সার্নে প্রোটনসদৃশ নতুন কণার আবিষ্কার

শিল্পীর কল্পনায় সাই-সিসি-প্লাস কণার ছবিছবি: সার্ন

ইউরোপীয় গবেষণা প্রতিষ্ঠান সার্নের মুকুটে আরেকটি সাফল্যের পালক যোগ হলো। সম্প্রতি সেখানে প্রোটন-সদৃশ্য নতুন একটি কণা আবিষ্কৃত হয়েছে। সার্নের বিখ্যাত কণা ত্বরক যন্ত্র লার্জ হ্যাড্রন কোলাইডারে নতুন এ কণা আবিষ্কৃত হয়। এ নিয়ে যন্ত্রটি ৮০টি নতুন কণা আবিষ্কারে ভূমিকা রাখল। গত ১৭ মার্চ, মঙ্গলবার বিজ্ঞানীরা এই আবিষ্কারের খবর প্রকাশ করেন।

কণাটির নাম দেওয়া হয়েছে সাই-সিসি-প্লাস। প্রোটনের সঙ্গে এর বেশ মিল আছে। তবে এটি প্রোটনের তুলনায় প্রায় চার গুণ ভারী। মহাবিশ্বের বেশির ভাগ দৃশ্যমান বস্তু ব্যারিয়ন শ্রেণির কণা দিয়ে গঠিত। পরমাণুর নিউক্লিয়াসের প্রোটন ও নিউট্রন—দুটি কণাই ব্যারিয়ন। এগুলো তিনটি কোয়ার্ক দিয়ে তৈরি। তবে পরমাণুর আরেক গুরুত্বপূর্ণ কণা ইলেকট্রন ব্যারিয়ন নয়, এটি লেপটন। অন্যদিকে দুটি কোয়ার্ক নিয়ে তৈরি আরেক ধরনের কণার নাম মেসন।

পৃথিবীর সবচেয়ে বড় কণা ত্বরক যন্ত্র এলএইচসি
ছবি: ম্যাক্সিমিলিয়েন ব্রাইস / সার্ন

মেসন ও ব্যারিয়ন ধরনের কণাদের একসঙ্গে হ্যাড্রন বলে। আর এই হ্যাড্রন নিয়েই কাজ করে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় কণা ত্বরক যন্ত্র এলএইচসি। ফ্রান্স-সুইজারল্যান্ড সীমান্তে মাটির ১০০ মিটার নিচে অবস্থিত এই যন্ত্রটি দৈর্ঘ্যে ২৭ কিলোমিটার লম্বা। এই যন্ত্রে কণাদের আলোর কাছাকাছি গতিতে ছোটানো হয়। ফলে বিগ ব্যাং বা মহাবিস্ফোরণের মাধ্যমে মহাবিশ্বের জন্মের ঠিক পরবর্তী পরিবেশ তৈরি হয়, যেখানে বিপুল শক্তি রূপান্তরিত হয় নতুন কণায়।

আরও পড়ুন
মেসন ও ব্যারিয়ন ধরনের কণাদের একসঙ্গে হ্যাড্রন বলে। আর এই হ্যাড্রন নিয়েই কাজ করে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় কণা ত্বরক যন্ত্র এলএইচসি।

ব্যারিয়ন কণারা তিনটি কোয়ার্ক দিয়ে গঠিত। এই মৌলিক কণা বা কোয়ার্ক আবার ছয় রকমের হয়: আপ, ডাউন, চার্ম, স্ট্রেঞ্জ, টপ ও বটম। আমাদের দেখা সব বস্তুর মূল গাঠনিক উপাদান এরাই। এই কোয়ার্কগুলোর বিভিন্ন রকম মিশ্রণে অসংখ্য ব্যারিয়ন তৈরি হতে পারে। যদিও এদের বেশির ভাগই পর্যবেক্ষণ করা বেশ দুষ্কর; কারণ এরা খুবই অস্থিতিশীল ও অস্থায়ী কণা। দেখার আগেই এরা উধাও হয়ে যায়!

এলএইচসি যন্ত্রে কণাদের চরম দ্রুতগতিতে ছুটিয়ে একে অপরের সঙ্গে সংঘর্ষ ঘটানো হয়। এর মাধ্যমে বিজ্ঞানীরা বুঝতে পারেন, কীভাবে অস্থিতিশীল পরমাণুরা ক্ষয় হয়। এ ছাড়া প্রস্তুতকৃত অস্থিতিশীল কণা পর্যবেক্ষণ করে তাঁরা মূল কণার বৈশিষ্ট্য বুঝতে পারেন। আমাদের পরিচিত প্রোটনে থাকা তিনটি কোয়ার্কের মধ্যে দুটি আপ ও একটি ডাউন কোয়ার্ক। কিন্তু নতুন আবিষ্কৃত সাই-সিসি-প্লাস কণায় আছে দুটি চার্ম ও একটি ডাউন কোয়ার্ক। আপ কোয়ার্কের চেয়ে চার্ম কোয়ার্কের ভর বেশি বলেই নতুন এই কণাটি প্রোটনের তুলনায় চার গুণ ভারী।

প্রোটনে থাকা তিনটি কোয়ার্কের মধ্যে দুটি আপ ও একটি ডাউন কোয়ার্ক
ছবি: উইকিমিডিয়া

এলএইচসিবি যন্ত্রের মুখপাত্র ভিনসেনৎজো ভানোনি জানান, এ নিয়ে মাত্র দ্বিতীয়বার ভারী কোয়ার্ক দিয়ে গড়া কোনো ব্যারিয়ন পাওয়া গেল। এর আগে ২০১৭ সালে একই যন্ত্র আরেকটি ভারী কণা আবিষ্কার করেছিল। ডাবলি চার্মড পার্টিকল নামে সেই কণায়ও দুটি চার্ম কোয়ার্ক ছিল, আর ছিল একটি আপ কোয়ার্ক। ফলে নতুন কণাটির সঙ্গে এর দারুণ মিল রয়েছে; পার্থক্য শুধু আপ ও ডাউন কোয়ার্কে। অবশ্য আরেকটি বড় পার্থক্য আছে। নতুন কণাটি আগেরটির চেয়ে প্রায় ছয় গুণ বেশি ক্ষণস্থায়ী। এর আয়ু এক সেকেন্ডের এক কোটি ভাগের এক লাখ ভাগ  মাত্র! ফলে এটি পর্যবেক্ষণ করা আরও অনেক বেশি কঠিন ছিল।

আরও পড়ুন
প্রকৃতির চারটি মৌলিক বলের মধ্যে সবল নিউক্লীয় বল সবচেয়ে শক্তিশালী। অদ্ভুত ব্যাপার হলো, কণার দূরত্ব বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এই বলের তীব্রতা বেড়ে যায়!

২০২৩ সালে এলএইচসিবি যন্ত্র আপগ্রেড করার পর এটি দ্বিতীয় আবিষ্কৃত কণা। এই আবিষ্কার কাজে লাগিয়ে তাত্ত্বিক পদার্থবিদেরা কোয়ান্টাম ক্রোমোডাইনামিকস বা কিউসিডি মডেল আরও নিখুঁতভাবে পরীক্ষা করতে পারবেন। কোয়ার্করা কীভাবে একত্র হয়ে ব্যারিয়ন তৈরি করে, তা এই তত্ত্ব ব্যাখ্যা করে। এ ছাড়া মেসনসহ আরও কিছু হ্যাড্রন কণার ব্যাখ্যাও দেয় তত্ত্বটি। সব মিলিয়ে এই কণা আবিষ্কারের মাধ্যমে সবল নিউক্লীয় বল সম্পর্কে আরও ভালো ধারণা পাওয়া যাবে। প্রকৃতির চারটি মৌলিক বলের মধ্যে এটি সবচেয়ে শক্তিশালী। অদ্ভুত ব্যাপার হলো, কণার দূরত্ব বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এই বলের তীব্রতা বেড়ে যায়! অবশ্য বলটি অত্যন্ত স্বল্প পাল্লায় কাজ করে; প্রোটন-নিউট্রনের চৌহদ্দির বাইরে এটি আর কাজই করে না।

নতুন নতুন কণা আবিষ্কারের মাধ্যমে সার্ন বিজ্ঞান গবেষণায় তাদের অসামান্য ভূমিকা অব্যাহত রেখেছে। এর আগে আবিষ্কৃত বিখ্যাত হিগস বোসন বা ঈশ্বরকণা সারা দুনিয়ায় তুমুল সাড়া ফেলেছিল। কৃত্রিম অ্যান্টিম্যাটার বা প্রতিবস্তুও প্রথম সার্নেই তৈরি হয়। সব মিলিয়ে সার্নের গবেষণাগারটি যেন এক কৃত্রিম আদিম মহাবিশ্ব!

লেখক: প্রভাষক, পরিসংখ্যান বিভাগ, ময়মনসিংহ গার্লস ক্যাডেট কলেজ

সূত্র: সার্ন, সায়েন্স অ্যালার্ট ডটকম ও দ্য গার্ডিয়ান

আরও পড়ুন