মেরি কুরি তেজস্ক্রিয়তায় মারা যান, তাঁর ল্যাব কীভাবে নিরাপদ জাদুঘর হলো
পৃথিবীতে এমন একটা ডায়েরি আছে যা পড়তে গেলে আপনাকে বিশেষ একধরনের প্রতিরক্ষামূলক পোশাক পরতে হবে! শুধু তা-ই নয়, এই ডায়েরিটি সিসার তৈরি একটি বিশেষ বাক্সে রাখা থাকে। এটি দেখার আগেও আপনাকে একটি আইনি কাগজে সই করতে হবে। এটা কোনো দেশের সরকারি ডকুমেন্ট নয়, এটি মেরি কুরির ডায়েরি!
মেরি কুরি প্রথম মানুষ হিসেবে দুটি নোবেল পুরস্কার জিতেছিলেন। বিজ্ঞানের ইতিহাসে তাঁর অবদান পাহাড়সম। বিজ্ঞানের ইতিহাস নিয়ে আপনার আগ্রহ থাকলে মেরি কুরির ল্যাবরেটরি আপনার জন্য দারুণ আকর্ষণ হতে পারে। তাত্ত্বিক বিজ্ঞানীদের টেবিলের চেয়ে একজন ব্যবহারিক বিজ্ঞানীর ল্যাবে দেখার মতো অনেক কিছু থাকে। আর এই ল্যাব দেখতে আপনাকে খুব দুর্গম কোথাও যেতে হবে না; প্যারিসের কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত এই জায়গাটি এখন ‘কুরি মিউজিয়াম’ নামে পরিচিত।
কিন্তু এখানে একটা বড় খটকা লাগে। মেরি কুরির মৃত্যুর কারণ ছিল অ্যাপ্লাস্টিক অ্যানিমিয়া, যা তাঁর আবিষ্কৃত তেজস্ক্রিয় উপাদানের কারণেই হয়েছিল বলে প্রায় নিশ্চিত। মৃত্যুর পর তাঁর দেহ এতই তেজস্ক্রিয় ছিল যে, তাঁকে সিসার আস্তরণ দেওয়া একটি কফিনে সমাহিত করা হয়। তাঁর নোটবুকগুলো যদি আজও এত বেশি তেজস্ক্রিয় এবং বিপজ্জনক থাকে, তবে তাঁর ল্যাবরেটরি সাধারণ দর্শকদের জন্য কীভাবে নিরাপদ হলো? সেখানে গেলে তো আপনার তেজস্ক্রিয়তায় আক্রান্ত হওয়ার কথা! অথচ আজ সেখানে তেজস্ক্রিয়তা মাপার যন্ত্র, মানে গাইগার কাউন্টার ধরলে ব্যাকগ্রাউন্ড লেভেলের চেয়ে বেশি বা অস্বাভাবিক কোনো সংকেতই ধরা পড়ে না। দর্শনার্থীরা নিশ্চিন্তে ল্যাবের ভেতর ঘুরে বেড়ান। এই জাদুকরী কাজটা আসলে কীভাবে সম্ভব হলো?
মেরি কুরির মৃত্যুর কারণ ছিল অ্যাপ্লাস্টিক অ্যানিমিয়া, যা তাঁর আবিষ্কৃত তেজস্ক্রিয় উপাদানের কারণেই হয়েছিল বলে প্রায় নিশ্চিত।
অনেকেই ভাবতে পারেন, এত বছর পার হয়ে গেছে, তেজস্ক্রিয়তা হয়তো এমনিতেই কমে গেছে। তবে আপনাকে জানিয়ে রাখি, বিজ্ঞানের ভাষায় অর্ধায়ু বলে একটি শব্দ আছে। প্রতিটি তেজস্ক্রিয় আইসোটোপের একটি নির্দিষ্ট অর্ধায়ু থাকে। এই সময় পার হলে ওই পদার্থের অর্ধেক ক্ষয় হয়ে যায়। কুরি যে রেডিয়াম নিয়ে কাজ করতেন, তার কিছু আইসোটোপের অর্ধায়ু ছিল মাত্র ৩.৬ বা ১১.৪ দিন। সেগুলো এত দিনে অনেকটাই বিলীন হয়ে যাওয়ার কথা। কিন্তু শুধু কয়েক বছর অপেক্ষা করলেই যদি ল্যাবটি নিরাপদ হয়ে যেত, তবে তো তাঁর নোটবুকগুলোও এত দিনে সাধারণ মানুষের জন্য উন্মুক্ত হয়ে যাওয়ার কথা!
মুশকিল হলো, মেরি কুরি সবচেয়ে বেশি কাজ করেছিলেন রেডিয়াম-২২৬ নিয়ে। এই রেডিয়াম-২২৬-এর অর্ধায়ু হলো ১ হাজার ৬০০ বছর! অর্থাৎ, ল্যাবের জিনিসপত্রে লেগে থাকা রেডিয়াম-২২৬-এর ৯০ শতাংশেরও বেশি আজও সেখানে দিব্যি টিকে আছে। তাহলে মিউজিয়ামটি নিরাপদ হলো কীভাবে?
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে আমাদের একটু গভীরে যেতে হবে। মেরি এবং পিয়েরে কুরি পিচব্লেন্ড নামে একটি প্রাকৃতিকভাবে পাওয়া আকরিক থেকে ইউরেনিয়াম ক্ষয়ের মাধ্যমে রেডিয়াম এবং পোলোনিয়াম আবিষ্কার করেছিলেন। ইউরেনিয়ামের কারণেই পিচব্লেন্ড তেজস্ক্রিয় হয়, তবে এটি এত ধীরে ক্ষয় হয় যে বিপজ্জনক হতে গেলে এর বিশাল পরিমাণের দরকার হয়।
রেডিয়াম-২২৬-এর অর্ধায়ু হলো ১ হাজার ৬০০ বছর! অর্থাৎ, মেরি কুরির ল্যাবের জিনিসপত্রে লেগে থাকা রেডিয়াম-২২৬-এর ৯০ শতাংশেরও বেশি আজও সেখানে দিব্যি টিকে আছে।
গবেষণা করার জন্য কুরি দম্পতিকে প্রচুর পিচব্লেন্ড প্রক্রিয়াজাত করতে হয়েছিল। ফলে তাঁরা এমন সব উপাদানের সংস্পর্শে এসেছিলেন, যেগুলো অনেক বেশি বিপজ্জনক। যেমন, ইউরেনিয়ামের চেয়ে এর ক্ষয়ের ফলে তৈরি হওয়া রেডিয়াম অনেক বেশি তেজস্ক্রিয়! তবে অবাক করা ব্যাপার হলো, তাঁদের জন্য সবচেয়ে বড় বিপদের কারণ রেডিয়াম বা পোলোনিয়াম ছিল না; ছিল এই দুটির মাঝখানে তৈরি হওয়া আরেকটি পদার্থ—রেডন গ্যাস!
রেডিয়াম-২২৬ যখন আলফা কণা বিকিরণ করে ক্ষয়প্রাপ্ত হয়, তখন তা রেডন-২২২-এ পরিণত হয়। এরপর তা একই প্রক্রিয়ায় ক্ষয় হয়ে পোলোনিয়াম-২১৮ হয়। আলফা কণা আমাদের ত্বক ভেদ করতে পারে না, তাই এটি তখনই বিপজ্জনক হয় যখন আমরা এটি শ্বাস-প্রশ্বাসের সঙ্গে টেনে নিই বা খাবার ও পানীয়ের সঙ্গে গিলে ফেলি। রেডিয়াম এবং পোলোনিয়াম সাধারণ তাপমাত্রায় কঠিন পদার্থ হিসেবে থাকে, তাই ধুলোর মাধ্যমে এগুলো এদিক-সেদিক গেলেও সরাসরি শরীরের ভেতরে ঢোকার আশঙ্কা কম।
কিন্তু রেডনের ব্যাপারটা একেবারেই আলাদা। মেরি কুরির কাজের সূত্র ধরে বিজ্ঞানী রাদারফোর্ড এবং ওয়েন্স এই রেডন আবিষ্কার করেন। এটি একটি নিষ্ক্রিয় গ্যাস, যার স্ফুটনাঙ্ক শূন্য ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে। মানে সাধারণ তাপমাত্রাতেই এটি গ্যাসীয় অবস্থায় থাকে। এর কোনো রং, গন্ধ বা স্বাদ নেই, তাই আপনি টেরও পাবেন না যে আপনি ভয়ংকর কিছু শরীরে নিচ্ছেন। রেডন-২২২-এর অর্ধায়ু মাত্র ৩.৮ দিন হলেও, গ্যাসীয় হওয়ার কারণে এটি খুব সহজেই শ্বাস-প্রশ্বাসের সঙ্গে মানুষের ফুসফুসে ঢুকে যায়।
রেডনের ব্যাপারটা একেবারেই আলাদা। মেরি কুরির কাজের সূত্র ধরে বিজ্ঞানী রাদারফোর্ড এবং ওয়েন্স এই রেডন আবিষ্কার করেন। এটি একটি নিষ্ক্রিয় গ্যাস, যার স্ফুটনাঙ্ক শূন্য ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে।
ফুসফুসে ঢোকার পর এই গ্যাস যখন আলফা ক্ষয় প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যায়, তখন ভেতরের নরম টিস্যুগুলোকে বাঁচানোর কোনো উপায় থাকে না। আলফা কণা চারপাশের কোষগুলোতে ধ্বংসযজ্ঞ চালায়। এখানেই শেষ নয়, এরপর আরও কয়েক ধাপে ক্ষয়ের পর এটি পরিণত হয় লেড-২০৬ বা সিসায়। এটিও শরীরের জন্য ভালো কিছু নয়। রেডিয়াম থেকে রেডন এবং রেডন থেকে পোলোনিয়ামে ক্ষয়ের এই প্রক্রিয়ার সঙ্গে গামা রশ্মিও নির্গত হয়।
আলফা কণার চেয়ে গামা রশ্মিকে আটকানো অনেক বেশি কঠিন। অনেক ক্ষেত্রেই এটি সবচেয়ে বিপজ্জনক বিকিরণ। তবে শরীরের ভেতরে থাকা তেজস্ক্রিয় উৎসের ক্ষেত্রে এই আলফা কণাগুলোই সবচেয়ে বেশি ক্ষতি করে।
মেরি কুরির নোটবুক বা ল্যাবের জিনিসপত্রগুলো এত বিপজ্জনক হওয়ার কারণ, সেগুলোতে রেডিয়ামের কণা আটকে আছে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই রেডিয়াম প্রতিনিয়ত ক্ষয় হয়ে নতুন করে রেডন গ্যাস ছড়াচ্ছে।
তাহলে কীভাবে ল্যাবটিকে নিরাপদ করা হলো? আসলে মেরি কুরি তাঁর সবচেয়ে বিপজ্জনক কাজগুলো এই মূল ল্যাবে করেননি; বরং তিনি সেগুলো করতেন পাশের একটি শেড বা ছাপরা ঘরে। সেটি তাঁর জীবদ্দশাতেই ভেঙে ফেলা হয়েছিল। তারপরও এই মূল ল্যাবটি সাধারণ মানুষের পরিদর্শনের জন্য অনেক বেশি তেজস্ক্রিয় ছিল।
মেরি কুরির নোটবুক বা ল্যাবের জিনিসপত্রগুলো বিপজ্জনক হওয়ার কারণ, সেগুলোতে রেডিয়ামের কণা আটকে আছে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই রেডিয়াম প্রতিনিয়ত ক্ষয় হয়ে নতুন করে রেডন গ্যাস ছড়াচ্ছে।
সবচেয়ে প্রথমে ল্যাবের ভেতরের সমস্ত আসবাবপত্র এবং অন্যান্য বস্তু সরিয়ে ফেলা হয়। এর মধ্যে ক্যাবিনেট এবং কাজের টেবিল ছিল, যেগুলোকে তেজস্ক্রিয়তামুক্ত করা সম্ভব ছিল না। কারণ রেডিয়াম কণা কাঠের একেবারে গভীরে ঢুকে গিয়েছিল। দর্শনার্থীদের কাছে হয়তো ল্যাবটিকে পুরোপুরি প্রাকৃতিক অবস্থায় দেখতে না পাওয়াটা আক্ষেপের, কিন্তু বিপজ্জনক মাত্রার তেজস্ক্রিয়তায় আক্রান্ত হওয়ার আক্ষেপের চেয়ে তো সেটি ভালো!
আপনার মনে প্রশ্ন জাগতে পারে, ল্যাব পরিষ্কারের কাজ যাঁরা করেছিলেন, তাঁরা কি চেরনোবিলের উদ্ধারকর্মীদের মতো মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়েছিলেন? আসলে ‘না’। গামা রশ্মি আটকাতে হ্যাজার্ড স্যুট বা সুরক্ষামূলক পোশাক খুব একটা কাজে না এলেও, মূল বিপদ যে রেডন গ্যাস নিঃশ্বাসের সঙ্গে শরীরে ঢোকা, তা থেকে রক্ষা করতে এগুলো দারুণ কার্যকর ছিল। আসবাবপত্রগুলো সরানোর পর সেগুলোকে তেজস্ক্রিয় বর্জ্যের আধুনিক মানদণ্ড মেনে নিরাপদ করা হয়। এই প্রোটোকলগুলো পারমাণবিক চুল্লির ব্যবহৃত জ্বালানি থেকে শুরু করে সবকিছুর ক্ষেত্রেই ব্যবহার করা হয়।
যেসব জিনিসের পৃষ্ঠতল অভেদ্য, সেগুলোকে ঘষে ঘষে পরিষ্কার করা হয়। তবে বিরল কিছু ক্ষেত্রে ইচ্ছাকৃতভাবেই এটি করা হয়নি। যেমন, দরজার হাতলে এখনো মেরি কুরির নিজের হাতের ছাপ রয়ে গেছে এবং সেটি এখনো তেজস্ক্রিয়! তবে এর মাত্রা এতই কম যে, স্ট্র্যাটোস্ফিয়ার দিয়ে উড়ে যাওয়া কোনো বিমানে ভ্রমণ করলে আপনি যতটা তেজস্ক্রিয়তার মুখে পড়বেন, এই হাতলটি তার চেয়েও কম ঝুঁকিপূর্ণ। মেরি কুরির সঙ্গে সরাসরি সংযোগ স্থাপনের নিদর্শন হিসেবে এই ছাপগুলোকে মহামূল্যবান ধরা হয়।
গামা রশ্মি আটকাতে হ্যাজার্ড স্যুট বা সুরক্ষামূলক পোশাক খুব একটা কাজে না এলেও, মূল বিপদ যে রেডন গ্যাস নিঃশ্বাসের সঙ্গে শরীরে ঢোকা, তা থেকে রক্ষা করতে এগুলো দারুণ কার্যকর ছিল।
ল্যাবে এমন কিছু মূল্যবান জিনিসও ছিল যেগুলো ধ্বংস করা যায় না, আবার পরিষ্কার করাও সম্ভব নয়। মেরি কুরির ল্যাবের নোটবুকগুলো এর সবচেয়ে বড় উদাহরণ। রেডিয়ামের লবণ বা তেজস্ক্রিয় ধুলো এই নোটবুকের কাগজের ভেতরে ঢুকে মিশে গেছে, যেখানে থাকা রেডিয়াম আজও ক্ষয় হয়ে রেডন গ্যাস তৈরি করছে।
এ কারণেই জিনিসগুলোকে সিসার লাইনিং দেওয়া বিশেষ বাক্সে রাখা হয়েছে। কোনো দর্শনার্থী যদি সেগুলো দেখতে চান, তবে তাঁকে সুরক্ষামূলক পোশাক পরতে হয় এবং একটি আইনি কাগজে সই করতে হয়, শুরুতেই যেমনটা বলেছিলাম।