কাগজ রিসাইকেল করলে কতগুলো গাছ বাঁচে
রিসাইকেল বিনে কাগজ ফেলার সময় কখনো ভেবে দেখেছেন, ঠিক কী ঘটছে এরপর? পুরোনো খাতা, ছেঁড়া খবরের কাগজ, প্যাকেজিং বক্স—এসব নিয়ে বেশির ভাগ মানুষ খুব একটা মাথা ঘামায় না। শুধু একটি সংখ্যা সবার মাথায় গেঁথে থাকে, এক টন কাগজ রিসাইকেল করলে ১৭টি গাছ বাঁচে। স্কুলের বই থেকে পৌরসভার লিফলেট; সব জায়গায় সংখ্যাটা ঘুরেফিরে আসে। কিন্তু এটি কোথা থেকে এল, খুঁজতে গেলে মজার একটি ইতিহাস পাওয়া যায়।
সত্তরের দশকের কথা। যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসে জমা দেওয়া একটি প্রতিবেদনে প্রথম এই হিসাবটি করা হয়। কনজারভাট্রি নামে একটি কাগজ পরিবেশক প্রতিষ্ঠান পরে এটি সবখানে ছড়িয়ে দেয়। মুশকিল হলো, হিসাবটি করা হয়েছিল শুধু নিউজপ্রিন্ট বা খবরের কাগজের জন্য। অফিস পেপার বা কার্ডবোর্ড তৈরি হয় সম্পূর্ণ ভিন্ন প্রক্রিয়ায়, কাঠের মণ্ড তৈরির পদ্ধতিও আলাদা। তারপরও ৫০ বছর ধরে এই একই সংখ্যা সব ধরনের কাগজের গায়ে সেঁটে দেওয়া হচ্ছে, যা আসলে বৈজ্ঞানিকভাবে ধোপে টেকে না।
সংখ্যাটাও তো সবখানে এক নয়। কোথাও ১৫, কোথাও ১৭, কোথাওবা ২০! কেন এমন হয়? কারণ, একটি গাছ থেকে কতটা মণ্ড পাওয়া যাবে, তা নির্ভর করে গাছের প্রজাতি, বয়স, ব্যাস—এমনকি এটি সফটউড নাকি হার্ডউড, তার ওপরও। একটি পাইনগাছ আর একটি ইউক্যালিপটাস গাছ—দুটি থেকে সমান কাগজ বানাতে একদমই সমান কাঠ লাগে না। তার ওপর আছে টনের হিসাবে গোলমাল। মেট্রিক টন এবং যুক্তরাষ্ট্রের শর্ট টন সমান নয়, ফারাক প্রায় ১০ শতাংশ। তাহলে সেই ১৭ সংখ্যাটি আসলে কোন টনের হিসাবে বলা হচ্ছে, এই প্রশ্নের উত্তর কেউ ঠিকমতো দিতে পারে না।
উন্নত দেশগুলোতে কাগজশিল্পের কাঠ বেশির ভাগ সময় প্রাকৃতিক বনভূমি থেকে আসে না; বরং আসে পরিকল্পিতভাবে লাগানো প্ল্যান্টেশন থেকে। অনেকটা ভুট্টা বা গমের মতো।
এর মানে এই নয় যে পুরো গল্পটাই বানোয়াট। খোদ মার্কিন পরিবেশ সুরক্ষা সংস্থা ইপিএ স্বীকার করেছে হিসাবটি নড়বড়ে; তারপরও বলেছে, এটি একটি মোটামুটি সত্য। গাছ ঠিক কতটা বাঁচল, সেটা বড় কথা নয়; কাঠের ওপর চাপ যে কমে, সেটাই আসল কথা।
শক্তি সাশ্রয়ের হিসাবটি এখানে সবচেয়ে বিশ্বাসযোগ্য মনে হয়। নতুন কাঠ থেকে কাগজ বানাতে যত জ্বালানি লাগে, রিসাইকেল করা কাগজে একই কাজে প্রায় ৬০ শতাংশ কম লাগে। কারণটা সহজ, কাঠ কেটে তন্তু আলাদা করার ধাপেই সবচেয়ে বেশি শক্তি খরচ হয়; রিসাইকেল কাগজে ফাইবারগুলো আগে থেকেই আলাদা থাকে বলে সেই ধাপটি আর লাগে না। পানি সাশ্রয় নিয়েও নানা সংখ্যা পাওয়া যায়। কোথাও ৩ হাজার গ্যালন, কোথাও ৭ হাজার; এটি মিলভেদে বদলায়। ল্যান্ডফিলের হিসাবটাও গুরুত্বপূর্ণ, কারণ কাগজ পচলে মিথেন তৈরি হয়, যা কার্বন ডাই-অক্সাইডের চেয়ে অনেক বেশি ক্ষতিকর।
তবে এখানে একটি কথা না বললেই নয়। উন্নত দেশগুলোতে কাগজশিল্পের কাঠ বেশির ভাগ সময় প্রাকৃতিক বনভূমি থেকে আসে না; বরং আসে পরিকল্পিতভাবে লাগানো প্ল্যান্টেশন থেকে। অনেকটা ভুট্টা বা গমের মতো। লাগানো হয়, কাটা হয়, আবার লাগানো হয় চক্র মেনে। তাই রিসাইকেল না করলেই যে সুন্দরবনের মতো কোনো প্রাকৃতিক বন কাটা পড়বে, এই ধারণাটি সঠিক নয়। রিসাইক্লিং মূলত কাঠের চাহিদা কমায়, ফলে প্ল্যান্টেশনের জন্য জমির প্রয়োজনও কমে যায়। এটি পরিবেশের জন্য ভালো, কিন্তু মানুষ যেভাবে গাছ বাঁচানো ভেবে রোমান্টিক একটি ছবি আঁকে, বাস্তবতা তার চেয়ে একটু দূরে।
নতুন কাঠ থেকে কাগজ বানাতে যত জ্বালানি লাগে, রিসাইকেল করা কাগজে একই কাজে প্রায় ৬০ শতাংশ কম লাগে। কারণটা সহজ, কাঠ কেটে তন্তু আলাদা করার ধাপেই সবচেয়ে বেশি শক্তি খরচ হয়।
বাংলাদেশের চিত্রটি অবশ্য আরেক রকম। এখানকার কাগজশিল্পের বড় অংশই আমদানি করা মণ্ডের ওপর নির্ভরশীল। কারণ দেশে গাছ কাটার মতো বাণিজ্যিক বনায়ন তেমন নেই, বনভূমিও এমনিতে বেশ সীমিত। তাই এখানে রিসাইকেল করার আসল লাভটা আসে অন্য জায়গা থেকে, আমদানিনির্ভরতা কমে, বর্জ্যের চাপ কমে আর দেশীয় রিসাইক্লিং মিলগুলো একটি স্থিতিশীল কাঁচামাল পায়। ঢাকার আশপাশে ছোট ছোট কাগজ রিসাইক্লিং কারখানা ঘুরলে বোঝা যায়, পুরো ব্যাপারটা এখানে অনেক বেশি শ্রমনির্ভর। কাঁচামাল সংগ্রহের নেটওয়ার্কটি মূলত ভাঙারি ব্যবসায়ীদের হাত ধরে চলে, যাদের কাজকে সাধারণত সেভাবে পাত্তা দেওয়া হয় না; অথচ পরিবেশগত হিসাবে তাদের অবদান মোটেও কম নয়।
তাহলে ১৭টি গাছের সংখ্যাটি আসলে ৫০ বছরের পুরোনো একটি হিসাব, যা একটি নির্দিষ্ট কাগজের জন্য বানানো হয়েছিল এবং যেটিকে এখন সবার জন্য ধ্রুব সত্য বানিয়ে ফেলা হয়েছে। গাছের সংখ্যা নির্ভুলভাবে গোনা এত সহজ কাজ নয়। এর সঙ্গে অনেকগুলো চলক জড়িত। তবে এই অনিশ্চয়তা রিসাইক্লিংয়ের গুরুত্ব কমায় না, শুধু এর পেছনের গল্পটিকে একটু জটিল করে দেয়।