নিউটনের মাথায় কি সত্যি আপেল পড়েছিল

নিউটনের মাথায় আপেল পড়ার ঘটনা বিজ্ঞানের ইতিহাসে সবচেয়ে জনপ্রিয় মিথগুলোর একটি। যদিও আপেল পড়ার দৃশ্য নিউটন দেখেছিলেন বলে প্রমাণ পাওয়া যায়, কিন্তু মাথায় পড়ার বিষয়টি অতিরঞ্জিত। মহাকর্ষ সূত্র আবিষ্কারের পেছনে ছিল গ্যালিলিও, কেপলার, কোপার্নিকাস এবং আল-হাইশামের মতো বিজ্ঞানীদের দীর্ঘ গবেষণার ইতিহাস। নিউটন সেই জ্ঞানকে গাণিতিক কাঠামোয় রূপ দিয়েছিলেন মাত্র। কিন্তু এই আপেল পড়ার মিথ এত জনপ্রিয় হলো কীভাবে?

বিজ্ঞানে ইউরেকা মোমেন্ট বলে একটা রোমাঞ্চকর ব্যাপার থাকে। যেকোনো আবিষ্কারের পূর্ণতা দেয় এই মুহূর্তটিই। এর পেছনের মূল ঘটনাটা ঘটেছিল আজ থেকে প্রায় আড়াই হাজার বছর আগে। গ্রিসের সিরাকিউজ দ্বীপের রাজা একটা সোনার মুকুট নিয়ে ঝামেলায় পড়েছিলেন। তিনি বুঝতে পারছিলেন না, সেটা খাঁটি না ভেজাল। উপায় না পেয়ে তিনি বিখ্যাত বিজ্ঞানী আর্কিমিডিসকে ডেকে পাঠান এবং নির্দেশ দেন, মুকুট না গলিয়েই এর বিশুদ্ধতা পরীক্ষা করতে হবে।

বিজ্ঞান জগতের ইউরেকা মোমেন্ট
ছবি: আন্দ্রি ঝেজেরা / শাটারস্টোক

আর্কিমিডিস সপ্তাহখানেক ভাবনা-শ্চিন্তার পর বাথটাবে গোসল করতে গিয়ে হঠাৎ সমাধান পেয়ে যান। তিনি লক্ষ করেন, পানিতে নামার সঙ্গে সঙ্গে বাথটাব থেকে পানি উপচে পড়ছে। এই উপচে পড়া পানি দেখেই তিনি আবিষ্কার করেন তাঁর বিখ্যাত সূত্র, বস্তুর আপেক্ষিক গুরুত্ব। উত্তেজনায় তিনি ‘ইউরেকা!’ ‘ইউরেকা!’ (পেয়েছি! পেয়েছি!) বলে চিৎকার করতে করতে রাজদরবারে ছোটেন। এই ঘটনাটিই এখন বিজ্ঞান জগতে ইউরেকা মোমেন্ট নামে পরিচিত। কিন্তু প্রশ্ন হলো, নিউটনের মহাকর্ষ সূত্র আবিষ্কারের ঘটনাও কি এমন কোনো ইউরেকা মোমেন্ট ছিল? নাকি এর পেছনে লুকিয়ে আছে অন্য কোনো ইতিহাস?

আরও পড়ুন

১৬৬৫ সাল। ব্রিটেন তখন কাঁপছে প্লেগের মহামারিতে। লন্ডন আক্রান্ত, মৃত্যুভয় ছড়িয়ে পড়েছে সর্বত্র। কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ বাধ্য হয়ে অনির্দিষ্টকালের জন্য ক্যাম্পাস বন্ধ ঘোষণা করেন। কেমব্রিজের গণিতের মেধাবী ছাত্র আইজ্যাক নিউটন ফিরে যান নিজের গ্রাম উস্টারশায়ারের উলপসথ্রপে। তখন তাঁর হাতে অফুরন্ত সময়। গণিতের জটিল সব সমীকরণ ও প্রাকৃতিক বিজ্ঞানের নানা প্রশ্ন তাঁর মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে। গ্যালিলিও, কেপলার এবং কোপার্নিকাসের কাজগুলো তাঁকে ভাবনায় ফেলে দিয়েছে।

গ্রামের বাড়িতে নিউটনদের একটি ফলের বাগান ছিল। প্রচলিত গল্পমতে, একদিন সেই বাগানের আপেল গাছের নিচে বসে নিউটন গভীর চিন্তায় মগ্ন ছিলেন। হঠাৎ একটি আপেল খসে পড়ে মাটিতে। মতান্তরে, আপেলটি নাকি সরাসরি নিউটনের মাথাতেই পড়েছিল! এই একটি ঘটনাই নাকি খুলে দিয়েছিল নিউটনের তৃতীয় নয়ন। তাঁর মাথায় প্রশ্ন জাগে, আপেল কেন মাটিতে পড়ে? কেন ওপরে উঠে যায় না? আর এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়েই নাকি তিনি মহাকর্ষ সূত্র আবিষ্কার করেন।

কিন্তু এই গল্প কি আদৌ সত্যি? নাকি এটি শুধুই একটি মিথ? বেশিরভাগ বিজ্ঞান ইতিহাসবিদের মতে, নিউটনের মাথায় আপেল পড়ার ঘটনাটি পুরোপুরি সত্য নয়। তবে আপেল পড়ার দৃশ্যটি হয়তো তিনি দেখেছিলেন। নিউটন নিজেই তাঁর শেষ বয়সে বলেছিলেন, গাছ থেকে আপেলের পতন দেখেই তিনি মহাকর্ষ বলের কথা ভাবতে শুরু করেছিলেন। কিন্তু মাথায় পড়ার বিষয়টি সম্ভবত অতিরঞ্জিত।

আরও পড়ুন
গ্রামের বাড়িতে নিউটনদের একটি ফলের বাগান ছিল। প্রচলিত গল্পমতে, একদিন সেই বাগানের আপেল গাছের নিচে বসে নিউটন গভীর চিন্তায় মগ্ন ছিলেন। হঠাৎ একটি আপেল খসে পড়ে মাটিতে।

যদি ধরেও নিই আপেল পড়ার ঘটনা সত্যি, তবুও বলা যায় মহাকর্ষ সূত্র হুট করে আবিষ্কৃত হয়নি। এর ভিত্তি অনেক আগে থেকেই তৈরি হচ্ছিল। নিউটন গভীরভাবে কেপলারের গ্রহের গতিসূত্রগুলো নিয়ে গবেষণা করেছিলেন। কেপলার দেখিয়েছিলেন, গ্রহগুলো সূর্যকে কেন্দ্র করে বৃত্তাকার পথে নয়, উপবৃত্তাকার পথে ঘোরে। তাঁর তৃতীয় সূত্রে বলা ছিল, কোনো গ্রহ সূর্য থেকে যত দূরে, সূর্যকে একবার ঘুরে আসতে তার তত বেশি সময় লাগে।

এই সূত্রের ভেতরেই লুকিয়ে ছিল মহাকর্ষ বলের বীজ। নিউটন বুঝতে পেরেছিলেন, সূর্য ও গ্রহদের মধ্যে কোনো এক অদৃশ্য আকর্ষণ কাজ করছে। তিনি গাণিতিকভাবে প্রমাণ করেন, দূরত্ব বাড়লে আকর্ষণ বল কমে যায়। তাঁর হিসাবমতে, মহাকর্ষ বল দূরত্বের বর্গের ব্যস্তানুপাতে কমে। অর্থাৎ দূরত্ব দ্বিগুণ হলে আকর্ষণ বল চারগুণ কমে যায়।

গ্যালিলিও
ছবি: হিস্ট্রি ডটকম

শুধু কেপলার নন, নিউটন ঋণী ছিলেন গ্যালিলিওর কাছেও। গ্যালিলিও পড়ন্ত বস্তুর সূত্র আবিষ্কার করেছিলেন। তিনি দেখিয়েছিলেন, বাতাসের বাধা না থাকলে ভারী ও হালকা বস্তু সমান ত্বরণে নিচে পড়ে। নিউটন এই পড়ন্ত বস্তুর সূত্র এবং কেপলারের গ্রহের গতি সূত্র একই সুতোয় গাঁথলেন। তিনি দেখালেন, যে বলের কারণে আপেল মাটিতে পড়ে, ঠিক সেই একই বলের কারণে চাঁদ পৃথিবীর চারপাশে ঘোরে। এটিই ছিল তাঁর মহাকর্ষ সূত্রের মূল ভিত্তি।

আরও পড়ুন
নিউটন গাণিতিকভাবে প্রমাণ করেন, দূরত্ব বাড়লে আকর্ষণ বল কমে যায়। তাঁর হিসাবমতে, মহাকর্ষ বল দূরত্বের বর্গের ব্যস্তানুপাতে কমে। অর্থাৎ দূরত্ব দ্বিগুণ হলে আকর্ষণ বল চারগুণ কমে যায়।

নিউটনের এই চিন্তার শিকড় প্রোথিত ছিল হাজার বছরের ইতিহাসে। গ্রিক দার্শনিক অ্যারিস্টটল বলেছিলেন, পার্থিব বস্তু মাটির টানে নিচে ফিরে আসে, কিন্তু স্বর্গীয় বস্তু (গ্রহ-নক্ষত্র) ভিন্ন নিয়মে চলে। নিউটন এই দ্বিমত ভেঙে দিয়েছিলেন। তিনি প্রমাণ করলেন, মহাবিশ্বের সব বস্তুই একই নিয়মে চলে।

আধুনিক মহাকাশবিদ্যার যাত্রা শুরু হয়েছিল পোলিশ বিজ্ঞানী নিকোলাস কোপার্নিকাসের হাত ধরে। তিনিই প্রথম বলেছিলেন, পৃথিবী নয়, সূর্যই সৌরজগতের কেন্দ্র।

নিকোলাস কোপার্নিকাস
ছবি: উইকিপিডিয়া

এরপর ১৬০৮ সালে নেদারল্যান্ডসের চশমা বিক্রেতা হ্যান্স লিপারশেই টেলিস্কোপের আদি সংস্করণ তৈরি করেন। সেই খবর পেয়ে গ্যালিলিও নিজের হাতে উন্নত টেলিস্কোপ বানান এবং বৃহস্পতির চারটি উপগ্রহ আবিষ্কার করেন। সেটা ১৬১০ সালের কথা।

কিন্তু অনেকেই জানেন না, নিউটনের বহু আগে দশম শতাব্দীর আরব বিজ্ঞানী ইবনে আল-হাইশাম (পাশ্চাত্যে আল হাজেন নামে পরিচিত) তাঁর মাকালাহ ফি আল-কারাস্তুন বইয়ে ভরের আকর্ষণ ও বলের আচরণ নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা করেছিলেন। ইউরোপ যখন অন্ধকার যুগে নিমজ্জিত, তখন এই আরব বিজ্ঞানীরাই জ্ঞান-বিজ্ঞানের মশাল জ্বালিয়ে রেখেছিলেন। নিউটনের প্রিন্সিপিয়া ম্যাথমেটিকা ছিল আসলে কোপার্নিকাস, কেপলার, গ্যালিলিও এবং আল-হাইশামদের কাজেরই এক চূড়ান্ত ও সুসংবদ্ধ রূপ।

নিউটনের প্রথম জীবনীকার ডেভিড বিউস্টার তাঁর বইয়ে আপেল পড়ার ঘটনাটি উল্লেখ করেননি। তার মানে বিউস্টার এ ঘটনাকে বিশ্বাস করেননি বা নিছক গাঁজাখুরি গল্প মনে করে এড়িয়ে গেছেন। তাহলে এই মিথ এত জনপ্রিয় হলো কীভাবে?

আরও পড়ুন
১৬০৮ সালে নেদারল্যান্ডসের চশমা বিক্রেতা হ্যান্স লিপারশেই টেলিস্কোপের আদি সংস্করণ তৈরি করেন। সেই খবর পেয়ে গ্যালিলিও নিজের হাতে উন্নত টেলিস্কোপ বানান।

নিউটন এই গল্পটি বলেছিলেন তাঁর ভাগনি ক্যাথরিন কন্ডুইটকে। ক্যাথরিনের স্বামী জন কন্ডুইটও নিউটনের সহকারী ছিলেন। নিউটনের মৃত্যুর পর জন কন্ডুইট তাঁর স্মৃতিচারণায় লিখেছিলেন, ‘তিনি (নিউটন) আমাকে বলেছিলেন, তিনি যখন বাগানে বসে চিন্তা করছিলেন, তখন আপেল পড়তে দেখে তাঁর মনে মাধ্যাকর্ষণের ধারণাটি আসে।’ মজার ব্যাপার হলো, নিউটন এই গল্পটি বলেছিলেন প্লেগ মহামারির প্রায় ৫০ বছর পর, জীবনের শেষ প্রান্তে এসে। সম্ভবত জটিল বিজ্ঞানকে সহজ করে বোঝানোর জন্যই তিনি এই উদাহরণটি ব্যবহার করেছিলেন।

তবে এই গল্পটিকে বিশ্বজুড়ে জনপ্রিয় করার মূল কৃতিত্ব ফরাসি লেখক ও দার্শনিক ভলতেয়ারের। তিনি নিউটনের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ায় যোগ দিতে লন্ডনে গিয়েছিলেন এবং সেখানে ক্যাথরিনের মুখে এই গল্প শোনেন। পরে ১৭২৭ সালে ভলতেয়ার তাঁর Essay on Epic Poetry বইয়ে ঘটনাটি লিখে একে অমর করে দেন। আর মাথায় আপেল পড়ার অতিরঞ্জিত সংস্করণটি চালু করেন আইজ্যাক ডি'ইসরায়েলি নামে এক ইতিহাসবিদ।

ফরাসি লেখক ও দার্শনিক ভলতেয়ার
ছবি: উইকিপিডিয়া

মিথ অনেকটা গুজবের মতো। এর ছড়িয়ে পড়ার ক্ষমতা সত্যের চেয়েও অনেক গুণ বেশি। তাই ইন্টারনেটের এই যুগেও প্রায় ৮০ ভাগ মানুষ বিশ্বাস করেন, আপেল মাথায় পড়েছিল বলেই নিউটন মহাকর্ষ সূত্র আবিষ্কার করতে পেরেছিলেন। কিন্তু বাস্তবতা হলো, একটি আপেল নিউটনের চিন্তার সূত্রপাত ঘটাতে পারে, কিন্তু মহাকর্ষ সূত্র ছিল হাজার বছরের বিজ্ঞানীদের নিরলস গবেষণা ও নিউটনের অসাধারণ গাণিতিক মেধার ফসল। তাই মহাকর্ষের কৃতিত্ব শুধু একটি আপেলকে দিলে কোপার্নিকাস, গ্যালিলিও বা কেপলারদের অবদানকেই অস্বীকার করা হয়।

লেখক: সাংবাদিক

আরও পড়ুন