সাধারণ মানুষ তার মস্তিষ্কের মাত্র ১০ শতাংশ ব্যবহার করতে পারে। ডলফিন পারে ২০ শতাংশ। কিন্তু কোনো মানুষ যদি তার মস্তিষ্কের ১০০ শতাংশই ব্যবহার করতে পারে, তবে কী হবে? সে কি সুপারহিরো হয়ে যাবে? নাকি হয়ে উঠবে অসীম ক্ষমতার অধিকারী?
ফরাসি পরিচালক লুক বেসনের সায়েন্স ফিকশন অ্যাকশন মুভি লুসির শুরুটাই হয় এমন এক ধারণা দিয়ে। এই মুভি আপনাকে এমন এক জগতে নিয়ে যাবে, যেখানে পদার্থবিজ্ঞানের চেনা সূত্রগুলো একেবারে তুচ্ছ মনে হবে। মুভিতে একজন সাধারণ মানুষ চোখের পলকে বদলে ফেলতে পারে চারপাশের বাস্তবতা!
মুভির মূল চরিত্র লুসি। তাইওয়ানে পড়তে আসা এক সাধারণ মার্কিন তরুণী। ভুল করে সে জড়িয়ে পড়ে এক ভয়ংকর কোরিয়ান ড্রাগ মাফিয়ার চক্করে। তার পেটের ভেতর জোর করে ঢুকিয়ে দেওয়া হয় সিপিএইচ৪ নামে এক নতুন ও অত্যন্ত শক্তিশালী সিনথেটিক ড্রাগের প্যাকেট। তাকে বাধ্য করা হয় ড্রাগ পাচারকারী হিসেবে কাজ করতে। কিন্তু এক পর্যায়ে পেটের ভেতরের সেই প্যাকেট ফেটে যায়। বিপুল পরিমাণ ড্রাগ মিশে যায় লুসির রক্তে।
সাধারণত এত ড্রাগ শরীরে ঢুকলে মানুষের মৃত্যু হওয়ার কথা। কিন্তু লুসি মারা যায় না। উল্টো শুরু হয় এক অবিশ্বাস্য পরিবর্তন। ড্রাগের প্রভাবে তার মস্তিষ্কের কর্মক্ষমতা ১০ শতাংশ থেকে লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়তে থাকে। ২০, ৩০, ৪০...সেই সঙ্গে লুসি অতিমানবিক সব ক্ষমতা লাভ করতে থাকে। সে অন্যের মন পড়তে পারে, ইশারাতেই যেকোনো ভারী জিনিস শূন্যে ভাসিয়ে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে, এমনকি ইলেকট্রোম্যাগনেটিক তরঙ্গও দেখতে পায় খালি চোখে!
কিন্তু একটা বড় সমস্যা আছে। মস্তিষ্ক ১০০ শতাংশে পৌঁছানোর পর লুসির অস্তিত্বের কী হবে? সে কি মানুষের রূপে বেঁচে থাকবে, নাকি মহাবিশ্বের সঙ্গে মিশে যাবে? এই অসীম জ্ঞানের ভান্ডার সে কার কাছে রেখে যাবে? এসবের উত্তর খুঁজতে লুসি প্যারিসের দিকে রওয়ানা দেয়। তার পিছু নেয় সেই ভয়ংকর কোরিয়ান মাফিয়া বাহিনী।
লুসি চরিত্রে স্কারলেট জোহানসনের অভিনয় এককথায় দুর্দান্ত। মুভির শুরুতে তিনি একজন ভয় পাওয়া, অসহায় ও সাধারণ মেয়ে, যে মৃত্যুর ভয়ে কাঁদছে। কিন্তু মস্তিষ্কের ক্ষমতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তাঁর ভেতরের সব আবেগ, ভয় ও মানবিক অনুভূতিগুলো উধাও হতে থাকে। একজন অনুভূতিহীন, যন্ত্রের মতো কিন্তু প্রবল ক্ষমতাবান এক সত্তায় পরিণত হওয়ার এই অদ্ভুত রূপান্তর তিনি অসাধারণ নিপুণতায় ফুটিয়ে তুলেছেন। তাঁর চোখের শূন্য দৃষ্টিই বুঝিয়ে দেয়, তিনি আর আমাদের মতো সাধারণ মানুষ নেই।
মুভিতে প্রফেসর নরম্যানের চরিত্রে আছেন কিংবদন্তি অভিনেতা মরগান ফ্রিম্যান। তিনি এমন এক বিজ্ঞানী, যিনি কয়েক দশক ধরে মানুষের মস্তিষ্কের ক্ষমতা নিয়ে গবেষণা করছেন। লুসি যখন বুঝতে পারে তার হাতে সময় খুব কম, তখন সে এই প্রফেসর নরম্যানকেই বেছে নেয়। মরগান ফ্রিম্যানের সেই গম্ভীর কণ্ঠস্বর মুভির সায়েন্স ফিকশন থিওরিগুলোকে দর্শকের কাছে বেশ বিশ্বাসযোগ্য করে তোলে। তিনিই যেন এই অতিপ্রাকৃত গল্পে সাধারণ মানুষের একমাত্র ভরসার জায়গা।
একনজরে
লুসি
পরিচালক: লুক বেসন
ধরন: সায়েন্স ফিকশন, অ্যাকশন, থ্রিলার
প্রকাশকাল: ২০১৪
ব্যাপ্তি: ১ ঘণ্টা ২৯ মিনিট
আইএমডিবি রেটিং: ৬.৪/১০
মুভিতে ভিলেনের চরিত্রে অভিনয় করেছেন কোরিয়ান অভিনেতা চোই মিন-সিক। তাঁর কথা না বললেই নয়। তিনি এক চরম নিষ্ঠুর ও ভয়ংকর মাফিয়া ডন। লুসির এই অসীম ক্ষমতার সামনেও সে একবিন্দু দমে যায় না, বরং প্রতিশোধের নেশায় তার পিছু নেয়। খুব কম কথা বলে, শুধু চোখের চাহনি এবং শারীরিক অভিব্যক্তিতে তিনি যে ত্রাস সৃষ্টি করেছেন, তা সত্যিই প্রশংসনীয়।
সব মিলিয়ে লুসি এমন এক মুভি, যা আপনাকে মাত্র দেড় ঘণ্টার এক রোলারকোস্টার রাইডে নিয়ে যাবে। টানটান উত্তেজনা, দুর্দান্ত অ্যাকশন ও ফিলোসফির এমন মিশেল সচরাচর দেখা যায় না। তবে মুভির শেষের দিকটা আপনার কাছে একটু জটিল মনে হতে পারে, এই যা!