চীন তৈরি করেছে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় কৃত্রিম সূর্য, এটি কী, কীভাবে কাজ করে

মানুষ কেন এত কাঠখড় পুড়িয়ে পৃথিবীতে সূর্য বানাতে চাইছে?ছবি: এক্স/স্ট্যানলিস ফোর

সূর্যের কেন্দ্রের তাপমাত্রা প্রায় দেড় কোটি ডিগ্রি সেলসিয়াস। কিন্তু পৃথিবীতে বসে কেউ যদি এর চেয়েও সাত গুণ বেশি উত্তপ্ত, অর্থাৎ প্রায় ১০ কোটি ডিগ্রি সেলসিয়াসের একটা জ্বলন্ত আগুনের গোলা বানাতে চায়, আপনি তাকে কী বলবেন? নির্ঘাৎ পাগল! কারণ পৃথিবীর বুকে এত ভয়াবহ তাপমাত্রা বন্দি করে রাখবে, এমন কোনো পাত্রের অস্তিত্বই নেই। লোহা বা ইস্পাত তো দূরের কথা, সবচেয়ে মজবুত ধাতুও এর কাছে গেলে চোখের পলকে বাষ্প হয়ে উড়ে যাবে।

অথচ এই অসম্ভবকেই সম্ভব করতে গত ৭০ বছর ধরে লড়ে যাচ্ছেন বিজ্ঞানীরা। তাঁরা এমন এক অদৃশ্য খাঁচা বানানোর পেছনে ছুটছেন, যা কোনো দেয়াল স্পর্শ না করেই এই প্রলয়ংকরী শক্তিকে শূন্যে ভাসিয়ে রাখবে। কোনো সায়েন্স ফিকশন নয়, আস্ত একটা সূর্যকে পৃথিবীতে নামিয়ে আনার এই রোমাঞ্চকর লড়াইয়ে এবার এক দানবীয় যন্ত্র বানিয়ে রীতিমতো হইচই ফেলে দিয়েছে চীন।

প্রতি কয়েক মাস পরপরই খবরের কাগজ কিংবা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে কৃত্রিম সূর্য নিয়ে নানা চমকপ্রদ খবর আসে। এর অনেকগুলোই হয়তো অতিশয়োক্তি। কিন্তু গত ২৭ জুন চীনের হেফেই শহরের ইনস্টিটিউট অব প্লাজমা ফিজিকস থেকে যে খবরটি এসেছে, তা মোটেও হেলাফেলা করার মতো নয়। তারা ৫২২ টন ওজনের আস্ত এক অতিপরিবাহী চুম্বকের সফল পরীক্ষা চালিয়েছে। ফিউশন রিঅ্যাক্টর বা কৃত্রিম সূর্যের জন্য বানানো এটাই পৃথিবীর ইতিহাসের সবচেয়ে বড় চুম্বক!

খবরটা শুনে মনে প্রশ্ন জাগতেই পারে, মানুষ কেন এত কাঠখড় পুড়িয়ে পৃথিবীতে সূর্য বানাতে চাইছে? এই দানবাকৃতির চুম্বকের কাজই বা কী? চলুন, ধীরে ধীরে এসব প্রশ্নের জট খোলা যাক।

আরও পড়ুন
আমাদের পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতে বর্তমানে বিদ্যুৎ তৈরি হয় ফিশন পদ্ধতিতে। এই পদ্ধতিতে পরমাণুকে ভাঙা হয়। কিন্তু ফিউশন পদ্ধতি এর ঠিক উল্টো। এখানে পরমাণুকে জোড়া লাগানো হয়।

কৃত্রিম সূর্য কী, কীভাবে কাজ করে

শুরুতেই একটা ভুল ভাঙিয়ে দিই। বিজ্ঞানীরা মাটি খুঁড়ে বিশাল কোনো জ্বলন্ত গোলক বানাচ্ছেন না। তাঁরা আসলে সূর্যের শক্তির উৎসটাকে নকল করার চেষ্টা করছেন।

সূর্যের ভেতরে কোটি কোটি ডিগ্রি তাপমাত্রায় হাইড্রোজেন পরমাণুগুলো প্রচণ্ড চাপে একে অপরের সঙ্গে জোড়া লেগে হিলিয়াম তৈরি করে। এই জোড়া লাগার সময় বিপুল পরিমাণ শক্তি বেরিয়ে আসে। বিজ্ঞানের ভাষায় একে বলে নিউক্লিয়ার ফিউশন। আমাদের পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতে বর্তমানে বিদ্যুৎ তৈরি হয় ফিশন পদ্ধতিতে। এই পদ্ধতিতে পরমাণুকে ভাঙা হয়। কিন্তু ফিউশন পদ্ধতি এর ঠিক উল্টো। এখানে পরমাণুকে জোড়া লাগানো হয়।

কিন্তু পৃথিবীতে এই ফিউশন ঘটাতে গেলে একটা মারাত্মক সমস্যা দেখা দেয়। সূর্যের তো বিশাল মহাকর্ষ বল আছে, যা দিয়ে সে পরমাণুগুলোকে চেপে ধরে রাখে। কিন্তু পৃথিবীতে তো সেই বিশাল মহাকর্ষ নেই! তাই পৃথিবীতে ফিউশন ঘটাতে হলে জ্বালানি বা প্লাজমাকে প্রায় ১০ কোটি ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত উত্তপ্ত করতে হয়। ভেবে দেখুন, খোদ সূর্যের কেন্দ্রের তাপমাত্রাই হলো দেড় কোটি ডিগ্রি সেলসিয়াস। অর্থাৎ, পৃথিবীতে সূর্যের চেয়েও প্রায় সাত গুণ বেশি তাপমাত্রার পরিবেশ তৈরি করতে হবে!

সমস্যা হলো, ১০ কোটি ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা ধরে রাখতে পারে, এমন কোনো পাত্র বা পদার্থ পৃথিবীতে নেই। তাহলে উপায়?

আরও পড়ুন
সূর্যের ভেতরে কোটি কোটি ডিগ্রি তাপমাত্রায় হাইড্রোজেন পরমাণুগুলো প্রচণ্ড চাপে একে অপরের সঙ্গে জোড়া লেগে হিলিয়াম তৈরি করে। এই জোড়া লাগার সময় বিপুল পরিমাণ শক্তি বেরিয়ে আসে।

উপায় হলো চৌম্বকীয় খাঁচা। বিজ্ঞানীরা ডোনাট বা রিংয়ের আকৃতির এক বিশাল যন্ত্র বানিয়েছেন, যাকে বলা হয় টোকামাক। এই যন্ত্রের ভেতরে শক্তিশালী চুম্বক দিয়ে একটা অদৃশ্য খাঁচা তৈরি করা হয়। প্লাজমা বা সেই ফুটন্ত আগুনের গোলাটি কোনো পাত্রের গা স্পর্শ না করে ওই চৌম্বক ক্ষেত্রের খাঁচার ভেতরেই শূন্যে ভাসতে থাকে!

ঠিক এই চৌম্বকীয় খাঁচাটি বানাতেই চীন তৈরি করেছে তাদের নতুন সুপারকন্ডাক্টিং চুম্বকটি। এর পরিসংখ্যান শুনলে যে কারও চোখ কপালে উঠতে বাধ্য। এই চুম্বকটি ২১ মিটার লম্বা এবং ১২ মিটার চওড়া। ওজন ৫৮২ মেট্রিক টন! এর চৌম্বক ক্ষেত্রের শক্তি প্রায় ৬.৫ টেসলা। হাসপাতালে এমআরআই মেশিনের ভেতরে যে চুম্বক থাকে, এটি তার চেয়েও দুই থেকে চার গুণ বেশি শক্তিশালী।

ফ্রান্সে তৈরি হওয়া বিশ্বের সবচেয়ে বড় আন্তর্জাতিক ফিউশন প্রজেক্ট আটিইআর বা আইটার চুম্বকের চেয়েও এটি আয়তনে ১.৩ গুণ বড়। আর এটি আইটারের চেয়ে প্রায় তিন গুণ বেশি শক্তি ধরে রাখতে পারে।

বিশাল এই চুম্বকটি এমন ১৬টি একই রকম কুণ্ডলী বা কয়েল মিলে তৈরি হবে। ২০২৭ সালের মধ্যে চীনের হেফেই শহরে বেস্ট (বার্নিং প্লাজমা এক্সপেরিমেন্টাল সুপারকন্ডাক্টিং টোকামাক) নামে নতুন প্রজন্মের একটি রিঅ্যাক্টরে বসানো হবে। এই চুম্বকটি তৈরি করতে চীনের সময় লেগেছে পাক্কা ছয় বছর। এর পেছনে ৪৭টি নতুন পেটেন্ট যুক্ত আছে।

আরও পড়ুন
চৌম্বকীয় খাঁচাটি বানাতেই চীন তৈরি করেছে তাদের নতুন সুপারকন্ডাক্টিং চুম্বকটি। এই চুম্বকটি ২১ মিটার লম্বা এবং ১২ মিটার চওড়া। ওজন ৫৮২ মেট্রিক টন! এর চৌম্বক ক্ষেত্রের শক্তি প্রায় ৬.৫ টেসলা।

মানুষ কেন এই অসাধ্য সাধনে মেতেছে

আপনার মনে হতে পারে, এত কোটি কোটি টাকা ও সময় নষ্ট করে এসব কী দরকার? এর উত্তর লুকিয়ে আছে আমাদের ভবিষ্যতের অস্তিত্বের মধ্যে।

বর্তমানে আমরা যেভাবে বিদ্যুৎ বানাচ্ছি, তা পরিবেশের বারোটা বাজাচ্ছে। অন্যদিকে ফিউশন বা কৃত্রিম সূর্যের জ্বালানি আসবে সরাসরি সমুদ্রের পানি থেকে! সমুদ্রের পানিতে থাকা হাইড্রোজেনের আইসোটোপ দিয়েই এই রিঅ্যাক্টর চলবে।

এর সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো, এখান থেকে পরিবেশদূষণকারী কোনো কার্বন ডাই-অক্সাইড বের হবে না। চেরনোবিলের মতো কোনো পারমাণবিক দুর্ঘটনার ভয়ও এখানে নেই। কারণ, এই ফিউশন বিক্রিয়া কোনো চেইন রিঅ্যাকশন নয়। কোনো কারণে যদি খাঁচার তাপমাত্রা কমে যায় বা কোনো ত্রুটি দেখা দেয়, তবে বিক্রিয়াটি সঙ্গে সঙ্গে নিজে থেকেই বন্ধ হয়ে যাবে।

সামনের দিনগুলোতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ডেটা সেন্টার এবং বৈদ্যুতিক গাড়ির কারণে বিদ্যুতের চাহিদা যে হারে বাড়বে, তা মেটানোর জন্য এই ফিউশন এনার্জির কোনো বিকল্প নেই। অফুরন্ত, পরিচ্ছন্ন এবং শতভাগ নিরাপদ শক্তির এক বিশাল খনি হলো এই ফিউশন। চীন ঠিক এই বাজারটাই দখল করতে চাইছে। সৌরবিদ্যুতের বাজার যেভাবে তারা নিজেদের পকেটে পুরেছে, ফিউশন শক্তির হার্ডওয়্যার আর সাপ্লাই চেইনটাও তারা সেভাবে নিজেদের কবজায় নিতে চাইছে।

আরও পড়ুন
এই ফিউশন বিক্রিয়া কোনো চেইন রিঅ্যাকশন নয়। কোনো কারণে যদি খাঁচার তাপমাত্রা কমে যায় বা কোনো ত্রুটি দেখা দেয়, তবে বিক্রিয়াটি সঙ্গে সঙ্গে নিজে থেকেই বন্ধ হয়ে যাবে।

এই অফুরন্ত শক্তির দেখা কবে মিলবে

আশার কথা শোনানোর পর এবার একটু বাস্তব কথা বলা যাক। আগামী মাসেই যে এই ফিউশন রিঅ্যাক্টর থেকে সুবিধা পাওয়া যাবে, ব্যাপারটা মোটেও তেমন নয়।

চীনের টার্গেট, ২০৩০ সালের দিকে পরীক্ষামূলকভাবে এই ফিউশন থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু করা। তবে সেটা হবে একেবারেই পরীক্ষামূলক স্কেলে। বাণিজ্যিকভাবে পুরো দেশের গ্রিডে ফিউশন বিদ্যুৎ যুক্ত হতে হয়তো ২০৪০ বা ২০৫০ সাল পর্যন্ত সময় লেগে যাবে।

তাহলে হেফেই শহরে এই বিশাল চুম্বকটির সফল পরীক্ষা কতটা বড় অর্জন? একটা চমৎকার উদাহরণ দিয়ে বিষয়টা বোঝানো যায়। ধরুন, আপনি একটা জেট ইঞ্জিন বানাতে চান। আপনি শুধু নিখুঁতভাবে ইঞ্জিনের টারবাইন ব্লেডটি বানাতে পেরেছেন। এটা অত্যন্ত জরুরি এবং দারুণ একটা অর্জন, তাতে সন্দেহ নেই; কিন্তু সেই বিমানে চড়ে আকাশে উড়তে এখনো অনেকটা পথ বাকি।

তবে সান্ত্বনার জায়গা হলো, মানবজাতি অন্তত সঠিক পথেই হাঁটছে। কে জানে, হয়তো আগামী কয়েক দশকের মধ্যেই আমরা সত্যিই পৃথিবীর বুকে নক্ষত্রের আলো নামিয়ে আনতে পারব!

সূত্র: টেক ডট ইয়াহু ডটকম

আরও পড়ুন