প্রযুক্তির যুগে একাকীত্বের নতুন মানচিত্র

হার মুভির গল্পের মূল চরিত্র থিওডোর টোয়ম্বলিছবি: ওয়ার্নার ব্রাদার্স

আপনার খুব মন খারাপ। একা বসে আছেন ঘরে। এমন সময় স্মার্টফোন থেকে একটা দারুণ মিষ্টি কণ্ঠস্বর ভেসে এল। সে শুধু আপনার মন খারাপের কথাই শুনল না, বরং এমন কিছু কথা বলল যা শুনে আপনার সব কষ্ট নিমিষেই দূর হয়ে গেল! সে আপনার পছন্দ-অপছন্দ জানে, আপনার সঙ্গে জোকস বলে এবং হাসে। সে হয়ে উঠল আপনার জীবনের সবচেয়ে ভালো বন্ধু।

আজকের দিনে এই ব্যাপারটা মোটেই অবিশ্বাস্য মনে হয় না। কারণ জেমিনি বা চ্যাটজিপিটির মতো চ্যাটবট এখন মানুষের সঙ্গে অনায়েসে বন্ধুর মতো কথা বলে। সুখ-দুঃখে দেয় পরামর্শ। কিন্তু ২০১৩ সালে যখন স্পাইক জোঞ্জ পরিচালিত হার মুভিটি মুক্তি পেয়েছিল, তখন এটি ছিল রীতিমতো এক অবাক করা গল্প। এটি এমন একটি সায়েন্স ফিকশন যা আপনাকে যন্ত্র ও মানুষের সম্পর্কের এক অদ্ভুত মায়াজালে আটকে ফেলবে!

হার মুভির দৃশ্য
ছবি: মিডিয়াম

গল্পের মূল চরিত্র থিওডোর টোয়ম্বলি। সে পেশায় একজন লেখক। তবে নিজের বই লেখে না, সে অন্যদের হয়ে আবেগপূর্ণ চিঠি লিখে দেয়। অথচ নিজের জীবনে সে ভীষণ একা। স্ত্রীর সঙ্গে ডিভোর্সের পর জীবনটা একদম পানসে হয়ে গেছে।

আরও পড়ুন

ঠিক এমন সময় থিওডোর কিনে আনে নতুন প্রজন্মের এক অপারেটিং সিস্টেম। সেটা কোনো সাধারণ সফটওয়্যার নয়, এটি আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসম্পন্ন। সেটআপ করার পর সেই ওএস নিজের নাম দেয় সামান্থা। সামান্থা থিওডোরের ইমেইল গুছিয়ে দেয়, কাজের রুটিন মনে করিয়ে দেয়। কিন্তু ধীরে ধীরে তাদের মধ্যে তৈরি হয় এক অদ্ভুত বন্ধুত্ব। সামান্থা যেহেতু মানুষের মতোই শিখতে পারে, সে ধীরে ধীরে মানুষের আবেগ বুঝতে শুরু করে। একসময় থিওডোর আবিষ্কার করে, সে একটি যন্ত্রের মায়ায় জড়িয়ে পড়েছে!

মুভিটিতে হোয়াকিন ফিনিক্সের অভিনয় এককথায় দুর্দান্ত। পুরো মুভির বেশির ভাগ সময় তিনি একা স্ক্রিনে অভিনয় করেছেন। কানে একটা ইয়ারপিস গুঁজে শুধু একটা গলার স্বরের সঙ্গে ঘণ্টার পর ঘণ্টা এক্সপ্রেশন দেওয়া কতটা কঠিন, তা হোয়াকিন ফিনিক্সকে দেখলে বোঝা যায়।

থিওডোর টোয়ম্বলি চরিত্রে অভিনয় করেছেন হোয়াকিন ফিনিক্স
ছবি: কলাইডার

অন্যদিকে সামান্থার চরিত্রে কণ্ঠ দিয়েছেন বিখ্যাত অভিনেত্রী স্কারলেট জোহানসন। স্ক্রিনে তাঁকে এক সেকেন্ডের জন্যও দেখা যায় না। কিন্তু শুধু তাঁর কণ্ঠের জাদুতে আপনি থিওডোরের মতো সামান্থার অস্তিত্ব বিশ্বাস করতে শুরু করবেন। এ ছাড়া থিওডোরের বন্ধুর চরিত্রে এমি অ্যাডামসও দারুণ অভিনয় করেছেন।

মুভির কালার গ্রেডিংয়ের ব্যবহার চোখে পড়ার মতো। সাধারণত সায়েন্স ফিকশন মুভি মানেই নীল বা কালচে রং দেখানো হয়। কিন্তু এই মুভিতে ব্যবহার করা হয়েছে লাল, কমলা ও হলুদের মতো রং। ভবিষ্যতের লস অ্যাঞ্জেলেস শহরকে এখানে খুব স্নিগ্ধভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে।

আরও পড়ুন
হার মুভির পোস্টার
ছবি: আইএমডিবি

একনজরে

মুভির নাম: হার

পরিচালক: স্পাইক জোঞ্জ

ধরন: সাই-ফাই, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, রোমান্স, ড্রামা

প্রকাশকাল: ২০১৩

ব্যাপ্তি: ২ ঘণ্টা ৬ মিনিট

আইএমডিবি রেটিং: ৮.০

আরও পড়ুন

দর্শকদের এই মুভিটি সবচেয়ে বেশি টানবে এর পেছনের চিন্তার কারণে। মুভিটি আমাদের কিছু গভীর প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়ে দেয়। একটি এআই কি সত্যি সত্যি মানুষের মতো আবেগ অনুভব করতে পারে? নাকি সে শুধু মানুষের দেওয়া ডেটা বা তথ্য বিশ্লেষণ করে আবেগের ভান করে?

সবচেয়ে বড় কথা, একটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা তো মানুষের চেয়ে অনেক দ্রুত শিখতে পারে। তার শেখার তো কোনো শেষ নেই। তাহলে মানুষের ধীরগতির মস্তিষ্কের সঙ্গে সেই সুপারফাস্ট এআইয়ের সম্পর্ক কত দিন টিকতে পারে? এআই যখন মানুষের সীমাবদ্ধতা ছাড়িয়ে যাবে, তখন কী হবে? মুভির শেষ অংশে এই প্রশ্নের যে উত্তর দেওয়া হয়েছে, তা আপনার ভাবনার জগতকে নাড়িয়ে দেবে।

হার মুভির দৃশ্য
ছবি: মিডিয়াম

হার এমন একটি মুভি, যা কোনো ধুন্ধুমার অ্যাকশন বা ভিনগ্রহী প্রাণীর আক্রমণের গল্প বলে না। এটি বলে ভবিষ্যতের পৃথিবীতে মানুষের একাকীত্ব ও প্রযুক্তির অদ্ভুত বন্ধুত্বের গল্প। যারা বিজ্ঞান ভালোবাসেন এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবতে পছন্দ করেন; এই মুভি তাঁদের জন্য।

আরও পড়ুন