১৯৮৫ সাল। ক্যালিফোর্নিয়ার হিল ভ্যালির ঘড়ির কাঁটা তখনো মধ্যরাত ছোঁয়নি। নির্জন এক শপিং মলের পার্কিং লটে কুয়াশা ও অন্ধকারের মধ্যে দাঁড়িয়ে আছে অদ্ভুতদর্শন এক গাড়ি। তার সামনে দাঁড়িয়ে দুজন মানুষ। একজন হাইস্কুল পড়ুয়া টিনেজার মার্টি ম্যাকফ্লাই, অন্যজন সাদা চুলের এক পাগলাটে বিজ্ঞানী। নাম এমেট ব্রাউন। তবে সবাই তাঁকে ডক নামেই চেনে। বিজ্ঞানী ডকের দাবি, এই গাড়ি সাধারণ কোনো গাড়ি নয়। এটি একটি টাইম মেশিন! প্লুটোনিয়াম দিয়ে চলে। গতি যখন ঘণ্টায় ৮৮ মাইল ছাড়িয়ে যায়, তখন এটি সময়ের দেয়াল ভেঙে পাড়ি দিতে পারে অতীত কিংবা ভবিষ্যতে।
মার্টি বিশ্বাস-অবিশ্বাসের দোলায় দুলছিল। কিন্তু ঠিক তখনই দৃশ্যপটে হাজির একদল লিবিয়ান সন্ত্রাসী। তাদের কাছ থেকেই প্লুটোনিয়াম চুরি করেছিলেন ডক। শুরু হলো গোলাগুলি। ডককে বাঁচাতে গিয়ে মার্টি উঠে বসল গাড়িতে। অ্যাক্সিলারেটরে চাপ দিতেই স্পিডোমিটারের কাঁটা ছুঁয়ে ফেলল ৮৮ মাইল।
চোখ ধাঁধানো এক আলোর ঝলকানি। তারপর সব শান্ত। মার্টি যখন চোখ মেলল, জায়গাটা সেই হিল ভ্যালিই আছে, কিন্তু সময়টা ১৯৮৫ থেকে চলে গেছে ১৯৫৫ সালে!
এভাবেই শুরু হয় সায়েন্স ফিকশন ইতিহাসের অন্যতম সেরা মুভি ব্যাক টু দ্য ফিউচার-এর যাত্রা। রবার্ট জেমেকিস পরিচালিত এই সিনেমাটি শুধু বক্স অফিস কাঁপায়নি, পপ কালচারের ইতিহাসই বদলে দিয়েছিল। টাইম ট্রাভেল নিয়ে হাজারটা মুভি হয়েছে, কিন্তু মার্টি ম্যাকফ্লাই ও ডক ব্রাউনের এই জুটির মতো আর কেউ নেই।
যাই হোক, ৩০ বছর আগের সময়ে, মানে ১৯৫৫ সালে গিয়ে মার্টি পড়ে মহা বিপদে। সেখানে তার সঙ্গে দেখা হয় তার সদ্য তরুণ বয়সের বাবা-মায়ের সঙ্গে। বাবা জর্জ ম্যাকফ্লাই একেবারেই ভীতু প্রকৃতির, যাকে সারাজীবন বুলিং করে এসেছে বিফ ট্যানেন নামে এক সহপাঠী। আর মা লরেইন? সে এক রোমান্টিক তরুণী। গণ্ডগোলটা বাঁধে এখানেই। দুর্ঘটনাবশত মার্টি তার বাবা-মায়ের প্রথম দেখায় বাধা হয়ে দাঁড়ায়।
ফলে ইতিহাস বদলে যেতে শুরু করে। চরম বিশৃঙ্খল ও অস্বস্তিকর এক পরিস্থিতিতে পড়তে হয় মার্টিকে। মার্টি সেই সমস্যা সমাধান করে দারুণ এক কৌশলে। অতীত থেকে বর্তমানে ফিরে আসার চেষ্টা করে সে। কিন্তু অতীত থেকে কি ফিরে আসতে পারবে? নাকি অতীতেই আটকে যাবে? এ প্রশ্নের উত্তর পেতে দেখতে হবে মুভিটি।
ব্যাক টু দ্য ফিউচার-এর চিত্রনাট্যকে হলিউডের অন্যতম নিখুঁত চিত্রনাট্য বলা হয়। মুভির প্রতিটি সংলাপ, প্রতিটি দৃশ্যের পেছনে কোনো না কোনো কারণ লুকিয়ে আছে। শুরুতে হয়তো দেখবেন কেউ একটা লিফলেট দিচ্ছে বা কোনো রাজনীতিকের নাম বলছে; শেষে গিয়ে দেখবেন সেটাই ঘুরিয়ে দিচ্ছে গল্পের মোড়। একে বলা হয় চেখভস গান টেকনিকের দারুণ ব্যবহার।
তাছাড়া মুভিটি শুধু টাইম ট্রাভেলের জটিলতা নিয়ে নয়। এটি আসলে বাবা-মায়ের সঙ্গে সন্তানের সম্পর্কের গল্প। আমরা প্রায়ই ভুলে যাই যে আমাদের বাবা-মায়েরাও একসময় আমাদের মতোই টিনেজার ছিলেন। তাদেরও ভুল ছিল, স্বপ্ন ছিল, বোকামি ছিল। মার্টি যখন তার তরুণ বাবাকে দেখে, সে বুঝতে পারে কেন তার বাবা আজ এমন। বাবার প্রতি তার শ্রদ্ধা আর ভালোবাসা নতুন রূপ পায়।
একজনরে
মুভির নাম: ব্যাক টু দ্য ফিউচার
পরিচালক: রবার্ট জেমেকিস
ধরণ: সায়েন্স ফিকশন, টাইম ট্রাভেল, অ্যাডভেঞ্চার ও কমেডি
প্রকাশকাল: ১৯৮৫
ব্যাপ্তি: ১ ঘন্টা ৫৬ মিনিট
আইএমডিবি রেটিং: ৮.৫
মুভিটি যেমন জমজমাট, এর পেছনের গল্পও তেমনি রোমাঞ্চকর। এই মুভিতে মার্টির চরিত্রে শুটিং শুরু করেছিল এরিক স্টলজ। প্রায় ছয় সপ্তাহ শুটিং করার পর পরিচালক জেমেকিসের মনে হলো, এরিক একটু বেশি সিরিয়াস। কমেডিটা ঠিক জমছে না। তখন আবার মাইকেল জে. ফক্সকে আনা হয়। ভাবা যায়? একটা মুভির অর্ধেক শুটিং শেষ করার পর বদলে ফেলা হয় হিরো!
আবার মুভিতে কিন্তু টাইম মেশিন হিসেবে আইকনিক ডিলোরিয়ান গাড়ির কথা ভাবা হয়নি। চিত্রনাট্যে ছিল একটা রেফ্রিজারেটর! কিন্তু নির্বাহী প্রযোজক স্টিভেন স্পিলবার্গের ভয় ছিল, মুভি দেখে বাচ্চারা ফ্রিজের ভেতর ঢুকে খেলতে গিয়ে আটকে যেতে পারে। তাই পরে গাড়ির আইডিয়া আনা হয়।
মার্টি যখন ১৯৫৫ সালে গিটার বাজিয়ে জনি বি গুড গানটি গায়, তখন সে ভবিষ্যতের রক অ্যান্ড রোল স্টাইল অনুকরণ করে। অথচ ওই গানটি বাস্তবে মুক্তি পায় ১৯৫৮ সালে! মুভিতে দেখানো হয়, চাক বেরি (গানের আসল গায়ক) তার কাজিনের কাছ থেকে ফোনে এই সুর শুনে গানটি চুরি করেছেন। এটি একটি চমৎকার বুটস্ট্র্যাপ প্যারাডক্স। যেখানে গানের উৎস আসলে কে, তা আর বের করা যায় না।
আপনি যদি সায়েন্স ফিকশন পছন্দ করেন, তবে এই মুভি আপনার জন্য মাস্ট ওয়াচ। আর যদি সায়েন্স ফিকশন পছন্দ নাও করেন, তবুও এটি আপনার ভালো লাগবে এর হিউমার ও আবেগের জন্য। ডক ব্রাউনের পাগলামি, বিফ ট্যানেনের শয়তানি ও মার্টির অসহায়ত্ব—সব মিলিয়ে এক দুর্দান্ত প্যাকেজ।
সিনেমার শেষ দৃশ্যে ডক ব্রাউন যখন বলেন, ‘রোডস? হ্যোয়ার উই আর গোয়িং, উই ডোন্ট নিড রোডোস!’, তখন আপনিও রোমাঞ্চ অনুভব করবেন। টাইম ট্রাভেলের লজিক ও টান টান উত্তেজনা যদি মিস করতে না চান, তবে আজই দেখে ফেলুন ব্যাক টু দ্য ফিউচার।