নিঃসঙ্গ গ্রহের শেষ প্রহরী

একাকীত্ব, অনুশোচনা ও অদ্ভুত এক মায়ার গল্প নিয়ে নির্মিত মুভি দ্য মিডনাইট স্কাইছবি: ম্যাশ মিটার

২০৪৯ সাল। পুরো পৃথিবী মৃত্যুপুরী। কোনো এক অজানা কারণে তেজস্ক্রিয়তা গ্রাস করে নিয়েছে পৃথিবীকে। মানুষ পালাচ্ছে মাটির নিচে বা অন্য কোনো গ্রহে, বাঁচার আশায়। বাতাস, পানি বিষাক্ত। চারদিকে শুধু হাহাকার আর মৃত্যুর নিস্তব্ধতা।

কিন্তু এই ধ্বংসস্তূপের মাঝে, পৃথিবীর একেবারে উত্তর প্রান্তে বরফ ঢাকা এক নির্জন মানমন্দিরে একা বসে আছেন এক বৃদ্ধ। সবাই যখন পালাচ্ছে, তিনি পালালেন না। তাঁর নাম অগাস্টিন লফথাউস। শরীরে বাসা বেঁধেছে মরণব্যাধি ক্যানসার। বাইরে হাড়কাঁপানো শীত আর ধেয়ে আসা তেজস্ক্রিয় বাতাস। মৃত্যুর দিন গুনছেন তিনি। চোখে এক রাশ শূন্যতা।

বৃদ্ধ অগাস্টিন আবিষ্কার করলেন, এই জনমানবহীন মৃত্যুপুরীতে তিনি একা নন। কেউ একজন রয়ে গেছে এখানে। একটি ছোট্ট মেয়ে, নাম আইরিস
ছবি: নেটফ্লিক্স

কিন্তু হঠাৎ সেই শূন্যতায় ছেদ পড়ল। বৃদ্ধ অগাস্টিন আবিষ্কার করলেন, এই জনমানবহীন মৃত্যুপুরীতে তিনি একা নন। কোথাও একটা ভুল হয়েছে। কেউ একজন রয়ে গেছে এখানে। একটি ছোট্ট মেয়ে, নাম আইরিস। কথা বলে না, শুধু বড় বড় চোখ করে তাকিয়ে থাকে।

ঠিক এই জায়গায় জর্জ ক্লুনি পরিচালিত এবং অভিনীত মুভি দ্য মিডনাইট স্কাই আপনাকে আটকে রাখবে। নেটফ্লিক্সের এই মুভিটি সাধারণ কোনো সাই-ফাই বা এলিয়েন আক্রমণের গল্প নয়; এটি একাকীত্ব, অনুশোচনা ও অদ্ভুত এক মায়ার গল্প।

আরও পড়ুন

গল্পটা সমান্তরালভাবে দুই জায়গায় চলতে থাকে। একদিকে পৃথিবীর বুকে বৃদ্ধ অগাস্টিন ও ছোট্ট আইরিস, অন্যদিকে মহাকাশের গভীর শূন্যতায় ভেসে বেড়াচ্ছে মহাকাশযান ইথার। ইথারের ক্রুরা জানে না, পৃথিবীতে কী ভয়াবহ বিপর্যয় নেমে এসেছে। তারা বৃহস্পতির একটি উপগ্রহ ‘কে-২৩’ থেকে ফিরছে পৃথিবীতে। সেখানে তারা প্রাণের সন্ধান পেয়েছে, মানুষের বসবাসের যোগ্য পরিবেশ পেয়েছে। খুশিমনে পৃথিবীতে ফিরছে সেই সুখবরটা দেওয়ার জন্য।

কিন্তু ওরা জানে না, ওরা ফিরছে এক শ্মশানে, এক মৃত্যুপুরীতে। ওদের ফেরার কোনো জায়গা নেই। কেউ নেই ওদের অভিবাদন করার জন্য।

দ্য মিডনাইট স্কাই মুভির দৃশ্য
ছবি: নেটফ্লিক্স

পৃথিবীর যোগাযোগ ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে। অগাস্টিন বুঝতে পারেন, ইথারের ক্রুরা যদি পৃথিবীতে ল্যান্ড করে, তবে তারাও মারা পড়বে। তাদের সতর্ক করতেই হবে। কিন্তু মানমন্দিরের অ্যান্টেনা যথেষ্ট শক্তিশালী নয়। তাকে যেতে হবে দূরের আরেকটা স্টেশনে, লেক হ্যাজেনে।

শুরু হয় বৃদ্ধ অগাস্টিন ও ছোট্ট আইরিসের এক অসম্ভব যাত্রা। সামনে দিগন্তজোড়া বরফ, তুষারঝড়, নেকড়ের পাল ও ভেঙে পড়া বরফের চাই। তারা কি পৌঁছাতে পারবে লেক হ্যাজেনে? সতর্ক করতে পারবে ইথারের ক্রুদের? নাকি মহাকাশের ওই যাত্রীরা ফিরে এসে এক মৃত পৃথিবী দেখবে? জানতে হলে দেখতে পারেন অসাধারণ এই মুভিটি।

আরও পড়ুন
দ্য মিডনাইট স্কাই মুভি পোস্টার
ছবি: আইএমডিবি

একনজরে

মুভি: দ্য মিডনাইট স্কাই

পরিচালক: জর্জ ক্লুনি

ধরণ: সায়েন্স ফিকশন, ড্রামা

মূল গল্প: লিলি ব্রুকস-ডাল্টনের গুড মর্নিং, মিডনাইট বই অবলম্বনে

মুক্তি: ২০২০

ব্যাপ্তি: ১ ঘণ্টা ৫৮ মিনিট

আইএমডিবি রেটিং: ৫.৭/১০

আরও পড়ুন

মুভির সিনেমাটোগ্রাফি আপনাকে মুগ্ধ করতে বাধ্য। একদিকে মহাকাশের অসীম শূন্যতা ও নীরবতা, অন্যদিকে সুমেরুর বরফশুভ্র ল্যান্ডস্কেপ। স্পেসশিপের দৃশ্যগুলো আপনাকে গ্র্যাভিটি বা ইন্টারস্টেলার মুভির কথা মনে করিয়ে দেবে।

অগাস্টিন চরিত্রে অভিনয় করেছেন পরিচালক জর্জ ক্লুনি নিজে। তিনি এই মুভিতে নিজেকে ভেঙেছেন। তাঁর ক্লান্ত চোখ, ভারী দাড়ি ও অসুস্থ শরীরের অভিব্যক্তি আপনাকে কষ্ট দেবে। তিনি খুব কম কথা বলেছেন, কিন্তু তাঁর নীরবতাই যেন চিৎকার করে তাঁর অনেক কথা বলেছে।

অগাস্টিন চরিত্রে অভিনয় করেছেন পরিচালক জর্জ ক্লুনি
ছবি: গ্লোবাল নিউজ / নেটফ্লিক্স

পুরো মুভিজুড়ে একটা অদ্ভুত নীরবতা আছে। আলেকজান্দ্রে ডেসপ্ল্যাটের ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক সেই নীরবতাকে আরও গভীর করে তুলেছে। এই মুভি দেখার সময় আপনি একধরনের হাহাকার অনুভব করবেন। মনে হবে, আমরা আসলেই এই মহাবিশ্বে কত একা!

সিনেমার শেষটা...না, এটা বলা যাবে না। শুধু এটুকু বলি, শেষের টুইস্টটা আপনার বুকে একটা বিশাল ধাক্কা দেবে। তখন পেছনের সব ঘটনার মানে খুঁজে পাবেন। চোখের কোণ ভিজে উঠতে পারে!

দ্য মিডনাইট স্কাই কোনো মারদাঙ্গা অ্যাকশন মুভি নয়। কাহিনি একটু ধীরে এগোলেও তা অসম্ভব শক্তিশালী। দিন শেষে আমরা যে সবাই ঘরে ফিরতে চাই, আপনজনের কাছে ফিরতে চাই, তা এই মুভি দেখলে ভালোভাবে টের পাবেন।

আরও পড়ুন