আবারও ভুল প্রমাণিত হলেন আইনস্টাইন, ১০০ বছর পর কোয়ান্টাম মেকানিকসের জয়
আলবার্ট আইনস্টাইন আমাদের মহাবিশ্বকে দেখার চোখটাই বদলে দিয়েছেন। কিন্তু তিনিও জীবনের অনেকটা সময় ব্যয় করেছেন কোয়ান্টাম মেকানিকস ভুল প্রমাণ করতে। আইনস্টাইনের সেই বিখ্যাত উক্তিটা নিশ্চয়ই শুনেছেন, ‘ঈশ্বর মহাবিশ্ব নিয়ে পাশা খেলেন না’। তিনি বিশ্বাস করতেন, এই মহাবিশ্বের সবকিছু চলে নির্দিষ্ট নিয়মে। কিন্তু কোয়ান্টাম মেকানিকস বলে উল্টো কথা। কোয়ান্টাম রাজ্যে সবকিছুই অনিশ্চিত, অদ্ভুত ও রহস্যময়। আইনস্টাইন এই অনিশ্চয়তা একদমই মেনে নিতে পারেননি। তাই তিনি দিনের পর দিন তর্ক করেছেন আরেক কিংবদন্তি বিজ্ঞানী নীলস বোরের সঙ্গে।
আজ থেকে প্রায় ১০০ বছর আগের কথা। ১৯২৭ সালে বেলজিয়ামে বসেছিল বিজ্ঞানের ইতিহাসের অন্যতম সেরা আড্ডা, পঞ্চম সলভে কনফারেন্স। সেখানে উপস্থিত ছিলেন মেরি কুরি, হাইজেনবার্গ, আইনস্টাইন, নীলস বোরসহ বাঘা বাঘা সব বিজ্ঞানী। সেখানেই শুরু হয় এক ঐতিহাসিক বিতর্ক। নীলস বোর বলছিলেন কমপ্লিমেন্টারিটির কথা।
সোজা কথায়, কোয়ান্টাম জগতে আপনি চাইলেই একসঙ্গে সব কিছু জানতে পারবেন না। ধরুন, আপনি যদি কোনো কণার অবস্থান নিখুঁতভাবে মাপতে চান, তাহলে তার ভরবেগ সম্পর্কে আপনার ধারণা ঝাপসা হয়ে যাবে। আবার ভরবেগ মাপতে গেলে অবস্থান হারিয়ে ফেলবেন। হাইজেনবার্গের অনিশ্চয়তা নীতিও এই কথাই বলে।
১৯২৭ সালে বেলজিয়ামে বসেছিল বিজ্ঞানের ইতিহাসের অন্যতম সেরা আড্ডা, পঞ্চম সলভে কনফারেন্স। সেখানে উপস্থিত ছিলেন মেরি কুরি, আইনস্টাইন, নীলস বোরসহ বাঘা বাঘা সব বিজ্ঞানী।
আইনস্টাইন বললেন, ‘উহু, এটা হতে পারে না। আমি এমন এক পরীক্ষার কথা ভাবছি, যা দিয়ে দুটোই মাপা সম্ভব।’ তিনি একটা কাল্পনিক পরীক্ষার প্রস্তাব দিলেন। বিজ্ঞানের ভাষায় একে বলে থট এক্সপেরিমেন্ট বা মানস পরীক্ষা। আইনস্টাইন প্রস্তাব করলেন বিখ্যাত দ্বি-চিড় পরীক্ষার একটু উন্নত সংস্করণ। সাধারণ দ্বি-চিড় পরীক্ষায় দেখা যায়, ইলেকট্রন বা ফোটন যখন দুটি ছিদ্রের মধ্য দিয়ে যায়, তখন তারা তরঙ্গের মতো আচরণ করে এবং পর্দার ওপর একটি বিশেষ নকশা তৈরি করে। আবার সেগুলো মাপতে গেলে আচরণ করে কণার মতো।
আইনস্টাইন বললেন, ‘আচ্ছা, আমরা যদি প্রথম ছিদ্রটা নড়াচড়া করার ব্যবস্থা করি? কণাটি যখন ওই ছিদ্র দিয়ে যাবে, তখন তার ধাক্কায় ছিদ্রটি একটু নড়ে যাবে। সেই নড়াচড়া থেকে আমরা কণাটির ভরবেগ জেনে যাব। আবার পর্দার ওপর ওটা তরঙ্গের নকশাও তৈরি করবে। তাহলেই তো বোরের তত্ত্ব ভুল প্রমাণিত হলো! আমরা একই সঙ্গে কণা এবং তরঙ্গের ধর্ম পেয়ে গেলাম।’
কিন্তু নীলস বোর তখন বললেন, ‘না আলবার্ট, তুমি ভুল করছ। তুমি যখনই ছিদ্রের নড়াচড়া দিয়ে ভরবেগ মাপতে যাবে, ঠিক তখনই হাইজেনবার্গের অনিশ্চয়তা নীতির কারণে পর্দার ওপর ওই তরঙ্গের নকশাটা ঝাপসা হয়ে যাবে বা মুছে যাবে।’
দ্বি-চিড় পরীক্ষায় দেখা যায়, ইলেকট্রন বা ফোটন যখন দুটি ছিদ্রের মধ্য দিয়ে যায়, তখন তারা তরঙ্গের মতো আচরণ করে এবং পর্দার ওপর একটি বিশেষ নকশা তৈরি করে।
তখন এটি ছিল শুধুই মস্তিষ্কের লড়াই। কিন্তু ১০০ বছর পর, চীনের একদল বিজ্ঞানী আইনস্টাইনের সেই কাল্পনিক পরীক্ষাটি বাস্তবে করে দেখিয়েছেন। সেই পরীক্ষায় আইনস্টাইন আবারও হারলেন! চীনের ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি অব চায়নার বিজ্ঞানী জিয়ান-ওয়েই প্যান এবং তাঁর দল এই পরীক্ষাটি চালিয়েছেন। তাঁরা ব্যবহার করেছেন রুবিডিয়াম পরমাণু। পরমাণুটিকে শূন্যে ভাসিয়ে রাখার জন্য তাঁরা অপটিক্যাল টুইজার ব্যবহার করেছেন। এটি হলো সায়েন্স ফিকশন সিনেমার ট্রাক্টর বিমের মতো আলো দিয়ে কোনো বস্তুকে ধরে রাখার প্রযুক্তি।
তাঁরা একটি ফোটনের সঙ্গে পরমাণুটিকে এমনভাবে যুক্ত করেছেন যাতে ফোটনটি দ্বি-চিড়ের মধ্য দিয়ে যাওয়ার সময় ভরবেগ মাপা যায়। বিজ্ঞানীরা দেখলেন, যে মুহূর্তে তাঁরা ভরবেগ মাপার চেষ্টা করলেন, ঠিক সেই মুহূর্তে নীলস বোরের ভবিষ্যদ্বাণী সত্য হয়ে গেল! পর্দার ওপর থাকা তরঙ্গের সেই সুন্দর নকশা গেল ঝাপসা হয়ে। অর্থাৎ, আপনি প্রকৃতিকে ধোঁকা দিতে পারবেন না। আপনি যখনই কণার ধর্ম মাপবেন, তরঙ্গের ধর্ম হারিয়ে যাবে। আর তরঙ্গের ধর্ম দেখতে চাইলে, কণার ধর্ম ছাড়তে হবে। দুটোকে একসঙ্গে পাওয়া সম্ভব নয়।
এই নতুন পরীক্ষাটি শুধু আইনস্টাইনকে ভুল প্রমাণ করেনি, বরং কোয়ান্টাম মেকানিকসের ভিত্তি যে কতটা মজবুত, তা আবারও চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল। তবে আইনস্টাইন ভুল করলেও তাঁর এই ভুলগুলোই বিজ্ঞানকে আজকের এই পর্যায়ে নিয়ে এসেছে। তাঁর সেই চ্যালেঞ্জগুলো না থাকলে বিজ্ঞানীরা হয়তো এত গভীরে গিয়ে চিন্তাই করতেন না!