আপনার শরীরের ভেতর দিয়ে যদি একটা ব্ল্যাকহোল চলে যায়!
ব্ল্যাকহোলকে আমরা বিশাল এক মহাজাগতিক দানব হিসেবেই চিনি। সে তার আশপাশের গ্রহ-নক্ষত্র সব গিলে খাচ্ছে। এমনকি আলোও তার পেট থেকে বের হতে পারে না। কিন্তু একটা খুদে ব্ল্যাকহোল যদি আপনার শরীরের ভেতর দিয়ে ছুটে চলে যায়? তখন কী হবে? আপনি কি সঙ্গে সঙ্গে ভ্যানিশ হয়ে যাবেন?
এই অদ্ভুত প্রশ্নের উত্তর অবশেষে পাওয়া গেছে। আর উত্তরটা শুনলে আপনি চমকে যাবেন! যুক্তরাষ্ট্রের ভ্যান্ডারবিল্ট ইউনিভার্সিটির পদার্থবিদ রবার্ট শেরার এ নিয়ে একটা গবেষণা করেছেন। তিনি রীতিমতো অঙ্ক কষে বের করেছেন, শরীরের ভেতর দিয়ে ব্ল্যাকহোল গেলে আসলে কী ঘটবে।
কিন্তু হঠাৎ এমন অদ্ভুত চিন্তা তাঁর মাথায় এল কেন? রবার্ট শেরার জানান, ১৯৭০-এর দশকে তিনি একটা সায়েন্স ফিকশন গল্প পড়েছিলেন। সেখানে একটা খুদে ব্ল্যাকহোল একজনের শরীরের ভেতর দিয়ে যায় এবং লোকটি মারা যায়। শেরার দেখতে চেয়েছিলেন, বিজ্ঞানের চোখে এমন ঘটনা সত্যিই ঘটা সম্ভব কি না।
এখন প্রশ্ন হলো, এত ছোট ব্ল্যাকহোল আবার হয় নাকি? বিজ্ঞানীরা মনে করেন, এমন ব্ল্যাকহোল থাকা সম্ভব। এদের বলা হয় প্রাইমোরডিয়াল ব্ল্যাকহোল বা আদিম কৃষ্ণগহ্বর। বিগ ব্যাং বা মহাবিস্ফোরণের ঠিক পরপরই মহাবিশ্বের কিছু জায়গায় পদার্থের ঘনত্ব খুব বেশি ছিল। সেখান থেকেই এদের জন্ম হতে পারে। অনেকেই ধারণা করেন, মহাবিশ্বের রহস্যময় ডার্ক ম্যাটারের পেছনে এদের হাত থাকতে পারে। যদিও বিজ্ঞানীরা মনে করেন, এ ধরনের ব্ল্যাকহোল তৈরি হওয়ার পরিবেশ মহাবিশ্বে খুব বিরল ছিল।
রবার্ট শেরার জানান, ১৯৭০-এর দশকে তিনি একটা সায়েন্স ফিকশন গল্প পড়েছিলেন। সেখানে একটা খুদে ব্ল্যাকহোল একজনের শরীরের ভেতর দিয়ে যায় এবং লোকটি মারা যায়।
এবার আসি আসল কথায়। শরীরের ভেতর দিয়ে ব্ল্যাকহোল গেলে ক্ষতিটা কেমন হবে? রবার্ট শেরারের হিসাব বলছে, ক্ষতি খুব সামান্যই হবে! একটা ১০০ বিলিয়ন বা ১০ হাজার কোটি টন ওজনের ব্ল্যাকহোল আপনার শরীরের যে ক্ষতি করবে, তা একটা ০.২২ ক্যালিবারের বুলেটের চেয়েও কম। বিশ্বাস হচ্ছে না?
আপনার শরীরের মারাত্মক ক্ষতি করতে হলে ব্ল্যাকহোলটির ভর অন্তত ১৪০ বিলিয়ন মেট্রিক টন হতে হবে। এটা কিন্তু বিশাল ভর। কিন্তু ভর এত বেশি হলেও এর আকার হবে খুবই সামান্য। এর ব্যাস হবে মাত্র ০.৪ পিকোমিটার। একটা হাইড্রোজেন পরমাণুর ব্যাসও এর চেয়ে অনেক বড়, প্রায় ১০৬ পিকোমিটার।
এই খুদে দানবটি যদি সেকেন্ডে ২০০ কিলোমিটার বেগে আপনার শরীর ভেদ করে চলে যায়, তবে সে শরীরের কোষ বা টিস্যুর সঙ্গে খুব একটা মিশবে না। কিন্তু তার গতি হবে বাতাসে শব্দের গতির চেয়েও অনেক বেশি। ফলে এর চলার পথে একটা সুপারসনিক শক ওয়েভ তৈরি হবে। ঠিক বন্দুকের গুলির মতো এই ধাক্কাটাই আপনার শরীরের আসল ক্ষতিটা করবে।
ব্ল্যাকহোল মানেই তো প্রবল মহাকর্ষ বল। এই বলের কারণে কি আমাদের শরীর নুডলসের মতো লম্বা হয়ে ছিঁড়ে যাবে না? বিজ্ঞানের ভাষায় একে বলে স্প্যাগেটিফিকেশন বা টাইডাল ফোর্স। ব্ল্যাকহোলের কাছাকাছি অংশের ওপর টান বেশি পড়ে বলেই জিনিসপত্র এভাবে লম্বা হয়ে ছিঁড়ে যায়।
আপনার শরীরের মারাত্মক ক্ষতি করতে হলে ব্ল্যাকহোলটির ভর অন্তত ১৪০ বিলিয়ন মেট্রিক টন হতে হবে। এটা কিন্তু বিশাল ভর। কিন্তু ভর এত বেশি হলেও এর আকার হবে খুবই সামান্য।
কিন্তু মজার ব্যাপার হলো, এই স্কেলে মহাকর্ষ বল বেশ দুর্বল। আমাদের শরীরের কোষ ও পরমাণুর নিজস্ব বাঁধন এর চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী। আপনি প্রতিদিন যে পৃথিবীতে হেঁটে বেড়াচ্ছেন, তার ভর প্রায় ৬ সেক্সটিলিয়ন মেট্রিক টন! ১ সেক্সটিলিয়ন মানে ১-এর পরে ২১টি শূন্য। কিন্তু পৃথিবীর টানে তো আমাদের কোষগুলো ছিঁড়ে যাচ্ছে না!
আপনার শরীরের সবচেয়ে সংবেদনশীল অংশ হলো মস্তিষ্ক। ব্ল্যাকহোলের মহাকর্ষ বল দিয়ে মস্তিষ্ককে ছিঁড়ে ফেলতে চাইলে ব্ল্যাকহোলটির ভর অন্তত ৭ লাখ কোটি মেট্রিক টন হতে হবে! তখন অবশ্য মহাকর্ষ বলের আগেই ওই সুপারসনিক ধাক্কাতে আপনার কাজ শেষ হয়ে যাবে।
এত সব ভয়ংকর কথা শুনে কি ভয় পাচ্ছেন? রাতে ঘুম হারাম হওয়ার জোগাড়? চিন্তার কোনো কারণ নেই। রবার্ট শেরার হিসাব করে দেখেছেন, একজন মানুষের সঙ্গে এমন খুদে ব্ল্যাকহোলের ধাক্কা লাগার সম্ভাবনা প্রায় শূন্য। প্রতি এক কুইন্টিলিয়ন (১-এর পর ১৮টি শূন্য) বছরে হয়তো একবার এমন ঘটনা ঘটতে পারে! অথচ আমাদের এই মহাবিশ্বের বয়স মাত্র ১ হাজার ৩৮০ কোটি বছর। মানবজাতি হয়তো অত দিন টিকে থাকারই সুযোগ পাবে না! মহাবিশ্ব নিজেও হয়তো অত দিন থাকবে না!
আপনার শরীরের সবচেয়ে সংবেদনশীল অংশ হলো মস্তিষ্ক। ব্ল্যাকহোলের মহাকর্ষ বল দিয়ে মস্তিষ্ককে ছিঁড়ে ফেলতে চাইলে ব্ল্যাকহোলটির ভর অন্তত ৭ লাখ কোটি মেট্রিক টন হতে হবে!
শেরার খুব সুন্দর করে পুরো বিষয়টা গুছিয়ে বলেছেন। তাঁর মতে, ‘তাত্ত্বিকভাবে আদিম ব্ল্যাকহোল থাকা সম্ভব, কিন্তু বাস্তবে হয়তো এদের কোনো অস্তিত্বই নেই। কোনো গ্রহাণুর সমান ভারী ব্ল্যাকহোল যদি আপনার শরীর ভেদ করে যায়, তবে বুলেটের মতো জখম হয়ে আপনি মারা যাবেন। কিন্তু ব্ল্যাকহোলটি যদি খুব ছোট হয়, তবে সেটা কখন শরীর ভেদ করে চলে যাবে, আপনি টেরই পাবেন না!’
তাই নিশ্চিন্তে ঘুমাতে পারেন। মহাকাশের এই খুদে দানব আপনাকে খেতে আসছে না!