স্টোনহেঞ্জের ৬ টনের পাথরটি কীভাবে পাড়ি দিল ৭০০ কিলোমিটার
দক্ষিণ ইংল্যান্ডের বিস্তীর্ণ সবুজ প্রান্তরে রহস্যময়ভাবে দাঁড়িয়ে আছে স্টোনহেঞ্জ। হাজার হাজার বছর ধরে এই বিশাল পাথরের কাঠামোটি বিজ্ঞানীদের ভাবিয়েছে। এর কেন্দ্রে রয়েছে ৬ টন ওজনের বিশাল এক বেলেপাথর, যাকে বলা হয় অ্যাল্টার স্টোন।
এত দিন মনে করা হতো, এটি হয়তো স্থানীয় কোনো পাহাড় বা ওয়েলসের দক্ষিণ-পশ্চিমের প্রিসেলি হিলস থেকে আনা। কিন্তু সম্প্রতি বিজ্ঞানীরা এক বিস্ময়কর তথ্য আবিষ্কার করেছেন। এই অ্যাল্টার স্টোনের আসল বাড়ি দক্ষিণ ইংল্যান্ড নয়, বরং সেখান থেকে ৭০০ কিলোমিটার দূরের উত্তর-পূর্ব স্কটল্যান্ড!
চার হাজার বছর আগে তো আর বিশাল ক্রেন বা আধুনিক ট্রাকের কোনো অস্তিত্ব ছিল না। তাহলে ৬ টন ওজনের এই দানবীয় পাথরটি এত বিশাল পথ পাড়ি দিল কীভাবে? এই রহস্যের জট খুলতেই বিজ্ঞানীরা নতুন এক গবেষণায় মেতেছেন।
২০২৪ সালে একদল ভূবিজ্ঞানী পাথরটির রাসায়নিক গঠন বিশ্লেষণ করেন। তাঁরা দেখতে পান, স্কটল্যান্ডের একেবারে উত্তরের অর্কাডিয়ান বেসিনের প্রাচীন লাল বেলেপাথরের সঙ্গে এর হুবহু মিল রয়েছে। শুরুতে বিজ্ঞানীরা ভেবেছিলেন, হয়তো প্রাকৃতিকভাবেই পাথরটি সেখানে পৌঁছেছে। বরফ যুগে বিশাল সব হিমবাহ যখন ঘন সিরাপের মতো মাটির ওপর দিয়ে গড়িয়ে চলত, তখন হয়তো তারাই পাথরটিকে স্কটল্যান্ড থেকে টেনে দক্ষিণ ইংল্যান্ডে নিয়ে এসেছিল।
২০২৪ সালে একদল ভূবিজ্ঞানী পাথরটির রাসায়নিক গঠন বিশ্লেষণ করে দেখতে পান, স্কটল্যান্ডের একেবারে উত্তরের অর্কাডিয়ান বেসিনের প্রাচীন লাল বেলেপাথরের সঙ্গে এর হুবহু মিল রয়েছে।
কিন্তু হিসাবে বিরাট গলদ দেখা গেল। বিজ্ঞানীরা হিসাব কষে দেখলেন, গত ১০ লাখ বছরে প্রায় সব হিমবাহই উত্তর দিকে এগিয়েছে, অথচ পাথরটির গন্তব্য ছিল ঠিক তার উল্টো—দক্ষিণ দিকে!
সম্প্রতি অস্ট্রেলিয়ার কার্টিন ইউনিভার্সিটির একদল গবেষক এই রহস্যের সমাধানে এগিয়ে এসেছেন। খনিজ পদার্থের বয়স নির্ধারণ এবং আইস-শিট মডেলিং ব্যবহার করে তাঁরা প্রমাণ করেছেন, পুরো ৭০০ কিলোমিটার পথ কেবল হিমবাহের পক্ষে পাড়ি দেওয়া কোনোভাবেই সম্ভব নয়।
তবে তাঁরা একটি নতুন সম্ভাবনার কথা জানিয়েছেন। তাঁদের গাণিতিক মডেল বলছে, বরফ যুগের হিমবাহগুলো হয়তো পাথরটিকে স্কটল্যান্ড থেকে টেনে ডগারল্যান্ড পর্যন্ত নিয়ে এসেছিল। ডগারল্যান্ড হলো বর্তমান ইংল্যান্ডের পূর্বে অবস্থিত একটি প্রাচীন ভূখণ্ড, যা এখন উত্তর সাগরের নিচে চিরতরে তলিয়ে গেছে।
হিমবাহের কারণে পাথরটির যাত্রাপথ প্রায় ৩০০ কিলোমিটার কমে গিয়েছিল। কিন্তু তারপরও বাকি থেকে যায় আরও ৪০০ কিলোমিটার পথ! গবেষকদের মতে, এই বাকি পথ কোনো প্রাকৃতিক উপায়ে নয়, বরং মানুষের অমানবিক পরিশ্রমেই পাড়ি দেওয়া হয়েছিল।
কার্টিন ইউনিভার্সিটির গবেষক অ্যান্থনি ক্লার্ক বলেন, ‘প্রাকৃতিক বরফে ভেসে আসার বদলে সব প্রমাণ বলছে, এটি ছিল একটি অত্যন্ত সুপরিকল্পিত কাজ। সে যুগের দুর্গম ও বৈচিত্র্যময় পথ পাড়ি দিয়ে পাথরটিকে ইচ্ছাকৃতভাবেই সেখানে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল।’
অস্ট্রেলিয়ার কার্টিন ইউনিভার্সিটির গবেষকদের গাণিতিক মডেল বলছে, বরফ যুগের হিমবাহগুলো হয়তো অ্যাল্টার স্টোনটিকে স্কটল্যান্ড থেকে টেনে ডগারল্যান্ড পর্যন্ত নিয়ে এসেছিল।
সবচেয়ে অবাক করা ব্যাপার হলো, চার হাজার বছর আগের সেই সময়ে ব্রিটেনে কোনো কেন্দ্রীয় বা সুসংগঠিত শাসনব্যবস্থা ছিল না। তাদের কাছে ছিল না কোনো নিখুঁত ম্যাপ বা আধুনিক যন্ত্রপাতি। তারপরও এত বিশাল একটি পাথরকে এতটা পথ বয়ে নেওয়াটা ছিল চরম অধ্যবসায়, নিখুঁত পরিকল্পনা এবং দুর্দান্ত সমন্বয়ের ফল। বিজ্ঞানীরা ধারণা করছেন, পাথরটি একবারে নেওয়া হয়নি; বরং ধাপে ধাপে এই যাত্রা সম্পন্ন হয়েছিল। এই যাত্রায় হয়তো স্থলপথে টেনে নেওয়ার পাশাপাশি নদী বা উপকূলীয় জলপথকেও কাজে লাগানো হয়েছিল।
গবেষকেরা এখন স্কটল্যান্ডে অ্যাল্টার স্টোনের একেবারে সুনির্দিষ্ট উৎপত্তিস্থল খোঁজার চেষ্টা করছেন। একই সঙ্গে এই দীর্ঘ যাত্রায় হিমবাহ ঠিক কতটুকু সাহায্য করেছিল, তা-ও নিখুঁতভাবে বের করার কাজ চলছে। এই গবেষণাপত্রটি সম্প্রতি বিজ্ঞান সাময়িকী জার্নাল অব কোয়াটারনারি সায়েন্স-এ প্রকাশিত হয়েছে।