ঝড়ের তোড়ে একটা অ্যান্টেনা ছিটকে এসে বিধেছে এক নভোচারীর শরীরে। বায়ুচাপ কমে যাওয়ায় স্পেস স্যুটও কাজ করছিল না ঠিকমতো। সহকর্মীরা রাডারে তাঁর কোনো সিগন্যাল না পেয়ে নিশ্চিত মৃত্যু ভেবেই পাড়ি জমালেন পৃথিবীর পথে। পুরো বিশ্ব শোক পালন করছে একজন শহীদ নভোচারীর জন্য। অথচ মঙ্গল গ্রহের ভয়াবহ ধূলিঝড়ের মধ্যে জ্ঞান ফেরার পর তিনি আবিষ্কার করলেন, তিনি এখনো বেঁচে আছেন। কিন্তু এই বেঁচে থাকা মৃত্যুর চেয়েও ভয়ংকর।
কারণ, পৃথিবী থেকে ২২ কোটি কিলোমিটার দূরের এই গ্রহে তিনি ছাড়া আর কোনো প্রাণের অস্তিত্ব নেই। অক্সিজেন সীমিত, খাবারও ফুরিয়ে আসছে। মাত্র কয়েকদিনের খবার আছে। আগামী চার বছরের আগে উদ্ধারকারী দল আসার কোনো সম্ভাবনা নেই! এখন উপায়?
ঠিক এমন এক শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতির গল্প নিয়েই রিডলি স্কটের সায়েন্স ফিকশন মুভি দ্য মার্শিয়ান। এখান থেকেই শুরু হয় এক অদম্য মানুষের বেঁচে থাকার লড়াই। তিনি হাল ছাড়েন না। নিজের বিজ্ঞানবুদ্ধিকে কাজে লাগিয়ে মঙ্গলের রুক্ষ মাটিতেই তৈরি করেন এক ছোটখাটো পৃথিবী।
বিজ্ঞানপ্রেমীদের জন্য এই মুভিটি এক কথায় মাস্ট ওয়াচ। কারণ, সচরাচর সায়েন্স ফিকশন মুভিতে আমরা কাল্পনিক এলিয়েন বা লেজার গানের লড়াই দেখি। কিন্তু দ্য মার্শিয়ান দেখিয়েছে প্রকৃত বিজ্ঞানের জাদু। মার্ক ওয়াটনি একজন বোটানিস্ট। মঙ্গলের মাটিতে নিজের বিষ্ঠা সার হিসেবে ব্যবহার করে তিনি কীভাবে আলু ফলান, তার এক দারুণ বাস্তবিক প্রয়োগ এখানে দেখানো হয়েছে। বিজ্ঞানের ভাষায় একে বলে স্পেস ফার্মিং।
একনজরে
মুভির নাম: দ্য মার্শিয়ান
পরিচালক: রিডলি স্কট
ধরণ: সায়েন্স ফিকশন, ড্রামা, অ্যাডভেঞ্চার
মূল গল্প: অ্যান্ডি উইয়ারের উপন্যাস দ্য মার্শিয়ান অবলম্বনে
মুক্তি: ২০১৫
ব্যাপ্তি: ২ ঘণ্টা ২৪ মিনিট
আইএমডিবি রেটিং: ৮.০/১০
পানি ছাড়া বেঁচে থাকাও অসম্ভব। মার্ক রকেটের জ্বালানি হাইড্রাজিন পুড়িয়ে কীভাবে রাসায়নিক বিক্রিয়ার মাধ্যমে পানি তৈরি করেন, তা রসায়ন তথা বিজ্ঞানের শিক্ষার্থীদের জন্য এক দারুণ শিক্ষণীয় বিষয়। আবার পুরোনো রোভার খুঁজে বের করে হেক্সাডেসিমেল কোড ব্যবহার করে পৃথিবীর সঙ্গে যোগাযোগ করার দৃশ্যটি ছিল এক কথায় অসাধারণ।
পুরো মুভিটি আসলে প্রবলেম সলভিংয়ের ওপর ভিত্তি করে তৈরি। মার্কের প্রতিটি সমস্যা এবং তার বৈজ্ঞানিক সমাধান আপনাকে ভাবতে বাধ্য করবে।
অবশ্য মুভিতে কিছু বৈজ্ঞানিক ত্রুটিও আছে। যেমন, মঙ্গলের বায়ুমণ্ডল খুব পাতলা, তাই সেখানে ঝড়ের তীব্রতা মুভিতে যেমন দেখানো হয়েছে, বাস্তবে ততটা হওয়ার কথা নয়। তবে গল্পের খাতিরে এইটুকু ছাড় দেওয়াই যায়।
এই মুভির প্রাণভোমরা ম্যাট ডেমন। তিনি মার্ক ওয়াটনির চরিত্রে অভিনয় করেছেন। মুভির সিংহভাগ সময় তিনি একাই পর্দায় ছিলেন। একাকীত্ব, হতাশা, ছোট ছোট জয়ে উল্লাস—সবই ফুটিয়ে তুলেছেন নিখুঁতভাবে। বিশেষ করে ভিডিও লগের সামনে তার নিজের সঙ্গে নিজের কথা বলার দৃশ্যগুলো ছিল অনবদ্য।
ম্যাট ডেমনের রসবোধ মুভিটিকে বোরিং হতে দেয়নি। মুভিতে তাঁর বলা একটি লাইন এমন, ‘আই’ম গোনা হ্যাভ টু সায়েন্স দ্য শিট আউট অফ দিস’। অর্থাৎ, বেঁচে থাকার জন্য আমাকে বিজ্ঞানের সর্বোচ্চ ব্যবহার করতে হবে!
পরিচালক রিডলি স্কট, যিনি এলিয়েন বা ব্লেড রানারের মতো কালজয়ী মুভি বানিয়েছেন, তিনি এখানে মঙ্গলের পরিবেশকে এতই জীবন্ত করে তুলেছেন যে মনে হবে আপনি নিজেই মার্কের সঙ্গে হাঁটছেন।
জেসিকা চ্যাস্টেইন, চিপেটেল এজিওফোরসহ বাকিরাও দারুণ সঙ্গ দিয়েছেন। মুভিটি সেরা মুভি এবং সেরা অভিনেতা ক্যাটাগরিতে গোল্ডেন গ্লোব জয় করেছে। অস্কারের মনোনীত হয়েছিল ৭টি বিভাগে।
দ্য মার্শিয়ান শুধু একটি মুভি নয়, এটি মানবাত্মার টিকে থাকার অদম্য ইচ্ছাশক্তির গল্প। এটি মুভি দেখে আপনি বুঝতে পারবেন, পরিস্থিতি যত প্রতিকূলই হোক না কেন, মনোবল থাকলে অসম্ভবকেও সম্ভব করা যায়!