প্রজেক্ট হেইল মেরি: এক মহাজাগতিক দানবের আগমন

প্রজেক্ট হেইল মেরি মুভির দৃশ্যছবি: ডেডলাইন

বিজ্ঞানীরা হঠাৎ করেই টের পেলেন, মহাকাশে একধরনের অদ্ভুত রেখা তৈরি হয়েছে। রেখাটি সূর্য থেকে শুরু হয়ে ধীরে ধীরে শুক্র গ্রহের দিকে এগোচ্ছে। রহস্যময় এই জিনিসটা আসলে কী, তা দ্রুত জানা দরকার। সে জন্য স্পেস প্রোব পাঠিয়ে নমুনা সংগ্রহ করা হলো। দেখা গেল জিনিসটা একধরনের অণুজীব, যা ধীরে ধীরে খোদ সূর্যকেই খেয়ে ফেলছে! অণুজীবটির নাম দেওয়া হলো অ্যাস্ট্রোফেজ।

হিসাব-নিকাশ করে বিজ্ঞানীরা দেখলেন, মোটামুটি ত্রিশ বছরের মধ্যে এই অণুজীব সূর্যের উজ্জ্বলতা প্রায় ১০ শতাংশ কমিয়ে দেবে। অর্থাৎ, পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা কমে যাবে প্রায় ১০ থেকে ১৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মতো! তবে এই হ্রাস পাওয়ার হার সরলরৈখিক নয়, বরং গুণোত্তর। অর্থাৎ প্রথম কয়েক বছরে অল্প কমলেও দিন দিন তাপমাত্রা কমার হার বেড়ে যাবে জ্যামিতিক হারে। পৃথিবীর সামনে এখন আক্ষরিক অর্থেই এক মহাবিপদ।

প্রজেক্ট হেইল মেরি মুভির দৃশ্য
ছবি: সনি পিকচার

পৃথিবী ধ্বংস হয়ে যাওয়ার মতো এমন কাহিনি আপনি নিশ্চয়ই অনেক মুভিতে দেখেছেন বা বইয়ে পড়েছেন। সাধারণত এসব ক্ষেত্রে একজন প্রচণ্ড বুদ্ধিমান, দারুণ সাহসী বিজ্ঞানী-কাম-অ্যাডভেঞ্চারার চট করে পাগলাটে কোনো সমাধান বের করে ফেলেন। পুরো পৃথিবী প্রথম দিকে সেই বিজ্ঞানীর বিরোধিতা করলেও পরে সবাই মিলে তাঁকে সহায়তা করতে শুরু করে।

কিন্তু বাস্তবে তো আর সে রকম হওয়ার কথা নয়! বাস্তবে পৃথিবীর সব দেশের বিজ্ঞানীরা এমন সংকটে একসঙ্গে কাজ করেন। তাঁরা বৈজ্ঞানিক সমাধান নিয়ে মাথা ঘামান, নানা হাইপোথিসিস প্রস্তাব করেন। তারপর সেগুলো পরীক্ষা করে দেখে তারপর সবচেয়ে যৌক্তিক সমাধানটি নিয়ে এগোনোর চেষ্টা করেন।

আরও পড়ুন

সমস্যা হলো, এই কাহিনিতে পৃথিবীর বেশির ভাগ বিজ্ঞানী (বাস্তবেও তা-ই) বিশ্বাস করেন, প্রাণের অস্তিত্বের জন্য পানি অত্যাবশ্যক। রেইল্যান্ড গ্রেস তাঁর পিএইচডি থিসিসে পানিবিহীন একটি প্রাণের সম্ভাবনার কথা বলেছিলেন। কিন্তু বেশির ভাগ বিজ্ঞানীই তাঁর কথা হেসেই উড়িয়ে দিয়েছেন। ফলে গ্রেস এখন একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে বিজ্ঞান পড়ান। নাসা তাঁরই দ্বারস্থ হলো, কারণ সব দেখে-শুনে মনে হচ্ছিল, অ্যাস্ট্রোফেজ কোনো পানিনির্ভর অণুজীব নয়।

প্রাথমিক বিদ্যালয়ের একজন শিক্ষক সুপারহিরোর মতো এসে সব সমস্যার সমাধান করে দেবেন ভাবছেন? একদমই তা হয়নি। উল্টো ড. গ্রেস অণুজীবটির ওপর পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালিয়ে দেখলেন, এই প্রাণটাও পানিনির্ভর। অর্থাৎ এর ভেতরে অক্সিজেন আছে। নিজের জীবনের ধ্যানধারণার সবটা যখন ব্যর্থ প্রমাণিত হয়, তখন কী হয়? মানুষ হেরে যায়। প্রজেক্ট হেইল মেরির কাহিনি এ রকমই একজন হেরে যাওয়া, ‘জ্বলে পুড়ে ছারখার, তবু মাথা নোয়াবার নয়’ ধাঁচের মানুষের ঘুরে দাঁড়ানোর কাহিনি। অ্যান্ডি উইয়ারের এই গল্পটা এতই অনন্য ও এর সমাধানের প্রচেষ্টা এতই অদ্ভুত যে পাঠকের চোখ কপালে উঠতে বাধ্য।

রেইল্যান্ড গ্রেস চরিত্রে অভিনয় করেছেন রায়ান গসলিং
ছবি: ওএসভি নিউজ ফটো/জনাথন ওলি/অ্যামাজন

কাজিনিতে ফিরি। বিজ্ঞানীরা দেখলেন, এই সমস্যার সমাধান পৃথিবীতে বসে করা যাবে না। নভোচারীদের মহাকাশে পাঠাতে হবে। প্রায় সাড়ে ১১ আলোকবর্ষ দূরে এক নক্ষত্রের সন্ধান পাওয়া গেছে। কোনো এক বিচিত্র কারণে অ্যাস্ট্রোফেজ সেটির কোনো ক্ষতি করতে পারছে না, অথচ আশপাশের আর সব নক্ষত্রকে ঠিকই খেয়ে ফেলছে। তার মানে, ওই দূর নক্ষত্রটিতেই মিলতে পারে বাঁচার উপায়।

এ জন্য পুরো পৃথিবী থেকে তিনজন নভোচারীকে নির্বাচন করা হলো। (স্পষ্ট করে বলি, ড. গ্রেস নয়; একজন স্কুলশিক্ষককে মহাকাশে পাঠানোর কোনো যৌক্তিকতা নেই)। গন্তব্য বহু দূর, প্রায় সাড়ে ১১ আলোকবর্ষ। আলোর ৯০ শতাংশ বেগে ছুটলেও প্রচুর জ্বালানি লাগবে। কিন্তু সমাধান হয়ে এল স্বয়ং সেই অ্যাস্ট্রোফেজ! দেখা গেল, ভেতরে অক্সিজেন থাকায় একেই মহাকাশযানের জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করা সম্ভব। তবে জিনিসটা পুনরুৎপাদনের ব্যবস্থা করতে গিয়েই চলে গেল অনেক সময়। ফিরতি জ্বালানি উৎপাদনের মতো সময় আর পৃথিবীর হাতে নেই।

আরও পড়ুন
প্রজেক্ট হেইল মেরি মুভির পোস্টার
ছবি: আইএমবিডি

একনজরে

প্রজেক্ট হেইল মেরি

পরিচালক: ফিল লর্ড এবং ক্রিস্টোফার মিলার

ধরন: সায়েন্স ফিকশন, অ্যাডভেঞ্চার, ড্রামা

প্রকাশকাল: ২০২৬

ব্যাপ্তি: ২ ঘণ্টা ৩৬ মিনিট

আইএমডিবি রেটিং: ৮.৪

আরও পড়ুন

তা ছাড়া আপেক্ষিকতার নীতি মেনে নভোচারীদের বয়স মাত্র সাড়ে ৪ থেকে ৫ বছর বাড়লেও, পৃথিবীতে তত দিনে পেরিয়ে যাবে ১৩ থেকে ১৫ বছর। নভোচারীরা তাই বাধ্য হয়ে মেনে নিলেন, এই যাত্রা হবে একমুখী। পৃথিবীর জন্য তাঁরা প্রাণ দেবেন মহাকাশে, ফেরার কোনো উপায় নেই।

ঠিক এই সময়েই ঘটে যায় এক দুর্ঘটনা। পরিস্থিতি এমন দাঁড়ায় যে ড. গ্রেসকে মহাকাশে পাঠানো ছাড়া আর কোনো উপায় থাকে না। কিন্তু ড. গ্রেস তো গল্পের চিরাচরিত সাহসী নায়ক নন! পৃথিবীর জন্য প্রাণ দেওয়ার কোনো ইচ্ছেই তাঁর ছিল না। তিনি পালিয়ে যাচ্ছিলেন, কিন্তু তাঁকে ধরে, অজ্ঞান করে জোর করে তুলে দেওয়া হলো মহাকাশযান হেইল মেরিতে।

পরিস্থিতি এমন দাঁড়ায় যে ড. গ্রেসকে মহাকাশে পাঠানো ছাড়া আর কোনো উপায় থাকে না
ছবি: অ্যামাজন এমজিএম স্টুডিও

হেইল মেরি কথাটির মানে—সব শেষ হয়ে গেছে জেনেও মরিয়া হয়ে শেষ চেষ্টা করা। এই মিশনটি ঠিক তা-ই। কিন্তু জীবন কি আর এতই সহজ? সাড়ে ১১ বছর পর ড. গ্রেস যখন মহাকাশযানের ভেতরে জ্ঞান ফিরে পেলেন, তত দিনে তিনি তাঁর স্মৃতি হারিয়েছেন! তাঁর সহকর্মী নভোচারীরা মারা গেছেন এবং এই বিশাল মহাকাশযানের ভেতরে কীভাবে কী করতে হয়, তার কোনো প্রশিক্ষণই তাঁর নেই! পৃথিবী থেকে সাহায্য চাইবেন? সিগন্যাল পৃথিবীতে যেতেই লাগবে সাড়ে ১১ বছর, আসতে আরও সাড়ে ১১—মানে উত্তর পেতে পেরিয়ে যাবে পুরো ২২ বছর!

ঠিক এই পর্যায়ে, মহাকাশের অনন্ত গভীরে গল্পে চলে আসে এক অদ্ভুত চরিত্র। শুরু হয় বিজ্ঞান ও মানুষের সমস্যা সমাধানের এক অদ্ভুত, মরিয়া প্রচেষ্টা। এরপর যা-ই বলব, স্পয়লার হয়ে যাবে।

আরও পড়ুন

অ্যান্ডি উইয়ারের বিখ্যাত বই দ্য মার্শিয়ান অবলম্বনে ইতিমধ্যেই দারুণ সফল একটি মুভি হয়েছে। কিন্তু প্রজেক্ট হেইল মেরি মুভিটি বই থেকে অনেকটাই আলাদা।

মুভির শুরুটা হয় একটু ফাস্ট পেসে, বেশ কিছু জাম্পকাটের মাধ্যমে পৃথিবীর বিপদের দিকটা দেখানো হয়। তবে দ্রুতই মুভিটি তার তাল খুঁজে নেয়। অসাধারণ সিনেমাটোগ্রাফি, চমৎকার সাউন্ড এবং রায়ান গসলিংয়ের প্রশংসনীয় অভিনয়ে গল্প এগোতে থাকে। মহাকাশ, নক্ষত্রদের ক্লোজআপ লুক এবং আমাদের চেনা জগতের বাইরের জিনিসগুলোকে পর্দায় ফুটিয়ে তোলার জন্য মুভিটিকে অনায়াসেই এ+ দেওয়া যায়। মুভির শেষ দিকে পৃথিবীর মহাবিপদের মাত্রাটা কেমন হতে পারে, তা পর্দায় দারুণভাবে দেখানো হয়েছে, যা বইয়ে কিছুটা উহ্য ছিল। যাঁরা বই পড়েননি, তাঁদের কাছে মুভিটি দুর্দান্ত লাগবে।

অ্যান্ডি উইয়ারের বিখ্যাত বই দ্য মার্শিয়ান বইটি থেকে প্রজেক্ট হেইল মেরি মুভিটি অনেকটাই আলাদা

তবে সমস্যায় পড়বেন বইয়ের পাঠকেরা। উইয়ারের গল্পে সেন্স অব হিউমার, সায়েন্টিফিক প্রবলেম সলভিং মানসিকতা এবং বিজ্ঞানের খুঁটিনাটি বিষয়ের নিখুঁত প্রয়োগ পাঠককে মুগ্ধ করে। মুভিতে রসবোধ থাকলেও বাকি দুটি মূল উপাদানের অনুপস্থিতি বেশ চোখে পড়ার মতো। পরিচালক মূলত মানবিক আবেগ ও ভিজ্যুয়ালের দিকেই বেশি মনোযোগ দিয়েছেন।

বাংলাদেশি দর্শকদের জন্য একটি বড় আক্ষেপ হলো, সারা বিশ্বে মুভিটি আইম্যাক্সে দেখানো হলেও এ দেশে থ্রিডিও নয়, বরং টুডি সিনেমা হিসেবে এসেছে। অর্থাৎ মুভির সবচেয়ে শক্তিশালী দিকটি পুরোপুরি উপভোগ করার উপায় নেই আমাদের। তারপরও বক্স অফিসে মুভিটি বেশ ভালো করছে। বইয়ে থাকা কিছু প্রাপ্তবয়স্ক দৃশ্য কৌশলে এড়িয়ে যাওয়ায় পরিবারের সবাইকে নিয়েই মুভিটি উপভোগ করা যাবে।

আরও পড়ুন

বই পড়তে আগ্রহীদের জন্য একটি মজার তথ্য দিই। এই মুহূর্তে চাঁদের উদ্দেশে ছুটছে নাসার আর্টেমিস ২ নভোযান। মজার ব্যাপার হলো, ২০১৭ সালে ঠিক আর্টেমিস নামেই একটি বই লিখেছিলেন অ্যান্ডি উইয়ার! ২০৮০ সালে চাঁদের বুকে গড়ে ওঠা এক শহরকে কেন্দ্র করে ছিল বইটির কাহিনি। নাম মিলে যাওয়াটা হয়তো কাকতালীয়। তবে আর্টেমিস ৪ মিশনে নভোচারীরা চাঁদে নামবেন এবং চাঁদের বুকে একটি কলোনি গড়ে তোলাই মানুষের এই অভিযানের চূড়ান্ত উদ্দেশ্য।

অ্যান্ডি উইয়ারের লেখা আর্টেমিস বইয়ের প্রচ্ছদ
ছবি: অ্যামাজন

হ্যাঁ, এভাবেই কল্পবিজ্ঞান ও বিজ্ঞান হাত ধরাধরি করে এগোয়। কারণ, বাস্তবে কিছু করার আগে কল্পনায় তার নাড়িনক্ষত্র বুঝে না নিলে আদৌ সেই কাজটা সঠিকভাবে করা সম্ভব কি না, সেটা এক বড় প্রশ্ন। আইনস্টাইন তো বলেই গেছেন—‘জ্ঞানের চেয়ে কল্পনা বেশি গুরুত্বপূর্ণ।’

আরও পড়ুন