স্বপ্নের গোলকধাঁধায় মস্তিষ্কের খেলা

ছবি: স্ক্রিন র‍্যান্ট

টেবিলের ওপর একটা লাটিম ঘুরছে। বনবন করে ঘুরছে তো ঘুরছেই। থামার কোনো নামগন্ধ নেই। আপনি তাকিয়ে আছেন অপলক। হৃৎস্পন্দন বেড়ে যাচ্ছে। যদি লাটিমটা থামে, তবে আপনি বাস্তবে আছেন। আর যদি না থামে? তবে আপনি স্বপ্নে আটকা পড়ে গেছেন চিরকালের জন্য!

ক্রিস্টোফার নোলানের ইনসেপশন মুভির শুরুই হয় এমন এক ধাঁধা দিয়ে। এই ধাঁধা আপনাকে শেষ পর্যন্ত তাড়িয়ে বেড়াবে। এই মুভি আপনাকে এমন এক জগতে নিয়ে যাবে, যেখানে মহাকর্ষ সূত্র কাজ করে না, যেখানে চোখের পলকে আস্ত একটা শহর কাগজের মতো ভাঁজ হয়ে যায়। আর সেই জগতে সবচেয়ে বড় ভয়ের নাম আপনার নিজের অবচেতন মন!

মুভিতে ডম কবের চরিত্রে অভিনয় করেছেন লিওনার্দো ডিক্যাপ্রিও। তিনি একজন চোর, তবে কোনো সাধারণ চোর নন। তিনি ব্যাংকের ভল্ট ভাঙেন না, ভাঙেন মানুষের মন। মানুষ যখন ঘুমে অচেতন থাকে, তখন তিনি তাদের স্বপ্নে ঢুকে চুরি করে নেন গোপন সব ব্যবসায়িক আইডিয়া। একে বলে এক্সট্রাকশন। এই বিদ্যার জন্য সবচেয়ে সেরা। কিন্তু এর জন্যই তিনি আজ ফেরারি, নিজের সন্তানদের কাছে ফিরতে পারেন না।

ইনসেপশন মুভিতে ডম কবের চরিত্রে অভিনয় করেছেন লিওনার্দো ডিক্যাপ্রিও
ছবি: ওয়ার্নার ব্রাদার্স / লুপার

হঠাৎ একটা বড় সুযোগ আসে। জাপানি ব্যবসায়ী সাইতো তাঁকে এক অদ্ভুত প্রস্তাব দেন। এবার চুরি করা নয়, বরং কারও মাথায় একটা নতুন আইডিয়া ঢুকিয়ে দিতে হবে। এর নাম ইনসেপশন। কাজটা প্রায় অসম্ভব। কারণ মানুষের মন ভাইরাসের মতো, বাইরে থেকে চাপিয়ে দেওয়া কোনো আইডিয়া সে সহজে নেয় না।

আরও পড়ুন

কিন্তু কব রাজি হন, কারণ এর বিনিময়ে তিনি ফিরে পাবেন তাঁর বাড়ি, তাঁর সন্তানদের। তৈরি হয় এক তুখোড় টিম। স্বপ্ন, তার ভেতরে স্বপ্ন, তারও ভেতরে স্বপ্ন... তিন স্তরের এক জটিল গোলকধাঁধায় তাঁরা নামেন রবার্ট ফিশার নামে এক ধনকুবেরের মাথায় আইডিয়া প্ল্যান্ট করতে। কিন্তু সেখানে ওঁত পেতে আছে এক ভয়ংকর শত্রু, কবের নিজেরই মৃত স্ত্রী ম্যাল। সে কবের অবচেতন মনের এক ধংসাত্মক প্রতিচ্ছবি, যে প্রতি মুহূর্তে মিশনটা পণ্ড করে দিতে চায়।

শেষ পর্যন্ত কি কব সফল হতে পারবেন? নাকি স্বপ্নের অতল গহ্বরে হারিয়ে যাবেন চিরতরে? সেই লাটিমটা কি শেষমেশ থেমেছিল, নাকি ঘুরছিলই? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে আপনার নিজের মস্তিষ্কই জট পাকিয়ে যাবে!

ইনসেপশন মুভির দৃশ্য
ছবি: মিডিয়াম

এই মুভিটা শুধু এর কনসেপ্টের জন্য সেরা নয়, অভিনেতাদের অনবদ্য পারফরম্যান্স একে অন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে। লিওনার্দো ডিক্যাপ্রিও এখানে এক পোড় খাওয়া দলনেতা। তাঁর চোখেমুখে সবসময় একটা চাপা কষ্ট ও অপরাধবোধ খেলা করে। তিনি যখন অ্যাকশন করেন, তখন তিনি হিরো; কিন্তু যখন মৃত স্ত্রীর স্মৃতির সঙ্গে লড়াই করেন, তখন তিনি এক অসহায় স্বামী। স্বপ্নের ভেতরে নিজের ইমোশনকে আটকে রাখার যে প্রাণান্তকর চেষ্টা, তা ডিক্যাপ্রিও ছাড়া আর কেউ এত নিখুঁতভাবে ফুটিয়ে তুলতে পারতেন কি না সন্দেহ!

মুভিতে কবের ডান হাত হিসেবে আর্থারের চরিত্রে অভিনয় করেছেন জোসেফ গর্ডন-লেভিট। তিনি দলের সবচেয়ে গোছানো এবং লজিক্যাল মানুষ। পুরো মুভিতে তাঁর অভিনয় ছিল দারুণ। বিশেষ করে জিরো-গ্র্যাভিটি অবস্থায় হোটেলের করিডরের মারামারির দৃশ্যটি সিনেমার ইতিহাসের অন্যতম সেরা দৃশ্য। কোনো স্পেশাল ইফেক্ট ছাড়া শুধু রোটেটিং সেটে তিনি যেভাবে ফাইট করেছেন, তা এক কথায় অবিশ্বাস্য।

আরও পড়ুন
ইনসেপশন মুভির পোস্টার
ছবি: আইএমডিবি

একজনরে

মুভির নাম: ইনসেপশন

পরিচালক: ক্রিস্টোফার নোলান

ধরন: সায়েন্স ফিকশন, অ্যাকশন

প্রকাশকাল: ২০১০

ব্যাপ্তি: ২ ঘন্টা ২৮ মিনিট

আইএমডিবি রেটিং: ৮.৮

আরও পড়ুন

তবে ইমসের চরিত্রে অভিনয় করা টম হার্ডির পুরো শো চুরি করে নিয়েছেন বলা যায়! তিনি টিমের ছদ্মবেশধারী। স্বপ্নের মধ্যে তিনি যে কারও রূপ নিতে পারেন। টম হার্ডির ব্রিটিশ উচ্চারণ, হিউমার ও বডি ল্যাঙ্গুয়েজ ছিল দুর্দান্ত। বিশেষ করে আর্থারের সঙ্গে তাঁর খুনসুটিগুলো সিরিয়াস মুভির মধ্যে একটু স্বস্তি দেয়। মুভিতে তাঁর আইকনিক ডায়লগের বাংলা অনেকটা এরকম, ‘ডার্লিং, স্বপ্ন যখন দেখছই, একটু বড় করেই দেখো’!

টিমের আর্কিটেক্ট হিসেবে অ্যারিয়াডনির চরিত্রে অভিনয় করেন এলিয়েন পেজে। তিনি স্বপ্নের নকশা করেন। দর্শকের হয়ে প্রশ্নগুলো মূলত তিনিই করেন। তাঁর মাধ্যমেই আমরা স্বপ্নের নিয়মকানুন জানতে পারি। পেজ খুব সাবলীল ছিলেন। বিশেষ করে কবের জটিল মনস্তত্ত্ব বোঝার ক্ষেত্রে তিনি দারুণ পরিপক্বতা দেখিয়েছেন।

ইনসেপশন মুভিতে রবার্ট ফিশারের চরিত্রে অভিনয় করেছেন কিলিয়ান মারফি
ছবি: স্ক্রিন র‍্যান্ট

রবার্ট ফিশারের চরিত্রে কিলিয়ান মারফির কথা না বললেই নয়। তিনি মূলত ভিক্টিম, যার স্বপ্নে সবাই ঢুকছে। বাবার সঙ্গে তাঁর টানাপোড়েনের অভিনয়টুকু ছিল সিনেমার ইমোশনাল ভিত্তি। তিনি খুব কম কথা বলে বুঝিয়ে দিয়েছেন, একজন একাকী ধনকুবের ছেলের কষ্ট।

সব মিলিয়ে ইনসেপশন এমন এক মুভি, যা একবার দেখলে মন ভরে না। বিজ্ঞান, মনস্তত্ত্ব ও অ্যাকশনের এমন ককটেল সচরাচর মেলে না। আপনি যদি এখনো না দেখে থাকেন, তবে আজই বসে পড়ুন। কিন্তু সাবধান! সিনেমা শেষ হওয়ার পর নিজের হাতে চিমটি কেটে দেখে নেবেন, আপনি জেগে আছেন তো?

আরও পড়ুন