রবার্ট হুকের স্প্রিং-রহস্য

বল যত বাড়ে, স্প্রিং তত বেশি প্রসারিত হয়ছবি: হুক'স ল এক্সপেরিমেন্ট

ছোটবেলায় বলপয়েন্ট কলম হাতে পেলেই ভেতরের পুঁচকে স্প্রিংটা বের করে খেলেননি, এমন মানুষ হয়তো খুব কম আছে। স্প্রিংটাকে হালকা টান দিলে লম্বা হতো, আবার ছেড়ে দিলেই টুপ করে আগের জায়গায় ফিরে আসত। আমাদের কাছে এটি স্রেফ একটি খেলা হলেও, পদার্থবিজ্ঞানীদের কাছে কিন্তু এটি এক মহাজাগতিক নিয়মের অংশ! ১৬৭৬ সালে ইংরেজ বিজ্ঞানী রবার্ট হুক এই ছোট্ট মজার ঘটনাটির পেছনে থাকা বিজ্ঞানকে খাতা-কলমে রূপ দিয়েছিলেন। আজ আমরা একে চিনি হুকের সূত্র নামে।

আরও পড়ুন
আপনি যদি স্প্রিংয়ের নিচে ১ কেজি ওজন ঝোলান এবং সেটি ১ সেন্টিমিটার লম্বা হয়, তবে ২ কেজি ঝোলালে সেটি ঠিক ২ সেন্টিমিটারই লম্বা হবে। বল যত বাড়াবেন, স্প্রিংয়ের দৈর্ঘ্যও তত বাড়বে!

স্থিতিস্থাপকতা ও হুকের সূত্র

প্রকৃতিতে প্রতিটি বস্তুরই সহ্য করার একটি নির্দিষ্ট সীমা আছে। বিজ্ঞানের ভাষায়, আপনি যখন কোনো বস্তুকে টেনেহিঁচড়ে লম্বা বা চ্যাপ্টা করার চেষ্টা করছেন, তখন আপনি তার ওপর পীড়ন প্রয়োগ করছেন। ফলে বস্তুটির যে রূপবদল ঘটছে, তাকে বলে বিকৃতি।

বল সরিয়ে নেওয়ার পর বস্তুটি যদি লক্ষ্মী ছেলের মতো আবার আগের জায়গায় ফিরে আসে, তবে তাকে আমরা বলি স্থিতিস্থাপক পদার্থ। যেমন, স্টিলের স্কেল বা স্প্রিং। আর যদি জোরে টেনে লম্বা করার পর সেটা আর আগের চেহারায় না ফেরে, তবে তা হলো প্লাস্টিক পদার্থ। যেমন, কাদামাটি বা চুইংগাম।

হুকের সূত্রটি মূলত কাজ করে স্থিতিস্থাপক সীমার ভেতরে। সহজ কথায়, ‘বস্তুর ওপর প্রযুক্ত বল বা পীড়ন তার প্রসারণ বা বিকৃতির সমানুপাতিক।’ অর্থাৎ আপনি যদি স্প্রিংয়ের নিচে ১ কেজি ওজন ঝোলান এবং সেটি ১ সেন্টিমিটার লম্বা হয়, তবে ২ কেজি ঝোলালে সেটি ঠিক ২ সেন্টিমিটারই লম্বা হবে। বল যত বাড়াবেন, স্প্রিংয়ের দৈর্ঘ্যও তত বাড়বে!

রাবার ব্যান্ড এবং পুটি হলো যথাক্রমে স্থিতিস্থাপক এবং প্লাস্টিক পদার্থের ভালো উদাহরণ
ছবি: শাটারস্টক

গাণিতিক রূপে হুকের সূত্রকে আমরা লিখতে পারি: F = -kx। এখানে F মানে প্রযুক্ত বল বা পীড়ন। x মানে বিকৃতি, প্রসারণ বা বস্তুটির দৈর্ঘ্যের পরিবর্তন। আর k মানে স্প্রিং ধ্রুবক।

আচ্ছা, সমীকরণে ঋণাত্মক বা মাইনাস চিহ্নটা কেন এল বলুন তো? কারণ, আপনি স্প্রিংটিকে টানছেন যেদিকে, স্প্রিংয়ের ভেতরের বলটি তাকে টেনে ফিরিয়ে আনতে চায় ঠিক তার উল্টো দিকে!

আরও পড়ুন
বল সরিয়ে নেওয়ার পর বস্তুটি যদি লক্ষ্মী ছেলের মতো আবার আগের জায়গায় ফিরে আসে, তবে তাকে আমরা বলি স্থিতিস্থাপক পদার্থ। যেমন, স্টিলের স্কেল বা স্প্রিং।

লেখচিত্রের ভাষায় হুকের সূত্র

একটি লেখচিত্রে যদি পীড়ন ও বিকৃতিকে স্থাপন করি, তবে স্থিতিস্থাপক সীমার মধ্যে আমরা একটি সরলরেখা পাব। কিন্তু এই সীমা অতিক্রম করলেই ঘটে বিপত্তি:

১. স্থিতিস্থাপক সীমা: এই সীমার পর আর সরলরেখা থাকে না।

২. ইল্ড পয়েন্ট: যেখানে বস্তু আর স্থিতিস্থাপক থাকে না, স্থায়ীভাবে বিকৃত হতে শুরু করে।

৩. নেকিং ও ভাঙন: বস্তুর প্রস্থচ্ছেদ পাতলা হতে থাকে এবং একসময় তা ছিঁড়ে বা ভেঙে যায়।

বিচ্যুতি ও আধুনিক প্রয়োগ

সব পদার্থ হুকের সূত্র মেনে চলে না। যেমন কাচ খুব বেশি ভঙ্গুর, আবার তামা খুব বেশি প্রসারণশীল; এদের আমরা বলি নন-হুকিয়ান পদার্থ। অন্যদিকে রাবারের মতো কিছু অতি-স্থিতিস্থাপক পদার্থ আছে, যাদের আমরা বলি নিও-হুকিয়ান পদার্থ।

সব পদার্থ হুকের সূত্র মেনে চলে না। যেমন কাচ খুব বেশি ভঙ্গুর
ছবি: শাটারস্টক

প্রতিদিনের জীবনে এর ব্যবহার কোথায়

মুদিদোকানে ডিজিটাল মিটারের আগে যে স্প্রিংওয়ালা ওজন মাপার যন্ত্র ব্যবহার করা হতো, তা কিন্তু এই হুকের সূত্রেই চলত। এ ছাড়া গাড়ির শক-অ্যাবজরবার, হাতঘড়ির ভেতরের ব্যালেন্স স্প্রিং কিংবা সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে বিশাল সব সেতু নির্মাণের হিসাব-নিকাশেও হুকের সূত্র এক অপরিহার্য হাতিয়ার। ল্যাটিন ভাষায় রবার্ট হুক তাঁর এই সূত্রের মূলমন্ত্রটি লিখেছিলেন—Ut tensio, sic vis। বাংলা করলে দাঁড়ায়, ‘যেমন প্রসারণ, তেমন বল।’ প্রকৃতির এই অদ্ভুত ও সুন্দর ভারসাম্যের নিয়মেই কিন্তু বাঁধা আমাদের চারপাশের চেনা জগৎটা!

লেখক: শিক্ষার্থী, পদার্থবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

সূত্র: সায়েন্স এবিসি

আরও পড়ুন