নিঃসঙ্গ নিউটন ও তাঁর অদ্ভুত দর্শন

আইজ্যাক নিউটনছবি: গেটি ইমেজ

নিউটন কেন সর্বকালের সেরা

১৬৬৫ সাল। পুরো বিশ্ব এক ভয়ানক মহামারিতে আক্রান্ত। এই মহামারির নাম প্লেগ।  বাহক ছোট ছোট ইঁদুর। দলে দলে মানুষ মারা যাচ্ছে। সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। ঠিক এই সময়ে ট্রিনিটি কলেজ থেকে এক তরুণ ছাত্র ফিরে এলেন তাঁর গ্রামের বাড়িতে। এর কিছুদিন পরেই ছেলেটি বলবিদ্যার ভিত্তি স্থাপন করলেন, দ্বিপদী উপপাদ্যকে দিলেন নতুন রূপ। কিন্তু তিনি যখন দেখলেন, তাঁর আবিষ্কৃত বলবিদ্যাকে ব্যাখ্যা করার মতো গণিত বা ভাষা তখনো তৈরি হয়নি, তখন নিজেই জন্ম দিলেন এক নতুন গণিতের—ক্যালকুলাস। এই ছেলেটির নামই আইজ্যাক নিউটন।

নিউটনের অমর সৃষ্টি ফিলোসফিয়া ন্যাচারালিস প্রিন্সিপিয়া ম্যাথমেটিকা। তবে এই বইয়ের জন্মের ইতিহাস বেশ করুণ। নিউটন যখন রয়্যাল সোসাইটির সদস্য হন, তখন সেখানকার প্রধান ছিলেন রবার্ট হুক। অনেকের মতে, হুক ছিলেন বেশ ঈর্ষাকাতর ও স্বার্থপর প্রকৃতির মানুষ। আমরা সবাই হুকের সেই বিখ্যাত সূত্রটি জানি, ‘স্থিতিস্থাপক সীমার মধ্যে পীড়ন বিকৃতির সমানুপাতিক’।

কিন্তু এই সূত্রের পেছনের ইতিহাসও বড় বিচিত্র। রবার্ট হুক এই সূত্রটি বিজ্ঞানীদের কাছে প্রথমে সরাসরি প্রকাশ করেননি; বরং একটি এনক্রিপশন বা ধাঁধার মতো করে ছড়িয়ে দিয়েছিলেন। কিছু অর্থপূর্ণ শব্দের সঙ্গে অর্থহীন শব্দের জগাখিচুড়ি পাকিয়ে তিনি এই ধাঁধা তৈরি করেন। বিজ্ঞানীরা প্রায় ১৮ বছর সময় নষ্ট করেন এই ধাঁধার সমাধান খুঁজতে। পরে যখন সূত্রটি পুরোপুরি হুকের নামে প্রতিষ্ঠিত হয়, তখনই আসল রহস্য প্রকাশ করেন তিনি।

নিউটনের অমর সৃষ্টি ফিলোসফিয়া ন্যাচারালিস প্রিন্সিপিয়া ম্যাথমেটিকা
ছবি: উইকিপিডিয়া

নিউটন যখনই তাঁর কোনো নতুন আবিষ্কার হুকের সামনে হাজির করতেন, হুক তাচ্ছিল্যের সুরে বলতেন, ‘এ আর নতুন কী! এটা তো আমি আগেই জানতাম।’ নিউটনের প্রতিটি আবিষ্কারকে এভাবে ব্যঙ্গ করায় একসময় মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন। ভীষণ হতাশও হন। তখন তাঁর শুভাকাঙ্ক্ষীরা তাঁকে পরামর্শ দেন, আবিষ্কারগুলো হুককে একটা একটা করে না দেখিয়ে বরং সবগুলোকে একত্রে বই আকারে প্রকাশ করতে। তাহলে হুক আর দাবি করতে পারবেন না যে, সব তাঁর জানা। এভাবেই হুকের ঈর্ষা থেকে বাঁচতে জন্ম হয় প্রিন্সিপিয়া ম্যাথমেটিকার। তবে এই বৈপ্লবিক পাণ্ডুলিপিটি নিউটন প্রায় হারিয়েই ফেলেছিলেন। কীভাবে তা পুনরুদ্ধার করেন, সেই গল্প জানতে পরিশিষ্ট-৩ পড়তে পারেন।

নিউটনের চিন্তার জগতে সবচেয়ে বড় বিপ্লব ছিল মহাকর্ষ। আপেল পড়ার ঘটনা থেকে তিনি এমন এক যুগান্তকারী ধারণা দেন, যা বিজ্ঞানের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। তাঁর সবচেয়ে সাহসী চিন্তাটি ছিল, ‘যেই আকর্ষণের কারণে পৃথিবীপৃষ্ঠে কোনো বস্তু নিচে পড়ে, ঠিক সেই একই কারণে চাঁদ পৃথিবীকে কিংবা পৃথিবী সূর্যকে কেন্দ্র করে ঘোরে।’ এই কথাটি বলা তখন সহজ ছিল না। কারণ সর্বত্র ছিল অ্যারিস্টটলের দর্শনের জয়জয়কার। অ্যারিস্টটল বলেছিলেন, চাঁদের ঘূর্ণন আর পৃথিবীতে আপেল পড়ার ঘটনা এক নয়; কারণ চাঁদ হলো স্বর্গীয় বস্তু। নিউটনই সর্বপ্রথম এই ধারণার বিপরীতে দাঁড়িয়ে গাণিতিক যুক্তি উপস্থাপন করেন।

আরও পড়ুন
নিউটন যখন রয়্যাল সোসাইটির সদস্য হন, তখন সেখানকার প্রধান ছিলেন রবার্ট হুক। অনেকের মতে, হুক ছিলেন বেশ ঈর্ষাকাতর ও স্বার্থপর প্রকৃতির মানুষ।

দ্বিপদী উপপাদ্যের ভাবনা

নিউটনের কাজের মধ্যে অন্যতম কিন্তু কিছুটা অবহেলিত কাজ দ্বিপদী উপপাদ্য। নিউটনের আগেও অনেকেই এই উপপাদ্য নিয়ে কাজ করেছেন, কিন্তু নিউটনই একে পরিপূর্ণতা দেন। দ্বিপদী বিস্তৃতি নিয়ে কাজ করতে গিয়ে গণিতবিদ ব্লেইজ প্যাসকেল সহগগুলোকে একটি ত্রিভুজের রূপ দেন। সেটাই আজ প্যাসকেলের ত্রিভুজ নামে পরিচিত। কিন্তু এই পদ্ধতিতে কাজ করা ছিল বেশ সময়সাপেক্ষ ও কষ্টসাধ্য।

প্যাসকেলের ত্রিভুজটি দেখতে এমন:

১ ১

১ ২ ১

১ ৩ ৩ ১

১ ৪ ৬ ৪ ১

……………….

এই ত্রিভুজটি মূলত সহগ নিয়ে কাজ করে। এর প্রথম সারিটি হলো শূন্য ঘাতের সহগ, পরের সারিটি এক ঘাতের সহগ। এই সহগগুলো ১, ১; কারণ (a + b) × 1 = a + b। অর্থাৎ যা আছে তাই। এরপর ধীরে ধীরে দুই ঘাত, তিন ঘাত, চার ঘাত, পাঁচ ঘাতের সহগ আসে। চিত্রে চার ঘাত পর্যন্ত দেখানো হয়েছে। এটি অসীম পর্যন্ত চলতে পারে।

এর একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো, ত্রিভুজের দুই ধারে সবসময় ১ থাকবে। এছাড়াও পাশাপাশি দুটি সহগ যোগ করে ঠিক তার নিচের ঘরে বসালেই পরের ঘাতের সহগ পাওয়া যায়। যেমন:

১ + ১ = ২ (এটি দ্বিতীয় ঘাতের মাঝখানের সহগ)

১ + ২ = ৩, ২ + ১ = ৩ (তৃতীয় ঘাতের সহগ)

১ + ৩ = ৪, ৩ + ৩ = ৬, ৩ + ১ = ৪ (চতুর্থ ঘাতের সহগ)

এভাবে চলতেই থাকে। এর পেছনের কারণটি পরিশিষ্ট-১-এ একটি ছোট্ট সংলাপের মাধ্যমে ব্যাখ্যা করা হয়েছে।

আরও পড়ুন
দ্বিপদী বিস্তৃতি নিয়ে কাজ করতে গিয়ে গণিতবিদ ব্লেইজ প্যাসকেল সহগগুলোকে একটি ত্রিভুজের রূপ দেন। সেটাই আজ প্যাসকেলের ত্রিভুজ নামে পরিচিত।

দ্বিপদী বিস্তৃতির ক্ষেত্রে মূল সমস্যা ছিল, যেকোনো ঘাতের সহগ বের করতে হলে তার আগের ঘাতের সহগ জানতে হতো। বড় কোনো ঘাতের (যেমন পাওয়ার ৫০) জন্য এটি ছিল অত্যন্ত কষ্টের। তাই বিষয়টিকে সাধারণীকরণের প্রয়োজন হয়ে পড়ে। নিউটনের কৃতিত্ব হলো, এই ঘটনাটিকে সাধারণ রূপ দেন তিনি। তাঁর উপপাদ্যে দ্বিপদী বিস্তৃতির সহগগুলোকে সমাবেশের মাধ্যমে প্রকাশ করেন এবং পূর্ণতাও দেন।

গণিতবিদেরা আগে থেকেই কিছু বৈশিষ্ট্য জানতেন। যেমন, দুটি পদ যদি a ও b ধরা হয়, তবে বিস্তৃতিতে a-এর ঘাত কমতে থাকলে b-এর ঘাত বাড়তে থাকে। যেমন,

(a + b)0 = 1

(a + b)1 = a + b

(a + b)2 = a2 + 2ab + b2

(a + b)3 = a3 + 3a2b + 3ab2 + b3

(a+b)4 = a4 + 4a3b + 6a2b2 + 4ab3 + b4

এখান থেকে দেখা যায়, a-এর ঘাত যখন সর্বোচ্চ, তখন b-এর ঘাত শূন্য। আবার a-এর ঘাত কমতে কমতে শূন্য হলে b-এর ঘাত সর্বোচ্চ হয়। আরেকটি বৈশিষ্ট্য হলো, রাশিটির ঘাত যত, বিস্তৃতিতে পদসংখ্যা তার চেয়ে ১ বেশি। অর্থাৎ ঘাত n হলে পদসংখ্যা হবে n + 1।

তাহলে আমরা যদি কোনো দ্বিপদী রাশি বিস্তৃত করতে যাই, আমাদের শুধু সহগ নির্ণয় করতে হবে। আর রাশি দুটি কীভাবে বসবে, তা তো বৈশিষ্ট্য থেকেই দেখা গেল। কিন্তু প্রশ্ন হলো, ওপরের সূত্রগুলো কীভাবে এল? সহজ উত্তর—(a + b)2 মানে ২ বার a + b গুণ করা। কিন্তু ঘাত যদি ১০ হয়? ১০ বার গুণ করা তো অনেক কষ্টের! নিউটন এই সমস্যার সমাধান করলেন সমাবেশের মাধ্যমে।

আরও পড়ুন
a-এর ঘাত যখন সর্বোচ্চ, তখন b-এর ঘাত শূন্য। আবার a-এর ঘাত কমতে কমতে শূন্য হলে b-এর ঘাত সর্বোচ্চ হয়। আরেকটি বৈশিষ্ট্য হলো, রাশিটির ঘাত যত, বিস্তৃতিতে পদসংখ্যা তার চেয়ে ১ বেশি।

ধরি, (a + b)5-কে বিস্তৃত করতে হবে। সমাবেশের ধারণাটি এমন, মনে করুন ৫টি ঝুড়ি আছে, যার প্রতিটিতে ১টি a ও ১টি b আছে। প্রতিটি ঝুড়ি থেকে একটি করে উপাদান তুলে দেখব আমি কী রাশি পেলাম।

১. (a + b)

২. (a + b)

৩. (a + b)

৪. (a + b)

৫. (a + b)

এখন আমি যদি ৫টি a নিতে চাই, তবে তা মাত্র ১ বারই নেওয়া সম্ভব (সব ঝুড়ি থেকে a নিলে)। সমাবেশের ভাষায় এটি 5C0। আবার ৫টি b নিতে চাইলেও ১ বারই নেওয়া সম্ভব 5C5। রাশিতে অন্তত ১টি b রাখতে চাইলে নেওয়া যাবে। তখন হবে 5C1

আবার যদি চাই ২টা b রাখতে সেটা নেওয়া যাবে ১০ বার। যেমন, (১,২); (১,৩); (১,৪); (১,৫); (২,৩); (২,৪); (২,৫); (৩,৪); (৩,৫); (৪,৫)।

এভাবে ৩টা b নেওয়া যাবে ১০ বার, ৪টা b নেওয়া যাবে ৫ বার। কৌশলটা কি ধরতে পারছেন? আমরা জানি a-এর ঘাত বাড়তে থাকলে b-এর ঘাত কমে। আবার a-এর ঘাত কমলে b-এর ঘাত বাড়ে। তাই আগে b-এর ঘাত ০ ধরে, ধীরে ধীরে b-এর ঘাত বেড়েছে। এতে বিস্তৃতির সঙ্গে মিল থাকে। এভাবে সবগুলো সমাবেশ করলে আমরা সহগসহ বিভিন্ন পদ পেয়ে যাব। এভাবে সমাবেশের সূত্র প্রয়োগ করে আমরা পাই:

(a + b)5

= a5 + 5a4b + 10a3b3 + 10a2b3 + 5ab5 + b5

= (5C0) a5 + (5C1) a4b + (5C2)

a3b2 + (5C3) a2b3 + (5C4) ab4 + (5C5) b5

একে সাধারণ বীজগাণিতিক রূপ দিলে দ্বিপদী উপপাদ্য পাওয়া যায়:

(a+b)n

=an +nC1 a(n-1)b +nC2 a(n-2)b2 +.......+ bn

 এভাবে ব্যাখ্যা করায় বিস্তৃতি ছাড়াই যেকোনো ঘাতের নির্দিষ্ট পদ বের করা সম্ভব হলো (পরিশিষ্ট-২ দ্রষ্টব্য)। মজার ব্যাপার হলো, নিউটন ক্যালকুলাসেরও জনক। ক্যালকুলাসের ম্যাকলরিন ধারা নির্দিষ্ট কিছু নিয়মে দ্বিপদী উপপাদ্যেই রূপ নেয়!

আরও পড়ুন
সমাবেশের ভাষায় এটি 5C0। আবার ৫টি b নিতে চাইলেও ১ বারই নেওয়া সম্ভব 5C5। রাশিতে অন্তত ১টি b রাখতে চাইলে নেওয়া যাবে। তখন হবে 5C1

চতুর্মাত্রিক কাঠামোর ধারণা

এই লেখাটির মূল উদ্দেশ্য ছিল দ্বিপদী বিস্তৃতি ও এর পেছনের সুন্দর চিন্তাগুলোর আভাস দেওয়া। কিন্তু প্রশ্ন আসতে পারে, এই উপপাদ্যের প্রয়োজন কী? গণিতবিদ জি. এইচ. হার্ডি বলেছিলেন, ‘যা মানুষের দৈনন্দিন প্রয়োজনে লাগে তা গৌণ গণিত। কিন্তু যা জ্ঞানের বিভিন্ন শাখাকে সংযুক্ত করে এবং গণিতবিদকে বিশুদ্ধ আনন্দ দেয়, তাই উচ্চতর গণিত।’ মূল ব্যাপারটি হলো নতুন ভাবনার খোরাক জোগানো। তবে অর্থনীতিবিদ ও আর্কিটেক্টরা প্রায়শই এই গণিত ব্যবহার করেন।

দ্বিপদী বিস্তৃতি নিয়ে ইউক্লিডও কাজ করেছিলেন। তিনি দুটি সংখ্যার বর্গ নিয়ে জ্যামিতিক প্রমাণ করেছিলেন, যা (a+b)2-এর জ্যামিতিক রূপ। তখন বীজগণিত ছিল না, তাই তিনি একে দ্বিমাত্রিক বর্গের সঙ্গে তুলনা করেছিলেন। এই চিন্তার সূত্র ধরে আমরা অন্যান্য মাত্রার কাঠামো কল্পনা করতে পারি।

(a + b)0 = বিন্দু (শূন্য মাত্রা)

(a + b)1 = রেখা (এক মাত্রা)

(a + b)2 = বর্গক্ষেত্র বা তল (দ্বিমাত্রিক)

(a + b)3 = ঘনক (ত্রিমাত্রিক, আমাদের পরিচিত জগত)

(a + b)4 = ?

এখানেই মজা! (a + b)4-কে আমরা চতুর্মাত্রিক কাঠামো হিসেবে ভাবতে পারি। সাধারণত কোনো প্রাণী যে মাত্রায় বাস করে, তার ওপরের মাত্রা সে কল্পনা করতে পারে না। কিন্তু গণিতের জাদুবলে আমরা তা পারছি। আইনস্টাইন সময়কে চতুর্থ মাত্রা ধরেছিলেন, কিন্তু আমরা এখানে জ্যামিতিক কাঠামোর কথা বলছি।

আসুন প্রান্তবিন্দু দিয়ে চতুর্থ মাত্রার সন্ধান করি:

শূন্য মাত্রা (বিন্দু) — ১টি প্রান্তবিন্দু (20)

এক মাত্রা (রেখা) — ২টি প্রান্তবিন্দু (21)

দ্বিমাত্রা (বর্গ) — ৪টি প্রান্তবিন্দু (22)

ত্রিমাত্রা (ঘনক) — ৮টি প্রান্তবিন্দু (23)

দেখা যাচ্ছে, মাত্রা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে প্রান্তবিন্দু ২-এর গুণিতক আকারে বা 2n হারে বাড়ছে। তাহলে চতুর্থ মাত্রার কাঠামোতে ১৬টি প্রান্তবিন্দু থাকবে (24 = 16)। আমরা যদি এমন কোনো কাঠামো আঁকতে পারি যাতে ১৬টি প্রান্তবিন্দু আছে, তবে সেটিই হবে চতুর্মাত্রিক কাঠামোর একটি জ্যামিতিক রূপ। গণিত এভাবেই আমাদের চিন্তার সীমাবদ্ধতা দূর করে।

আরও পড়ুন
গণিতবিদ জি. এইচ. হার্ডি বলেছিলেন, ‘যা মানুষের দৈনন্দিন প্রয়োজনে লাগে তা গৌণ গণিত। কিন্তু যা জ্ঞানের বিভিন্ন শাখাকে সংযুক্ত করে এবং গণিতবিদকে বিশুদ্ধ আনন্দ দেয়, তাই উচ্চতর গণিত।’

সম্ভাবনাময় প্যাসকেলের ত্রিভুজ

প্যাসকেলের ত্রিভুজ একটি সুন্দর শিল্পকর্ম। ত্রিভুজের সংখ্যার বিন্যাসে হকিস্টিক নকশা দেখা যায়। যদি হকিস্টিকের হাতল ডান দিকে থাকে, তবে ডান দিকের সংখ্যাগুলো যোগ করে বাঁয়ে মোড় নিলে যোগফলটি পাওয়া যায়। উল্টোটাও সত্য। কারণ, পাশাপাশি দুটি সহগ যোগ করে পরের সহগ পাওয়া যায়।

                        ১

                     ১    ১

                 ১     ২     ১

             ১    ৩       ৩     ১

          ১    ৪     ৬      ৪      ১

      ১     ৫    ১০    ১০    ৫      ১

   ১    ৬     ১৫    ২০   ১৫    ৬     ১

………………………………………

এখন সম্ভাবনার সঙ্গে এর সম্পর্ক দেখা যাক। একটি কয়েন টস করলে হেড (H) বা টেল (T) পড়ার সম্ভাবনা ১/২। যদি ২ বার টস করা হয়, ফলাফলগুলো হতে পারে: HH, (HT, TH), TT।

২ বারই হেড — ১ উপায়ে

১ বার হেড ও ১ বার টেল — ২ উপায়ে

২ বারই টেল — ১ উপায়ে

এটি ১, ২, ১, অর্থাৎ প্যাসকেলের ত্রিভুজে ২ ঘাতের সহগ।

৩ বার টস করলে পাওয়া যাবে ১, ৩, ৩, ১। এটিও দ্বিপদী রাশির সহগের সঙ্গে মিলে যায়। প্রথম ১ হলো ৩ বারই হেড পাওয়ার উপায়। এভাবে একটি করে হেড কমে আর টেল বাড়ে। সম্ভাবনা বের করার সূত্র হলো:

সম্ভাবনা = কাঙ্ক্ষিত ফলাফল\মোট নমুনাক্ষেত্র

যেমন ২ বার টস করলে ১ বার হেড বা টেল পাওয়ার সম্ভাবনা = ২/৪ বা ১/২।

এই মিলের কারণ হলো, দ্বিপদী বিস্তৃতি দুটি পদ (a, b) নিয়ে কাজ করে, আর কয়েন টসেও দুটি ফলাফল হেড বা টেল আসে। তাই সমাবেশের নিয়ম এখানেও খাটে।

 

সমস্যা: ৪ বার কয়েন টস করলে নমুনাক্ষেত্র কী হবে এবং সেখান থেকে ২টা হেড ও ২টা টেল পাওয়ার সম্ভাবনা প্যাসকেলের ত্রিভুজ দিয়ে বের করুন। (সমাধান করতে পারলে আনন্দ পাবেন)

 

হকিস্টিক রহস্য: হকিস্টিক নকশায় ১, ৪, ১০-এর যোগফল ১৫ হয়। এর কারণ, ১৫ সংখ্যাটি এসেছে ১০ আর ৫ যোগ করে। আবার ৫ এসেছে ১ আর ৪ যোগ করে। অর্থাৎ এটি সেই পাশাপাশি সহগ যোগ করার একটি চেইন রিঅ্যাকশন।

আরও পড়ুন
একটি কয়েন টস করলে হেড বা টেল পড়ার সম্ভাবনা ১/২। যদি ২ বার টস করা হয়, ফলাফলগুলো হতে পারে: HH, HT, TH, TT।

পরিশিষ্ট–১: প্যাসকেলের ইন্টারভিউ

প্যাসকেলের ত্রিভুজে পাশাপাশি দুটি সহগ যোগ করলে নতুন সহগ পাওয়া যায়। এই ফর্মুলাটা কেন কাজ করে? চলুন স্বয়ং প্যাসকেল সাহেবের কাছ থেকেই জেনে নিই...

—মহামতি প্যাসকেল! মহামতি প্যাসকেল!

—এই তুই কে রে? জানিস না আমার সময়ের কত দাম! কী চাস?

—না মানে...ইয়ে...আপনার নামে যে ত্রিভুজ, সেখানে পাশাপাশি দুটি সহগ যোগ করলে নতুন সহগ পাওয়া যায় কেন?

—ও আচ্ছা! ভেতরে আয়। তোদের মতো দু-চারটা কৌতূহলী ছাত্র আমার ভালোই লাগে। খাতা-কলম নিয়ে বস। ত্রিভুজটা দেখ:

১ ১

১ ২ ১

১ ৩ ৩ ১

—তোর প্রশ্ন হলো, এখানে ১ + ১ কেন হলো? ১ - ১ কেন হলো না, তাই তো?

—জি।

—দেখ, ত্রিভুজের প্রথম সহগ ১। এটা বোঝায় (a + b)0 = 1। কেন ১ হলো জানিস?

—জানি, কিন্তু বুঝি না।

—পাওয়ার ০ মানে দৈর্ঘ্য, প্রস্থ, উচ্চতা কিছুই নেই। ডানে-বাঁয়ে, ওপরে-নিচে যাওয়া যাবে না, এমন জিনিস হলো বিন্দু। কিন্তু বিন্দুর তো একটা অস্তিত্ব আছে। সেটাই প্রকাশ করা হয় ১ দিয়ে।

—জি।

—এবার পরেরটা দেখ ১, ১। এটা হলো (a + b)1। এখানে a ও b-এর সহগ ১। এখন

(a + b)2 = (a + b)(a + b)।

(a + b)(a + b)

= (1)a + (1)ab + (1)ab + (1)b

...................

 1a  +  2ab  + 1b [যোগ করে]

—দেখলি? মাঝখানের সহগটা (২) আগের লাইনের ১ আর ১ যোগ করে পাওয়া গেল। একইভাবে (a + b)3-এর ক্ষেত্রেও আগের লাইনের ১ ও ২ যোগ করে ৩ পাওয়া যায়। এভাবে প্রান্তীয় সহগ সবসময় ১ থাকে, আর মাঝখানের সহগগুলো হয় আগের লাইনের পাশাপাশি দুটি সহগের যোগফল।

—জি, অনেক মজার জিনিস!

—যা এবার, মহান প্যাসকেল এখন বিশ্রাম নেবেন।

আরও পড়ুন
পাওয়ার ০ মানে দৈর্ঘ্য, প্রস্থ, উচ্চতা কিছুই নেই। ডানে-বাঁয়ে, ওপরে-নিচে যাওয়া যাবে না, এমন জিনিস হলো বিন্দু। কিন্তু বিন্দুর তো একটা অস্তিত্ব আছে। সেটাই প্রকাশ করা হয় ১ দিয়ে।

পরিশিষ্ট–২: সাধারণ পদ নির্ণয়

নিউটন সমাবেশের মাধ্যমে প্যাসকেলের ত্রিভুজের সীমাবদ্ধতা দূর করেছেন। আরেকটি মজার কাজ হলো সাধারণ পদ নির্ণয়। ধরুন, বলা হলো (a + b)10-কে বিস্তৃত করলে এর ৫ নম্বর পদটি কত হবে? পদসংখ্যা হবে ১১টি, কারণ ঘাত ১০। পুরোটা বিস্তৃত না করেই এটি বের করা যায়। দ্বিপদী উপপাদ্যটি কবিতার মতো আবৃত্তি করুন:

(a+b)n=

nC0 an b0+ nC1 a(n-1)b1+ nC2 a(n-2)b2+ nC3 a(n-3) b3+....+ nCn a(n-n)bn

খেয়াল করুন:

১ম পদে nC0,b-এর ঘাত ০।

২য় পদে nC1, b-এর ঘাত ১।

৩য় পদে nC2, b-এর ঘাত ২।

তার মানে, যততম পদ, nC-এর নিচের সংখ্যাটি তার চেয়ে ১ কম। b-এর ঘাতও ১ কম। তাহলে r + 1 তম পদ বা সাধারণ পদ হবে:

nCr a(n-r)br

 

সমস্যা:

১. (a + b)20-এর বিস্তৃতিতে ১১তম পদ কত?

২. (a + b)11-এর বিস্তৃতিতে ১৩তম পদ কত?

৩. (a + b)12-কে প্যাসকেলের ত্রিভুজের সাহায্যে বিস্তৃত করো।

আরও পড়ুন
অভিকর্ষ বলের কারণে চাঁদ পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করতে পারেনি, আবার চাঁদের গতির কারণে সে ধসেও পড়ে না। এই ভারসাম্যই তাকে ঘোরাচ্ছে।

পরিশিষ্ট-৩: নিউটনের জীবনী থেকে

প্লেগে ট্রিনিটি কলেজ বন্ধ। নিউটন গ্রামের বাড়িতে। গভীর রাত। মোমবাতির আলোয় নিউটন একমনে কাজ করছেন। ছোটবেলার ডায়েরিটা বের করলেন। সেখানে লেখা—‘চাঁদ কেন পৃথিবীর গায়ে ছিটকে পড়ছে না?’

এর উত্তর নিউটন এখন জানেন। অভিকর্ষ বলের কারণে চাঁদ পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করতে পারেনি, আবার চাঁদের গতির কারণে সে ধসেও পড়ে না। এই ভারসাম্যই তাকে ঘোরাচ্ছে। আবার রংধনু কেন হয়? কারণ সাদা আলো সাতটি রঙের সমষ্টি। নিউটন এসবই খাতায় লিখছিলেন।

হঠাৎ দরজায় কড়া নাড়ার আওয়াজ। নিউটন চমকে উঠলেন। দরজা খুলতে গেলেন। ঠিক তখনই তাঁর পোষা কুকুর ডায়মন্ড লাফালাফি করতে গিয়ে উল্টে দিল মোমবাতি। নিমিষেই জ্বলে উঠল নিউটনের বছরের পর বছর সাধনার ফসল, তাঁর সব খাতা ও কাগজপত্র। নিউটন দৌড়ে এসে দেখলেন সব ছাই। তিনি ডায়মন্ডকে কোলে তুলে শুধু বললেন, ‘ডায়মন্ড, তুমি জানো না তুমি আমার কত বড় ক্ষতি করলে!’

ওই খাতাই ছিল প্রিন্সিপিয়া ম্যাথমেটিকা। নিউটন পরের এক বছর স্মৃতি হাতড়ে আবার লিখলেন সেই বই। বিজ্ঞান পিছিয়ে পড়ল এক বছর!*

* আইজ্যাক নিউটন এবং তার কুকুর ডায়মন্ডকে নিয়ে প্রচলিত এই গল্পটি ঐতিহাসিকদের মতে একটি জনশ্রুতি বা মিথ, যা পুরোপুরি সত্য নয়। বিজ্ঞানের ইতিহাসে এটি একটি অত্যন্ত জনপ্রিয় এবং আবেগঘন গল্প হলেও এর পেছনে শক্ত কোনো ঐতিহাসিক প্রমাণ নেই।

সূত্র: বিবিভিএ ডটকম

রাগিব হাসান/বিজ্ঞানীদের কান্ডকারখানা-০১

মুনির হাসান/যারা গণিত ভালোবাসে

আরও পড়ুন