দ্য ক্রিয়েটর: মানবতা ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার এক শ্বাসরুদ্ধকর লড়াই

দ্য ক্রিয়েটর মুভির পোস্টারছবি: আরএনজেড

লস অ্যাঞ্জেলেস শহরটা চোখের পলকে ধ্বংস হয়ে গেল। লাখ লাখ মানুষ মারা গেল এক নিমিষে। এই ভয়াবহ পারমাণবিক বিস্ফোরণের পেছনের খলনায়ক আর কেউ নয়, মানুষেরই তৈরি করা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা! এরপরই শুরু হলো মানবজাতি ও এআইয়ের মধ্যে এক নির্মম ও ধ্বংসাত্মক যুদ্ধ। পশ্চিমা বিশ্ব এআই নিষিদ্ধ করে ধ্বংসযজ্ঞে মেতে উঠল। কিন্তু এশিয়ার কিছু অঞ্চল পশ্চিমাদের কথা মানতে পারল না। সেখানকার মানুষ এআইকে আপন করে নিয়ে তাদের সঙ্গে সহাবস্থান চালিয়ে যেতে লাগল। এই অঞ্চলের নাম দেওয়া হলো ‘নিউ এশিয়া’।

যুদ্ধ থামাতে মার্কিন সামরিক বাহিনী জশুয়া টেইলর নামে এক সাবেক স্পেশাল ফোর্সের এজেন্টকে পাঠায় এক রুদ্ধশ্বাস মিশনে। তার লক্ষ্য, এআইদের রহস্যময় ক্রিয়েটরকে খুঁজে বের করে হত্যা করা। এই ক্রিয়েটরের নাম ‘নির্মাতা’।

দ্য ক্রিয়েটর মুভির দৃশ্য
ছবি: টোয়েন্টিয়েথ সেঞ্চুরি স্টুডিওস

তাকে পশ্চিমা বিশ্বের নেতারা হত্যা করতে চায়। কারণ সে এমন এক ভয়ংকর অস্ত্র তৈরি করেছে, যা পুরো মানবজাতিকে মুছে ফেলতে পারে এবং এই অন্তহীন যুদ্ধের মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারে। কিন্তু শত্রুপক্ষের দুর্ভেদ্য ঘাঁটিতে অনুপ্রবেশ করে জশুয়া যখন সেই ভয়ংকর অস্ত্রের কাছে পৌঁছায়, তখন তার চোখ ছানাবড়া! এই চরম অস্ত্রটি কোনো বোমা বা মিসাইল নয়, বরং মানুষের রূপধারী এক ছোট্ট এআই শিশু! মানবজাতিকে বাঁচাতে তাকে কি এই নিষ্পাপ শিশুটিকে হত্যা করতে হবে? এই শিশুটি কি মানবশিশু নাকি শুধুই এআই? এই যুদ্ধের পেছনে কি অন্য কোনো গহীন সত্য লুকিয়ে আছে? এমন এক শ্বাসরুদ্ধকর ও আবেগময় গল্প নিয়েই তৈরি হয়েছে সায়েন্স ফিকশন থ্রিলার দ্য ক্রিয়েটর

আরও পড়ুন

এই মুভির সবচেয়ে বড় আকর্ষণ হলো এর চোখধাঁধানো ভিজ্যুয়াল ও অসাধারণ ওয়ার্ল্ড-বিল্ডিং। রোগ ওয়ান: আ স্টার ওয়ার্স স্টোরি খ্যাত পরিচালক গ্যারেথ এডওয়ার্ডস এমন এক ভবিষ্যতের পৃথিবী তৈরি করেছেন, যা দেখে মুগ্ধ না হয়ে উপায় নেই। মুভিতে নিউ এশিয়ার যে সাইবারপাঙ্ক রূপ দেখানো হয়েছে, তা এককথায় অবিশ্বাস্য। একদিকে অত্যাধুনিক প্রযুক্তির ছড়াছড়ি, অন্যদিকে সবুজ প্রকৃতি, পাহাড় ও বৌদ্ধমন্দিরের মতো আধ্যাত্মিকতার সঙ্গে রোবটদের সহাবস্থান। সব মিলিয়ে এক অদ্ভুত সুন্দর পরিবেশ তৈরি হয়েছে।

মুভির সবচেয়ে ভয়ংকর সুন্দর অংশটি হলো নোম্যাড। এটি মার্কিনদের তৈরি করা একটি বিশাল স্পেস স্টেশন। মেঘের ওপর থেকে শিকারি পাখির মতো টার্গেট স্ক্যান করে আকাশ থেকে সরাসরি নীল রঙের লেজার হামলা চালায়। এই নোম্যাডের প্রতিটি আক্রমণ এবং শব্দ আপনার বুকে কাঁপন ধরিয়ে দেবে। মুভির সিনেমাটোগ্রাফি এতই নিখুঁত যে, এটি বর্তমান সময়ের অন্যতম সেরা ভিজ্যুয়াল স্পেকট্যাকল হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়ার দাবি রাখে।

জশুয়ার চরিত্রে জন ডেভিড ওয়াশিংটন এবং ছোট্ট এআই শিশু অ্যালফির চরিত্রে শিশুশিল্পী মেডেলিন ইউনা ভয়েলসের অভিনয় দুর্দান্ত
ছবি: টোয়েন্টিয়েথ সেঞ্চুরি স্টুডিওস

তবে এত চমৎকার ভিজ্যুয়াল ও অ্যাকশনের বিশালত্বের কাছে মুভির চিত্রনাট্য মাঝে মাঝে একটু মার খেয়ে গেছে। জশুয়ার চরিত্রে জন ডেভিড ওয়াশিংটন এবং ছোট্ট এআই শিশু অ্যালফির চরিত্রে শিশুশিল্পী মেডেলিন ইউনা ভয়েলসের অভিনয় দুর্দান্ত। তাদের দুজনের রসায়ন ও আবেগময় দৃশ্যগুলো দর্শকদের মন ছুঁয়ে যাবে। কিন্তু মুভির অন্যান্য চরিত্রের পেছনের গল্প বা মানসিক বিকাশে খুব একটা জোর দেওয়া হয়নি।

আরও পড়ুন
দ্য ক্রিয়েটর মুভির পোস্টার
ছবি: আইএমবিডি

একনজরে

দ্য ক্রিয়েটর

পরিচালক: গ্যারেথ এডওয়ার্ডস

লেখক: গ্যারেথ এডওয়ার্ডস, ক্রিস উইটজ

ধরন: সায়েন্স ফিকশন, অ্যাকশন, ড্রামা, অ্যাডভেঞ্চার

মুক্তি: ২০২৩ সাল

ব্যাপ্তি: ২ ঘণ্টা ১৩ মিনিট

আইএমডিবি রেটিং: ৬.৮/১০

আরও পড়ুন

এ ছাড়া গল্পের প্লট অনেকটাই অনুমান করা যায়। মানবতা বনাম এআইয়ের এই দ্বন্দ্ব নিয়ে আমরা আগেই ব্লেড রানার বা টার্মিনেটর-এর মতো ক্লাসিক মুভি দেখেছি। সেই তুলনায় দ্য ক্রিয়েটর-এর গল্পে খুব নতুন কোনো দার্শনিক গভীরতা নেই। মুভির শেষের দিকে সামরিক কৌশল ও ফিজিকসের লজিক বেশ দুর্বল মনে হতে পারে। এত বিশাল একটা স্পেস স্টেশনে নিরাপত্তা ব্যবস্থা কেন এত ঠুনকো, সেটা ভেবে দর্শকেরা কিছুটা হতাশ হতে পারেন।

দ্য ক্রিয়েটর মুভির দৃশ্য
ছবি: টোয়েন্টিয়েথ সেঞ্চুরি স্টুডিওস

এই ছোটখাটো ত্রুটিগুলো বাদ দিলে দ্য ক্রিয়েটর অত্যন্ত উপভোগ্য একটি মুভি। আপনি যদি ব্লেড রানার ২০৪৯-এর মতো খুব ধীরস্থির এবং গভীর দার্শনিক চিন্তার মুভি খোঁজেন, তবে এটি হয়তো আপনার পুরোপুরি মন ভরাতে পারবে না। কিন্তু আপনি যদি চোখধাঁধানো ভিজ্যুয়াল, দুর্দান্ত অ্যাকশন, ইমোশনাল ড্রামা এবং অরিজিনাল সায়েন্স ফিকশন দেখতে ভালোবাসেন, তবে দ্য ক্রিয়েটর আপনাকে হতাশ করবে না। বর্তমান সময়ে এআই নিয়ে যখন আমাদের মনে এত ভয় ও কৌতূহল, তখন এই মুভিটি আপনাকে ভালো-মন্দের সংজ্ঞা নিয়ে নতুন করে ভাবাতে বাধ্য করবে।

আরও পড়ুন