ওয়ার মেশিন: মানুষের জেদের কাছে কি হার মানবে ভিনগ্রহের দানবীয় যন্ত্র

ওয়ার মেশিন মুভির দৃশ্যছবি: বেন কিং / নেটফ্লিক্স

এই মুভির শুরু আর দশটা সাধারণ সামরিক মহড়ার গল্পের মতোই। ভাই হারানোর শোকে কাতর এক সেনা কর্মকর্তা, যাঁকে সবাই চেনে শুধু ‘৮১’ নম্বরে। ভাইয়ের স্বপ্ন পূরণের জন্য যোগ দেন ইউএস আর্মি রেঞ্জার্স একাডেমিতে। পৃথিবীর সবচেয়ে কঠিন ও নির্মম এক সিলেকশন প্রক্রিয়ার শেষ ২৪ ঘণ্টা চলছে তখন। একদল ক্লান্ত, বিধ্বস্ত কিন্তু অদম্য ক্যাডেট যখন গভীর জঙ্গলে নিজেদের চূড়ান্ত পরীক্ষার মুখোমুখি, ঠিক তখনই গল্পটা বাঁক নেয় এক অকল্পনীয় দিকে।

তারা আবিষ্কার করে, জঙ্গলঘেরা এক অজানা অঞ্চলে এমন এক ভিনগ্রহের রোবোটিক যন্ত্র আছড়ে পড়েছে, যা মানুষের আধুনিক মারণাস্ত্রের চেয়েও কয়েক গুণ শক্তিশালী। মুহূর্তের মধ্যে একটি সাধারণ সামরিক মহড়া পরিণত হয় এক অসম অস্তিত্ব রক্ষার লড়াইয়ে। যে দানবীয় যন্ত্রের কাছে মানুষের কোনো প্রযুক্তিই টিকছে না, তার হাত থেকে কি এই ক্লান্ত রেঞ্জার্স দল নিজেদের বাঁচাতে পারবে? নাকি মানুষের আবেগ ও জেদের কাছে হার মানবে যান্ত্রিক নিষ্ঠুরতা?

ওয়ার মেশিন মুভিতে মূল চরিত্রে অভিনয় করেছেন অ্যালান রিচসন
ছবি: বেন কিং / নেটফ্লিক্স

এই রোমাঞ্চকর প্রশ্নের উত্তর পেতে হলে আপনাকে দেখতে হবে প্যাট্রিক হিউজ পরিচালিত নেটফ্লিক্সে সদ্য মুক্তি পাওয়া সাই-ফাই অ্যাকশন মুভি ওয়ার মেশিন

এই মুভিতে মূল চরিত্রে অভিনয় করেছেন অ্যালান রিচসন। রিচার সিরিজের পর এখানেও তিনি তাঁর দুর্দান্ত শারীরিক গঠন ও অ্যাকশন হিরো সুলভ গাম্ভীর্য নিয়ে হাজির হয়েছেন। মানসিক আঘাতে জর্জরিত একজন সেনা কর্মকর্তার চরিত্রে তাঁর অভিনয় হয়তো অস্কার পাওয়ার মতো কিছু নয়, কিন্তু মুভির প্রয়োজনে যে শারীরিক সক্ষমতা এবং একরোখা মানসিকতার দরকার ছিল, তা তিনি নিখুঁতভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন।

আরও পড়ুন

অন্যদিকে প্রবীণ অভিনেতা ডেনিস কোয়াইড এবং স্টেফান জেমসের অভিনয়ও ছিল চোখে পড়ার মতো। তবে দুঃখের বিষয় হলো, মুভির পার্শ্বচরিত্রগুলোকে সেভাবে বিকশিত হওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়নি। অনেক চরিত্রকেই কেবল ভিনগ্রহের দানবটির শক্তির মহড়া দেখানোর জন্য বলি হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে বলে মনে হয়। তাদের পেছনের গল্পগুলো আরেকটু শক্ত হলে দর্শকদের আবেগ আরও ভালোভাবে যুক্ত হতে পারত।

তবে পরিচালকের মুন্সিয়ানা অন্য জায়গায়। পরিচালক প্যাট্রিক হিউজ এর আগে দ্য হিটম্যানস বডিগার্ড, দ্য এক্সপেন্ডেবলস ৩ মুভি বানিয়েছেন। আগের মুভিগুলোর মতো এই মুভিতে তাঁর অ্যাকশন পরিচালনার মুন্সিয়ানা বেশ ভালোভাবেই দেখিয়েছেন। বিশেষ করে মুভির শেষ ভাগে তাঁর সিনেমাটোগ্রাফি এবং একটি দীর্ঘ ওয়ান-শট অ্যাকশন সিকোয়েন্স দর্শকদের রীতিমতো সিটের প্রান্তে বসিয়ে রাখবে। মুভিটির সবচেয়ে ভালো দিক হলো, এটি শুধু স্টুডিওর গ্রিন স্ক্রিনে না বানিয়ে অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ডের জঙ্গলের মতো বাস্তব লোকেশনে শুটিং করা হয়েছে। এতে মুভিতে একটি দারুণ বাস্তবসম্মত ফিল পাওয়া গেছে।

ওয়ার মেশিন মুভির দৃশ্য
ছবি: বেন কিং / নেটফ্লিক্স

তবে পরিচালকের সবচেয়ে বড় দুর্বলতার জায়গাটি হলো মুভির সুরের পরিবর্তন। মুভির প্রথম ভাগ যেখানে একটি মনস্তাত্ত্বিক সামরিক ড্রামা হিসেবে এগোচ্ছিল, দ্বিতীয় ভাগে তা হুট করে প্রেডেটর বা ওয়ার অব দ্য ওয়ার্ল্ডস-এর মতো একটি পিওর সাই-ফাই সারভাইভাল মুভিতে রূপ নেয়। এই পরিবর্তনটি একটু বেশিই আকস্মিক। এছাড়া, মুভিতে পোস্ট-ট্রমাটিক স্ট্রেস ডিসঅর্ডার বা মানসিক আঘাতের মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়কে তুলে আনার দারুণ সুযোগ থাকলেও, পরিচালক তা খুব ভাসা ভাসা ভাবে এড়িয়ে গেছেন। গল্পটাকে আরেকটু গভীরতা দিলে এটি হয়তো মাস্টারপিস হতে পারত।

আরও পড়ুন
ওয়ার মেশিন মুভির পোস্টার
ছবি: উইকিপিডিয়া

একজনরে

মুভির নাম: ওয়ার মেশিন

পরিচালক: প্যাট্রিক হিউজ

ধরন: অ্যাকশন, সাই-ফাই, থ্রিলার, এলিয়েন ইনভেশন

প্রকাশকাল: ২০২৬

ব্যাপ্তি: ১ ঘণ্টা ৪৬ মিনিট

আইএমডিবি রেটিং: ৬.৪

আরও পড়ুন

তাহলে মুভিটি কি দেখার মতো ভালো হয়েছে নাকি শুধু সময় নষ্ট হবে? মুভিতে ভিনগ্রহের এই যন্ত্রটিকে বর্তমান সময়ের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার আগ্রাসনের একটি দারুণ মেটাফোর হিসেবে দেখতে পাবেন। মুভিটি আমাদের শেখায়, প্রযুক্তির কাছে হয়তো আমরা অনেক ক্ষেত্রেই অসহায়, কিন্তু মানুষের ভেতরের হার না মানা জেদের কোনো বিকল্প নেই।

ওয়ার মেশিন মুভির দৃশ্য
ছবি: নেটফ্লিক্স

আন্তর্জাতিক মানের মাপকাঠিতে বিচার করলে ওয়ার মেশিন হয়তো কোনো যুগান্তকারী বা নতুন ঘরানার সাই-ফাই ক্ল্যাসিক নয়, তবে এটি একবার দেখার জন্য দারুণ মুভি হতে পারে। আশির দশকের সেই নস্টালজিক অ্যাকশন মুভিগুলোর স্বাদ আপনি এতে ভরপুর পাবেন। কিছু জায়গায় চিত্রনাট্য আরও শক্ত করার সুযোগ থাকলেও, আপনি যদি গভীর কোনো দর্শনের বদলে নিছক বিনোদন, শ্বাসরুদ্ধকর অ্যাকশন ও মানুষ বনাম যন্ত্রের টিকে থাকার লড়াই দেখতে চান, তবে নেটফ্লিক্সের এই সাই-ফাই মুভিটি আপনাকে মোটেও হতাশ করবে না।

আরও পড়ুন