বিগ ব্যাংয়ের সময় হারিয়ে যাওয়া সেই অ্যান্টিম্যাটার এখন চলমান

বিগ ব্যাংয়ের ঠিক পরেই মহাবিশ্বে সম পরিমাণ ম্যাটার আর অ্যান্টিম্যাটার সৃষ্টি হয়েছিলছবি: স্যাক-মেসটারকে / সায়েন্স ফটো লাইব্রেরি

২০২৫ সালে সামার প্রোগ্রামের অংশ হিসেবে সার্নে কাটানো সময়ে মনে হয়েছিল, আমি যেন এমন এক জায়গায় দাঁড়িয়ে আছি, যেখানে মানুষের কৌতূহল ও প্রযুক্তি মিলে মহাবিশ্বের মহাকাব্য নতুন করে লিখছে। সেই প্রোগ্রামের অংশ হিসেবে সার্নের অ্যান্টিম্যাটার ফ্যাক্টরির কারখানা ঘুরে দেখার সুযোগ হয়েছিল আমার।

সেখানে অ্যান্টিম্যাটার ধীর করার প্রক্রিয়া, অ্যান্টিম্যাটারের ওপর মহাকর্ষের প্রভাব, ম্যাটার-অ্যান্টিম্যাটার প্রতিসাম্য পরীক্ষাসহ অন্যান্য রোমাঞ্চকর পরীক্ষা দেখার সৌভাগ্য হয়েছিল। ফ্যাক্টরির মধ্যে দিয়ে হাঁটার সময় মনে হচ্ছিল, মহাবিশ্বের হারিয়ে যাওয়া আদিম কণা খোঁজার এক মহাযজ্ঞ দেখছি! তবে আশার কথা হলো, বিজ্ঞানীরা এখন এই কণাগুলোকে কেবল তৈরিই করছেন না, বরং সেগুলোকে সুরক্ষিতভাবে এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় নিয়ে গিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈজ্ঞানিক অগ্রগতি অর্জন করেছেন।

সার্নের অ্যান্টিম্যাটার ফ্যাক্টরি
ছবি: ম্যাক্সিমিলিয়ান ব্রাইস / সার্ন

সম্প্রতি একটি ঐতিহাসিক মাইলফলক স্পর্শ করেছে সার্নের বেস এক্সপেরিমেন্ট। প্রথমবারের মতো বিজ্ঞানীরা ৯২টি অ্যান্টিপ্রোটন মানে প্রোটনের প্রতিকণা একটি ট্রাকে করে সার্ন ক্যাম্পাসের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে সফলভাবে স্থানান্তর করেছেন। এটি বিজ্ঞানের ইতিহাসে বহনযোগ্য অ্যান্টিম্যাটারের এক নতুন যুগের সূচনা করল। অ্যান্টিম্যাটারের কথা শুনলেই অ্যানিহিলেট বা ধ্বংস হয়ে যাওয়ার যে ভয় থাকে, সেটা আপাতত তোলা থাক। চলুন জেনে নিই, কীভাবে অ্যান্টিম্যাটারগুলোকেও সাধারণ পদার্থের মতো অক্ষত রাখা যায় এবং কেন অ্যান্টিপ্রোটনের এই স্থানান্তর বিজ্ঞানের এক বিস্ময়কর অধ্যায়!

আরও পড়ুন
প্রথমবারের মতো বিজ্ঞানীরা ৯২টি অ্যান্টিপ্রোটন মানে প্রোটনের প্রতিকণা একটি ট্রাকে করে সার্ন ক্যাম্পাসের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে সফলভাবে স্থানান্তর করেছেন।

অ্যান্টিম্যাটার বা প্রতিপদার্থ হলো সাধারণ পদার্থের প্রতিকণা, যার বৈদ্যুতিক চার্জ বিপরীত হলেও ভর একদম একই থাকে। যখনই কোনো কণা ও তার প্রতিকণা একে অপরের সংস্পর্শে আসে, তখনই তারা একে অপরকে ধ্বংস করে ফেলে এবং সঙ্গে উচ্চ শক্তির গামা রশ্মি নির্গত করে। এই ধ্বংস হয়ে যাওয়ার প্রক্রিয়াকেই বলা হয় অ্যানিহিলেশন।

সুইজারল্যান্ডের সার্নে অবস্থিত অ্যান্টিম্যাটার ফ্যাক্টরি হলো বিশ্বের একমাত্র গবেষণাগার, যেখানে এই রহস্যময় অ্যান্টিম্যাটার উৎপাদন করে স্বল্প শক্তিতে নিয়ন্ত্রিতভাবে সংরক্ষণ করা এবং দীর্ঘ সময় ধরে পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব। এরপর গবেষকেরা এগুলো নিয়ে কাজ করেন। কিন্তু সমস্যা হলো, এই কণাগুলোকে রাখা হবে কোথায়? যে পাত্রেই রাখা হোক না কেন, তা তো কোনো না কোনো পদার্থেরই তৈরি!

সুইজারল্যান্ডের সার্নে অবস্থিত অ্যান্টিম্যাটার ফ্যাক্টরির একাংশ
ছবি: সার্ন

তাই বিজ্ঞানীরা এক বিশেষ ধরনের ইলেকট্রিক ও বিদ্যুৎচুম্বকীয় ক্ষেত্রের মাধ্যমে পরিচালিত কনটেইনারে অ্যান্টিম্যাটারগুলো রাখেন। একে বলা হয় পেনিং ট্র্যাপ। এটি একটি বিশেষ কনটেইনার, যা শক্তিশালী বৈদ্যুতিক ও চুম্বকীয় ক্ষেত্র ব্যবহার করে কণাগুলোকে শূন্যস্থানে ভাসিয়ে রাখে। ফলে কণাগুলো পাত্রের দেয়ালের সংস্পর্শে আসতে পারে না। সেই সঙ্গে ক্রায়োজেনিক কুলিং পদ্ধতি ব্যবহার করে কণাগুলোকে স্থির রাখতে এর তাপমাত্রা মাইনাস ২৬৮ ডিগ্রি সেলসিয়াসে নামিয়ে আনা হয়। এই প্রচণ্ড শীতল পরিবেশে কণাগুলোর গতি কমে যায়। ফলে তাদের নিয়ন্ত্রণ করা সহজ হয়।

আরও পড়ুন
পেনিং ট্র্যাপ হলো একটি বিশেষ কনটেইনার, যা শক্তিশালী বৈদ্যুতিক ও চৌম্বক ক্ষেত্র ব্যবহার করে কণাগুলোকে শূন্যস্থানে ভাসিয়ে রাখে। ফলে কণাগুলো পাত্রের দেয়ালের সংস্পর্শে আসতে পারে না।

এখন মূল ফ্যাসিলিটি থেকে সরিয়ে সেগুলোকে একটি ট্রাকে করে স্থানান্তর করা কতটা জটিল প্রক্রিয়া, একবার ভাবুন তো! সম্প্রতি যে ৯২টি কণা স্থানান্তর করা হয়েছে, সেগুলো বাঁচিয়ে রাখতে বিজ্ঞানীরা ব্যবহার করেছেন বেস-স্টেপ বা সিমেট্রি টেস্টস ইন এক্সপেরিমেন্টস উইথ পোর্টেবল অ্যান্টিপ্রোটনস নামে একটি বহনযোগ্য ট্র্যাপ। ১.৯ মিটার দীর্ঘ এবং ১০০০ কেজি ওজনের এই যন্ত্রটি একটি সুপারকন্ডাক্টিং ম্যাগনেট, তরল হিলিয়াম ক্রায়োজেনিক কুলিং, পাওয়ার রিজার্ভ এবং একটি ভ্যাকুয়াম চেম্বারের সমন্বয়ে গঠিত এমন একটি ব্যবস্থা, যা কোনো ট্রাকে বা ল্যাবরেটরির দরজা দিয়ে সহজেই ঢুকে যেতে পারে।

কিন্তু ট্রাকে তরল হিলিয়াম এবং একটি আলাদা জেনারেটর ব্যবহার করে দীর্ঘ সময় পেনিং ট্র্যাপ কার্যকর রাখাটাই ছিল আসল চ্যালেঞ্জ, যা সম্প্রতি সার্নের বিজ্ঞানীরা সফলভাবে করে দেখিয়েছেন। রাস্তার ঝাঁকুনি বা কম্পনের মধ্যেও কণাগুলো স্থিতিশীল আছে কি না, তা পর্যবেক্ষণের জন্য বিজ্ঞানীরা একটি স্মার্টফোন অ্যাপ ব্যবহার করেছেন! স্ক্রিনে নির্দিষ্ট কম্পাঙ্কের গ্রাফ দেখে তাঁরা নিশ্চিত হন, কণাগুলো ট্র্যাপের ঠিক মাঝখানে নিরাপদে ভাসছে।

১৯৯৫ সালে সার্ন প্রথমবারের মতো ৯টি অ্যান্টিহাইড্রোজেন পরমাণু তৈরি করে বিশ্বকে তাক লাগিয়ে দিয়েছিল। যদিও সেগুলো মাত্র এক সেকেন্ডের কোটি ভাগের এক ভাগ সময় টিকে ছিল, তবু সেটিই ছিল আজকের পোর্টেবল অ্যান্টিম্যাটারের আদি ভিত্তি। বর্তমানের এই গবেষণাগারটি এখন একটি পূর্ণাঙ্গ অ্যান্টিম্যাটার ফ্যাক্টরি, যেখানে মহাবিশ্বের মৌলিক রহস্যগুলো উন্মোচনে দিনরাত কাজ চলছে।

আরও পড়ুন
১৯৯৫ সালে সার্ন প্রথমবারের মতো ৯টি অ্যান্টিহাইড্রোজেন পরমাণু তৈরি করে বিশ্বকে তাক লাগিয়ে দিয়েছিল। যদিও সেগুলো মাত্র এক সেকেন্ডের কোটি ভাগের এক ভাগ সময় টিকে ছিল!

এই ফ্যাক্টরির প্রাণকেন্দ্র হলো অ্যান্টিপ্রোটন ডিসিলারেটর বা এডি এবং এলিনা বা এক্সট্রা লো এনার্জি অ্যান্টিপ্রোটন রিং। সাধারণ কণা ত্বরক যন্ত্র বা অ্যাকসিলারেটর কণার গতি বাড়ালেও এখানে ঠিক উল্টো কাজ করা হয়। এডি এবং এলিনা মূলত অ্যান্টিপ্রোটনগুলোর গতি কমিয়ে সেগুলোকে ধীরগতির করে ফেলে, যাতে বিজ্ঞানীরা সেগুলোকে ট্র্যাপে আটকে রেখে গবেষণা করতে পারেন।

এক্সট্রা লো এনার্জি অ্যান্টিপ্রোটন রিং
ছবি: সার্ন

এখানে বেশ কিছু রোমাঞ্চকর পরীক্ষা করা হয়, যার মধ্যে একটি হলো বেস এক্সপেরিমেন্ট। এটি মূলত সিপিটি সিমেট্রি বা পদার্থ ও প্রতিপদার্থের স্বভাবের সূক্ষ্ম মিল পরীক্ষা করার কাজ করে। বিজ্ঞানীরা প্রোটন এবং অ্যান্টিপ্রোটনের চুম্বকীয় ধর্ম পরিমাপ করে দেখছেন, তারা হুবহু এক কি না। এ ছাড়া এখানে জি-বার এবং এজিস নামে এক্সপেরিমেন্টও রয়েছে, যেখানে অ্যান্টি-গ্র্যাভিটি বা প্রতিপদার্থের ওপর অভিকর্ষের প্রভাব নিয়ে কাজ করা হয়। সাধারণ পদার্থ অভিকর্ষের টানে নিচের দিকে পড়লেও অ্যান্টিম্যাটার একইভাবে নিচের দিকে পড়ে কি না, নাকি অন্য কোনো আচরণ করে—সেটিই পরীক্ষা করে দেখা হচ্ছে।

তবে এই সূক্ষ্ম গবেষণায় বড় বাধা হলো খোদ গবেষণাগারের নিজস্ব পরিবেশ। এখানকার বিশাল সব যন্ত্রপাতির কারণে সৃষ্ট অত্যন্ত ক্ষুদ্র চুম্বকীয় তারতম্যও ফলাফলের নিখুঁত মান পেতে বাধা দেয়। এই সীমাবদ্ধতা এড়াতেই দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে অ্যান্টিম্যাটারগুলোকে ইউরোপের অন্যান্য দেশের ল্যাবরেটরিতে নিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা চলছে। সেখানে নীরব পরিবেশে গবেষণা করলে বর্তমানের চেয়েও বেশি নিখুঁত ফলাফল পাওয়া সম্ভব হবে।

আরও পড়ুন
জি-বার এবং এজিস নামে এক্সপেরিমেন্টও রয়েছে, যেখানে অ্যান্টি-গ্র্যাভিটি বা প্রতিপদার্থের ওপর অভিকর্ষের প্রভাব নিয়ে কাজ করা হয়।

এটি কেবল একটি পরিবহনের পরীক্ষাই নয়, বরং নিখোঁজ হয়ে যাওয়া অ্যান্টিম্যাটারের কুলকিনারা খুঁজে বের করার এক অদম্য প্রয়াস। বিগ ব্যাং বা মহাবিস্ফোরণের তত্ত্ব অনুযায়ী, সৃষ্টির শুরুতে মহাবিশ্বে ঠিক সমান পরিমাণ পদার্থ এবং প্রতিপদার্থ তৈরি হওয়ার কথা ছিল। যদি তা-ই হতো, তবে তারা একে অপরকে পুরোপুরি ধ্বংস করে দিত এবং মহাবিশ্বে নক্ষত্র বা গ্রহের বদলে শুধু নিছক বিকিরণ ছাড়া আর কিছুই থাকত না।

কিন্তু বাস্তবে মহাবিশ্বে শুধু পদার্থেরই এত আধিপত্য কেন? প্রতিকণার ধর্ম অত্যন্ত নিখুঁতভাবে পরিমাপ করার মাধ্যমে বিজ্ঞানীরা দেখতে চান, পদার্থ ও প্রতিপদার্থের মধ্যে কোনো সূক্ষ্ম পার্থক্য বা অপ্রতিসাম্য আছে কি না। যদি এই প্রতিসাম্য লঙ্ঘনের কোনো ছোট প্রমাণও পাওয়া যায়, তবেই শেষ পর্যন্ত বোঝা যাবে কেন সৃষ্টির শুরুতে সবটুকু অ্যান্টিম্যাটার উধাও হয়ে গেলেও কিছু পরিমাণ পদার্থ টিকে গিয়েছিল, যা দিয়ে আজ আমাদের এই চেনা মহাবিশ্ব গঠিত হয়েছে।

সার্ন ক্যাম্পাসের ভেতরে এই ১০ কিলোমিটারের যাত্রা ছিল কেবল একটি মহড়া বা পরীক্ষা। বিজ্ঞানীদের পরবর্তী লক্ষ্য হলো জার্মানির ডাসেলডর্ফে প্রায় ৮ ঘণ্টার দীর্ঘ পথ পাড়ি দেওয়া। বেস-স্টেপ প্রজেক্টের লিডার ক্রিশ্চিয়ান স্মোরা বলেন, ‘সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে গন্তব্যে পৌঁছানোর পর অ্যান্টিপ্রোটনগুলোকে ধ্বংস হতে না দিয়ে সফলভাবে অন্য ল্যাবে স্থানান্তর করা।’

যদি এই মিশন সফল হয়, তবে অদূর ভবিষ্যতে অ্যান্টিম্যাটারের লুকানো রহস্যের সমাধান হয়ে হয়তো মহাবিশ্বের চমকপ্রদ কোনো নতুন তথ্য মানবসভ্যতার কাছে উন্মোচিত হবে!

লেখক: শিক্ষার্থী, নিউক্লিয়ার ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

সূত্র: সার্ন

আরও পড়ুন