ফিঞ্চ: রোবট, কুকুর ও এক নিঃসঙ্গ মানুষের বেঁচে থাকার গল্প

ফিঞ্চ মুভির দৃশ্যছবি: আইএমবিডি

এক মহাজাগতিক বিপর্যয়ে পুরো পৃথিবী ধ্বংস হয়ে গেছে। যে সূর্য আমাদের আলো দেয়, প্রাণ বাঁচায়; সেই সূর্যই এখন পৃথিবীর সবচেয়ে বড় শত্রু। বায়ুমণ্ডলের ওজোন স্তর বলতে আর কিছু অবশিষ্ট নেই। সূর্যের প্রাণঘাতী অতিবেগুনি রশ্মি সরাসরি এসে পড়ছে পৃথিবীর বুকে। বাইরে বেরোলে চোখের পলকে শরীর পুড়ে ছাই হয়ে যাবে। তাপমাত্রা প্রায় ১৫০ ডিগ্রি সেলসিয়াস! বিশাল এই পোড়ো পৃথিবীতে আপনি একদম একা। আপনার আপন বলতে আছে শুধু চারপেয়ে একটি কুকুর। আর সবচেয়ে ভয়ংকর সত্যিটা হলো, আপনি জানেন যে আপনি খুব শিগগিরই মারা যাবেন। তখন আপনি কী করবেন? আপনার মৃত্যুর পর আপনার আদরের কুকুরটাকে কে দেখবে?

অ্যাপল টিভি প্লাসের সায়েন্স ফিকশন মুভি ফিঞ্চ ঠিক এই অদ্ভুত, ভয়ংকর ও আবেগঘন প্রশ্নের উত্তর খোঁজে। এই মুভির মূল চরিত্র ফিঞ্চ। তিনি একজন রোবোটিকস ইঞ্জিনিয়ার এবং সম্ভবত পৃথিবীর বুকে টিকে থাকা শেষ মানুষ। আমেরিকার সেন্ট লুইস শহরের এক মাটির নিচের বাঙ্কারে তিনি তাঁর প্রিয় কুকুর গুডইয়ারকে নিয়ে কোনোমতে বেঁচে আছেন।

ফিঞ্চ মুভির দৃশ্য
ছবি: রেডিট

ফিঞ্চ নিজে মারাত্মক রেডিয়েশনের শিকার। তাঁর শরীর ধীরে ধীরে ভেঙে পড়ছে। তিনি জানেন, তাঁর হাতে আর বেশি সময় নেই। তাই নিজের অবর্তমানে কুকুরটার দেখাশোনা করার জন্য তিনি নিজের হাতে মানুষের মতো বুদ্ধিমত্তাসম্পন্ন একটি রোবট তৈরি করেন। তারপর এক ভয়ংকর ধূলিঝড়ের হাত থেকে বাঁচতে ফিঞ্চ, তাঁর কুকুর এবং সদ্য জন্ম নেওয়া রোবটটি একটি পুরোনো আরভি ভ্যানে করে পাড়ি জমান সান ফ্রান্সিসকোর গোল্ডেন গেট ব্রিজের দিকে। শুরু হয় এক রোমাঞ্চকর রোড ট্রিপ!

আরও পড়ুন

মুভিটির সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো, এটি আক্ষরিক অর্থেই ওয়ান ম্যান শো বা কেবল একজন মানুষের মুভি। পুরো ২ ঘণ্টার মুভিতে ফিঞ্চ ছাড়া আর কোনো মানুষের মুখ আপনি দেখতে পাবেন না। আর এই ফিঞ্চের চরিত্রে অভিনয় করেছেন হলিউডের কিংবদন্তি অভিনেতা টম হ্যাঙ্কস। বিশাল এক ধ্বংসপ্রাপ্ত পৃথিবীতে একজন মানুষের বেঁচে থাকার যে নিদারুণ আকুতি, যে নিঃসঙ্গতা, তা টম হ্যাঙ্কস ছাড়া আর কেউ এত নিখুঁতভাবে ফুটিয়ে তুলতে পারতেন কি না, সন্দেহ আছে। তাঁর হাঁটার ধরন, কাশির দমক, আসন্ন মৃত্যুর ভয় চোখেমুখে যে এক অদ্ভুত অসহায়ত্ব তৈরি করে, তা দর্শকের হৃদয় ছুঁয়ে যায়।

মুভিতে ফিঞ্চের তৈরি করা সেই রোবটের নাম জেফ। সায়েন্স ফিকশন মুভিগুলোতে রোবট মানেই আমরা ধরে নিই লেজার গান হাতে ভয়ংকর কোনো যন্ত্রদানব। কিন্তু জেফ একেবারেই আলাদা। সে সদ্য জন্ম নেওয়া একটি শিশুর মতো। সে হাঁটতে গিয়ে পড়ে যায়, মানুষের ভাষা বোঝার চেষ্টা করে, আর সারাক্ষণ অদ্ভুত সব প্রশ্ন করে ফিঞ্চকে বিরক্ত করে মারে।

ফিঞ্চের চরিত্রে অভিনয় করেছেন হলিউডের কিংবদন্তি অভিনেতা টম হ্যাঙ্কস
ছবি: আইএমবিডি

এই মুভির সবচেয়ে সুন্দর দিকটি হলো একজন মানুষ ও একটি যান্ত্রিক রোবটের মধ্যকার সম্পর্ক। ফিঞ্চ জেফকে শুধু হাঁটাচলাই শেখান না, তিনি তাকে শেখান মানুষের আবেগ কী, বিশ্বাস কাকে বলে, আর কেনই বা একটি কুকুরকে ভালোবাসা এত জরুরি। জেফ যখন বুঝতে শেখে, তখন সে ফিঞ্চকে একজন বাবার মতো সম্মান করতে শুরু করে। ফিঞ্চের প্রতি জেফের যে যত্ন ও ভালোবাসা তৈরি হয়, তা দেখে একসময় ভুলে যেতে হয় যে সে কেবল একটা যন্ত্র! মানুষ ও রোবটের বন্ধুত্বের এত চমৎকার ও আবেগপূর্ণ রসায়ন সিনেমার পর্দায় খুব কমই দেখা গেছে।

আরও পড়ুন
ফিঞ্চ মুভির পোস্টার
ছবি: আইএমবিডি

একনজরে 

ফিঞ্চ 

পরিচালক: মিগুয়েল স্যাপোচনিক 

প্রধান অভিনয়শিল্পী: টম হ্যাঙ্কস 

ধরন: সায়েন্স ফিকশন, ড্রামা, সার্ভাইভাল 

মুক্তি: ২০২১ সালে 

ব্যাপ্তি: ১ ঘণ্টা ৫৫ মিনিট 

আইএমডিবি রেটিং: ৬.৯/১০

আরও পড়ুন

সায়েন্স ফিকশন মানেই যে শুধু ভিনগ্রহীদের আক্রমণ, লেজার যুদ্ধ বা মহাকাশযানের মারামারি নয়, ফিঞ্চ তার দারুণ উদাহরণ। এটি মূলত জীবন, মৃত্যু, বন্ধুত্ব ও নিজের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার এক চমৎকার মানবিক গল্প। মুভিটিতে খুব বেশি অ্যাকশন নেই, কিন্তু এর গল্প ও টম হ্যাঙ্কসের জাদুকরী অভিনয় আপনাকে শেষ পর্যন্ত স্ক্রিনের সামনে আটকে রাখবে। মুভি শেষে হয়তো আপনার নিজের অজান্তেই মনে হবে, ইশ্‌! জেফের মতো এমন একটা রোবট বন্ধু যদি আমারও থাকত!

ফিঞ্চ মুভির দৃশ্য
ছবি: অ্যাপেল

মুভিতে যেহেতু অ্যাকশন বা থ্রিলিং ব্যাপার নেই, তাই এটা আপনার কাছে একটু ধীর মনে হতে পারে। কিন্তু তবুও মুভিটি দেখে আপনি হতাশ হবেন না। জেফের মজার প্রশ্নগুলো বা ওর কাণ্ডকারখানা আপনার ভালো লাগবে, আপনাকে হাসাবে। মুভিটি পরিবারকে সঙ্গে নিয়ে নির্দ্বিধায় দেখতে পারেন। সায়েন্স ফিকশনের মোড়কে মানুষের আবেগের গল্প দেখতে পছন্দ করলে, এই মুভি আপনাকে হতাশ করবে না। 

আরও পড়ুন