পৃথিবীর যে জায়গা দেখতে হুবহু মঙ্গল গ্রহের মতো

তুরস্কের সালদা নামে একটি জলাশয়ের সঙ্গে মঙ্গল গ্রহের জেজেরো ক্রেটারের অনেক মিল রয়েছেছবি: গেটি ইমেজ

সৌরজগতে লাল গ্রহ নামে পরিচিত মঙ্গল গ্রহ। কোটি কোটি মাইল দূরের মঙ্গলে না গিয়ে যদি পৃথিবীতেই এর মতো কোনো স্থানের দেখা মিলত, তবে কেমন হতো? বিষয়টি কাল্পনিক মনে হলেও পৃথিবীতে আসলেই এমন একটি জায়গা রয়েছে, যার পরিবেশ ও চারপাশের গঠন মঙ্গল গ্রহের মতোই শুষ্ক ও পাথুরে। সেখানে গেলে মনে হবে মঙ্গল গ্রহেরই কোনো একটি হ্রদ।

তুরস্কের সালদা নামে একটি জলাশয়ের সঙ্গে মঙ্গল গ্রহের জেজেরো ক্রেটারের অনেক মিল রয়েছে। এই হ্রদটি পৃথিবীর একমাত্র জায়গা, যার মাটির গঠন ও খনিজ উপাদানগুলো মঙ্গল গ্রহের সেই প্রাচীন ক্রেটারের খনিজের সঙ্গে মিলে যায়। মঙ্গলের সঙ্গে এই অদ্ভুত মিল থাকার কারণেই বিজ্ঞানীরা সালদা হ্রদের পরিবেশ নিয়ে গবেষণা করেন। ২০২১ সালে নাসার পারসিভারেন্স রোভার মঙ্গলের মাটিতে অবতরণ করার ঠিক আগে এই পরীক্ষাটি চালান।

সালদা হ্রদ তুরস্কের অন্যতম গভীর একটি হ্রদ, যার সর্বোচ্চ গভীরতা প্রায় ৬৪৩ ফুট বা ১৯৬ মিটার। এই হ্রদের পাড় বা তীরবর্তী এলাকা গুঁড়ো হাইড্রোম্যাগনেসাইট নামে একটি খনিজ উপাদান দিয়ে ঢাকা। এটি মূলত ম্যাগনেশিয়ামসমৃদ্ধ একটি কার্বনেট খনিজ, যা গুহায় কিংবা নির্দিষ্ট কিছু হ্রদের তীরে তৈরি হয়। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই খনিজটি কোটি কোটি বছর আগের অতিক্ষুদ্র অণুজীব বা ব্যাকটেরিয়ার জীবাশ্ম নিজের ভেতরে সুরক্ষিত রাখতে পারে।

আরও পড়ুন
সালদা হ্রদ তুরস্কের অন্যতম গভীর একটি হ্রদ, যার সর্বোচ্চ গভীরতা প্রায় ৬৪৩ ফুট বা ১৯৬ মিটার। এই হ্রদের পাড় বা তীরবর্তী এলাকা গুঁড়ো হাইড্রোম্যাগনেসাইট নামে একটি খনিজ উপাদান দিয়ে ঢাকা।

ওয়েস্টার্ন ওয়াশিংটন ইউনিভার্সিটির গ্রহবিজ্ঞানী ব্র্যাড গারজিনস্কি নাসার আর্থ অবজারভেটরিকে বিষয়টি জানান। তিনি বলেন, ‘কার্বনেট খনিজ বিজ্ঞানীদের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, এই খনিজগুলো তাদের চারপাশের পরিবেশে থাকা অতিক্ষুদ্র অণুজীব, জৈব উপাদান বা প্রাচীন প্রাণের যেকোনো প্রমাণকে বছরের পর বছর নিজের ভেতরে অক্ষত অবস্থায় আটকে রাখতে পারে।’

সালদা হ্রদের তীরে জমে থাকা হাইড্রোম্যাগনেসাইট খনিজগুলো সম্ভবত মাইক্রোবায়ালাইট নামে একধরনের স্তূপ ভেঙে তৈরি হয়েছে। এই মাইক্রোবায়ালাইটগুলো দেখতে প্রবালপ্রাচীরের মতো পাথুরে স্তূপ হলেও এগুলো মূলত তৈরি হয়েছে অতিক্ষুদ্র অণুজীবের মাধ্যমে। নাসার আর্থ অবজারভেটরির তথ্য অনুযায়ী, এই হ্রদে এখনো এমন অনেক আস্ত মাইক্রোবায়ালাইট রয়েছে, যেগুলো সময়ের সঙ্গে ক্ষয়ে গিয়ে একপর্যায়ে তীরের বালুতে পরিণত হবে।

নাসার মার্স রিকনসান্স অরবিটার মহাকাশযানের পাঠানো তথ্য ব্যবহার করে বিজ্ঞানীরা ২০১৯ সালে মঙ্গলের জেজেরো ক্রেটারের পশ্চিম প্রান্তেও ঠিক একই ধরনের খনিজ উপাদান খুঁজে পান। এই আবিষ্কার থেকে ধারণা করা হয়, জেজেরো ক্রেটারেও একসময় একটি হ্রদ ছিল। পরে পারসিভারেন্স রোভার মঙ্গলের মাটিতে নেমে এই ধারণাকে সত্যি বলে প্রমাণ করে। রোভারটি জেজেরো ক্রেটারের ভেতরে কোটি কোটি বছর আগের একটি হ্রদের খনিজ উপাদানের স্পষ্ট প্রমাণ খুঁজে পায়।

আরও পড়ুন
নাসার মার্স রিকনসান্স অরবিটার মহাকাশযানের পাঠানো তথ্য ব্যবহার করে বিজ্ঞানীরা ২০১৯ সালে মঙ্গলের জেজেরো ক্রেটারের পশ্চিম প্রান্তেও ঠিক একই ধরনের খনিজ উপাদান খুঁজে পান।

সালদা হ্রদ ও মঙ্গলের জেজেরো ক্রেটারের মধ্যে আরও একটি বড় মিল রয়েছে। তা হলো এদের বদ্বীপ। নদী যখন কোনো হ্রদ বা বড় জলাশয়ে এসে মেশে, তখন নদীর বয়ে আনা পলি জমে এই বদ্বীপ তৈরি হয়। জেজেরো ক্রেটারে কীভাবে পানি এসে জমা হয়েছিল, সে বিষয়ে বিজ্ঞানীরা গবেষণা করেছেন। তুরস্কের সালদা হ্রদের বদ্বীপ নিয়ে গবেষণা করেই বিজ্ঞানীরা মঙ্গলের জেজেরো ক্রেটারের ঠিক কোন কোন জায়গায় প্রাণের সন্ধান করা উচিত, তা আগে থেকেই নির্দিষ্ট করতে পেরেছিলেন।

বিজ্ঞানীদের মতে, সালদা হ্রদে গেলে দারুণ একটি অভিজ্ঞতা হয়। এটি দেখলে বোঝা যায়, কোটি কোটি বছর আগে মঙ্গলের জেজেরো হ্রদের তীর ঠিক কেমন ছিল। এই হ্রদ মানুষকে প্রাচীন মঙ্গলের পরিবেশ সম্পর্কে একটি বাস্তব ধারণা দেয়।

মঙ্গলে প্রাচীন প্রাণের সম্ভাব্য চিহ্ন খুঁজতে এই হ্রদ নিয়ে গবেষণা করছেন বিজ্ঞানীরা
ছবি: গেটি ইমেজ

সিএনএনের তথ্য অনুযায়ী, সালদা হ্রদের চারপাশের এলাকায় প্রায় ৩০০টির বেশি প্রজাতির গাছপালা ও ৩০ প্রজাতির জলচর পাখি বসবাস করে। এ কারণে প্রকৃতিপ্রেমী ও পর্যটকদের কাছে এটি একটি পছন্দের জায়গা। এই হ্রদটি পামুক্কালে ট্র্যাভারটাইন নামে একটি জায়গা থেকে গাড়িতে খুব অল্প দূরত্বের মধ্যে অবস্থিত। পামুক্কালে মূলত উষ্ণ পানির তৈরি একধরনের চমৎকার প্রাকৃতিক চুনাপাথরের পাহাড়ি গঠন। এটি দেখতে হাজার হাজার মানুষ প্রতিবছর সেখানে ভিড় করেন।

সূত্র: লাইভ সায়েন্স

আরও পড়ুন