যে ধূমকেতু শিরোনাম হতে পারেনি

ডোন্ট লুক আপ মুভির দৃশ্যছবি: আইএমডিবি

ল্যাবে অঙ্ক কষে এক বিজ্ঞানী হঠাৎ আবিষ্কার করলেন, আর মাত্র ছয় মাস ১৪ দিন পর পৃথিবী ধ্বংস হয়ে যাবে! একটা বিশাল ধুমকেতু ধেয়ে আসছে আমাদের দিকে। বিজ্ঞানী যোগাযোগ করলেন দেশের প্রেসিডেন্টের সঙ্গে। ভাবলেন, প্রেসিডেন্ট নিশ্চয়ই সবকিছু ফেলে পৃথিবী বাঁচাতে ঝাঁপিয়ে পড়বেন। কিন্তু তিনি উল্টো বিজ্ঞানীকে বসিয়ে রেখে বললেন, ‘আচ্ছা, দেখা যাক! আগে নির্বাচনটা পার করি, তারপর ওসব ধুমকেতু-টেতু দেখা যাবে।’

বিজ্ঞানীর জায়গায় আপনি নিজে থাকলে কী করতেন? রাগে চুল ছিড়তে ইচ্ছে করবে না? ঠিক এই অদ্ভুত আর পিলে চমকানো ঘটনা নিয়েই তৈরি হয়েছে অ্যাডাম ম্যাককের মুভি ডোন্ট লুক আপ। নেটফ্লিক্সের এই মুভিটি হাসাতে হাসাতে আপনাকে এমন এক ভয়ের সামনে দাঁড় করাবে যে মুভি শেষ হওয়ার পর নিজেই আকাশের দিকে তাকাতে বাধ্য হবেন।

গবেষক কেট ডিবিয়াস্কি চরিত্রে অভিনয় করেছেন জেনিফার লরেন্স এবং প্রফেসর র‍্যান্ডাল মিন্ডি চরিত্রে অভিনয় করেছেন লিওনার্দো ডিক্যাপ্রিও
ছবি: গিক টাইরান্ট

মুভির গল্পের শুরু যুক্তরাষ্ট্রের মিশিগান স্টেট ইউনিভার্সিটির অ্যাস্ট্রোনমি বিভাগের এক ল্যাবে। পিএইচডি গবেষক কেট ডিবিয়াস্কি (জেনিফার লরেন্স) হঠাৎ একটি নতুন ধুমকেতু আবিষ্কার করেন। প্রথমে আনন্দের বন্যা বয়ে যায়। কিন্তু তাঁর প্রফেসর র‍্যান্ডাল মিন্ডি (লিওনার্দো ডিক্যাপ্রিও) যখন এর কক্ষপথ ও গতিবেগ হিসাব করেন, তখন তাঁদের মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ে

আরও পড়ুন

হিসাব বলছে, প্রায় ৯ কিলোমিটার চওড়া এই ধুমকেতু সরাসরি পৃথিবীর বুকেই আছড়ে পড়বে। আর এতে ডাইনোসরদের মতো মানুষও বিলুপ্ত হয়ে যাবে। হাতে সময় আছে মাত্র ছয় মাস ১৪ দিন।

তাঁরা ছোটেন হোয়াইট হাউসে। কিন্তু প্রেসিডেন্ট জেনি অরলিয়ান ও তাঁর ছেলে চিফ অফ স্টাফ জেসন বিষয়টাকে পাত্তাই দেন না। তাঁদের কাছে আসন্ন নির্বাচনের চেয়ে পৃথিবী ধ্বংসের খবরটা কম গুরুত্বপূর্ণ! হতাশ হয়ে মিন্ডি ও কেট যান একটি জনপ্রিয় টিভি টকশোতে। সেখানেও উপস্থাপকেরা বিষয়টাকে হালকা জোকস বানিয়ে উড়িয়ে দেন। ধীরে ধীরে এগিয়ে আসে সেই ধ্বংসাত্মক দিন।

এই মুভিটা সায়েন্স ফিকশন হলেও এটা মূলত ডার্ক কমেডি বা স্যাটায়ার। পরিচালক খুব চতুরভাবে দেখিয়েছেন, আমরা কতটা বোকা হতে পারি। ধুমকেতুটি আসলে এখানে জলবায়ু পরিবর্তন বা বড় কোনো বিপদের প্রতীক।

ডোন্ট লুক আপ মুভির দৃশ্য
ছবি: ইউনিভার্স টুডে

বিজ্ঞানীরা চিৎকার করে বলছেন বিপদ আসছে, কিন্তু রাজনীতিবিদেরা দেখছেন তাঁদের ভোট, মিডিয়া দেখছে টিআরপি, আর সাধারণ মানুষ ব্যস্ত পপ তারকাদের ব্রেকআপ স্টোরি নিয়ে। মুভির একপর্যায়ে সমাজ দুভাগে ভাগ হয়ে যায়। একদল বলে জাস্ট লুক আপ। মানে আকাশের দিকে তাকালেই তো ধুমকেতু দেখা যাচ্ছে। কিন্তু রাজনীতিবিদেরা স্লোগান দেন ‘ডোন্ট লুক আপ’। অর্থাৎ, ওপরে তাকালে ভয় পাবে, তাকিও না। 

মুভিতে প্রফেসরের ভূমিকায় অভিনয় করেছেন টাইটানিক খ্যাত লিওনার্দো ডিক্যাপ্রিও। তিনি এখানে নার্ভাস, তোতলামি করা, ওষুধ খেয়ে টেনশন কমানো এক সাধারণ বিজ্ঞানী। তিনি যখন চিৎকার করে টিভি ক্যামেরার সামনে বলেন, ‘উই আর অল গোয়িং টু ডাই’, তখন গায়ের লোম দাঁড়িয়ে যায়।

আরও পড়ুন

একজনরে

মুভির নাম: ডোন্ট লুক আপ

পরিচালক: অ্যাডাম ম্যাককে

ধরণ: সায়েন্স ফিকশন ও ব্ল্যাক কমেডি 

প্রকাশকাল: ২০২১

ব্যাপ্তি: ২ ঘন্টা ১৮ মিনিট

আইএমডিবি রেটিং: ৭.১

আরও পড়ুন

জেনিফার লরেন্স অভিনয় করেছেন জেদি ও স্পষ্টবক্তা ছাত্রীর চরিত্রে। তাঁর অভিনয়ও অনবদ্য। কেউ তাঁকে বিশ্বাস করছে না দেখে তাঁর যে ফ্রাস্ট্রেশন, তা তিনি দারুণভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন। স্বার্থপর, চতুর ও ক্ষমতালোভী প্রেসিডেন্টের চরিত্রে দুর্দান্ত অভিনয় করেছেন মেরিল স্ট্রিপ।

তবে পরিচিত অভিনেতাদের বাইরে মার্ক রাইল্যান্সও বেশ ভালো অভিনয় করেছেন। তাঁর চরিত্রটাও দারুণ। তিনি এখানে এক টেক বিলিয়নিয়ার। অনেকটা স্টিভ জবস ও ইলন মাস্কের মিশেল। তাঁর চরিত্রটি সবচেয়ে ভয়ংকর। তিনি ধুমকেতু ধ্বংস না করে সেটাকে ভেঙে তার ভেতরের দামি খনিজ সম্পদ আহরণ করতে চান। লোভ যে মানুষকে কতটা অন্ধ করতে পারে, তা মার্ক রাইল্যান্সের ঠান্ডা গলার অভিনয়ে ভালোই ফুটে উঠেছে।

প্রফেসর র‍্যান্ডাল মিন্ডি চরিত্রে অভিনয় করেছেন লিওনার্দো ডিক্যাপ্রিও
ছবি: কারেন্ট অ্যাফেয়ার্স

এই মুভি ভীষণ প্রাসঙ্গিক। এই মুভি দেখলে বুঝবেন, বিজ্ঞান অবজ্ঞা করলে তার ফল কতটা ভয়াবহ হতে পারে। মুভিটা দেখতে দেখতে আপনার হাসি পাবে, আবার পরক্ষণেই মেজাজ খারাপ হবে মানুষের বোকামি দেখে।

মুভির এডিটিং ও চিত্রনাট্য বেশ ভালো। গল্প এগোয় খুব দ্রুত। বোরিং লাগার তেমন কোনো সুযোগ নেই। আর একদম শেষের দৃশ্যটা? ওটার স্পয়লার দেব না, তবে এটুকু বলি, ওটা দেখার পর আপনি অনেকক্ষণ চুপ করে বসে থাকবেন। এই লেখার শিরোনামের মর্মটাও বুঝতে পারবেন।

তবে এতসব ভালোর মধ্যে মুভিটির একমাত্র দুর্বল দিক হলো, গল্পটা মাঝের দিকে একটু ধীর মনে হতে পারে। কিছু জোকস হয়তো সবার ভালো না-ও লাগতে পারে। কিন্তু মেসেজটা এত শক্তিশালী যে এই ছোটখাটো ত্রুটিগুলো চোখেই পড়ে না।

আরও পড়ুন