পারমাণবিক বোমার ধ্বংসস্তূপে যেভাবে জন্ম নিল একটি নতুন পদার্থ

১৯৪৫ সালের ১৬ জুলাই। যুক্তরাষ্ট্রের নিউ মেক্সিকোর বিস্তীর্ণ মরুভূমি। মানব ইতিহাসের প্রথম পারমাণবিক বোমার সফল পরীক্ষা চালানো হলো সেদিন, যার সাংকেতিক নাম দেওয়া হয়েছিল ট্রিনিটি টেস্ট। আপনি হয়তো ভাবছেন, পারমাণবিক বোমা মানেই তো ধ্বংস, মৃত্যু এবং এক ভয়ংকর অভিশাপের নাম! কিন্তু আপনি শুনলে অবাক হবেন, মানববিধ্বংসী এই বোমার প্রথম বিস্ফোরণ শুধু ধ্বংসযজ্ঞই ডেকে আনেনি, বরং পৃথিবীর বুকে জন্ম দিয়েছিল সম্পূর্ণ নতুন এক পদার্থের!

ইতালির ফ্লোরেন্স ইউনিভার্সিটির ভূতাত্ত্বিক লুকা বিন্দির নেতৃত্বে একদল আন্তর্জাতিক গবেষক সম্প্রতি এই চমকপ্রদ আবিষ্কারটি করেছেন। তাঁরা এমন একটি অভিনব পদার্থের সন্ধান পেয়েছেন, যা এর আগে প্রকৃতির কোথাও দেখা যায়নি, এমনকি পৃথিবীর কোনো অত্যাধুনিক ল্যাবরেটরিতেও শত চেষ্টা করে কৃত্রিমভাবে তৈরি করা সম্ভব হয়নি। ক্যালসিয়াম, তামা এবং সিলিকনের সমন্বয়ে গঠিত এই নতুন পদার্থটিকে বিজ্ঞানের ভাষায় বলা হচ্ছে ক্ল্যাথরেট।

১৯৪৫ সালের ১৬ই জুলাই নিউ মেক্সিকোতে ট্রিনিটি পারমাণবিক পরীক্ষা থেকে সৃষ্ট অগ্নিগোলক
ছবি: আন্ডারউড আর্কাইভস/কন্ট্রিবিউটর/গেটি ইমেজ

ক্ল্যাথরেট শব্দটির সঙ্গে আপনি হয়তো খুব একটা পরিচিত নন। খুব সহজ করে বললে, এটি হলো একধরনের জাদুকরী খাঁচার মতো কাঠামোর পদার্থ। এই পদার্থের অণুগুলো নিজেদের মধ্যে এমনভাবে সাজানো থাকে যে, তারা আস্ত একটি আণবিক খাঁচার রূপ নেয় এবং সেই খাঁচার ভেতর অন্য পদার্থের অণু বা পরমাণুকে বন্দী করে ফেলতে পারে!

আরও পড়ুন
ক্যালসিয়াম, তামা এবং সিলিকনের সমন্বয়ে গঠিত এই নতুন পদার্থটিকে বিজ্ঞানের ভাষায় বলা হচ্ছে ক্ল্যাথরেট। খুব সহজ করে বললে, এটি হলো একধরনের জাদুকরী খাঁচার মতো কাঠামোর পদার্থ।

এই অদ্ভুত কাঠামোর কারণে ক্ল্যাথরেটগুলোর দারুণ সব বৈশিষ্ট্য থাকে, যা বর্তমান ও ভবিষ্যতের প্রযুক্তির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ক্ল্যাথরেট নিয়ে বিজ্ঞানীদের এত আগ্রহের কারণ কী জানেন? ধরুন, এমন কোনো উপাদান আমাদের হাতে এল, যা কারখানার চিমনি বা গাড়ির ইঞ্জিনের নষ্ট হওয়া তাপকে সরাসরি বিদ্যুতে রূপান্তর করতে পারে! কিংবা এমন কোনো নিরাপদ পাত্র পাওয়া গেল, যার ভেতরে ভবিষ্যতের পরিবেশবান্ধব জ্বালানি হিসেবে হাইড্রোজেন গ্যাসকে নিশ্চিন্তে বন্দী করে রাখা যায়! বিজ্ঞানীরা মনে করছেন, শক্তির রূপান্তর, নতুন প্রজন্মের সেমিকন্ডাক্টর তৈরি এবং গ্যাস সংরক্ষণে এই ক্ল্যাথরেট যুগান্তকারী ভূমিকা রাখতে পারে।

ট্রিনিটি টেস্টে যখন প্রথম পারমাণবিক বোমার বিস্ফোরণ ঘটানো হলো, তখন এর কেন্দ্রস্থলের তাপমাত্রা মুহূর্তের জন্য সূর্যের পৃষ্ঠের তাপমাত্রাকেও ছাড়িয়ে গিয়েছিল। সেই প্রচণ্ড তাপ ও চাপে মরুভূমির সাধারণ বালু গলে গিয়ে তৈরি হয়েছিল সবুজ ও লালচে রঙের একধরনের কাঁচজাতীয় পদার্থ। বিজ্ঞানীরা এই পদার্থের নাম দিয়েছিলেন ট্রিনিটাইট। নতুন এই পদার্থটি আবিষ্কার করার জন্য গবেষকেরা মূলত এই ট্রিনিটাইটের দিকেই নজর দিয়েছিলেন।

ট্রিনিটাইট পদার্থের নমুনা
ছবি: লুকা বিন্দিয়া, মারেক মিহালকোভিচ, মাইকেল উইডম, পল জে. স্টাইনহার্ট/পিএনএএস

তাঁরা রেড ট্রিনিটাইটের একটি নমুনার ভেতরে আটকে থাকা তামায় ভরপুর অতি ক্ষুদ্র একটি ধাতব বিন্দুর ওপর এক্স-রে ডিফ্র্যাকশন প্রযুক্তি ব্যবহার করেন। আর তাতেই বেরিয়ে আসে এই জাদুকরী ক্যালসিয়াম-কপার-সিলিকনভিত্তিক টাইপ-১ ক্ল্যাথরেটের অস্তিত্ব!

আরও পড়ুন
ট্রিনিটি টেস্টে যখন প্রথম পারমাণবিক বোমার বিস্ফোরণ ঘটানো হলো, তখন এর কেন্দ্রস্থলের তাপমাত্রা মুহূর্তের জন্য সূর্যের পৃষ্ঠের তাপমাত্রাকেও ছাড়িয়ে গিয়েছিল।

গবেষকেরা জানিয়েছেন, পারমাণবিক বিস্ফোরণের ওই চরম মুহূর্তে স্বতঃস্ফূর্তভাবেই এই নতুন পদার্থটি তৈরি হয়েছিল। মানে, পারমাণবিক বিস্ফোরণের সময় যে অভাবনীয় তাপমাত্রা ও প্রচণ্ড চাপের সৃষ্টি হয়, তা এমন এক চরম পরিবেশ তৈরি করে, যা আমাদের সাধারণ গবেষণাগারের প্রচলিত পদ্ধতিতে কোনোভাবেই তৈরি করা সম্ভব নয়।

এই আবিষ্কারের ঘটনাটি আরও বেশি চমকপ্রদ হওয়ার পেছনে আরেকটি বড় কারণ আছে। এই একই ট্রিনিটি বিস্ফোরণের ধ্বংসস্তূপ থেকে কয়েক বছর আগে লুকা বিন্দির এই দলটাই আরও একটি বিরল পদার্থের সন্ধান পেয়েছিল। সিলিকনসমৃদ্ধ সেই অদ্ভুত পদার্থটির নাম ছিল কোয়াসিক্রিস্টাল।

কোয়াসিক্রিস্টাল কী, সে সম্পর্কে লুকা বিন্দি একবার বলেছিলেন, ‘এটি পুরোপুরি কোনো স্ফটিক বা ক্রিস্টাল নয়, কিন্তু দেখতে অনেকটা ক্রিস্টালের মতোই। এদের সবচেয়ে অদ্ভুত দিক হলো, এদের ভেতরের পরমাণুগুলোর বিন্যাস সাধারণ ক্রিস্টালের মতো নিয়মিত বা পর্যায়ক্রমিক নয়। কিন্তু তা সত্ত্বেও এরা এমন এক অবিশ্বাস্য প্রতিসাম্য বা সিমেট্রি তৈরি করে, যার ফলে এদের মধ্যে এমন সব ভৌত বৈশিষ্ট্য দেখা যায়, যা আগে থেকে অনুমান করা বিজ্ঞানীদের জন্য প্রায় অসম্ভব!’

আরও পড়ুন
ট্রিনিটি বিস্ফোরণের ধ্বংসস্তূপ থেকে কয়েক বছর আগে লুকা বিন্দির এই দলটাই আরও একটি বিরল পদার্থের সন্ধান পেয়েছিল। সিলিকনসমৃদ্ধ সেই অদ্ভুত পদার্থটির নাম ছিল কোয়াসিক্রিস্টাল।

এই কোয়াসিক্রিস্টাল এবং নতুন আবিষ্কৃত ক্ল্যাথরেটের মধ্যকার সম্পর্ক বিজ্ঞানীদের এখন নতুন করে ভাবতে বাধ্য করছে। চরম এবং চরমতম পরিস্থিতিতে পরমাণুগুলো কীভাবে নিজেদের সাজিয়ে নেয়, তা বুঝতে এই আবিষ্কারগুলো বিশাল ভূমিকা রাখছে।

গবেষকেরা বলছেন, বজ্রপাত, ভয়ংকর উল্কাপাত বা পারমাণবিক বিস্ফোরণের মতো চরম ধ্বংসাত্মক ঘটনাগুলো আসলে প্রকৃতির একেকটি প্রাকৃতিক গবেষণাগার হিসেবে কাজ করে। ল্যাবরেটরির নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে আমরা পদার্থের যে রূপগুলো কোনো দিন তৈরি করতে পারি না, প্রকৃতির এই প্রচণ্ড শক্তির কাছে তা নিমিষেই তৈরি হয়ে যায়।

অর্থাৎ, এই যুগান্তকারী গবেষণাটি ভবিষ্যতের উদ্ভাবনী প্রযুক্তির উন্নয়নের জন্য নতুন এক দিগন্তের সূচনা করেছে। এটি আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল, পারমাণবিক বোমার মতো একটি চরম ধ্বংসাত্মক ঘটনার ধ্বংসস্তূপের ভেতরেও ভবিষ্যতের মানবকল্যাণে কাজে লাগার মতো বিস্ময়কর ও নতুন কোনো সৃষ্টির বীজ লুকিয়ে থাকতে পারে!

সূত্র: ওয়্যার্ড ডটকম

আরও পড়ুন