সায়েন্স মিথ
তাপমাত্রা বাড়লেই কি সব বস্তুর আয়তন বাড়ে
তাপ দিলেই কি সব বস্তুর আয়তন বেড়ে যায়? রেললাইনের পাত বা থার্মোমিটারের পারদ তো বাড়ে। কিন্তু বরফ? সে তো তাপ পেলে গলে ছোট হয়ে যায়! কেন এমন হয়? পানির এই অদ্ভুত আচরণের রহস্য কী? কেন কঠিন বরফ তরল পানির চেয়ে হালকা?
তাপমাত্রা বাড়লে বস্তুর আয়তন বাড়ে। এটা বস্তুর সাধারণ ধর্ম। লোহাকে তাপ দিন, এর আয়তন বেড়ে যাবে। এ জন্যই রেললাইন টানা একটা লোহার পাত দিয়ে তৈরি হয় না। কিছু দূর পরপর রেললাইনে পাতগুলো কাটা থাকে। দুটি পাতের মধ্যে রাখা হয় পর্যাপ্ত ফাঁক। তারপর নাটের সাহায্যে জোড়া দেওয়া হয়।
কারণ, রেলের চাকার ঘর্ষণে তাপ উৎপন্ন হয়। এতে পাতগুলোর আয়তন ও দৈর্ঘ্য বেড়ে যায়। তখন মাঝখানের ফাঁকগুলোর জন্য রেললাইন স্থির থাকে। ফাঁক না থাকলে রেলের পাতের দৈর্ঘ্য বেড়ে যেত। তখন ধনুকের মতো বাঁকা হয়ে যেত পাতগুলো। রেলপথ থেকে বিচ্যুত হতো ট্রেন।
তাপমাত্রা বাড়লে সব ধরনের ধাতব পদার্থ প্রসারিত হয়। বিষয়টি সবচেয়ে ভালো বোঝা যায় থার্মোমিটারে। এর ভেতরকার পারদ দ্রুত বাড়ে। তাই তাপমাত্রা বা শরীরের জ্বর মাপা সহজ হয়।
পানি ও তেলের মতো তরল পদার্থের তাপমাত্রা বাড়লে তা দ্রুত প্রসারিত হয়। গ্যাসীয় পদার্থ প্রসারিত হয় আরও দ্রুত। যৌগিক পদার্থগুলোও তাপমাত্রা বাড়লে বাড়ে। কঠিন পদার্থের মধ্যে ধাতব পদার্থগুলো বাড়ে দ্রুত। অধাতুগুলোও প্রসারিত হয়, তবে ধাতুর মতো অতটা নয়। অর্থাৎ তাপমাত্রা বাড়লে বেশির ভাগ পদার্থেরই আয়তন বাড়ে।
তাপমাত্রা বাড়লে সব ধরনের ধাতব পদার্থ প্রসারিত হয়। বিষয়টি সবচেয়ে ভালো বোঝা যায় থার্মোমিটারে। এর ভেতরকার পারদ দ্রুত বাড়ে। তাই তাপমাত্রা বা শরীরের জ্বর মাপা সহজ হয়।
তবে কিছু পদার্থ আছে তাপ কুপরিবাহী। এই ব্যাপারটা একটু বুঝিয়ে বলা দরকার। শব্দ বা বিদ্যুৎ যেমন মাধ্যমের সাহায্যে এক স্থান থেকে আরেক স্থানে যায়, তাপও তেমনি বস্তুর মাধ্যমে প্রবাহিত হয়। কোনো বস্তুতে তাপ দিলে তার ভেতরকার অণুগুলো কাঁপতে শুরু করে। কম্পনের ফলে একে অপরকে ধাক্কা দেয়। অণুগুলোর কম্পনশক্তি বা গড় গতিশক্তি বাড়ে। আর অণুদের এই গড় গতিশক্তিকেই বলে তাপমাত্রা। বস্তুতে তাপ দিলে তাই এর তাপমাত্রা বেড়ে যায়। তাপমাত্রা বাড়া মানে বস্তুর ভেতরকার অণুগুলোর কম্পন বা গতি বেড়ে যাওয়া। তখন তাপশক্তিও অণুর ওই ধাক্কাধাক্কির ফলে বস্তুর এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে পৌঁছে যায়। একে বলে তাপের পরিবহন।
যে বস্তু যত দ্রুত তাপ পরিবহন করে, সেই বস্তুর তাপ পরিবহনক্ষমতা তত বেশি। সেই বস্তুকে তাই তাপের সুপরিবাহী বলা হয়। অন্যদিকে কিছু পদার্থের তাপ পরিবহনক্ষমতা খুব কম। তাই ওই সব বস্তুকে বলে তাপ কুপরিবাহী পদার্থ। যেমন কাঠ বা প্লাস্টিক তাপ কুপরিবাহী।
এসব বস্তুর ক্ষেত্রে তাই তাপ বাড়িয়ে তেমন লাভ হয় না। এগুলো তাপমাত্রা বৃদ্ধির সঙ্গে প্রসারিত হয় না বললেই চলে। তবে খুব বেশি তাপ দিলে এগুলো পুড়ে ছাই হয়ে যাবে। তাই বলা যায়, এসব ক্ষেত্রে তাপ দিয়ে আয়তন বাড়ানোর চেষ্টা করা বৃথা।
কুপরিবাহী বস্তুতে তাপমাত্রা বাড়িয়ে আয়তন বাড়ানো যায় না, সেটা ঠিক। কিন্তু কিছু পদার্থ আছে, যারা তাপ বাড়লে আয়তন বাড়ার এই নিয়মটাকে যেন বুড়ো আঙুল দেখায়। এসব বস্তুর তাপমাত্রা বাড়ালে আয়তন উল্টো কমে যায়। উদাহরণ চান? হাতের কাছেই আছে। বরফ, নারকেল তেল ইত্যাদি।
যে বস্তু যত দ্রুত তাপ পরিবহন করে, সেই বস্তুর তাপ পরিবহনক্ষমতা তত বেশি। সেই বস্তুকে তাই তাপের সুপরিবাহী বলা হয়। অন্যদিকে কিছু পদার্থের তাপ পরিবহনক্ষমতা খুব কম। এরা তাপ কুপরিবাহী বলে।
তরল পানি বা বাষ্পে তাপ দিলে আয়তন বাড়ে। কিন্তু পানির তাপমাত্রা কমাতে থাকলে এর আয়তন কমে। তবে ৪ ডিগ্রিতে নামার পর আয়তন বাড়তে থাকে। পানিকে ঠান্ডা করে বরফে পরিণত করলে আবার আয়তন বেড়ে যায়, কিন্তু ঘনত্ব কমে। তাই বরফ পানিতে ভাসে।
এবার যদি উল্টো করে ব্যাখ্যা করি, তবে বুঝতে সহজ হবে। বরফ একধরনের কঠিন পদার্থ। এতে তাপ প্রয়োগ করলে বরফ গলে পানিতে পরিণত হবে ঠিকই, কিন্তু পানির আয়তন বরফের চেয়ে কম হবে। বরফ গলে পানিতে পরিণত হওয়ার পরও তাপমাত্রা বাড়াতে থাকুন। ৪ ডিগ্রিতে গিয়ে থামুন। এই অবস্থায় পানির আয়তন হবে সবচেয়ে কম এবং ঘনত্ব হবে সবচেয়ে বেশি।
তবে ৪ ডিগ্রি তাপমাত্রায় পৌঁছানোর পরেও তাপ প্রয়োগ করুন। এবার পানি স্বাভাবিক আচরণ করবে। আয়তন বাড়তে শুরু করবে। কিন্তু ১০০ ডিগ্রিতে তাপমাত্রা পৌঁছানোর আগপর্যন্ত পানির আয়তন বরফের চেয়ে কম থাকবে। বাষ্পে পরিণত হলে আয়তন আর নির্দিষ্ট থাকে না। তাই বরফের চেয়ে বাষ্পের আয়তন বেশি হবে।
কিন্তু পানির চেয়ে বরফের আয়তন বেশি কেন? বরফে দুটি হাইড্রোজেন ও একটি অক্সিজেন অনেকটা পিরামিডের মতো বন্ধন তৈরি করে। এই বন্ধন অনেক শক্তিশালী। তাই বরফ কঠিন। কিন্তু এই বন্ধনগুলো এমনভাবে সজ্জিত যে এর মধ্যে প্রচুর ফাঁক থাকে। তাই শক্ত হলেও বরফের আয়তন পানির চেয়ে বেশি, ঘনত্ব পানির চেয়ে কম।
একই কথা নারকেল তেলের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। অর্থাৎ সব ক্ষেত্রে তাপমাত্রা বাড়ালে বস্তুর আয়তন বাড়ে না।