে এগিয়ে থাকে।
২. চিন্তা করার শক্তি বাড়ায়
মেটাকগনিশন শব্দটা হয়তো নতুন শুনছ, এর সহজ মানে হলো ‘চিন্তা সম্পর্কে চিন্তা করা’। অর্থাৎ, তোমার নিজের ভাবনার প্রক্রিয়াটাকে নিয়ন্ত্রণ করা। ২০২২ সালে এডুকেশন রিসার্চ ইন্টারন্যাশনাললের এক গবেষণায় বলা হয়েছে, গণিত এই দক্ষতা বাড়ানোর সেরা উপায়।
তুমি যখন কোনো অঙ্ক করো, তখন তোমার মস্তিষ্ক প্রতিনিয়ত নিজেকে প্রশ্ন করে, ‘আমি কি সঠিক পথে আছি?’, ‘কোথায় ভুল হলো?’, ‘অন্য কোনো নিয়মে কি এটা করা যেত?’। এই যে নিজের কাজকে নিজেই যাচাই করার অভ্যাস, এটা একবার তৈরি হয়ে গেলে তুমি যখন ইতিহাস বা বিজ্ঞানের কোনো বড় প্রশ্নের উত্তর লিখবে, তখনও তোমার মস্তিষ্কে স্বয়ংক্রিয়ভাবে এসব কাজ করবে। তুমি নিজেই বুঝবে তোমার যুক্তি ঠিক আছে কি না। আর জানো তো, পৃথিবীর ৯৩ শতাংশ বড় বড় সিইওরা বলেন, তাঁরা এমন কর্মী চান যারা জটিল সমস্যা নিয়ে ভাবতে পারে।
৩. কল্পনার জগতকে ত্রিমাত্রিক করে
জ্যামিতি করার সময় মনে মনে ত্রিভুজ বা চতুর্ভুজ চিন্তা করতে হয় না? এসব চিন্তা না করলেও অন্তত গ্রাফ পেপারে তো কিছু বসাতে হয়। একে বলে স্পেশাল রিজনিং। সাইকোলজিক্যাল সায়েন্সের এক গবেষণায় দেখা গেছে, মাত্র ৬ মাস বয়সী শিশুদের মধ্যেও এই দক্ষতার বীজ লুকিয়ে থাকে।
এই দক্ষতা শুধু জ্যামিতি ক্লাসেই আটকে থাকে না, যারা ভবিষ্যতে ইঞ্জিনিয়ার হতে চায়, তাদের বিল্ডিংয়ের নকশা বুঝতে এটা লাগে; যারা বায়োলজি পড়ে, তাদের ডিএনএর গঠন বুঝতে এটা লাগে। সোজা কথায়, বিজ্ঞান, প্রযুক্তি বা প্রকৌশলে সফলতার গোপন চাবিকাঠি হলো এই স্পেশাল রিজনিং। আর এই চাবিকাঠি শান দেওয়ার একমাত্র উপায় হলো গণিত চর্চা।
সাইকোলজিক্যাল সায়েন্সের এক গবেষণায় দেখা গেছে, মাত্র ৬ মাস বয়সী শিশুদের মধ্যেও স্পেশাল রিজনিং দক্ষতার বীজ লুকিয়ে থাকে।
৪. ব্রেইনের ‘র্যাম’ বাড়ে
কম্পিউটার বা ফোনের র্যাম যত বেশি হয়, তা তত দ্রুত কাজ করে, তাই না? আমাদের মস্তিষ্কেরও একটা র্যাম আছে, যাকে বিজ্ঞানীরা বলেন ওয়ার্কিং মেমোরি। ফ্রন্টিয়ার্স ইন হিউম্যান নিউরোসায়েন্সের এক গবেষণায় দেখা গেছে, গণিত চর্চা করলে মস্তিষ্কের এই ওয়ার্কিং মেমোরি শক্তিশালী হয়।
যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব কানসাসের এক গবেষণায় দেখা গেছে, যাদের ওয়ার্কিং মেমোরি ভালো, তারা যেকোনো সমস্যার সমাধান দ্রুত করতে পারে। গণিত করার সময় তোমাকে একসঙ্গে অনেকগুলো তথ্য মাথায় রাখতে হয়। এই অভ্যাসটা আমাদের মস্তিষ্কের ধারণক্ষমতা বাড়িয়ে দেয়। ফলে তুমি যখন নতুন কোনো ভাষা শিখবে বা ইতিহাসের সাল-তারিখ মনে রাখবে, দেখবে কাজটা অনেক সহজ হয়ে গেছে।
৫. যুক্তিবাদী হওয়ার চাবিকাঠি
এটাই হলো গণিতের সবচেয়ে বড় দান। প্লাস ওয়ান জার্নালে প্রকাশিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, যারা গণিত চর্চা করে, তাদের যৌক্তিক তর্ক করার ক্ষমতা অনেক বেশি। গণিত তোমাকে শেখায়, কীভাবে একটা বিশাল সমস্যাকে ছোট ছোট টুকরো করে সমাধান করতে হয়।
এই দক্ষতা শুধু পরীক্ষার খাতায় নয়, বাস্তব জীবনেও কাজে লাগে। ধরো, টিভিতে একটা বিজ্ঞাপনে লিমিটেড টাইমের অফার দেখে তুমি কি হুট করে পণ্যটা কিনবে, নাকি হিসাব করে দেখবে এটা আসলে লাভজনক কি না? অথবা কোনো রাজনৈতিক নেতার ভাষণ শুনে তুমি কি অন্ধভাবে বিশ্বাস করবে, নাকি তার কথার পেছনের যুক্তি খুঁজবে? গণিত তোমার মগজে এমন এক বিশ্লেষণের ছাঁচ তৈরি করে দেয়, যা তোমাকে বোকা হওয়া থেকে বাঁচায়।
তাই গণিতের কোনো কঠিন সমীকরণ বা জ্যামিতির উপপাদ্য দেখে ভয় লাগলে মনে রেখো, তুমি শুধু একটা অঙ্ক করছ না; তুমি তোমার মস্তিষ্ককে শান দিচ্ছ, শক্তিশালী করছ। গণিত তোমাকে ক্লাসের পড়াশোনায় ভালো করার পাশাপাশি বুদ্ধিমান মানুষ হিসেবে গড়ে তুলবে!
