ব্ল্যাকহোলের পেটের ভেতর লুকিয়ে আছে মৌলিক সংখ্যার রহস্য

মৌলিক সংখ্যা কি কৃষ্ণগহ্বরের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকতে পারে?ছবি: রবার্ট লিয়া / ক্যানভা

পদার্থবিজ্ঞানে যেমন ইলেকট্রন বা প্রোটনকে সবচেয়ে মৌলিক কণা ধরা হয়, গণিতের জগতেও তেমনি নিজস্ব একধরনের মৌলিক কণা আছে। হ্যাঁ, মৌলিক সংখ্যার কথাই বলছি! যে সংখ্যাগুলোকে ১ এবং ওই সংখ্যা ছাড়া অন্য কোনো সংখ্যা দিয়ে ভাগ করা যায় না, তা-ই মৌলিক সংখ্যা।

কিন্তু আপনাকে যদি বলি, গণিতের এই নীরস সংখ্যাগুলো দিয়ে মহাবিশ্বের সবচেয়ে ভয়ংকর এবং রহস্যময় বস্তু কৃষ্ণগহ্বরকে ব্যাখ্যা করা যায়? হ্যাঁ, সাম্প্রতিক গবেষণায় বিজ্ঞানীরা পদার্থবিজ্ঞান ও গণিতের মধ্যে ঠিক এমনই এক অবিশ্বাস্য যোগসূত্র খুঁজে পেয়েছেন!

কৃষ্ণগহ্বরের কেন্দ্রে এমন একটি বিন্দু থাকে, যাকে বলা হয় সিঙ্গুলারিটি। এখানে মহাকর্ষ বল এতই শক্তিশালী যে, আমাদের চেনা পদার্থবিজ্ঞানের কোনো সূত্রই আর সেখানে কাজ করে না; স্থান ও কালের ধারণা পুরোপুরি ভেঙে পড়ে। ১৯৬০-এর দশকে বিজ্ঞানীরা দেখলেন, এই সিঙ্গুলারিটির ঠিক গায়ে ঘেঁষে এক অদ্ভুত ধরনের বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়।

মজার ব্যাপার হলো, ঠিক একই রকম বিশৃঙ্খলার দেখা মিলেছে গণিতের মৌলিক সংখ্যার জগতেও!

গণিতের অন্যতম বড় এবং কঠিন রহস্য হলো ১৮৫৯ সালের রিম্যান হাইপোথিসিস। জার্মান গণিতবিদ রিম্যান একটি বিশেষ সূত্র তৈরি করেছিলেন, যা দিয়ে একটি নির্দিষ্ট সীমার নিচে কতগুলো মৌলিক সংখ্যা আছে, তা খুব কাছাকাছি অনুমান করা যায়। এই সূত্রটি কীভাবে কাজ করে বা এর পেছনের নিখুঁত জ্যামিতি কী, তা আজও পুরোপুরি প্রমাণিত হয়নি। এটি এতই গুরুত্বপূর্ণ যে, যিনি এটি প্রমাণ করতে পারবেন, তাঁকে ১০ লাখ ডলার পুরস্কার দেবে ক্লে ম্যাথমেটিকস ইনস্টিটিউট!

আরও পড়ুন
জার্মান গণিতবিদ রিম্যান একটি বিশেষ সূত্র তৈরি করেছিলেন, যা দিয়ে একটি নির্দিষ্ট সীমার নিচে কতগুলো মৌলিক সংখ্যা আছে, তা খুব কাছাকাছি অনুমান করা যায়।

আশির দশকের শেষের দিকে ফরাসি পদার্থবিদ বার্নার্ড জুলিয়া এক অদ্ভুত প্রস্তাব দিলেন। তিনি ভাবলেন, এমন কি কোনো কণা থাকতে পারে, যার শক্তির মাত্রাগুলো হবে হুবহু মৌলিক সংখ্যার মতো? তিনি এই কাল্পনিক কণাগুলোর নাম দিলেন প্রাইমন। অনেকগুলো প্রাইমন মিলে তৈরি হওয়া গ্যাসের নাম প্রাইমন গ্যাস। অবিশ্বাস্যভাবে, এই প্রাইমন গ্যাসের গাণিতিক হিসাবনিকাশ রিমানের সেই জিটা ফাংশনের সূত্রের সঙ্গে একদম হুবহু মিলে যায়! তখন সবাই ভেবেছিল, এটি হয়তো শুধুই গণিতবিদদের একটা কল্পনার খেলা।

কিন্তু ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাজ্যের কেমব্রিজ ইউনিভার্সিটির পদার্থবিদ শন হার্টনল এবং তাঁর এক ছাত্র মিলে এই কল্পনাকে বাস্তবে রূপ দেন। তাঁরা আইনস্টাইনের আপেক্ষিকতা তত্ত্ব ব্যবহার করে দেখান, ব্ল্যাকহোলের সিঙ্গুলারিটির কাছের সেই বিশৃঙ্খলার ভেতর একধরনের প্রতিসাম্য তৈরি হয়। এটি অনেকটা জুম-ইন বা জুম-আউট করার মতো, যতই গভীরে যান না কেন, একই নকশা বারবার ফিরে আসে। আর এই নকশার গাণিতিক রূপটি নিখুঁতভাবে সেই কাল্পনিক প্রাইমন গ্যাস ক্লাউডের মৌলিক সংখ্যার সঙ্গে মিলে যায়!

পাঁচ মাস পর গবেষক দলটিতে যোগ দেন পদার্থবিদ মেরিন ডি ক্লার্ক। তাঁরা গবেষণায় আরও একটি মাত্রা যোগ করেন। তাঁরা দেখলেন, আমাদের চার মাত্রার (দৈর্ঘ্য, প্রস্থ, উচ্চতা ও সময়) মহাবিশ্বের বদলে যদি পাঁচ মাত্রার মহাবিশ্ব নিয়ে কাজ করা হয়, তবে সাধারণ মৌলিক সংখ্যা দিয়ে আর হিসাব মেলে না। তখন প্রয়োজন হয় গাউসিয়ান প্রাইম নামের এক বিশেষ ধরনের জটিল মৌলিক সংখ্যার! এই সংখ্যাগুলোতে একটি কাল্পনিক অংশ যুক্ত থাকে। বিজ্ঞানীরা এই নতুন ব্যবস্থার নাম দিয়েছেন কমপ্লেক্স প্রাইমন গ্যাস।

আরও পড়ুন
অনেকগুলো প্রাইমন মিলে তৈরি হওয়া গ্যাসের নাম প্রাইমন গ্যাস। অবিশ্বাস্যভাবে, এই প্রাইমন গ্যাসের গাণিতিক হিসাবনিকাশ রিমানের সেই জিটা ফাংশনের সূত্রের সঙ্গে একদম হুবহু মিলে যায়!

২০২৫ সালের শেষের দিকে এরিক পার্লমাটার নামে আরেক গবেষক এই জিটা ফাংশনকে আরও বড় পরিসরে ব্যবহার করার একটি নতুন কাঠামো প্রস্তাব করেছেন। তিনি ভগ্নাংশ বা অমূলদ সংখ্যাগুলোকেও এর আওতায় নিয়ে এসেছেন, যা কোয়ান্টাম গ্র্যাভিটির রহস্য ভেদে নতুন দরজা খুলে দিয়েছে।

এত দিন আমরা ভাবতাম, ব্ল্যাকহোল বা কোয়ান্টাম মহাকর্ষের মতো বিষয়গুলো হয়তো শুধু পদার্থবিজ্ঞানের জটিল সমীকরণ দিয়েই বুঝতে হবে। কিন্তু বিজ্ঞানীরা এখন বিশ্বাস করতে শুরু করেছেন, মহাবিশ্বের সবচেয়ে জটিল এবং সুন্দর কাঠামোটি বুঝতে হলে গণিতই হয়তো প্রকৃতির আসল এবং সবচেয়ে স্বাভাবিক ভাষা।

লেখক: সহকারী শিক্ষক, গণিত বিভাগ, পদ্মা ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজ, শরীয়তপুর

সূত্র: লাইভ সায়েন্স

আরও পড়ুন