মঙ্গলে বসবাসের জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত জায়গা কোনটি

মঙ্গলে বসবাসের জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত জায়গা কোনটি? বিজ্ঞানীরা বহুদিন ধরে এমন এক জায়গার খোঁজ করছিলেন, যেখানে পর্যাপ্ত সূর্যালোকের পাশাপাশি মিলবে পানির উৎস। অবশেষে তেমন জায়গা মিলেছে। এই আবিষ্কার কি মঙ্গলে মানুষের বসতি গড়ার স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দেবে?

গবেষকেরা মঙ্গল গ্রহে মানুষের বসবাসের জন্য উপযুক্ত জায়গা খুঁজে পেয়েছেনছবি: শাটারস্টোক

মঙ্গল গ্রহে মানুষের বসতি গড়ার স্বপ্ন অনেক দিনের। কিন্তু পৃথিবী ছেড়ে ভিনগ্রহে পাড়ি জমানো তো আর চাট্টিখানি কথা নয়! মঙ্গলে যাওয়ার আগে বিজ্ঞানীদের প্রথমে ভাবতে হবে, মানুষ মঙ্গলে গিয়ে কোথায় নামবে? এমন একটা জায়গা দরকার যেখানে নিরাপদে অবতরণের পাশাপাশি বেঁচে থাকার রসদও মিলবে।

সম্প্রতি ইউনিভার্সিটি অব মিসিসিপির একদল গবেষক দাবি করেছেন, তাঁরা হয়তো সেরকম একটি জায়গা খুঁজে পেয়েছেন। নতুন এই গবেষণায় নেতৃত্ব দিয়েছেন প্ল্যানেটারি জিওলজিস্ট এরিকা লুজ্জি। তাঁদের গবেষণা বলছে, মঙ্গলের একটি নির্দিষ্ট অঞ্চলে মাটির ঠিক নিচেই লুকিয়ে আছে বরফ।

শিল্পীর কল্পনায় মঙ্গল গ্রহ
ছবি: সংগৃহীত

জার্নাল অব জিওফিজিক্যাল রিসার্চ: প্ল্যানেটস-এ প্রকাশিত গবেষণায় বলা হয়েছে, মঙ্গলের পৃষ্ঠের মাত্র এক মিটারেরও কম গভীরতায় এই পানির বরফ থাকতে পারে। নাসার আমেস রিসার্চ সেন্টারের বে এরিয়া এনভায়রনমেন্টাল রিসার্চ ইনস্টিটিউটের গবেষক এরিকা লুজ্জি বলেন, ‘মঙ্গলে মানুষ পাঠাতে চাইলে আমাদের পানি লাগবেই। এটা শুধু খাওয়ার জন্য নয়, রকেটের জ্বালানি এবং আরও নানা কাজের জন্যও পানি অপরিহার্য।’ পৃথিবী থেকে সব রসদ বয়ে নিয়ে যাওয়া অসম্ভব। তাই বিজ্ঞানীরা চাইছেন স্থানীয় সম্পদ ব্যবহার করতে। আর মাটির অল্প নিচে বরফ থাকা মানে খুব সহজেই সেই পানি তুলে ব্যবহার করা যাবে।

আরও পড়ুন
গবেষক এরিকা লুজ্জি বলেন, ‘মঙ্গলে মানুষ পাঠাতে চাইলে আমাদের পানি লাগবেই। এটা শুধু খাওয়ার জন্য নয়, রকেটের জ্বালানি এবং আরও নানা কাজের জন্যও পানি অপরিহার্য।’

বিজ্ঞানীরা হাই-রেজোলিউশন ছবি বিশ্লেষণ করে মঙ্গলের অ্যামাজোনিস প্ল্যানিশিয়া নামে এলাকাটিকে চিহ্নিত করেছেন। এটি মঙ্গলের মধ্য-অক্ষাংশে অবস্থিত। কেন এই জায়গাটিই সেরা? কারণ, মধ্য-অক্ষাংশে কিছু ভারসাম্য বজায় থাকবে। এখানে পর্যাপ্ত সূর্যালোক আছে। এই সূর্যের আলোর সাহায্যেই তৈরি করা যাবে বিদ্যুৎ। আবার এই জায়গা এতটাই ঠান্ডা যে মাটির নিচের বরফ গলে বা বাষ্প হয়ে উড়ে যায় না। অর্থাৎ, শক্তি এবং পানি এখানেই পাওয়ার সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি।

স্যাটেলাইট থেকে তোলা মঙ্গলের অ্যামাজোনিস প্ল্যানিশিয়া অঞ্চলের ছবি
ছবি: নাসা

নভোচারীদের দীর্ঘ সময় মঙ্গলে থাকার জন্য এই বরফ খুব দরকার। কারণ এগুলো গলিয়ে খাওয়ার পানি, শ্বাস নেওয়ার অক্সিজেন এবং রকেটের জ্বালানিও তৈরি করা যাবে। গবেষণার সহ-লেখক এবং ইতালিয়ান স্পেস এজেন্সির গবেষক জিয়াকোমো নজৌমি বলেন, ‘চাঁদের ক্ষেত্রে ব্যাপারটা ভিন্ন। সেখানে রসদ ফুরিয়ে গেলে পৃথিবী থেকে গিয়ে এক সপ্তাহের মধ্যে দিয়ে আসা সম্ভব। কিন্তু মঙ্গলে যেতে লাগে কয়েক মাস। তাই মঙ্গলে আমাদের এমন প্রস্তুতি নিয়ে যেতে হবে যেন পৃথিবী থেকে দীর্ঘ সময় কোনো সাহায্য না এলেও আমরা টিকে থাকতে পারি।’

আরও পড়ুন
মঙ্গল গ্রহের মধ্য-অক্ষাংশে কিছু ভারসাম্য বজায় থাকবে। এখানে পর্যাপ্ত সূর্যালোক আছে। এই সূর্যের আলোর সাহায্যেই তৈরি করা যাবে বিদ্যুৎ।

বরফের উপস্থিতি শুধু টিকে থাকার জন্যই নয়, এটি মঙ্গলের অতীত ইতিহাস জানার জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। এর সঙ্গে অ্যাস্ট্রোবায়োলজির গভীর সম্পর্ক আছে। পৃথিবীতে বরফের মধ্যে প্রাচীন প্রাণের চিহ্ন পাওয়া গেছে। বরফের মধ্যে অণুজীবও বেঁচে থাকতে পারে। মঙ্গলের এই বরফ পরীক্ষা করলে হয়তো জানা যাবে, গ্রহটি একসময় বাসযোগ্য ছিল কি না।

স্যাটেলাইট থেকে তোলা মঙ্গলের অ্যামাজোনিস প্ল্যানিশিয়া অঞ্চলের ছবি
ছবি: নাসা

মহাকাশ থেকে ছবি দেখে বিজ্ঞানীরা প্রায় নিশ্চিত হলেও শতভাগ নিশ্চিয়তা দিচ্ছেন না। কারণ, শতভাগ নিশ্চিত হলে মঙ্গলে রোবট পাঠাতে হবে। তবে ছবি দেখে বরফের যে চিহ্ন পাওয়া গেছে। তাও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। রোবট বা ল্যান্ডার পাঠালে হয়তো আসলেই ওখানে মাটির নিচে বরফ পাওয়া যাবে!

লেখক: সহকারী শিক্ষক, গণিত বিভাগ, পদ্মা ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজ, শরীয়তপুর

সূত্র: সায়েন্স ডেইলি

আরও পড়ুন