ফিউশন রিয়েক্টরের নতুন সম্ভাবনা

প্রথমবারের মতো কোনো ফিউশন রিয়েক্টরে প্রদত্ত শক্তির চেয়ে উৎপাদিত শক্তির পরিমাণ বেশি পাওয়া পাওয়া গেছে এখানে। এমনটাই দাবি করছে যুক্তরাষ্ট্রের ডিপার্টমেন্ট অব এনার্জি কর্তৃপক্ষ।

সম্প্রতি নিউক্লিয়ার ফিউশন বিক্রিয়া থেকে শক্তি উৎপাদনের ক্ষেত্রে বড় মাইলফলক অর্জন করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের একদল বিজ্ঞানী। প্রথমবারের মতো কোনো ফিউশন রিয়েক্টরে প্রদত্ত শক্তির চেয়ে উৎপাদিত শক্তির পরিমাণ বেশি পাওয়া পাওয়া গেছে এখানে। এমনটাই দাবি করছে যুক্তরাষ্ট্রের ডিপার্টমেন্ট অব এনার্জি কর্তৃপক্ষ। গত ১১ ডিসেম্বর, বুধবার সরকারি প্রতিষ্ঠানটি তাঁদের ওয়েবসাইটে বিষয়টি জানায়।

বর্তমানে পৃথিবীতে যেসব পদ্ধতিতে শক্তি উৎপাদন করা হয়, সেগুলো আগামীর পৃথিবীর জন্য যথেষ্ট নয়। তেল ও গ্যাসের মতো অনাবয়নযোগ্য শক্তির উৎসগুলো পরিবেশের জন্য প্রচণ্ড ক্ষতিকর। অন্যদিকে সৌরশক্তি, বায়ুকল কিংবা জলবিদ্যুতের মতো নয়াবয়নযোগ্য উৎস থেকে পাওয়া শক্তির পরিমাণ যথেষ্ট নয়। নিউক্লিয়ার ফিশন বিক্রিয়ার মাধ্যমে গত শতক থেকে বিদ্যুৎশক্তি তৈরি করছে মানুষ। এই শক্তি উৎপাদনের এই প্রক্রিয়াও পুরোপুরি নিরাপদ নয়। এ থেকে উৎপন্ন পারমাণবিক তেজস্ক্রিয় বর্জ্য প্রাণ ও প্রকৃতির জন্য মারাত্মক ক্ষতির কারণ হয়ে ওঠতে পারে। আবার এ বিক্রিয়ার জন্য প্রধান যে জ্বালানী ইউরেনিয়াম, তার পরিমাণও অফুরন্ত নয়।

তাই, ক্রমবর্ধমান শক্তির চাহিদা মেটানোর জন্য স্থায়ী নিরাপদ কোনো উৎস দরকার ছিল। বিজ্ঞানীরা তাই অনেকদিন ধরেই পারমাণবিক ফিউশন বিক্রিয়া আয়ত্তে আনতে কাজ করে যাচ্ছেন। নক্ষত্রের বুকে এই পদ্ধতিতে শক্তি উৎপাদন হয়। হালকা মৌলের দুটি পরমাণু যুক্ত হয়ে একটি ভারী মৌল তৈরি করে এ বিক্রিয়ায়। ভারী মৌলের ভর হালকা দুটি মৌলের পরমাণুর চেয়ে সামান্য কম হয়। আইনস্টাইনের বিখ্যাত E=mc2 সূত্রানুযায়ী এই সামান্য ভর পরিণত হয় বিপুল শক্তিতে। পারমাণবিক ফিউশন বিক্রিয়ার মূল জ্বালানী হাইড্রোজেন। মহাবিশ্বের হাইড্রোজেনের প্রাচুর্য্য সবচেয়ে বেশি। পৃথিবীতেও তাই। এই বিক্রিয়া থেকে তেজস্ক্রিয় বর্জ্য উৎপাদন হয় না। তাই একে আয়ত্তে আনা গেলে পাওয়া যাবে সবচেয়ে পরিবেশের জন্য নিরাপদ ও অকল্পনীয় শক্তি। এই পারমাণবিক ফিউশন বিক্রিয়াকে বাগে আনার দিকে বিজ্ঞানীরা আরও একধাপ এগিয়ে গেল এই পরীক্ষণের মধ্যে দিয়ে।

যুক্তরাষ্ট্র সরকারের অর্থায়নে নির্মিত ক্যালিফোর্নিয়ার লরেন্স লিভারমোর ন্যাশনাল ল্যাবরেটরির ন্যাশনাল ইগনিশন ফ্যাসিলিটি (এনআইএফ) যন্ত্রের সাহায্যে এই গবেষণাটি পরিচালনার করেন দেশটির একদল পদার্থবিদ।

আরও পড়ুন
আরও পড়ুন

নিউক্লিয়ার ফিউশন রিয়েক্টরে হাইড্রোজেনের দুটি আইসোটোপ— ডিউটেরিয়াম এবং ট্রিটিয়ামকে প্লাজমায় পরিণত করার জন্য বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী লেজার রশ্মি দিয়ে আঘাত করেন তাঁরা। লেজারের মাধ্যমে প্রায় ২ মেগাজুল শক্তি প্রয়োগ করা হয়। বিনিয়ময়ে ডিউটেরিয়াম এবং টিট্রিয়ামের প্লাজমাতে তৈরি হয় প্রায় ৩ মেগাজুল শক্তি। এভাবে ফিউশন বিক্রিয়ার মাধ্যমে প্রায় দেড়গুণ বেশি শক্তি উৎপাদন এর আগে কখনো করা সম্ভব হয়নি।

যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি বিভাগের আন্ডারসেক্রেটারি ফর নিউক্লিয়ার সিকিউরিটি এবং ন্যাশনাল নিউক্লিয়ার সিকিউরিটি অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের (এনএনএসএ) প্রশাসক জিল রুবি গত ১৩ ডিসেম্বর এক সংবাদ সম্মেলনে এ প্রসঙ্গে বলেন, পরীক্ষাটি করার জন্য আমরা ১৯২টি উচ্চ-শক্তির লেজার ব্যবহার করি। লক্ষ্যবস্তু ছিলো একটা গোলমরিচের চেয়েও ছোট আকারের একটি ক্যাপসুল। এর মধ্যে ছিল ডিউটেরিয়াম এবং ট্রিটিয়ামের মিশ্রণ। লেজারের আঘাতে লক্ষ্যবস্তু প্রায় ৩০ লক্ষ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা তৈরি হয়। পুরো জিনিসটি একটি অতিক্ষুদ্র নক্ষত্রের মতো অবস্থায় পৌঁছে।

পরীক্ষণটি সম্পন্ন হতে এক সেকেণ্ডের ১০০ কোটি ভাগের একভাগ সময়। মানে চোখে পলকেরও আগে মূল ঘটনাটি ঘটে যায়

গবেষক দলের অন্যতম সদস্য কুইন্স ইউনিভার্সিটি বেলফাস্টের পদার্থবিজ্ঞানের অধ্যাপক জিয়ানলুকা সাররি মতে, নিউক্লিয়ার ফিউশন বিক্রিয়া থেকে প্রদত্ত শক্তির চেয়ে বেশি পরিমাণ শক্তি পাওয়া সম্ভব, সেটাই প্রমাণিত হয়েছে এই পরীক্ষণটির মাধ্যমে। প্রকৃতপক্ষে নিয়ক্লিয়ার ফিউশন শক্তিকে বাগে এনে কাজে লাগানো, অর্থাৎ বাণিজ্যিকভাবে এখান থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা এখনও অনেক দেরি। কারণ প্রযুক্তিগত অনেক বাঁধা আছে সামনে। সেগুলো সমাধান না করে অসীম শক্তির এই দৈত্যকে কাজে লাগানো সম্ভব নয়। বিজ্ঞানীরা মনে করেন পারমাণবিক ফিউশন থেকে থেকে ব্যবহারযোগ্য শক্তি বের করে আনতে এখনও প্রায় কয়েক দশক সময় প্রয়োজন।

তবে, বিজ্ঞানীদের এই পরীক্ষণের ফলাফল বিশ্বজুড়ে অন্যান্য গবেষকদের অনুপ্রাণিত করবে, এমনটাই মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

লেখক: শিক্ষার্থী, পদার্থবিজ্ঞান বিভাগ, তেজগাঁও কলেজ, ঢাকা

সূত্র: লাইভ সায়েন্স