এক কাল্পনিক ইঞ্জিনের রূপকথা

১৭৬৯ সালের এক শীতের সকাল। স্কটিশ প্রকৌশলী জেমস ওয়াট মাত্রই থমাস নিউকমেনের পুরোনো বাষ্পীয় ইঞ্জিনটাকে বদলে এক নতুন যুগের সূচনা করেছেন। চাকা ঘুরছে, কয়লা পুড়ছে, চারদিকে হইচই! তখন আনন্দের পাশাপাশি তাঁর মনে একটা বড় আফসোসও ছিল। তিনি হিসাব কষে দেখলেন, কয়লা পুড়িয়ে যে বিপুল বাষ্প তৈরি হচ্ছে, তার প্রায় ৮০ শতাংশই স্রেফ বাতাসে উড়ে অপচয় হয়ে যাচ্ছে! মাত্র ২০ শতাংশ কাজ পাওয়া যাচ্ছে। শুরু হলো ইঞ্জিনের অপচয় কমানোর এক তীব্র প্রতিযোগিতা। এই প্রতিযোগিতাই পুরো পৃথিবীর ইতিহাস বদলে দিয়েছিল। একে আমরা বলি শিল্পবিপ্লব। কিন্তু বিজ্ঞানীদের মাথায় তখন একটাই ভূত চাপল—ইঞ্জিনের এই অপচয় কি কোনোভাবে একেবারে শূন্যে নামিয়ে আনা সম্ভব? এমন কোনো ইঞ্জিন কি বানানো যায়, যা এক ফোঁটা জ্বালানিও নষ্ট করবে না?

ফরাসি সামরিক প্রকৌশলী নিকোলাস লিওনার্ড সাদি কার্নো
ছবি: উইকিপিডিয়া

ঠিক এই অসম্ভব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে ১৮২৪ সালে পদার্থবিজ্ঞানের জগতে এক বিস্ময় তৈরি করলেন ফরাসি সামরিক প্রকৌশলী নিকোলাস লিওনার্ড সাদি কার্নো। তিনি বাস্তবে নয়, খাতা-কলমে এমন এক নিখুঁত বা আদর্শ ইঞ্জিনের গল্প শোনালেন, যার দক্ষতা হবে মহাবিশ্বের মধ্যে সর্বোচ্চ! বিজ্ঞানের ইতিহাসে একেই আমরা চিনি কার্নো ইঞ্জিন নামে। এর ভেতরের কাণ্ডকারখানাকে বলা হয় কার্নো চক্র বা কার্নো সাইকেল।

কার্নো ভাবলেন, আচ্ছা, এমন একটা সিলিন্ডার ও পিস্টন নেওয়া যাক, যার কোনো ঘর্ষণ থাকবে না। অর্থাৎ ওঠানামা করার সময় কোনো শক্তি ক্ষয় হবে না। চারপাশের দেয়ালগুলো হবে এমন যে তা দিয়ে এক চিলতে তাপও বাইরে বেরিয়ে যাবে না। বাস্তবে এমন মাধ্যম বানানো অসম্ভব হলেও থিওরি বুঝতে ক্ষতি কী!

আরও পড়ুন
ফরাসি সামরিক প্রকৌশলী নিকোলাস লিওনার্ড সাদি কার্নো বাস্তবে নয়, খাতা-কলমে এমন এক নিখুঁত বা আদর্শ ইঞ্জিনের গল্প শোনালেন, যার দক্ষতা হবে মহাবিশ্বের মধ্যে সর্বোচ্চ!

কার্নোর এই কাল্পনিক ইঞ্জিনটি মূলত দুটি তাপীয় উৎসের মধ্যে কাজ করে:

১. উচ্চ তাপমাত্রার উৎস: যেখান থেকে ইঞ্জিন কয়লা বা জ্বালানির মতো তাপ গ্রহণ করে। ধরা যাক, এর তাপমাত্রা Th)।

২. নিম্ন তাপমাত্রার উৎস: ইঞ্জিন কাজ করার পর অপ্রয়োজনীয় তাপ যেখানে ফেলে দেয় বা বর্জন করে। ধরি, এর তাপমাত্রা Tc

সহজ কথায়, ইঞ্জিনটি উচ্চ তাপমাত্রার উৎস থেকে তাপ (Qh) গ্রহণ করে, সেই তাপের একটি অংশকে কাজে (W) রূপান্তরিত করে এবং বাকি অবশিষ্টাংশ তাপ (Qc) নিম্ন তাপমাত্রার উৎসে ফেলে দেয়।

কার্নো ইঞ্জিনটি একটা চাকার মতো ঘোরে। পুরো প্রক্রিয়াটি মূলত চারটি ধাপে সম্পন্ন হয়ে আবার আগের জায়গায় ফিরে আসে:

ধাপ ১ (সমোষ্ণ প্রসারণ): উচ্চ তাপমাত্রায় গ্যাসকে সিলিন্ডারে রেখে আস্তে আস্তে প্রসারিত হতে দেওয়া হয়। গ্যাস এখানে মনের সুখে কাজ করে।

কার্নো ইঞ্জিনটি একটা চাকার মতো ঘোরে
ছবি: রিসার্চ গেইট

ধাপ ২ (রুদ্ধতাপীয় প্রসারণ): এবার বাইরে থেকে কোনো তাপ না নিয়ে গ্যাসকে আরও ছড়িয়ে পড়তে দেওয়া হয়। ফলে ভেতরের তাপমাত্রা দ্রুত কমে যায়।

ধাপ ৩ (সমোষ্ণ সংকোচন): এবার উল্টো টান! নিম্ন তাপমাত্রায় গ্যাসকে বাইরে থেকে চাপ দিয়ে সংকুচিত করা হয় এবং বাড়তি তাপটুকু সিঙ্কে চলে যায়।

ধাপ ৪ (রুদ্ধতাপীয় সংকোচন): শেষ ধাপে তাপের কোনো আদান-প্রদান ছাড়াই গ্যাসকে আরও চেপে একদম শুরুর অবস্থায় ফিরিয়ে আনা হয়। চাকা এক চক্কর সম্পন্ন করল!

আরও পড়ুন
সহজ কথায়, ইঞ্জিনটি উচ্চ তাপমাত্রার উৎস থেকে তাপ গ্রহণ করে, সেই তাপের একটি অংশকে কাজে রূপান্তরিত করে এবং বাকি অবশিষ্টাংশ তাপ নিম্ন তাপমাত্রার উৎসে ফেলে দেয়।

সাদি কার্নো খাতা-কলমে হিসাব করে এমন এক অকাট্য সত্য প্রমাণ করলেন, যা বিজ্ঞানীদের আকাশ থেকে মাটিতে আছড়ে ফেলল। তিনি দেখালেন, আপনি যত নিখুঁত বা ঘর্ষণহীন ইঞ্জিনই বানান না কেন, তার দক্ষতা কখনোই শতভাগ হওয়া সম্ভব নয়। প্রকৃতির নিয়মেই শক্তির কিছু অংশ তাপে রূপান্তরিত হয়ে অপচয় হবেই! বিজ্ঞানে একে বলে কার্নো থিওরেম।

গাণিতিক ভাষায় সমীকরণটি হলো: η= 1-Tc/Th

এই সমীকরণটি একটু মন দিয়ে দেখলেই জট খুলে যাবে। দক্ষতা যদি শতভাগ বা ১ করতে হয়, তবে নিচের তাপমাত্রা Tc হতে হবে পরম শূন্য বা 0 K (-273°C)। কিন্তু প্রকৃতিতে আজ পর্যন্ত কোনো বিজ্ঞানীই পরম শূন্য তাপমাত্রা ল্যাবরেটরিতে তৈরি করতে পারেননি। তাই এক ফোঁটা অপচয় ছাড়া শতভাগ দক্ষ ইঞ্জিন পাওয়া শুধু অলীক কল্পনা!

ছবি: সায়েন্স এবিসি

এই ছোট্ট খাতা-কলমের ভাবনাই পরবর্তীকালে জন্ম দিয়েছিল পদার্থবিজ্ঞানের সবচেয়ে শক্তিশালী ভিত্তি—তাপগতিবিদ্যার দ্বিতীয় সূত্র এবং এনট্রপির মতো মহাজাগতিক ধারণা। বাস্তবে কার্নো ইঞ্জিন তৈরি করা অসম্ভব ঠিকই, কিন্তু আজ অবধি যেকোনো আধুনিক গাড়ি, বুলেট ট্রেন কিংবা বিমানের ইঞ্জিন তৈরি করার সময় প্রকৌশলীরা কার্নো সাইকেলের স্কেল ধরেই মাপেন, তাদের তৈরি ইঞ্জিনটি প্রকৃতির নিয়মের কতটা কাছাকাছি পৌঁছাতে পারল!

লেখক: শিক্ষার্থী, পদার্থবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

সূত্র: সায়েন্স এবিসি

আরও পড়ুন