সূর্য ধীরে ধীরে মারা যাচ্ছে। এটি প্রসারিত হয়ে এক বিশাল লাল দানবে পরিণত হচ্ছে। খুব শিগগিরই এটি পুরো পৃথিবীকে গিলে খাবে। মানবজাতিকে টিকিয়ে রাখার জন্য বিজ্ঞানীদের সামনে একটাই রাস্তা; সৌরজগৎ থেকে পালিয়ে যেতে হবে! কিন্তু স্পেসশিপে করে কতজনকেই বা বাঁচানো যাবে? তাই বিজ্ঞানীরা এক অবিশ্বাস্য সিদ্ধান্ত নিলেন। আস্ত পৃথিবীটাকেই সরিয়ে নিতে চান সৌরজগতের অন্য কোথাও! পৃথিবীর বুকে বসানো হলো ১০ হাজার বিশাল ফিউশন বা আর্থ ইঞ্জিন। মানবজাতিকে বাঁচাতে শুরু হলো পৃথিবীর এক নতুন যাত্রা। এই যাত্রার গন্তব্য ৪.২ আলোকবর্ষ দূরের আলফা সেন্টাউরি।
সবকিছু ঠিকঠাকই চলছিল। পৃথিবী সৌরজগৎ ছেড়ে বেরিয়ে যাওয়ার পথে বৃহস্পতি গ্রহের কাছাকাছি পৌঁছাল। উদ্দেশ্য, বৃহস্পতির বিশাল মাধ্যাকর্ষণ শক্তিকে কাজে লাগিয়ে মহাকর্ষীয় গতি বাড়িয়ে নেওয়া। কিন্তু যাত্রাপথে হঠাৎ ঘটে গেল এক ভয়াবহ বিপর্যয়। বৃহস্পতির প্রচণ্ড মাধ্যাকর্ষণের টানে পৃথিবীর ইঞ্জিনগুলো বিকল হতে শুরু করল। পৃথিবী ধীরে ধীরে ছিটকে পড়তে লাগল বৃহস্পতির দিকে। দুটি গ্রহের মধ্যে ভয়াবহ সংঘর্ষ হতে মাত্র কয়েক ঘণ্টার অপেক্ষা।
পৃথিবীকে বাঁচানোর আর কোনো সহজ উপায় নেই। চারপাশের বরফজমাট পরিবেশে পদে পদে লুকিয়ে আছে মৃত্যুর ফাঁদ। এমন এক শ্বাসরুদ্ধকর টিকে থাকার গল্প নিয়ে তৈরি হয়েছে ব্লকবাস্টার সায়েন্স ফিকশন মুভি দ্য ওয়ান্ডারিং আর্থ।
এই মুভির সবচেয়ে বড় আকর্ষণ এর পেছনের বিশাল বৈজ্ঞানিক কল্পনা। সায়েন্স ফিকশন মানেই যে শুধু লেজার, বন্দুক ও স্পেসশিপের মারামারি নয়, বরং পদে পদে মেধা ও বিজ্ঞানের সূত্র ব্যবহার করেও মহাজাগতিক বিপর্যয় থেকে বেঁচে ফেরা যায়, তার এক দারুণ উদাহরণ এই মুভি। বিখ্যাত লেখক লিউ সিক্সিনের গল্প অবলম্বনে এটি নির্মিত।
ভয়ংকর ওই বিপর্যয় থেকে পৃথিবীকে বাঁচাতে লিউ কিউ এবং তার উদ্ধারকারী দলকে বিজ্ঞানের দ্বারস্থ হতে হয়। আস্ত একটি গ্রহকে সরিয়ে নেওয়ার জন্য প্রথমে পৃথিবীর আহ্নিক গতি থামিয়ে দেওয়া হয়। ফলে পৃথিবীর ওপরিভাগ ভয়াবহ শীতল হয়ে যায়। তাপমাত্রা নেমে আসে মাইনাস ৮৪ ডিগ্রি সেলসিয়াসে! মানুষকে বাধ্য হয়ে বাঁচতে হয় মাটির নিচের বিশাল সব আন্ডারগ্রাউন্ড সিটিতে। বিকল হয়ে যাওয়া ফিউশন ইঞ্জিনগুলোকে পুনরায় চালু করতে পদার্থবিজ্ঞানের নিখুঁত ব্যবহার এই মুভিতে দেখা যায়।
এ ছাড়া মুভির স্পেস স্টেশন এবং মহাজাগতিক পরিবেশ অত্যন্ত চমৎকারভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। মুভির শেষদিকের ক্লাইম্যাক্স পুরোপুরি রসায়ন ও বিজ্ঞানের ওপর নির্ভরশীল। বৃহস্পতি গ্রহে আছে প্রচুর হাইড্রোজেন গ্যাস। পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে আছে অক্সিজেন। যখন পৃথিবীর সঙ্গে বৃহস্পতির সংঘর্ষ প্রায় নিশ্চিত, তখন নভোচারী লিউ পেইকিয়াং এবং পৃথিবীর বিজ্ঞানীরা পৃথিবীর ইঞ্জিন থেকে ফায়ার করে বৃহস্পতির বায়ুমণ্ডলে আগুন ধরিয়ে বিশাল বিস্ফোরণ ঘটানোর চেষ্টা করেন।
উদ্দেশ্য, সেই বিস্ফোরণের প্রচণ্ড ধাক্কায় পৃথিবীকে দূরে ঠেলে দেওয়া! আস্ত একটি গ্রহকে মহাকাশযানের মতো চালিয়ে নেওয়ার কী কী ভূতাত্ত্বিক ও মহাজাগতিক পরিণতি হতে পারে, তার এক অসাধারণ বৈজ্ঞানিক কল্পনা এই মুভিতে দেখা যায়।
তবে মুভিতে কিছুটা ঘাটতি আছে। মুভির ভিজ্যুয়াল ও সায়েন্স ফিকশনের বিশালত্বের আড়ালে অভিনয়টা মাঝে মাঝে একটু ঢাকা পড়ে গেছে বলে মনে হয়। নভোচারী লিউ পেইকিয়াংয়ের চরিত্রে উ জিং বেশ পরিণত অভিনয় করেছেন। একজন বাবা ও নভোচারীর দায়িত্ববোধ তাঁর চোখেমুখে স্পষ্ট ছিল। অন্যদিকে তাঁর ছেলে লিউ কিউয়ের চরিত্রে চুশিও চু এবং হান দুয়োদুয়োর চরিত্রে ঝাও জিনমাইয়ের অভিনয় বেশ কিছু জায়গায় একটু বেশিই অতি-আবেগি মনে হয়েছে। তবে দাদুর চরিত্রে প্রয়াত অভিনেতা এনজি মান-তাতের স্ক্রিন প্রেজেন্স ছিল দারুণ ইমোশনাল।
একনজরে
দ্য ওয়ান্ডারিং আর্থ
পরিচালক: ফ্যান্ট গ্যুও
লেখক: লিউ সিক্সিন
ধরন: সায়েন্স ফিকশন, অ্যাকশন, ডিজেস্টার, অ্যাডভেঞ্চার
মুক্তি: ২০১৯ সাল
ব্যাপ্তি: ২ ঘণ্টা ৫ মিনিট
আইএমডিবি রেটিং: ৬/১০
এটি আন্তর্জাতিক মানের সায়েন্স ফিকশন হলেও এর কিছু সীমাবদ্ধতা চোখে পড়ার মতো। চরিত্রগুলোর পেছনের গল্প বা মানসিক বিকাশে খুব একটা জোর দেওয়া হয়নি। পুরো ফোকাসটাই ছিল পৃথিবীর ধ্বংস ও সেটা বাঁচানোর রুদ্ধশ্বাস অভিযানের দিকে। কিছু কিছু জায়গায় সিজিআই একটু দুর্বল মনে হয়েছে। মুভির কিছু কিছু জায়গায় হাই-গ্রাফিক্সের ভিডিও গেম মনে হতে পারে।
আবার আস্ত পৃথিবীকে সরিয়ে নেওয়ার মতো বিশাল পরিকল্পনায় ফিজিকসের বেশ কিছু সূত্রকে চিত্রনাট্যের সুবিধামতো একটু বদলে দেওয়া হয়েছে। যেমন, বৃহস্পতির এত কাছে যাওয়ার ফলে পৃথিবীর ওপর মহাকর্ষ বলের অকল্পনীয় চাপ পড়ার কথা। কিন্তু মুভিতে বিষয়টি সেভাবে পাত্তা দেওয়া হয়নি।
এই বিষয়গুলো বাদ দিলে মুভিটি বেশ উপভোগ্য। আপনি যদি ক্রিস্টোফার নোলানের ইন্টারস্টেলার মুভির মতো ধীরস্থির এবং গভীর দর্শনের মুভি খোঁজেন, তবে এটি হয়তো আপনার জন্য নয়। কিন্তু আপনি যদি ২০১২ বা দ্য ডে আফটার টুমরো মুভির মতো গ্র্যান্ড স্কেলের ডিজেস্টার মুভি দেখতে ভালোবাসেন, তবে দ্য ওয়ান্ডারিং আর্থ আপনাকে হতাশ করবে না। যাঁরা মহাজাগতিক স্কেলের বিশালত্ব, শ্বাসরুদ্ধকর অ্যাকশন এবং একটি ভিজ্যুয়াল স্পেকট্যাকল দেখতে পছন্দ করেন, তাঁদের জন্য এটি দারুণ একটি মুভি হতে পারে।