চীনের বিলবোর্ডে তারকাদের হটিয়ে কেন জায়গা পাচ্ছেন বিজ্ঞানীরা
শহরের সবচেয়ে ঝলমলে শপিংমল কিংবা ব্যস্ত ওভারপাসের ওপর থাকা বিশালাকার ডিজিটাল স্ক্রিনগুলো সাধারণত মুভির পোস্টার বা খেলার মাঠের তারকাদের দখলে থাকে। হরহামেশাই নামীদামি ব্র্যান্ডের চোখধাঁধানো বিজ্ঞাপনও দেখা যায়। মাঝেমধ্যে কোনো রাজনীতিবিদের চওড়া হাসিমুখও দেখতে পারেন। কিন্তু আপনি যদি সম্প্রতি চীনের কোনো শহরের রাস্তায় হাঁটেন, তাহলে আপনার চোখের সামনে ভেসে উঠবে সম্পূর্ণ ভিন্ন এক দৃশ্য। সেখানে নায়ক-নায়িকা বা সেলিব্রেটির বদলে শহরের সবচেয়ে দামি বিলবোর্ডগুলো দখল করে আছেন এমন সব মানুষ, যারা হয়তো সারা জীবন ল্যাবরেটরির নিভৃত কোণে দিনের পর দিন কাজ করেছেন। চীনের বড় বড় শহরের সবচেয়ে আকর্ষণীয় বিজ্ঞাপনচিত্রগুলোতে এখন শোভা পাচ্ছে বিজ্ঞানীদের ছবি!
শানডং প্রদেশ থেকে শুরু হওয়া এই অভিনব ট্রেন্ড এখন আনহুই, ইনার মঙ্গোলিয়া, চিয়াংশি থেকে শুরু করে গোটা চীনে ছড়িয়ে পড়েছে। বিশাল সব স্ক্রিনে ভেসে উঠছে চীনের মহাকাশ ও ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচির জনক চিয়েন শুয়েসেন, ম্যালেরিয়ার যুগান্তকারী ওষুধ আর্টেমিসিনিন আবিষ্কারক নোবেলজয়ী চিকিৎসাবিজ্ঞানী তু ইউইউ কিংবা হাইব্রিড ধানের জনক, কৃষিব্যবস্থায় বিপ্লব আনা বিজ্ঞানী ইউয়ান লংপিংয়ের মতো মানুষদের মুখ। সঙ্গে জুড়ে দেওয়া হচ্ছে তাঁদের অভাবনীয় সব আবিষ্কারের গল্প। সাধারণ মানুষ, এমনকি বিদেশ থেকে আসা পর্যটকরাও রীতিমতো দাঁড়িয়ে এসব স্ক্রিনের সামনে সেলফি তুলছেন!
চীন সরকার চায়, আগামী প্রজন্ম গভীরভাবে উপলব্ধি করুক, শুধুই গ্ল্যামার বা অভিনয় নয়, বরং জ্ঞান, নিরলস সাধনা এবং দেশের প্রতি সেবাই হলো সত্যিকারের তারকা হওয়ার মাপকাঠি।
হঠাৎ কেন চীনে এই পরিবর্তন
সোশ্যাল মিডিয়া ও ইন্টারনেটের এই যুগে যুক্তরাষ্ট্র বা যুক্তরাজ্যের মতো পশ্চিমা দেশগুলোর শিশুদের নিয়ে হওয়া সাম্প্রতিক জনমত জরিপগুলো একটি ভয়ংকর সত্য সামনে এনেছে। ওসব দেশের শিশুদের কাছে এখন জীবনের সবচেয়ে বড় স্বপ্ন হলো সোশ্যাল মিডিয়া ইনফ্লুয়েন্সার হওয়া। এককথা টিকটকার বা ফেসবুক সেলিব্রেটি হওয়া। অন্যদিকে, চীনের শিশুরা স্বপ্ন দেখছে নভোচারী বা বড় মাপের বিজ্ঞানী হওয়ার। এর পেছনের কারণটা কিন্তু লুকিয়ে আছে ওই বিলবোর্ডগুলোতেই!
একটি শিশু যখন প্রতিদিন স্কুলে যাওয়ার পথে শহরের সবচেয়ে সুন্দর ও আলোকিত জায়গায় কোনো বিজ্ঞানীর ছবি দেখে, তখন অবচেতনভাবেই তার মনে বিজ্ঞানীদের প্রতি এক ধরনের বীরত্বের ধারণা তৈরি হয়। চীন সরকার সাধারণ তারকাদের সমকক্ষ হিসেবে বিজ্ঞানীদের দাঁড় করাতে চাইছে। তারা চায়, আগামী প্রজন্ম গভীরভাবে উপলব্ধি করুক, শুধুই গ্ল্যামার বা অভিনয় নয়, বরং জ্ঞান, নিরলস সাধনা এবং দেশের প্রতি সেবাই হলো সত্যিকারের তারকা হওয়ার মাপকাঠি।
আন্তর্জাতিক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলোতে বিদেশি নেটিজেনরাও চীনের এই উদ্যোগ দেখে দারুণভাবে অভিভূত। অনেকেই আবেগাপ্লুত হয়ে লিখছেন, ‘বিজ্ঞানীদেরই তো আসল আইডল হওয়া উচিত!’ কেউ আবার লিখেছেন, ‘আমাদের দেশেও এমনটা করা দরকার, যাতে শিশুরা সত্যিকারের রোল মডেল খুঁজে পায়।’
হাজার বছর ধরে কনফুসীয় আদর্শে বিশ্বাসী এই জাতি জ্ঞান, বিজ্ঞান এবং মানুষের পরিশ্রমকে সর্বোচ্চ সম্মান দিয়ে এসেছে। তারই আধুনিক এবং দৃশ্যমান রূপ হলো এই প্রাইম সিটি বিলবোর্ড ক্যাম্পেইন।
কোটি টাকার বিজ্ঞাপনের জায়গা কেন বিনা মূল্যে পাচ্ছেন গবেষকেরা
আপনার মনে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগতে পারে, এতদিন ধরে বিশ্বের অন্য কোনো দেশ কেন এমনটা করার কথা ভাবল না? আর চীনই বা হঠাৎ কেন এই পথে হাঁটল? এর উত্তর আছে বৈশ্বিক অর্থনীতি ও সংস্কৃতির একেবারে গভীরে। সারা বিশ্বেই এত দিন ধরে একটি অলিখিত নিয়ম চলে আসছিল, পাবলিক বিলবোর্ড মানেই তা বাণিজ্যিক পণ্যের দখলে থাকবে। পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় শহরের সবচেয়ে দামি জায়গাগুলো বিক্রি হয় সর্বোচ্চ দরদাতার কাছে। সেখানে বিজ্ঞানীদের প্রচার করার মতো আর্থিক বা বাণিজ্যিক কোনো লাভ তাৎক্ষণিকভাবে চোখে পড়ে না। ফলে যুগ যুগ ধরে বিজ্ঞানীরা বরাবরই থেকে গেছেন আড়ালে।
কিন্তু চীন হাঁটছে সম্পূর্ণ ভিন্ন এক দর্শনে। হাজার বছর ধরে কনফুসীয় আদর্শে বিশ্বাসী এই জাতি জ্ঞান, বিজ্ঞান এবং মানুষের পরিশ্রমকে সর্বোচ্চ সম্মান দিয়ে এসেছে। তারই আধুনিক এবং দৃশ্যমান রূপ হলো এই প্রাইম সিটি বিলবোর্ড ক্যাম্পেইন। সাম্প্রতিক সময়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, হিউম্যানয়েড রোবট, বৈদ্যুতিক গাড়ি কিংবা মহাকাশ গবেষণায় চীন যে অবিশ্বাস্য দাপট দেখাচ্ছে, বিদেশিরা আগে তার কারণ খুঁজে বেড়াত। তারা ভাবত, ‘চীন এত কিছু কীভাবে অর্জন করছে’? এখন চীনের রাস্তায় ঘুরতে আসা পর্যটকেরা বিলবোর্ডের দিকে তাকিয়েই সেই উত্তর পেয়ে যাচ্ছেন। যে জাতি বিজ্ঞান ও বিজ্ঞানীদের শহরের সবচেয়ে দামি ও সম্মানজনক জায়গায় বসাতে জানে, তাদের প্রযুক্তিগত উত্থান যে অবধারিত, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। একটি দেশ যখন বিজ্ঞানকে সম্মান করে, তখন তার উন্নয়নের ভিত এমনিতেই মজবুত হয়ে যায়।
শহরের কেন্দ্রে সগর্বে দাঁড়িয়ে থাকা এই বিজ্ঞানীদের ছবিগুলো তাই শুধু কোনো সস্তা বিজ্ঞাপন নয়, এগুলো আধুনিক বিশ্বের সামনে জ্ঞান, প্রজ্ঞা ও মানবতার এক নীরব কিন্তু অত্যন্ত শক্তিশালী অহংকার।
তা ছাড়া, এই বিজ্ঞানীদের অবদান তো শুধু চীনের নিজস্ব গণ্ডিতে আটকে নেই। ইউয়ান লংপিংয়ের হাইব্রিড ধান কিংবা তু ইউইউর ম্যালেরিয়ার ওষুধ গোটা বিশ্বের কোটি কোটি মানুষের প্রাণ বাঁচিয়েছে। বেইডু ন্যাভিগেশন সিস্টেম আজ বিশ্বজুড়ে ব্যবহৃত হচ্ছে এবং চীনের মহাকাশ স্টেশন এখন সব দেশের বিজ্ঞানীদের গবেষণার জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়েছে। কনফুসীয় দর্শনের সেই অমোঘ বাণী—‘একজন মানবিক মানুষ নিজে যা অর্জন করতে চায়, তা অন্যদেরও অর্জন করতে সাহায্য করে’—যেন অক্ষরে অক্ষরে প্রতিফলিত হচ্ছে এখানে।
শহরের কেন্দ্রে সগর্বে দাঁড়িয়ে থাকা এই বিজ্ঞানীদের ছবিগুলো তাই শুধু কোনো সস্তা বিজ্ঞাপন নয়, এগুলো আধুনিক বিশ্বের সামনে জ্ঞান, প্রজ্ঞা ও মানবতার এক নীরব কিন্তু অত্যন্ত শক্তিশালী অহংকার। এই দৃশ্যপট হয়তো খুব শিগগিরই বিশ্বের আরও অনেক দেশকে তাদের আসল হিরোদের চিনতে এবং সম্মান জানাতে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করবে।