ব্ল্যাকহোল হওয়ার ঠিক আগমুহূর্তে নিউট্রন স্টার কতটা ছোট হতে পারে

নিউট্রন স্টারের কাল্পনিক ছবিছবি: ইএসএ

মহাকাশের এক অদ্ভুত ও বিস্ময়কর বস্তু নিউট্রন স্টার। বিশাল কোনো নক্ষত্র যখন জীবনের শেষ পর্যায়ে সুপারনোভা হিসেবে বিস্ফোরিত হয়, তখন তার অবশিষ্ট কেন্দ্রটুকু চুপসে গিয়ে তৈরি হয় এই নিউট্রন স্টার।

আমাদের সূর্যের চেয়েও তিন গুণ বেশি ভরের একটা জিনিস যদি পিটিয়ে ছোট করে একটা শহরের সমান জায়গায় ঢুকিয়ে দেওয়া হয়, তবে তার ঘনত্ব কেমন হবে? এতই বেশি যে, এই নিউট্রন স্টারের এক চামচ উপাদানের ওজন হতে পারে কয়েক শ কোটি টন!

কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই নিউট্রন স্টার আসলে কতটা ছোট বা ঘন হতে পারে? ঠিক কোন সীমায় পৌঁছালে এটি আর নিউট্রন স্টার থাকে না, চুপসে গিয়ে ব্ল্যাকহোলে পরিণত হয়? সম্প্রতি বিজ্ঞানীরা এই প্রশ্নের একটি তাত্ত্বিক উত্তর খুঁজে পেয়েছেন।

শিল্পীর কল্পনায় নিউট্রন স্টারের ছবি
ছবি: আইসিইসি-এসআইসি / ডি. ফুটসেলার / মারিনো

জার্মানির ফ্রাঙ্কফুর্ট ইউনিভার্সিটির তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানের অধ্যাপক লুসিয়ানো রেজোল্লা বলেন, ‘নিউট্রন স্টারের ভর মাপা আমাদের জন্য বেশ সহজ এবং আমরা তা নিখুঁতভাবেই করতে পারি। কিন্তু সমস্যা বাধে এর ব্যাসার্ধ মাপতে গিয়ে।’

কারণ নিউট্রন স্টারগুলো পৃথিবী থেকে অনেক দূরে। সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো ইকুয়েশন অব স্টেট বা অবস্থার সমীকরণ নিয়ে। নিউট্রন স্টারের ভেতরের ঘনত্ব ও চাপের সম্পর্ক কেমন, তা এখনো বিজ্ঞানীরা নিশ্চিতভাবে জানেন না।

আরও পড়ুন
অধ্যাপক লুসিয়ানো রেজোল্লা বলেন, ‘নিউট্রন স্টারের ভর মাপা আমাদের জন্য বেশ সহজ এবং আমরা তা নিখুঁতভাবেই করতে পারি। কিন্তু সমস্যা বাধে এর ব্যাসার্ধ মাপতে গিয়ে।’

নিউট্রন স্টারের ভেতরের পরিবেশ এতটাই চরম, সেখানে আমাদের পরিচিত পদার্থবিজ্ঞানের নিয়মগুলো রীতিমতো হিমশিম খায়। প্রচণ্ড চাপে পরমাণুগুলো চ্যাপ্টা হয়ে যায়। পজিটিভ প্রোটন ও নেগেটিভ ইলেকট্রন মিলেমিশে একাকার হয়ে তৈরি করে শুধু নিউট্রন।

আরও গভীরে গেলে হয়তো দেখা মিলবে স্ট্রেঞ্জ ম্যাটার বা হাইপারন কণার। কিংবা নিউট্রনগুলোও ভেঙে গিয়ে তৈরি হতে পারে কোয়ার্ক সুপ। আমাদের ল্যাবরেটরিতে এই পরিবেশ তৈরি করা অসম্ভব। তাই বিজ্ঞানীরা নিশ্চিত নন, ভেতরে আসলে কী ঘটে। একেকটি গাণিতিক মডেল একেক রকম সম্ভাবনার কথা বলে।

অধ্যাপক রেজোল্লা এবং তাঁর সহকর্মী ক্রিশ্চিয়ান সম্প্রতি এক বিশাল গবেষণা করেছেন। তাঁরা যাচাই-বাছাই করেছেন নিউট্রন স্টারের সম্ভাব্য হাজার হাজার গাণিতিক মডেল। উদ্দেশ্য, নিউট্রন স্টার সর্বোচ্চ কতটা ঘন হতে পারে তা বের করা।

অবশেষে তাঁরা একটি চমকপ্রদ সীমানার খোঁজ পেয়েছেন। তাঁরা দেখেছেন, নিউট্রন স্টার যত ভারীই হোক না কেন, তার ভর ও ব্যাসার্ধের একটি নির্দিষ্ট অনুপাত আছে। এই অনুপাত কখনোই এক-তৃতীয়াংশের বেশি হতে পারে না।

পদার্থবিজ্ঞানের ভাষায় একে বলে জিওমেট্রাইজড ইউনিট, যেখানে ভরকেও দৈর্ঘ্যের এককে প্রকাশ করা যায়। সহজ কথায়, আপনি যদি কোনো নিউট্রন স্টারের ভর জানেন, তবে এই সূত্র দিয়ে বলে দেওয়া যাবে তার ব্যাসার্ধ ন্যূনতম কত হতে পারে। গবেষকদের মতে, ব্যাসার্ধ অবশ্যই ভরের তিনগুণের বেশি হতে হবে।

আরও পড়ুন
অধ্যাপক রেজোল্লা এবং তাঁর সহকর্মী ক্রিশ্চিয়ান দেখেছেন, নিউট্রন স্টার যত ভারীই হোক না কেন, তার ভর ও ব্যাসার্ধের একটি নির্দিষ্ট অনুপাত আছে। যা কখনোই এক-তৃতীয়াংশের বেশি হতে পারে না।

কোনো বস্তু যদি এর চেয়ে বেশি ঘন বা ছোট হয়ে যায়, তবে সেটি আর নিউট্রন স্টার হিসেবে টিকতে পারবে না। সেটি ভেঙে ব্ল্যাকহোলে পরিণত হবে।

এই গবেষণাটি দাঁড়িয়ে আছে কোয়ান্টাম ক্রোমোডাইনামিকসের ওপর ভিত্তি করে। এই তত্ত্ব বলে, কীভাবে কোয়ার্কগুলো শক্তিশালী বলের মাধ্যমে আঠার মতো লেগে থেকে নিউট্রন তৈরি করে।

রেজোল্লা বলেন, ‘ভবিষ্যতে আমরা যদি এমন কোনো নিউট্রন স্টার খুঁজে পাই, যার ঘনত্ব এই ১/৩ অনুপাতের চেয়ে বেশি, তবে বুঝতে হবে আমাদের কোয়ান্টাম ফিজিক্সের গোড়াতেই কোনো গলদ আছে।’

আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনের নাইসার টেলিস্কোপ
ছবি: উইকিপিডিয়া

বিজ্ঞানীরা এখন অপেক্ষা করছেন। আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনের নাইসার (NICER) টেলিস্কোপ এবং মহাকর্ষীয় তরঙ্গের মাধ্যমে অদূর ভবিষ্যতেই নিউট্রন স্টারের ব্যাসার্ধ নিখুঁতভাবে মাপা সম্ভব হবে। ততদিন পর্যন্ত মহাকাশের এই অতি-ঘন দানবগুলো আমাদের কাছে রহস্য হয়েই থাকছে!

 

লেখক: শিক্ষক, পদার্থবিজ্ঞান বিভাগ, শহীদ স্মৃতি মহাবিদ্যালয়, শশিকর, মাদারীপুর

সূত্র: স্পেস ডটকম

আরও পড়ুন