পরমাণুর ভেতরের যৌথ পরিবারের গল্প!
ইলেকট্রন, প্রোটন ও নিউট্রন দিয়ে পরমাণু গঠিত—বইয়ের পাতায় পড়া এই অতিপরিচিত তথ্যের পেছনেই লুকিয়ে আছে কোয়ান্টাম ফিজিক্সের এক রোমাঞ্চকর জগৎ! এই জটিল বিজ্ঞান সহজে বোঝা এবং বোঝানোই আসল চ্যালেঞ্জ। চলুন, আমাদের চেনা পারিবারিক ও সামাজিক জীবনের আলোয় বিষয়টি সহজ ভাষায় বোঝা যাক।
প্রোটন: মূল ভিটা ও মেজাজি ভাইয়েরা
একটি পরমাণুর মূল ভিটা বা ঘরের ভেতরটাই হলো তার কেন্দ্র বা নিউক্লিয়াস। এই ঘরে বাস করে পরিবারের ভাইয়েরা, যাদের আমরা প্রোটন নামে চিনি।
যেহেতু প্রোটনগুলোর ধনাত্মক (+ve) চার্জ থাকে, তাই তারা অনেকটা একগুঁয়ে ও মেজাজি ভাইদের মতো! একই ধরনের চার্জ হওয়ার কারণে তারা একে অপরকে বিদ্যুৎচুম্বকীয় বলের মাধ্যমে তীব্রভাবে বিকর্ষণ করে। অর্থাৎ, এরা একে অন্যকে একদম সহ্য করতে পারে না! তাদের ঘরের ভেতর যদি একা ছেড়ে দেওয়া হয়, তবে মেজাজের চোটে সেই বিকর্ষণে মূল ভিটাবাড়িই ভেঙে চুরমার হয়ে যাবে।
নিউট্রন: বাড়ির শান্তিকামী বোনেরা
বোনদের কোনো চার্জ নেই, অর্থাৎ তারা চার্জ-নিরপেক্ষ। কিন্তু তাদের আছে প্রকৃতিপ্রদত্ত এক বিশেষ শক্তি, যার নাম সবল পারমাণবিক বল। সহজ কথায় এটি বোনদের খাঁটি ভালোবাসা ও মমতার বন্ধন। আঠার মতো কাজ করে এই বোনেরাই মেজাজি ভাইদের মাঝখানে বসে সব বিকর্ষণ মিটিয়ে শক্তহাতে পুরো পরিবার ও ভিটাবাড়িকে একসুতোয় বেঁধে রাখে। (এখানে বলে রাখা ভালো, নিউক্লিয়াসে মহাকর্ষ বলও কাজ করে, তবে প্রোটন ও নিউট্রনকে একত্রে ধরে রাখার আসল নায়ক কিন্তু এই সবল পারমাণবিক বল।)
একই ধরনের চার্জ হওয়ার কারণে প্রোটনরা একে অপরকে বিদ্যুৎচুম্বকীয় বলের মাধ্যমে তীব্রভাবে বিকর্ষণ করে। অর্থাৎ, এরা একে অন্যকে একদম সহ্য করতে পারে না!
ইলেকট্রন: উঠানের ব্যক্তিগত সহকারীরা
আমাদের সামাজিক পরিবার কিন্তু শুধু ঘরের ভেতরের মানুষ দিয়ে চলে না! বাইরের কাজকর্ম, ব্যবসা আর লেনদেন সামলানোর জন্য দরকার হয় ব্যক্তিগত সহকারী, যারা হলো ইলেকট্রন। এদের ঋণাত্মক (-ve) চার্জ থাকে।
একটি স্বাভাবিক ও নিরপেক্ষ পরমাণুতে ভাইয়ের সংখ্যা (প্রোটন) এবং সহকারীর সংখ্যা (ইলেকট্রন) সবসময় সমান থাকে, যাতে চার্জের নিখুঁত ভারসাম্য বজায় থাকে।
এই সহকারীদের কিন্তু মূল ঘরে বা নিউক্লিয়াসে ঢোকার কোনো অনুমতি নেই! তারা ঘরের বাইরে উঠানে—যাকে আমরা অরবিটাল বা শক্তিস্তর বলি—সেখানেই নির্দিষ্ট নিয়মে ঘুরে বেড়ায়। পরমাণুর সমস্ত বাহ্যিক যোগাযোগ, রাসায়নিক বন্ধন এবং যাবতীয় লেনদেন এই ইলেকট্রনগুলোর মাধ্যমেই সম্পন্ন হয়। আর প্রোটন ও নিউট্রন ভাই-বোনেরা শান্ত হয়ে ঘরের ভেতরে বসে থাকে।
বংশ বা মৌলের পরিচয়
একটি যৌথ পরিবার সমাজে কেমন পরিচিতি পাবে, তা নির্ভর করে ঘরে কতজন ভাই (প্রোটন) বাস করছে তার ওপর।
১ ভাই, হাইড্রোজেন: বাড়িতে যখন মাত্র একজন ভাই থাকে, তখন কোনো ভাইয়ে-ভাইয়ে ঝগড়ার সুযোগই থাকে না! তাই সাধারণ হাইড্রোজেনের (প্রোটিয়াম) ভিটাবাড়িতে কোনো বোনের (নিউট্রন) প্রয়োজনই পড়ে না। ১ জন ভাইয়ের জন্য উঠানে থাকে ১ জন সহকারী।
২ ভাই, হিলিয়াম: এখানে সাধারণত ২ জন ভাই, ২ জন বোন এবং উঠানে ২ জন সহকারী থাকে।
৮ ভাই, অক্সিজেন: পরিবারে ৮ জন ভাই থাকলে ঘরে ৮ জন বোন এবং বাইরে কাজের জন্য ৮ জন সহকারী লাগে।
সহকারীদের কিন্তু মূল ঘরে বা নিউক্লিয়াসে ঢোকার কোনো অনুমতি নেই! তারা ঘরের বাইরে উঠানে—যাকে আমরা অরবিটাল বা শক্তিস্তর বলি—সেখানেই নির্দিষ্ট নিয়মে ঘুরে বেড়ায়।
যৌথ পরিবারের গোল্ডেন রুল
ছোট যৌথ পরিবারে ১:১ ব্যালেন্স খুব সুন্দর কাজ করে (যেমন ৮ জন ভাইয়ের জন্য ৮ জন বোন)। কিন্তু নিউক্লিয়াসে ভাইদের (প্রোটন) সংখ্যা যত বাড়ে, তাদের মধ্যকার চার্জের বিকর্ষণও তত তীব্র হতে থাকে! তাই এতগুলো মেজাজি ভাইকে শান্ত করে ধরে রাখতে প্রোটনের চেয়ে অনেক বেশি বোন বা নিউট্রনের দরকার হয়।
৭৯ ভাই, সোনা: গৃহযুদ্ধ থামাতে ভাই (প্রোটন) ৭৯টি হলেও বোন (নিউট্রন) লাগে ১১৮টি!
৮২ ভাই, সীসা: ৮২টি প্রোটনের বিপরীতে ঘর টিকিয়ে রাখতে ১২৬টি বোন লাগে!
সামাজিক বন্ধন ও আত্মীয়তা (মলিকিউল ও কেমিস্ট্রি)
দুটি হাইড্রোজেনের বাড়ি এবং একটি অক্সিজেনের বাড়ি যখন তাদের উঠানের সহকারীদের (ইলেকট্রন) ভাগাভাগি করার মাধ্যমে সামাজিক লেনদেন করে (যাকে আমরা সমযোজী বন্ধন বলি), তখন তাদের মধ্যে এক শক্ত পারিবারিক ও সামাজিক আত্মীয়তা গড়ে ওঠে। এই নতুন মহল্লাকেই আমরা বলি পানি (H2O)।
নিউক্লিয়াসে ভাইদের সংখ্যা যত বাড়ে, তাদের মধ্যকার চার্জের বিকর্ষণও তত তীব্র হতে থাকে! তাই এতগুলো মেজাজি ভাইকে শান্ত করে ধরে রাখতে প্রোটনের চেয়ে বেশি বোন বা নিউট্রনের দরকার হয়।
ঘিঞ্জি বাড়ি ও ভাঙন (তেজস্ক্রিয়তা)
চিন্তা করুন, একটি ভিটাবাড়িতে যদি অতিরিক্ত মানুষ (প্রোটন ও নিউট্রন) গাদাগাদি করে থাকে, তখন কী হবে? পরিবারে দেখা দেয় চরম অশান্তি ও বিশৃঙ্খলা। নিউক্লিয়াসের সাইজ বড় হয়ে গেলে সবল পারমাণবিক বল এত মানুষকে সহজে আটকে রাখতে পারে না।
সেই অতিরিক্ত চাপ সামলাতে না পেরে একসময় নিউক্লিয়াস থেকে কণা ও শক্তি তেজস্ক্রিয় রশ্মি (আলফা, বিটা, গামা) হিসেবে বাইরে ঠিকরে বের হয়ে যায়। এই প্রক্রিয়াই হলো তেজস্ক্রিয়তা! সাধারণত প্রোটন সংখ্যা ৮৩ বা তার বেশি হলে মৌলগুলো স্বাভাবিকভাবেই অস্থিতিশীল ও তেজস্ক্রিয় হয়ে ওঠে। যেমন বিসমাত বা ইউরেনিয়াম।
মাইক্রোসেকেন্ডের এক ভগ্নাংশের মধ্যে কোটি কোটি ভিটাবাড়ি একসঙ্গে ভেঙে চুরমার হয়ে যায়, যা থেকে সৃষ্টি হয় এক ধ্বংসাত্মক আলো, তাপ ও ভয়ংকর পারমাণবিক বিস্ফোরণ!
পারমাণবিক বোমা কীভাবে কাজ করে
১. ভিড়ে ঠাসা ঘিঞ্জি প্রাসাদ: এর শুরু হয় ইউরেনিয়াম-২৩৫ দিয়ে, যার বাড়িতে ৯২ জন ভাই (প্রোটন) এবং ১৪৩ জন বোন (নিউট্রন) রয়েছে।
২. নতুন অতিথির ধাক্কা: বিজ্ঞানীরা বাইরে থেকে অতিরিক্ত ১টি বোনকে (ধীরগতির মুক্ত নিউট্রন) ইউরেনিয়াম-২৩৫ এর বাড়িতে পাঠিয়ে দেন। ফলে এটি অতি-অস্থিতিশীল ইউরেনিয়াম-২৩৬-এ পরিণত হয় এবং ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে যায়!
৩. ঘর ভাঙা: সহ্য করতে না পেরে পুরো ভিটাবাড়ি দুই টুকরো হয়ে আলাদা দুটি শান্ত পরিবারে ভাগ হয়ে যায় (বেরিয়াম ও ক্রিপ্টন)। এই ভাঙনের সময় কিছুটা ভর শক্তিতে রূপান্তরিত হয়, যা আইনস্টাইনের বিখ্যাত E = mc2 সূত্র দিয়ে হিসাব করা যায়।
৪. চেইন রিয়্যাকশন: প্রাসাদটি ভাঙার সময় আরও ৩টি মুক্ত নিউট্রন তীব্র গতিতে ছিটকে বের হয়ে পাশের অন্যান্য ইউরেনিয়াম রাজবাড়িগুলোতে গিয়ে আঘাত করে। সেই ঘরগুলোও একইভাবে দুই টুকরো হয়ে যায়, ভরকে শক্তিতে রূপান্তর করে এবং আরও নিউট্রন মুক্ত করে। এই প্রক্রিয়াটি একটি চেইন রিয়্যাকশনের মতো চলতে থাকে, যতক্ষণ না সব ইউরেনিয়াম পরমাণু ভেঙে শক্তি নির্গত হয়।
মাইক্রোসেকেন্ডের এক ভগ্নাংশের মধ্যে কোটি কোটি ভিটাবাড়ি একসঙ্গে ভেঙে চুরমার হয়ে যায়, যা থেকে সৃষ্টি হয় এক ধ্বংসাত্মক আলো, তাপ ও ভয়ংকর পারমাণবিক বিস্ফোরণ!
বিজ্ঞানীরা বাইরে থেকে অতিরিক্ত ১টি বোনকে ইউরেনিয়াম-২৩৫ এর বাড়িতে পাঠিয়ে দেন। ফলে এটি অতি-অস্থিতিশীল ইউরেনিয়াম-২৩৬-এ পরিণত হয় এবং ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে যায়!
ইতিহাসের পাতায়
১৯৪৫ সালের ৬ আগস্ট জাপানের হিরোশিমা শহরে আঘাত হানা লিটল বয় বোমায় এই ইউরেনিয়াম-২৩৫ ব্যবহার করা হয়েছিল। এই বোমায় ক্ষয়প্রাপ্ত ভর থেকে মাত্র প্রায় ০.৭ গ্রাম ভর বিশুদ্ধ শক্তিতে রূপান্তরিত হয়ে মুহূর্তেই পুরো শহর ছাই করে দিয়েছিল! তবে ৯ আগস্ট নাগাসাকিতে ফেলা দ্বিতীয় বোমা ফ্যাট ম্যানে প্লুটোনিয়াম-২৩৯ ব্যবহার করা হয়েছিল, যার পেছনের মূল বিজ্ঞানটাও একই।
পরমাণুর এই ভাঙনের শক্তিকে আমরা যেমন ধ্বংসের কাজে ব্যবহার করতে পারি, তেমনি চিকিৎসাবিজ্ঞানেও কাজে লাগাতে পারি। যেমন, তেজস্ক্রিয় আইসোটোপ ব্যবহার করে ক্যানসারের কোষ ধ্বংস করা (রেডিওথেরাপি) কিংবা বিভিন্ন জটিল রোগ নির্ণয় ও স্ক্যান করা এর মাধ্যমেই সম্ভব।
শেষ কথা
বিজ্ঞানের এই চমকপ্রদ গল্পটি আমাদের একটি গভীর সত্য মনে করিয়ে দেয়। ক্ষুদ্রতম পরমাণুর ভেতরে প্রোটন ও নিউট্রন যেমন নিজেদের ভেদাভেদ ভুলে একসঙ্গে আবদ্ধ থাকে বলেই পুরো সৃষ্টি টিকে আছে, তেমনি আমাদের এই পৃথিবী নামে বিশাল যৌথ পরিবারকেও টিকিয়ে রাখতে প্রয়োজন পরম মমতা আর পারস্পরিক বন্ধন। পরমাণুর সেই গচ্ছিত শক্তিকে আমরা কি ধ্বংসের মারণাস্ত্র বানাব, নাকি ক্যানসার জয় করে জীবন বাঁচানোর আলো জ্বালাব; সেই পছন্দটি কিন্তু কোনো পরমাণুর হাতে নেই; সেই দায়িত্বটা কেবলই আমাদের, মানুষের!