বিগ ব্যাংয়ের পরে কিছু কণা কীভাবে টিকে গেল, সেই উত্তর দিতে পারে নিউট্রিনো

বিগ ব্যাংয়ের পর বস্তু ও প্রতিবস্তুর সংঘর্ষে পুরো মহাবিশ্ব ধ্বংস হয়ে যাওয়ার কথা ছিল! কিন্তু তা হয়নি। কেন? এই মহাজাগতিক রহস্যের উত্তর দিতে পারে এক ভৌতিক কণা—নিউট্রিনো! যুক্তরাষ্ট্র ও জাপানের বিজ্ঞানীরা মাটির নিচ দিয়ে এই কণার রশ্মি ছুড়ে এক অবিশ্বাস্য পরীক্ষায় মেতেছেন। তাঁরা দেখেছেন, নিউট্রিনো এবং এর প্রতিপদার্থের আচরণে সূক্ষ্ম অমিল রয়েছে। এই সামান্য অমিলটাই হয়তো বিগ ব্যাংয়ের পর আমাদের এই দৃশ্যমান মহাবিশ্বকে ধ্বংসের হাত থেকে বাঁচিয়েছিল!

নিউট্রিনো নামে অধরা কণা নিয়ে গবেষণা করা একদল আন্তর্জাতিক বিজ্ঞানী মহাবিশ্বের অস্তিত্বের কারণ সম্পর্কে নতুন সূত্র উন্মোচন করেছেনছবি: শাটারস্টক

মহাবিশ্ব নিয়ে আমাদের জানাশোনায় এক যুগান্তকারী অগ্রগতি অর্জন করেছেন গবেষকেরা। যুক্তরাষ্ট্রের ইন্ডিয়ানা ইউনিভার্সিটির গবেষকদের সহায়তায় আন্তর্জাতিক দুটি শীর্ষ নিউট্রিনো গবেষণাপ্রকল্পের যৌথ প্রচেষ্টায় এই সাফল্য এসেছে। নিউট্রিনো অত্যন্ত ক্ষুদ্র ও প্রায় ভরহীন একধরনের কণা। এরা প্রতিনিয়ত মহাকাশ, গ্রহ-নক্ষত্র, এমনকি আমাদের শরীরের ভেতর দিয়েও ছুটে চলেছে।

যদিও এসব কণা সাধারণত অন্য কোনো বস্তুর সঙ্গেই মিথস্ক্রিয়া করে না। নেচার সাময়িকীতে প্রকাশিত এই গবেষণার ফলাফল বিজ্ঞানীদের একটি পুরোনো প্রশ্নের সমাধান দিতে পারে। বিগ ব্যাংয়ের পরে মহাবিশ্বের সব কণা ধ্বংস না হয়ে কিছু কণা টিকে গেল কেন?

এই যুগান্তকারী সাফল্যটি এসেছে যুক্তরাষ্ট্রের নোভা এবং জাপানের টি-টু-কে নামে দুটি পরীক্ষার ডেটার যৌথ বিশ্লেষণের মাধ্যমে। এই দুটি হলো বিশ্বের সবচেয়ে আধুনিক দূরপাল্লার নিউট্রিনো প্রকল্প। এই দুই প্রকল্পের ফলাফল একসঙ্গে মিলিয়ে গবেষকেরা নিউট্রিনো এবং এদের প্রতিপদার্থ রূপ সম্পর্কে আরও ভালোভাবে জানার সুযোগ পেয়েছেন। ফলে বিগ ব্যাং বা মহাবিস্ফোরণের পরপরই মহাবিশ্ব কেন নিজেকে ধ্বংস করে ফেলল না, সেই রহস্যের জট খুলতে শুরু করেছে।

আরও পড়ুন
নিউট্রিনো অত্যন্ত ক্ষুদ্র ও প্রায় ভরহীন একধরনের কণা। এরা প্রতিনিয়ত মহাকাশ, গ্রহ-নক্ষত্র, এমনকি আমাদের শরীরের ভেতর দিয়েও ছুটে চলেছে।

এই দুটি পরীক্ষাতেই বিজ্ঞানীরা কণা ত্বরকযন্ত্র ব্যবহার করে নিউট্রিনোর বিম তৈরি করেন। এরপর সেই রশ্মিকে ভূগর্ভস্থ বিশাল দূরত্বের মধ্য দিয়ে পাঠিয়ে বড় বড় ডিটেক্টর যন্ত্রে ধরা হয়। এদের শনাক্ত করাটা অবিশ্বাস্য রকমের কঠিন। উৎপন্ন হওয়া অগণিত কণার মধ্যে মাত্র সামান্য কয়েকটি কণা পরিমাপযোগ্য সংকেত রেখে যায়। এরপর অত্যাধুনিক ডিটেক্টর এবং শক্তিশালী সফটওয়্যার ব্যবহার করে এই বিরল মিথস্ক্রিয়াগুলোকে নতুন করে সাজানো হয় এবং যাত্রাপথে নিউট্রিনো কীভাবে পরিবর্তিত হয়, তা নিয়ে গবেষণা করা হয়।

কয়েক দশক ধরেই এই কাজে ইন্ডিয়ানা ইউনিভার্সিটি (আইইউ) বড় ভূমিকা পালন করে আসছে। ডিটেক্টর সিস্টেম তৈরি, ডেটা বিশ্লেষণ এবং তরুণ গবেষকদের গাইড করার ক্ষেত্রে আইইউর বিজ্ঞানীরা দারুণ অবদান রেখেছেন। আইইউ ব্লুমিংটনের কলেজ অব আর্টস অ্যান্ড সায়েন্সেসের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের প্রধান ও অধ্যাপক মার্ক মেসিয়ার ২০০৬ সাল থেকে এই প্রকল্পে নেতৃত্বের ভূমিকায় আছেন। এই গবেষণায় যুক্ত থাকা আইইউর অন্যান্য গবেষকদের মধ্যে আছেন পদার্থবিদ জন উরহাইম, ইমেরিটাস অধ্যাপক জেমস মুসার, জ্যোতির্বিজ্ঞানের ইমেরিটাস অধ্যাপক স্টুয়ার্ট মুফসন এবং রসায়ন বিভাগের জোনাথন কার্টি।

আরও পড়ুন
নিউট্রিনো তিনটি রূপে পাওয়া যায়—ইলেকট্রন, মিউয়ন এবং টাউ। মহাকাশের ভেতর দিয়ে ছুটে চলার সময় এরা এক রূপ থেকে অন্য রূপে বদলে যেতে পারে। এই প্রক্রিয়াকে বলা হয় অসিলেশন বা দোলন।

নিউট্রিনো এবং বস্তু-প্রতিবস্তুর রহস্য

নিউট্রিনো মহাবিশ্বের অন্যতম সাধারণ একটি কণা। এদের কোনো বৈদ্যুতিক চার্জ নেই এবং ভর প্রায় নেই বললেই চলে। এ কারণেই এদের শনাক্ত করা এত কঠিন। তবে এই একই বৈশিষ্ট্যের কারণেই এরা পদার্থবিজ্ঞানের গভীর নিয়মগুলো সন্ধানের ক্ষেত্রে অমূল্য এক হাতিয়ার।

মহাকাশবিদ্যার অন্যতম বড় রহস্য হলো, মহাবিশ্বে কেন বস্তুর এত আধিপত্য? বিগ ব্যাংয়ের সময় তো বস্তু এবং প্রতিবস্তু সমান পরিমাণে তৈরি হওয়ার কথা। যখনই কোনো বস্তু তার প্রতিবস্তুর মুখোমুখি হয়, তখন শক্তির এক বিশাল বিস্ফোরণ ঘটিয়ে তারা একে অপরকে ধ্বংস করে দেয়। আদি মহাবিশ্বে যদি দুই ধরনের কণাই নিখুঁতভাবে সম পরিমাণে থাকত, তবে সবকিছুই ধ্বংস হয়ে যেত। কিন্তু তার বদলে, এক অজানা কারণে বস্তুর পরিমাণ একটু বেশি হয়ে যায় বা ভারসাম্য নষ্ট হয়। আর এই বাড়তি বস্তুকণাগুলো দিয়েই গ্যালাক্সি, নক্ষত্র, গ্রহ এবং প্রাণের সৃষ্টি হয়েছে।

বিজ্ঞানীদের ধারণা, এই ভারসাম্যহীনতার কারণ ব্যাখ্যা করতে পারে নিউট্রিনো। নিউট্রিনো তিনটি রূপে পাওয়া যায়—ইলেকট্রন, মিউয়ন এবং টাউ। মহাকাশের ভেতর দিয়ে ছুটে চলার সময় এরা এক রূপ থেকে অন্য রূপে বদলে যেতে পারে। এই প্রক্রিয়াকে বলা হয় অসিলেশন বা দোলন। নিউট্রিনো এবং অ্যান্টিনিউট্রিনো যদি ভিন্ন ভিন্নভাবে দুলতে থাকে, তবে সেই পার্থক্যটাই আমাদের বলে দিতে পারে যে শেষ পর্যন্ত কেন বস্তুকণাই টিকে গেল।

আরও পড়ুন
সিপি সিমেট্রি বা চার্জ-প্যারিটি সিমেট্রি নীতি অনুযায়ী, বস্তু এবং প্রতিবস্তুর একই ভৌত নিয়ম মেনে চলার কথা এবং এদের একে অপরের নিখুঁত প্রতিবিম্বের মতো আচরণ করার কথা।

নেচার সাময়িকীতে প্রকাশিত নতুন এই গবেষণাটি আলাদাভাবে নজর কেড়েছে, কারণ এতে দুটি শীর্ষস্থানীয় নিউট্রিনো মানমন্দিরের ডেটা একসঙ্গে মেলানো হয়েছে। নোভা প্রকল্প শিকাগোর কাছের ফার্মি ন্যাশনাল অ্যাক্সিলারেটর ল্যাবরেটরি থেকে ৮১০ কিলোমিটার দূরে মিনেসোটার অ্যাশ রিভারে অবস্থিত একটি ১৪ হাজার টনের ডিটেক্টরে নিউট্রিনো রশ্মি পাঠায়। অন্যদিকে, জাপানের টি-টু-কে প্রকল্প তোকাই শহরের জে-পার্ক অ্যাক্সিলারেটর থেকে ২৯৫ কিলোমিটার দূরে মাউন্ট ইকেনোইয়ামার নিচে অবস্থিত বিশাল সুপার-কামিওকান্দে ডিটেক্টরে রশ্মি পাঠায়।

এই দুই পরীক্ষার ফলাফল একসঙ্গে বিশ্লেষণ করে গবেষকেরা নিউট্রিনোর আচরণ মাপার ক্ষমতা অনেকটাই বাড়িয়ে তুলেছেন। নেচার-এর এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, ‘যৌথভাবে এই বিশ্লেষণ দুটি পরীক্ষারই পরিপূরক সংবেদনশীলতার সুবিধা কাজে লাগিয়েছে এবং একসঙ্গে কাজ করার গুরুত্ব প্রমাণ করেছে।’ পৃথিবীর ভেতর দিয়ে নোভার দূরত্ব এবং টি-টু-কের তীব্রতর রশ্মি একে অপরের পরিপূরক হিসেবে কাজ করে। ফলে বিজ্ঞানীরা তাঁদের হিসাবনিকাশগুলো নিখুঁতভাবে উন্নত করতে পেরেছেন।

ডেটাগুলো একসঙ্গে করার কারণে নিউট্রিনোর অসিলেশন নিয়ন্ত্রণকারী প্যারামিটারগুলো, বিশেষ করে নিউট্রিনো এবং অ্যান্টিনিউট্রিনোর মধ্যকার পার্থক্যের বিষয়গুলো গবেষক দল আরও ভালোভাবে নির্ধারণ করতে পেরেছে। এই ফলাফলের মূল ফোকাস সিপি সিমেট্রি বা চার্জ-প্যারিটি সিমেট্রি। এই নীতি অনুযায়ী, বস্তু এবং প্রতিবস্তুর একই ভৌত নিয়ম মেনে চলার কথা এবং এদের একে অপরের নিখুঁত প্রতিবিম্বের মতো আচরণ করার কথা।

অথচ আমাদের দৃশ্যমান মহাবিশ্ব বস্তু দিয়েই ভর্তি, বিগ ব্যাং থেকে টিকে থাকা প্রতিবস্তুর পরিমাণ খুবই সামান্য। এই যৌথ গবেষণার ফলাফল ইঙ্গিত দেয়, নিউট্রিনো এবং অ্যান্টিনিউট্রিনো যেভাবে অসিলেট করে, তাতে হয়তো কোনো পার্থক্য আছে। মানে এখানে সিপি সিমেট্রি লঙ্ঘিত হওয়ার একটা সম্ভাবনা রয়েছে। সহজ কথায়, নিউট্রিনোগুলো হয়তো তাদের প্রতিবস্তু বা অ্যান্টিনিউট্রিনো রূপের মতো হুবহু একই আচরণ করে না। এই সূক্ষ্ম পার্থক্যটিই হতে পারে মহাবিশ্বে বস্তুকণা টিকে থাকার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সূত্র!

আরও পড়ুন
জাপানের টি-টু-কে প্রকল্প তোকাই শহরের জে-পার্ক অ্যাক্সিলারেটর থেকে ২৯৫ কিলোমিটার দূরে মাউন্ট ইকেনোইয়ামার নিচে অবস্থিত বিশাল সুপার-কামিওকান্দে ডিটেক্টরে রশ্মি পাঠায়।

প্রযুক্তি, প্রশিক্ষণ এবং বৈশ্বিক সহযোগিতা

কণা পদার্থবিজ্ঞানের বড় মাপের পরীক্ষাগুলো থেকে প্রায়ই শুধু মৌলিক বিজ্ঞানের বাইরেও অনেক সুবিধা পাওয়া যায়। নিউট্রিনো শনাক্ত করার জন্য তৈরি করা বিভিন্ন প্রযুক্তি, যেমন হাই-স্পিড ইলেকট্রনিকস এবং উন্নত ডেটা অ্যানালাইসিস সিস্টেম প্রায়ই শিল্পক্ষেত্রে বাস্তব কাজে লেগে যায়। যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি দপ্তরের অর্থায়নে এই যৌথ গবেষণাটি পরিচালিত হচ্ছে।

মেসিয়ার বলেন, ‘হাই-এনার্জি ফিজিকস থেকে সমাজের সব ক্ষেত্রেই যুগান্তকারী প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন এসেছে। শুধু তা-ই নয়, আগামী প্রজন্মের বিজ্ঞানীরা ডেটা সায়েন্স, মেশিন লার্নিং, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং ইলেকট্রনিকস নিয়ে কাজ করছেন। মহাবিশ্বের এই কঠিন প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজতে গিয়ে তাঁরা যেসব গভীর দক্ষতা অর্জন করছেন, পরে তা নিয়ে তাঁরা শিল্পক্ষেত্রে দারুণ ভূমিকা রাখছেন।’

নোভা এবং টি-টু-কে প্রকল্পে যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ এবং জাপানসহ এক ডজনেরও বেশি দেশের শত শত বিজ্ঞানী কাজ করছেন। বর্তমানে এই যৌথ গবেষণায় আইইউর বেশ কয়েকজন পিএইচডি শিক্ষার্থীও যুক্ত আছেন, যাঁদের মধ্যে রিড বোলস, অ্যালেক্স চ্যাং, হ্যানি চেন, এরিন ইওয়ার্ট, হানা লেমোইন এবং মারিয়া মানরিক-প্লাটা অন্যতম। ২০১৪ সালে নোভা শুরু হওয়ার পর থেকে মেসিয়ার এবং তাঁর সহকর্মীরা এই পরীক্ষায় যুক্ত অসংখ্য স্নাতক এবং স্নাতকোত্তর পর্যায়ের শিক্ষার্থীকে দিকনির্দেশনা দিয়েছেন।

এই যৌথ উদ্যোগটি আমাদের দেখিয়ে দেয়, ভবিষ্যতে কণা পদার্থবিজ্ঞানের বড় বড় প্রকল্প কীভাবে পরিচালিত হতে পারে। আইইউ এবং এর সহযোগীদের জন্য এই ফলাফলগুলো আরও নিখুঁত গবেষণার নতুন দরজা খুলে দিয়েছে, যা ভবিষ্যতের কাজের মজবুত ভিত্তি গড়ে তুলবে।

লেখক: শিক্ষক, পদার্থবিজ্ঞান বিভাগ, শহীদ স্মৃতি মহাবিদ্যালয়, শশিকর, মাদারীপুর

সূত্র: সায়েন্স ডেইলি ডটকম

আরও পড়ুন