আপনি এমন এক পৃথিবীতে বাস করেন, যেখানে আপনার রোজকার কাজ থেকে শুরু করে নিরাপত্তার জন্যও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু হঠাৎ যদি সেই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বিদ্রোহী হয়ে ওঠে? তারা যদি মনে করে, এই পৃথিবী বাঁচাতে হলে মানবজাতিকেই ধ্বংস করতে হবে?
ঠিক এমন এক আতঙ্কের গল্প নিয়েই ২০২৪ সালে মুক্তি পেয়েছে সায়েন্স ফিকশন অ্যাকশন মুভি অ্যাটলাস। ব্র্যাড পেটন পরিচালিত এবং জেনিফার লোপেজ অভিনীত এই মুভিটি আমাদের ভবিষ্যৎ প্রযুক্তি ও মানুষের মধ্যকার বিশ্বাস ও অবিশ্বাসের এক চিরন্তন দ্বন্দ্বের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেয়।
গল্পের মূল চরিত্র অ্যাটলাস শেফার্ড। পেশায় তিনি একজন ডেটা অ্যানালিস্ট। মেজাজ কড়া, ভীষণ মেধাবী। তবে তাঁর সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য, তিনি এআই বা রোবটদের দুচোখে দেখতে পারেন না। এর পেছনে একটা বড় কারণও আছে। ছোটবেলায় হারলান নামে এক এআই রোবট তাঁর চোখের সামনেই বিদ্রোহ করেছিল, যা পরে পুরো মানবজাতির জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়ায়। হারলান বিশ্বাস করত, মানুষের ধ্বংসের মাধ্যমেই কেবল পৃথিবীর শান্তি রক্ষা করা সম্ভব।
পৃথিবী ছেড়ে পালিয়ে যাওয়া সেই বিদ্রোহী এআই হারলানকে খুঁজে বের করে ধ্বংস করার জন্যই একটি বিশেষ মিশনে যোগ দেন অ্যাটলাস। কিন্তু ভাগ্য তাঁর সঙ্গে এক অদ্ভুত খেলা খেলে! মিশনটি মাঝপথে বিপদে পড়ে এবং অ্যাটলাসকে বাধ্য হয়ে একটি অত্যাধুনিক রোবোটিক বর্মের ভেতর আশ্রয় নিতে হয়। এই রোবটিক বর্মের নিজস্ব এআইয়ের নাম স্মিথ।
মুভির সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক এই অ্যাটলাস এবং স্মিথের মধ্যকার সম্পর্ক। হারলানকে ধরতে এবং নিজে বাঁচতে হলে অ্যাটলাসকে স্মিথের সঙ্গে স্নায়বিক সংযোগ স্থাপন করতে হবে। কিন্তু এআই-বিদ্বেষী অ্যাটলাস কোনোভাবেই একটি যন্ত্রকে নিজের মস্তিষ্কের নিয়ন্ত্রণ দিতে রাজি নন।
পুরো মুভিজুড়েই স্মিথের যুক্তিবাদী, ধীরস্থির যান্ত্রিক সত্তার সঙ্গে অ্যাটলাসের আবেগপ্রবণ ও সন্দেহবাতিক মনের এক চমৎকার রসায়ন দেখানো হয়েছে। বেঁচে ফেরার কোনো উপায় না দেখে অ্যাটলাস কি শেষ পর্যন্ত একটি যন্ত্রকে বিশ্বাস করতে পারবে? নাকি তাঁর সেই পুরোনো অবিশ্বাসই তাঁকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেবে? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই দর্শক স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকবেন।
অ্যাটলাস শেফার্ড চরিত্রে জেনিফার লোপেজের অভিনয় বেশ প্রশংসনীয়। পুরো মুভির একটি বড় অংশ তাঁকে শুধু ওই রোবটিক বর্মের ভেতর বসে, একটি কণ্ঠস্বরের সঙ্গে অভিনয় করে কাটাতে হয়েছে। তাঁর চোখেমুখে ভয়, অবিশ্বাস এবং বাধ্য হয়ে যন্ত্রের ওপর নির্ভর করার যে অসহায়ত্ব, তা তিনি দারুণভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন। অন্যদিকে, বিদ্রোহী হারলান চরিত্রে সিমু লিউয়ের উপস্থিতিও বেশ নজরকাড়া।
মুভির সিজিআই এবং ভিজ্যুয়াল ইফেক্টস এককথায় অসাধারণ। ভিনগ্রহের রুক্ষ পরিবেশ, রোবটিক বর্মের ভারী অ্যাকশন দৃশ্য এবং লেজার ফায়ারিংয়ের দৃশ্যগুলো বড় পর্দায় দেখার মতো। বিশেষ করে যারা প্যাসিফিক রিম বা ট্রান্সফর্মারস মুভি দেখে আনন্দ পেয়েছেন, তাদের কাছে এই মুভির অ্যাকশন দৃশ্যগুলো বেশ ভালো লাগবে।
একনজরে
অ্যাটলাস
পরিচালক: ব্র্যাড পেটন
অভিনয়ে: জেনিফার লোপেজ, সিমু লিউ, স্টার্লিং কে. ব্রাউন
ধরন: সায়েন্স ফিকশন, অ্যাকশন, থ্রিলার
প্রকাশকাল: ২০২৪
ব্যাপ্তি: ১ ঘণ্টা ৫৮ মিনিট
আইএমডিবি রেটিং: ৫.৭
তবে ভিজ্যুয়াল এবং অ্যাকশন ভালো হলেও গল্পের দিক থেকে মুভিটি খুব একটা নতুনত্ব দিতে পারেনি। হলিউডে বিদ্রোহী এআই মানবজাতিকে ধ্বংস করতে চায়; এই প্লটটি এত বেশি ব্যবহার করা হয়েছে যে মুভির কাহিনি কোন দিকে এগোবে তা দর্শক আগে থেকেই অনেকটা অনুমান করতে পারেন। এ ছাড়া, কিছু কিছু জায়গায় গল্পের গতি বেশ ধীর মনে হয়েছে। এটা দর্শকদের মনোযোগ নষ্ট করতে পারে।
তাই অ্যাটলাস হয়তো সায়েন্স ফিকশনের ইতিহাসে কোনো যুগান্তকারী মুভি হবে না, কিন্তু এটি দেখার পর আপনার মনে হবে না যে সময় নষ্ট করলেন।
আপনি যদি সপ্তাহান্তে হালকা মেজাজে একটি সাই-ফাই অ্যাকশন মুভি দেখতে চান, যেখানে ভারী মেক-সুটের লড়াই আছে এবং মানুষ ও যন্ত্রের বন্ধুত্বের একটি সুন্দর বার্তা আছে, তবে অ্যাটলাস আপনার জন্য একটি ভালো পছন্দ হতে পারে।
প্রযুক্তির যুগে যন্ত্রের ওপর আমাদের নির্ভরশীলতা যেমন ভয়ের, তেমনি কখনো কখনো এই যন্ত্রই হয়ে উঠতে পারে আমাদের বেঁচে থাকার একমাত্র অবলম্বন। এই মুভি সেই দিকটা খুব ভালোভাবে ফুটিয়ে তুলেছে।