ম্যান্ডেলা ইফেক্ট: স্মৃতিভ্রম নাকি প্যারালাল ইউনিভার্স

আপনি কি নিশ্চিত যে নেলসন ম্যান্ডেলা আশির দশকেই মারা গিয়েছিলেন? যদি আপনার উত্তর ‘হ্যাঁ’ হয়, তবে আপনিও শিকার হয়েছেন এক অদ্ভুত রহস্যের, নাম ম্যান্ডেলা ইফেক্ট। এটা কি শুধুই মনের ভুল, নাকি এর পেছনে আছে প্যারালাল ইউনিভার্সের হাত?

দক্ষিণ আফ্রিকার বর্ণবাদবিরোধী আন্দোলনের নেতা নেলসন ম্যান্ডেলাছবি: লুইস গাব / করবিস সাবা / গেটি ইমেজ

আজকের আলোচিত বিষয়টি বেশ অদ্ভুত ও বিতর্কিত। ধরুন, আজ আপনার পরীক্ষা। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে গেলেন পরীক্ষা দিতে। আপনার এক বন্ধু বলল, ‘আমাকে একটা কলমী দাও’। নিশ্চয়ই অবাক হয়ে ভাববেন, বন্ধু হয়তো ভুলে কলমকে কলমী বলছে। কিন্তু পাশে আরও কয়েকজন যদি কলমী বলে, তাহলে হয়তো একটু ভড়কে যাবেন। কিন্তু তারপর আবার যদি ওটাকে অনেকে কলম বলে, তাহলে আত্মবিশ্বাস ফিরে পাবেন।

এমন কোনো ঘটনা আপনার সঙ্গে ঘটলে বুঝতে হবে, আপনি প্রাথমিকভাবে ম্যান্ডেলা ইফেক্টের সঙ্গে প্রাথমিকভাবে পরিচিত হয়ে গেছেন। ম্যান্ডেলা ইফেক্ট একধরনের স্মৃতিভ্রম। যখন কোনো স্মৃতিভ্রম একসঙ্গে অনেক মানুষের হয়, তখন তাকে ম্যান্ডেলা ইফেক্ট বলে। চলুন, আরও বিস্তারিত জানা যাক।

দক্ষিণ আফ্রিকার বর্ণবাদবিরোধী আন্দোলনের নেতা নেলসন ম্যান্ডেলা
ছবি: উইকিপিডিয়া

ম্যান্ডেলা ইফেক্ট নামটি এসেছে প্যারানরমাল কনসালটেন্ট ফিওনা ব্রুমের কাছ থেকে। ব্রুম ২০০৯ সালে যখন অনেকের সঙ্গে আলোচনা করছিলেন, তখন অদ্ভুতভাবে দেখা গেল তাঁর মতো অনেকেই মনে করেন, ১৯৮০ সালের দিকে দক্ষিণ আফ্রিকার বর্ণবাদবিরোধী আন্দোলনের নেতা নেলসন ম্যান্ডেলা কারাগারে মারা গিয়েছিলেন। তাঁরা এটাও দাবি করেন যে, তাঁরা নেলসন ম্যান্ডেলার শেষকৃত্য অনুষ্ঠান দেখেছিলেন। তিন মিনিট দাঁড়িয়ে শোক পালন করেছিলেন এবং ম্যান্ডেলার স্ত্রীর হৃদয়বিদারক ভাষণও শুনেছিলেন।

কিন্তু নেলসন ম্যান্ডেলা কারাগারে মারা যাননি। বরং তিনি ১৯৯০ সালে কারাগার থেকে মুক্তি পান এবং ১৯৯৪ সালে দক্ষিণ আফ্রিকার রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। তিনি ২০১৩ সালে মৃত্যুবরণ করেন। এতজন মানুষ যেমন একসঙ্গে ভুল হতে পারে না, আবার একজন মানুষও তো দুইবার মৃত্যুবরণ করতে পারেন না। তখন এই ধরনের গণস্মৃতিভ্রমকে বলে ম্যান্ডেলা ইফেক্ট।

আরও পড়ুন
১৯৮০ সালের দিকে দক্ষিণ আফ্রিকার বর্ণবাদবিরোধী আন্দোলনের নেতা নেলসন ম্যান্ডেলা কারাগারে মারা গিয়েছিলেন। তাঁরা এটাও দাবি করেন যে, তাঁরা নেলসন ম্যান্ডেলার শেষকৃত্য অনুষ্ঠান দেখেছিলেন।

অনেক মানুষ দাবি করেন, স্টার ওয়ার্স: এপিসোড ৫-এ ডার্থ ভেডারের সেই বিখ্যাত উক্তিটি ছিল ‘লুক, আই এম ইউর ফাদার’। কিন্তু বাস্তবে সে বলেছিল, ‘নো, আই এম ইউর ফাদার’। এটি ম্যান্ডেলা ইফেক্টের একটি ধ্রুপদী উদাহরণ। 

ম্যান্ডেলা ইফেক্ট নিয়ে বিভিন্নজন বিভিন্নভাবে ব্যাখ্যা দেন। আমরা এখন ম্যান্ডেলা ইফেক্টের কারণগুলো নিয়ে আলোচনা করব। অনেক বিজ্ঞানীর মতে, ম্যান্ডেলা ইফেক্টের জন্য দায়ী প্যারালাল ইউনিভার্স। প্যারালাল ইউনিভার্স মানে আমাদের ইউনিভার্সের মতো আরও অনেক ইউনিভার্স আছে এবং ওই ইউনিভার্সে আমাদের পৃথিবীর মতো আরও অনেক পৃথিবী আছে। এসব পৃথিবীতে কিছু পার্থক্য ছাড়া প্রায় সব ঘটনাই মিলে যায়। বিজ্ঞানের মতে, এই প্যারালাল ইউনিভার্সের কারণে মানুষের চিন্তাধারা প্রভাবিত হয়। তখন অসংখ্য মানুষের স্মৃতিভ্রম হয়।

শিল্পীর কল্পনায় প্যারালাল ইউনিভার্স
ছবি: অস্ট্রেলিয়ান রিসার্চ অ্যান্ড স্পেস এক্সপ্লোরেশন

ধারণা করা হয়, অন্য কোনো ডাইমেনশনের কোনো ঘটনা এই মুহূর্তে হচ্ছে কিন্তু আমরা তা দেখতে পারি না। অনেক সময় অন্য ইউনিভার্সের টাইমলাইন আমাদের ইউনিভার্সের টাইমলাইনের সঙ্গে মিশে যায়। ফলে অনেক মানুষের টাইমলাইনের পরিবর্তন হয়ে যায়। তাই তারা কোনো ঘটনাকে ভুলভাবে স্মরণ করে। হতে পারে অন্য কোনো ইউনিভার্সে নেলসন ম্যান্ডেলা ১৯৮০ সালে কারাগারে মারা যান।

আরও পড়ুন
প্যারালাল ইউনিভার্স মানে আমাদের ইউনিভার্সের মতো আরও অনেক ইউনিভার্স আছে এবং ওই ইউনিভার্সে আমাদের পৃথিবীর মতো আরও অনেক পৃথিবী আছে।

আবার সাইকোলজির মতে, ম্যান্ডেলা ইফেক্টের জন্য দায়ী মিথ্যে খবর বা ফলস মেমোরি। ফলস মেমোরির কারণে মানুষ সত্য এবং কাল্পনিক ঘটনার মধ্যে পার্থক্য করতে পারে না। এ কারণে মানুষ কোনো ঘটনাকে এমনভাবে স্মরণ করে যা কখনো ঘটেনি বা সম্পূর্ণ ভিন্নভাবে ঘটেছিল। বর্তমানে বিভিন্ন সোশ্যাল মিডিয়া প্রচুর মিথ্যে সংবাদ প্রচার করে।

এসব মিথ্যে সংবাদ মানুষের চিন্তাধারাকে প্রভাবিত করে এবং ম্যান্ডেলা ইফেক্টের মতো ঘটনা ঘটে। হতে পারে কোথাও ডার্থ ভেডারের উক্তিটি ভুলভাবে প্রচারিত হয়েছিল, তাই অনেকে তা ভুলভাবে স্মরণ করছে। এই কারণগুলো ছাড়াও অনেকে ইলুমিনাতির প্রভাব এবং টাইম ট্রাভেল করে অতীতে যেয়ে ঘটনা পরিবর্তন করার মতো ব্যাখ্যা দেন। কিন্তু সাইকোলজিক্যাল ব্যাখ্যাগুলো বাস্তব জীবনে বেশি যুক্তিসঙ্গত হিসেবে গৃহীত হয়।


লেখক: আডজাংক্ট (কন্ট্রাকচুয়াল) ফ্যাকাল্টি, ডিপার্টমেন্ট অব এম এন এস, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়

আরও পড়ুন