কোয়ান্টাম মেকানিকস নিয়ে ৭টি ভুল ধারণা
কোয়ান্টাম মেকানিকস। নাম শুনলেই কেমন যেন একটা রহস্যের গন্ধ পাওয়া যায়, তাই না? অনিশ্চয়তায় ঘেরা এক অদ্ভুতুড়ে জগৎ এই কোয়ান্টাম দুনিয়া। এখানে অসম্ভব বলে কিছু নেই। চারদিকে শুধু অদ্ভুত সব ঘটনা। কিন্তু সত্যিই কি কোয়ান্টাম জগৎ পুরোটাই পাগলাটে? নাকি আমরাই না বুঝে অনেক কল্পকাহিনি বানিয়ে নিয়েছি? চলুন, আজ কোয়ান্টাম ফিজিকস নিয়ে প্রচলিত ৭টি ভুল ধারণা বা মিথের গল্প শুনি। এই ফাঁকে হয়তো সত্যটাও জানা হয়ে যাবে।
১. সবকিছুই কি দৈব
কোয়ান্টাম জগৎ মানেই সব এলোমেলো নয়। যদিও অনেকেরই এমন ধারণা আছে। হাইজেনবার্গের অনিশ্চয়তা নীতির কথা শুনলে এমনটা মনে হওয়া স্বাভাবিক। কিন্তু পুরোটা ঠিক নয়। পরমাণুর জগতের অনেক কিছুই আমরা দারুণ নিখুঁতভাবে মাপতে পারি। ভবিষ্যদ্বাণীও করতে পারি। হ্যাঁ, এখানে সম্ভাবনার একটা বড় খেলা আছে, কিন্তু তাই বলে পুরো জগৎটা কোনো নিয়ম ছাড়া এমনি এমনি চলছে না।
২. কোয়ান্টাম মেকানিকস কি কল্পনা করা যায়
বিখ্যাত পদার্থবিদ রিচার্ড ফাইনম্যান একবার বলেছিলেন, ‘কেউই কোয়ান্টাম মেকানিকস বোঝে না।’ কথাটা তো শুনেছেন নিশ্চয়ই? কোয়ান্টাম জগৎ সত্যিই জটিল গণিতে ভরা। তাই অনেকেই ভাবেন, একে কল্পনা করা কিংবা এর ছবি আঁকা বুঝি অসম্ভব। কিন্তু বিজ্ঞানীরা ঠিকই এর ছবি এঁকেছেন। এই যেমন ওয়েভ ফাংশন কিংবা ফাইনম্যান ডায়াগ্রাম! এগুলোর সাহায্যে অতিপারমাণবিক কণাগুলোর আচরণ দিব্যি কাগজে এঁকে ফেলা যায়।
৩. কোয়ান্টাম মেকানিকস কি জাদুবিদ্যা সমর্থন করে
কোয়ান্টাম জগতের অদ্ভুত সব নিয়ম শুনে অনেকেই একে আধ্যাত্মিকতার সঙ্গে মিলিয়ে ফেলেন। মনে করেন, এখানে বুঝি দারুণ কোনো গুপ্ত রহস্য লুকিয়ে আছে। আসলে এটা পুরোপুরি ভুল। বিজ্ঞানীদের কাছে কোয়ান্টাম মেকানিকস অন্যতম সফল ও পরীক্ষিত একটি শাখা। আমাদের হাতের স্মার্টফোনের মাইক্রোপ্রসেসর, লেজার—এসবই তো কোয়ান্টাম মেকানিকসের দান! তাই একে জাদুর বদলে আধুনিক প্রযুক্তির ভিত্তি বলাই ভালো।
আইনস্টাইন নিজেই ম্যাক্স প্ল্যাঙ্কের কোয়ান্টাম ধারণা ব্যবহার করে ফটোইলেকট্রিক ইফেক্ট বা আলোকতড়িৎ ক্রিয়া ব্যাখ্যা করেছিলেন। এজন্যই তো তিনি ১৯২২ সালে পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পান!
৪. মহাবিশ্বের সব প্রশ্নের উত্তর কি কোয়ান্টামে আছে
অনেকে ভাবেন, কোয়ান্টাম ফিজিকস বুঝি এক নতুন ধর্ম! মহাবিশ্বের শুরু কীভাবে, প্রাণ কী—সব উত্তর বুঝি এখানে মিলবে! সত্যি বলতে, এসব বড় প্রশ্নের উত্তর কোয়ান্টাম মেকানিকসে নেই। কোয়ান্টাম মানে অতি ক্ষুদ্র পরিমাণ। এটি শুধু পরমাণু আর মৌলিক কণাগুলোর জগতের নিয়মকানুন নিয়ে কাজ করে। এর বাইরেও অনেক জগৎ আছে। তাই সবকিছুর উত্তর এর কাছে নেই।
৫. একটি কণা কি একই সঙ্গে দুই জায়গায় থাকতে পারে
ওয়েভ ফাংশন আমাদের বলে, কোনো কণা কোথায় থাকার সম্ভাবনা কতটা। অঙ্কের হিসাবে একটা কণার তরঙ্গ অনেক জায়গায় ছড়িয়ে থাকতে পারে। তার মানে কি কণাটি বাস্তবে একই সময়ে সব জায়গায় আছে? না! ওয়েভ ফাংশন শুধু একটা গাণিতিক সম্ভাবনা। কণাটি বাস্তবে যেকোনো এক জায়গাতেই থাকে। আমরা শুধু মাপার আগ পর্যন্ত জানি না, সেটা ঠিক কোথায় আছে। যখনই মাপা হয়, অমনি ওয়েভ ফাংশন ধসে পড়ে এবং কণাটি একটি নির্দিষ্ট জায়গাতেই ধরা দেয়।
৬. আইনস্টাইন কি কোয়ান্টামের শত্রু ছিলেন
মোটেই না! আইনস্টাইন নিজেই ম্যাক্স প্ল্যাঙ্কের কোয়ান্টাম ধারণা ব্যবহার করে ফটোইলেকট্রিক ইফেক্ট বা আলোকতড়িৎ ক্রিয়া ব্যাখ্যা করেছিলেন। এজন্যই তো তিনি ১৯২২ সালে পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পান! তাহলে শত্রু কেন ভাবা হয়? তার কারণ, আইনস্টাইন একবার বলেছিলেন, ‘ঈশ্বর পাশা খেলেন না।’ তিনি আসলে কোয়ান্টামের এই সম্ভাবনা আর অনিশ্চয়তা মেনে নিতে পারছিলেন না। চিরায়ত পদার্থবিজ্ঞানে সবকিছুই নির্দিষ্ট। কিন্তু কোয়ান্টাম জগতে অনিশ্চয়তাই রাজা! কেবল এই জায়গাটিতেই আইনস্টাইনের আপত্তি ছিল।
কোয়ান্টাম মানে অতি ক্ষুদ্র পরিমাণ। এটি শুধু পরমাণু আর মৌলিক কণাগুলোর জগতের নিয়মকানুন নিয়ে কাজ করে। এর বাইরেও অনেক জগৎ আছে। তাই সবকিছুর উত্তর এর কাছে নেই।
৭. কণাগুলো কি ইচ্ছেমতো তরঙ্গ ও কণায় রূপ বদলায়
আমাদের চারপাশের জগৎটা আমরা যেভাবে দেখি, পরমাণুর জগৎটা তার চেয়ে অনেক আলাদা। আমরা বল বলতে একটা কণা বুঝি। আর পানিতে ঢিল ছুড়লে বুঝি তরঙ্গ। অতিপারমাণবিক জগৎটা এতই অদ্ভুত যে আমরা এই বল আর তরঙ্গের ছবি দিয়ে তা বোঝার চেষ্টা করি।
ফাইনম্যান বলেছিলেন, ‘ইলেকট্রন তরঙ্গের মতো আচরণ করে... না, ঠিক তা নয়। ইলেকট্রন কণার মতো আচরণ করে... না, এটাও ঠিক নয়।’ আসলে ইলেকট্রন বা প্রোটন এরা পুরোপুরি কণাও নয়, আবার পুরোপুরি তরঙ্গও নয়। এরা ইচ্ছেমতো রূপও বদলায় না। আমরা শুধু আমাদের বোঝার সুবিধার জন্য কখনো এদের কণা, আবার কখনো তরঙ্গ মডেল দিয়ে ব্যাখ্যা করি মাত্র।
তো কী বুঝলেন? কোয়ান্টাম জগৎ অদ্ভুত ঠিকই। তবে জাদুকরী কিছু নয়। এটি প্রকৃতিরই এক দারুণ সুন্দর নিয়ম। বিজ্ঞান দিয়ে যাকে আমরা প্রতিদিন একটু একটু করে বুঝছি।