৬ বছর পর ঘুম ভাঙল বিশ্বের সবচেয়ে বড় অ্যাসিড গিজারের

বিশ্বের সবচেয়ে বড় অ্যাসিড গিজার ইকাইনাস গিজারছবি: কালভো / ভি-ডব্লিউ পিকস / ইউনিভার্সাল ইমেজ / গেটি ইমেজ

মাটির নিচ থেকে ফুটন্ত পানি ও বাষ্প যখন প্রচণ্ড বেগে ফোয়ারার মতো আকাশের দিকে ছুটে আসে, তখন সেই অদ্ভুত সুন্দর দৃশ্যকে বিজ্ঞানের ভাষায় বলা হয় গিজার। আর গিজার বললেই সবার আগে চোখের সামনে ভেসে ওঠে যুক্তরাষ্ট্রের বিখ্যাত ইয়েলোস্টোন ন্যাশনাল পার্কের কথা। এই পার্কের মাটির নিচে লুকিয়ে আছে এক বিশাল আগ্নেয়গিরি বা সুপারভলকানো। আর তার প্রভাবেই এখানকার মাটি ফুঁড়ে বেরিয়ে আসে হাজারো উষ্ণ প্রস্রবণ ও গিজার।

তবে আজ আপনাদের এমন এক গিজারের গল্প শোনাব, যা সাধারণ কোনো গিজার নয়। এটি হলো বিশ্বের সবচেয়ে বড় অ্যাসিড গিজার! এর নাম ইকাইনাস গিজার। দীর্ঘ ৬ বছর গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন থাকার পর হঠাৎ করেই আবার জেগে উঠেছে ভয়ংকর সুন্দর এই গিজারটি।

অ্যাসিডের ফোয়ারা কেন এত বিরল

ইয়েলোস্টোন ন্যাশনাল পার্কের সবচেয়ে উষ্ণ এবং পরিবর্তনশীল অঞ্চলের নাম নোরিস গিজার বেসিন। এখানেই অবস্থিত আমাদের এই ইকাইনাস গিজার। মজার ব্যাপার হলো, পৃথিবীতে সাধারণ গিজারের দেখা মিললেও অ্যাসিড গিজার খুব বিরল। কিন্তু কেন?

বিজ্ঞানীদের মতে, ইকাইনাস গিজারের ভেতরের অ্যাসিড খুব বেশি ঘন বা শক্তিশালী নয়
ছবি: লিও কোহাউট / শাটারস্টক ডটকম

কারণ অ্যাসিডের ধ্বংসাত্মক ক্ষমতা। গিজারের মাটির নিচে পাথরের তৈরি প্রাকৃতিকভাবে গড়ে ওঠা একধরনের পাইপলাইনের মতো ব্যবস্থা থাকে। ফুটন্ত অ্যাসিডের তীব্রতা এতই বেশি থাকে যে, তা সহজেই এই ভূগর্ভস্থ পাথরগুলোকে গলিয়ে বা ভেঙে ফেলতে পারে। পাথর গলে গেলে গিজারের কাঠামোই নষ্ট হয়ে যায়।

তাহলে ইকাইনাস গিজার কীভাবে টিকে আছে? বিজ্ঞানীরা বলছেন, ইকাইনাস গিজারের ভেতরের অ্যাসিড খুব বেশি ঘন বা শক্তিশালী নয়। ভূগর্ভস্থ অ্যাসিডিক গ্যাস এবং সাধারণ পানি একসঙ্গে মিশে এই গিজারের পানি তৈরি হয়। ফলে এর পানিতে অ্যাসিডের মাত্রা এতটাই কমে যায় যে তা পাথর গলিয়ে ফেলার মতো ক্ষমতা রাখে না।

আরও পড়ুন
ফুটন্ত অ্যাসিডের তীব্রতা এতই বেশি থাকে যে, তা সহজেই এই ভূগর্ভস্থ পাথরগুলোকে গলিয়ে বা ভেঙে ফেলতে পারে। পাথর গলে গেলে গিজারের কাঠামোই নষ্ট হয়ে যায়।

রঙিন পাথর আর ফুটন্ত পানির কুণ্ড

ইকাইনাস গিজারের চারপাশের দৃশ্য দেখলে আপনার মনে হতে পারে, আপনি হয়তো অন্য কোনো গ্রহে চলে এসেছেন! যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা ইউএসজিএস-এর মতে, এখানকার পানির এই অদ্ভুত রাসায়নিক মিশ্রণের কারণেই চারপাশে চমৎকার সব রং ও আকৃতির পাথর তৈরি হয়েছে।

এই গিজারের পুল লম্বায় প্রায় ৬৬ ফুট! এর চারপাশে ছড়িয়ে আছে সিলিকা দিয়ে ঢাকা কাঁটাযুক্ত অদ্ভুত সব পাথর। আর এই পাথরগুলোর রং টকটকে লাল! পানিতে মিশে থাকা লোহা, অ্যালুমিনিয়াম এবং আর্সেনিকের কারণেই চারপাশের মাটি ও পাথরে এমন লালচে মরিচার রং ধরেছে।

ইকাইনাস গিজারের পুল লম্বায় প্রায় ৬৬ ফুট!
ছবি: ইউএসজিএস

ভয়ংকর আর্সেনিক ও অ্যাসিডের কথা শুনে নিশ্চয়ই ভয় পাচ্ছেন? ইউএসজিএস আশ্বস্ত করে বলেছে, এই গিজারের অ্যাসিড খুব একটা বিপজ্জনক নয়। এর অম্লতার মাত্রা অনেকটা আমাদের পরিচিত কমলার রস বা ভিনেগারের মতোই! কিন্তু তাই বলে এতে হাত দেওয়ার কথা ভুলেও চিন্তা করবেন না! কারণ অ্যাসিড না পোড়ালেও এর ফুটন্ত পানি আপনাকে ঠিকই পুড়িয়ে দেবে। এই গিজারের পানির তাপমাত্রা ২০০ ডিগ্রি ফারেনহাইট বা প্রায় ৯৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে। তাই দর্শনার্থীদের সব সময় নিরাপদ দূরত্বে থাকতে বলা হয়।

আরও পড়ুন
ইকাইনাস গিজারের পুল লম্বায় প্রায় ৬৬ ফুট! এর চারপাশে ছড়িয়ে আছে সিলিকা দিয়ে ঢাকা কাঁটাযুক্ত অদ্ভুত সব পাথর। আর এই পাথরগুলোর রং টকটকে লাল!

জেগে ওঠা ও ঘুমিয়ে পড়ার ইতিহাস

ভূতত্ত্ববিদদের মতে, ১৯৪৮ সালের আগে পর্যন্ত ইকাইনাস গিজার বলতে গেলে ঘুমিয়েই ছিল। মাঝেমধ্যে দু-একবার হয়তো জেগে উঠত। কিন্তু ১৯৭০-এর দশকে এসে এটি তার আসল রূপ দেখাতে শুরু করে। তখন প্রতি ৪০ থেকে ৮০ মিনিট পরপরই এটি থেকে ফুটন্ত পানি আকাশের দিকে ছিটকে উঠত।

১৯৮০ এবং ১৯৯০-এর দশকে এর রূপ হয়ে ওঠে আরও ভয়ংকর! তখন একেকবার অগ্ন্যুৎপাত বা পানি ছিটকে ওঠার দৃশ্য টানা ৯০ মিনিটেরও বেশি সময় ধরে চলত। কিন্তু ২০০০ সালের পর থেকে গিজারটি ধীরে ধীরে শান্ত হতে শুরু করে। এর তাপমাত্রা কমে আসে এবং অগ্ন্যুৎপাতও কমে যায়।

দীর্ঘ নীরবতা ভেঙে ২০১৭ সালের শরতে গিজারটি আবার প্রাণ ফিরে পায়। ওই বছরের ১৮ অক্টোবর থেকে ১০ নভেম্বর পর্যন্ত এটি প্রতি দুই থেকে তিন ঘণ্টা পরপর নিয়মিত পানি ছিটাতে থাকে। কিন্তু এরপরই আবার দীর্ঘ ঘুম! ২০১৮ এবং ২০১৯ সালে মাত্র একবার করে, আর ২০২০ সালের ডিসেম্বরে মাত্র দুবার জেগে উঠেছিল এটি।

গিজারটির ওপরিভাগের পানি টগবগ করে ফুটতে শুরু করে এবং চারপাশের নালা দিয়ে প্রচুর পানি উপচে পড়তে থাকে
ছবি: ইউএসজিএস

অবশেষে দীর্ঘ ৬ বছরের বিরতি দিয়ে এই বছরের ফেব্রুয়ারির শুরুতে গিজারটি আবার অস্থির হয়ে ওঠে। এর ওপরিভাগের পানি টগবগ করে ফুটতে শুরু করে এবং চারপাশের নালা দিয়ে প্রচুর পানি উপচে পড়তে থাকে। ১৬ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হয় আসল চমক! গিজারটি প্রতি দুই থেকে পাঁচ ঘণ্টা পরপর ফুটন্ত অ্যাসিড ও পানির মিশ্রণ আকাশের দিকে ছুড়ে মারতে শুরু করে। একেকবার এই অগ্ন্যুৎপাত ২ থেকে ৩ মিনিট স্থায়ী হয়েছে এবং পানি প্রায় ২০ থেকে ৩০ ফুট ওপর পর্যন্ত ছিটকে উঠছে! বিজ্ঞানীরা বলছেন, গিজারের এই বর্তমান আচরণ ২০১৭ সালের সেই জেগে ওঠার প্যাটার্নের সঙ্গেই হুবহু মিলে যাচ্ছে।

আরও পড়ুন
দীর্ঘ নীরবতা ভেঙে ২০১৭ সালের শরতে ইকাইনাস গিজারটি আবার প্রাণ ফিরে পায়। ওই বছরের ১৮ অক্টোবর থেকে ১০ নভেম্বর পর্যন্ত এটি প্রতি দুই থেকে তিন ঘণ্টা পরপর নিয়মিত পানি ছিটাতে থাকে।

ঘরে বসেই দেখুন গিজারের লাইভ আপডেট

আপনি যদি হাজার মাইল দূরে বসেও এই গিজারের খবর রাখতে চান, তবে তারও ব্যবস্থা আছে! ইয়েলোস্টোন ভলকানো অবজারভেটরির ওয়েবসাইটে গিয়ে আপনি খুব সহজেই এর তাপমাত্রার গ্রাফ বা দেখতে পারেন। গ্রাফের কাঁটা যখন ১০৪ ডিগ্রি ফারেনহাইটে পৌঁছায়, তখন বুঝতে হবে গিজারের পানি ফুলে উঠছে। আর যখন কাঁটা লাফিয়ে ১৫৮ ডিগ্রি ফারেনহাইটে চলে যায়, তখন বুঝবেন গিজারটি এই মুহূর্তে পানি ওপরে ছুড়ে মারছে!

বিজ্ঞানীরা ধারণা করছেন, গিজারের এই জেগে ওঠা হয়তো খুব বেশি দিন স্থায়ী হবে না। গ্রীষ্মের পর্যটন মৌসুম আসার আগেই হয়তো এটি আবার গভীর ঘুমে তলিয়ে যাবে। তাই প্রকৃতির এই জাদুকরী মুহূর্তটি ফুরিয়ে যাওয়ার আগেই খোঁজ রাখুন!

লেখক: প্রাক্তন শিক্ষার্থী, গণিত বিভাগ, সরকারি তিতুমীর কলেজ, ঢাকা

সূত্র: পপুলার সায়েন্স

আরও পড়ুন