নিউটনের আপেল ও মাধ্যাকর্ষণের গল্প
আপনার প্রচণ্ড ক্ষুধা পেয়েছে। এই মুহূর্তে আপনার কাছে খাওয়ার মতো তেমন কিছুই নেই, শুধু এক প্যাকেট বিস্কুট ছাড়া। এখন তাড়াহুড়ো করে প্যাকেটটি ছিঁড়তে গিয়ে বিস্কুট নিচে পড়ে গেল! ব্যস, পাঠ চুকল আপনার খাওয়া-দাওয়ার!
আমি কিন্তু আপনার খাবার নিয়ে গবেষণা করতে বসিনি। আমার চিন্তাটা অন্য জায়গায়। আমি যদি আপনাকে বিষয়টি ধরিয়ে দিই, আপনিও ভাববেন, ‘আরে তাই তো! বিস্কুটগুলো তো ওপরের দিকেও যেতে পারত। সেখানে না গিয়ে এগুলো সরাসরি মাটিতেই বা কেন পড়ল?’
যে শক্তি বা বলের প্রভাবে এই বিস্কুট মাটিতে পড়ল, তাকে বলা হয় মাধ্যাকর্ষণ বা অভিকর্ষ বল। পৃথিবীর বিভিন্ন জায়গায় মাধ্যাকর্ষণ বলের মান আলাদা হয়।
মাধ্যাকর্ষণ হলো এমন একটি মৌলিক বল, যা সব ধরনের ভারী বস্তুর ওপর কাজ করে। এটি এমন এক আকর্ষণ বল, যার মাধ্যমে পৃথিবীসহ মহাবিশ্বের যেকোনো ভরযুক্ত বস্তু অন্য বস্তুকে নিজের দিকে টানে।
যে শক্তি বা বলের প্রভাবে এই বিস্কুট মাটিতে পড়ল, তাকে বলা হয় মাধ্যাকর্ষণ বা অভিকর্ষ বল। পৃথিবীর বিভিন্ন জায়গায় মাধ্যাকর্ষণ বলের মান আলাদা হয়।
মহাকর্ষ বলের ধারণাটি প্রাথমিকভাবে ব্রিটিশ বিজ্ঞানী স্যার আইজ্যাক নিউটনই আমাদের সামনে প্রকাশ করেন। ১৬৮৭ সালে তাঁর বিখ্যাত ফিলোসোফিয়া ন্যাচারালিস প্রিন্সিপিয়া ম্যাথামেটিকা বইয়ে তিনি মহাকর্ষ সূত্র প্রকাশ করেন।
এই বলের প্রভাবেই সব ধরনের বস্তু মাটির দিকে পড়তে থাকে। অনেকের ধারণা, ভারী বস্তু হালকা বস্তুর চেয়ে দ্রুত নিচে পড়ে। কিন্তু বিজ্ঞানী গ্যালিলিও প্রমাণ করেছিলেন, বাতাসের বাধা না থাকলে এই মহাকর্ষ বলের প্রভাবে ভারী ও হালকা বস্তু একই গতিতে নিচে পড়ে। অর্থাৎ, বাতাসের বাঁধা এখানে গুরুত্বপূর্ণ।
কিন্তু এ ক্ষেত্রে আমাদের মনে রাখতে হবে, ভর ও ওজন সম্পূর্ণ ভিন্ন দুটি জিনিস। এদের কোনোভাবেই একসঙ্গে মেলানো যাবে না। ভর মানে কোনো জিনিসের মধ্যে বা কোনো বস্তুর মধ্যে ঠিক কতটুকু পদার্থ রয়েছে, তার পরিমাণ। বস্তুর ভর ধ্রুবক। ভরের সাধারণত কোনো পরিবর্তন হয় না, যেকোনো জায়গায় ভর সব সময় নির্দিষ্ট থাকে।
কিন্তু যেকোনো বস্তুর ওজন নির্ভর করে মূলত মহাকর্ষ বলের ওপর। বিজ্ঞানীরা পরিমাপ করে দেখেছেন, পৃথিবীর বিভিন্ন জায়গায় মাধ্যাকর্ষণ বলের মাত্রা ভিন্ন হয়। সেই কারণে বস্তুর ওজনও ভিন্ন হতে পারে। যেমন নভোচারীরা যখন চাঁদে যান, তখন তাঁদের ভর একই থাকে। কিন্তু মহাকর্ষ কম হওয়ায় চাঁদে তাঁদের ওজন হয়ে যায় পৃথিবীতে থাকা ওজনের মাত্র ছয় ভাগের এক ভাগ!
ভর মানে কোনো জিনিসের মধ্যে বা কোনো বস্তুর মধ্যে ঠিক কতটুকু পদার্থ রয়েছে, তার পরিমাণ। বস্তুর ভর ধ্রুবক। ভরের সাধারণত কোনো পরিবর্তন হয় না, যেকোনো জায়গায় ভর সব সময় নির্দিষ্ট থাকে।
সাধারণত তিনটি কারণে পৃথিবীর বিভিন্ন জায়গায় মহাকর্ষ ও বস্তুর ওজনের পরিবর্তন ঘটতে পারে। প্রথম কারণটি হলো পৃথিবীর আকার। আমাদের এই পৃথিবী কিন্তু পুরোপুরি গোলাকার নয়। এর বিভিন্ন জায়গায় উঁচু পাহাড় ও নিচু খাদের মতো জায়গা রয়েছে। আবার নিরক্ষরেখায় পৃথিবীর ব্যাসার্ধ মেরু অঞ্চলের ব্যাসার্ধের চেয়ে কিছুটা বেশি। যে কারণে নিরক্ষীয় অঞ্চলে মহাকর্ষের পরিমাণ কিছুটা কম থাকে। পৃথিবীর ঘূর্ণন গতির কারণে এই প্রভাবটি আরও বেড়ে যায়। কারণ, পৃথিবীর নিরক্ষরেখায় কেন্দ্রবিমুখী বলের পরিমাণ থাকে বেশি।
দ্বিতীয় কারণটি হলো উচ্চতা। আপনি বিমানে কিংবা পাহাড়ে যত ওপরে যাবেন, পৃথিবীর কেন্দ্র থেকে আপনার দূরত্ব তত বৃদ্ধি পাবে। দূরত্বের সঙ্গে মহাকর্ষের সম্পর্কটি ব্যস্তানুপাতিক। অর্থাৎ পৃথিবীর কেন্দ্র থেকে কোনো বস্তুর দূরত্ব যত বাড়ে, মহাকর্ষের পরিমাণ তত কমতে থাকে।
তৃতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি হলো মাটির গঠন। কোনো অঞ্চলের মাটিতে ভারী খনিজ পদার্থের উপস্থিতি থাকলে সেখানে মাধ্যাকর্ষণ বলের পরিমাণ কিছুটা বেড়ে যায়। এসব কারণ মিলিয়েই হিসাব করলে দেখা যায়, বিষুবীয় অঞ্চলের তুলনায় মেরু অঞ্চলে আপনার ওজন স্বাভাবিকভাবেই প্রায় আধা শতাংশ বেড়ে যাবে।
ওপরের আলোচনা থেকে মহাকর্ষ বলের কয়েকটি বৈশিষ্ট্য আমরা তুলে ধরতে পারি। এক, এই বলের সর্বজনীন আকর্ষণ বল রয়েছে। মহাবিশ্বের প্রতিটি বস্তু একে অপরকে আকর্ষণ করে। দুই, বস্তুর ভর যত বেশি হয়, এর আকর্ষণ বলও তত বেশি হয়। তিন, আলোচিত বস্তুগুলোর মধ্যকার দূরত্ব বাড়লে এই বলের মান কমে যায় এবং দূরত্ব কমলে বলের মান বেড়ে যায়।
আমাদের এই পৃথিবী কিন্তু পুরোপুরি গোলাকার নয়। এর বিভিন্ন জায়গায় উঁচু পাহাড় ও নিচু খাদের মতো জায়গা রয়েছে। আবার নিরক্ষরেখায় পৃথিবীর ব্যাসার্ধ মেরু অঞ্চলের ব্যাসার্ধের চেয়ে কিছুটা বেশি।
ঠিক এই কারণেই পাহাড়ে ওঠার সময় কষ্ট হয়, কিন্তু নামার সময় ততটা হয় না। বিষয়টি নদীতে নৌকা চলার মতো। স্রোতের বিপরীতে যদি নৌকা চলে, তবে নৌকা চালাতে পরিশ্রম বেশি হয়। কারণ, স্রোত নৌকাটিকে উল্টো দিকে টানতে থাকে। আর স্রোতের অনুকূলে চালালে পরিশ্রম কম হয়, কারণ স্রোত নিজেই তখন নৌকাকে সামনের দিকে টেনে নেয়। মহাকর্ষের বেলায়ও পাহাড়ে ওঠার সময় পৃথিবীর টান আমাদের নিচের দিকে টানে বলে বেশি কষ্ট হয়।
এই মহাকর্ষই পৃথিবী ও অন্যান্য গ্রহকে সূর্যের চারপাশে নির্দিষ্ট কক্ষপথে ধরে রাখে। আবার উপগ্রহগুলোকেও তাদের নিজ নিজ গ্রহের চারপাশে ঘুরতে সাহায্য করে। সাধারণ আপেক্ষিকতার অনুসারে, এর কারণ ভারী বস্তুর কারণে সৃষ্ট স্থানের বক্রতা।
যাই হোক, খালি চোখে কিংবা সাধারণভাবে বোঝা না গেলেও, পৃথিবীতে মহাকর্ষের মাত্রা সব জায়গায় আসলে সমান হয় না।